সববাংলায়

বক্সিং খেলা

বক্সিং খেলা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে খুবই জনপ্রিয়। বক্সিংকে অনেকে আউটডোর খেলা মনে করলেও আসলে এটি একটি ইনডোর গেম। দুইজন খেলোয়াড়ের মধ্যে সাধারণত মুষ্টিযুদ্ধই হল বক্সিং খেলা (Boxing Games)। হিসেবমতো খুবই প্রাচীন একটি খেলা এই বক্সিং। তবে আধুনিককালে একটি বক্সিং রিং-এর মধ্যে দুই যোদ্ধা লড়াই করেন। মূলত যে দেশগুলি বক্সিং খেলার জন্য বিখ্যাত সেগুলি হল: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, ফিলিপাইন, যুক্তরাজ্য, কিউবা।

বক্সিং খেলাটির উৎপত্তির সন্ধান করলে দেখা যাবে এটি আসলে খুব পুরাতন একটি খেলা। মানব ইতিহাসের সূচনাকাল থেকেই মানুষ হাতাহাতির মাধ্যমে লড়াই করছে। কিন্তু বক্সিংয়ের সঠিক উৎপত্তির ইতিহাস যথাযথভাবে চিহ্নিত করা কঠিন। তবে কয়েকটি সূত্র অনুসারে এর প্রাগৈতিহাসিক উৎপত্তিস্থল ইথিওপিয়া, সেখানে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ সহস্রাব্দে নাকি এই বক্সিংয়ের আবির্ভাব হয়েছিল। নুবিয়া আক্রমণ করে মিশরীয়রা স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে বক্সিং এর শিল্প শিখেছিল এবং তারা খেলাটিকে মিশরে নিয়ে যায় এবং সেখানে এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মিশর থেকে বক্সিং গ্রীস সহ অন্যান্য দেশে পূর্ব দিকে মেসোপটেমিয়া এবং উত্তর দিকে রোমে ছড়িয়ে পড়ে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দ থেকে মিশর এবং সুমের উভয় জায়গাতেই বক্সিংয়ের প্রথম চাক্ষুষ প্রমাণ পাওয়া যায়।

ভারতবর্ষের সঙ্গেও বক্সিং খেলার একটি প্রাচীন যোগাযোগ রয়েছে। মুষ্টিযুদ্ধের উল্লেখ তো প্রাচীন বৈদিক সাহিত্য ঋগ্বেদের মধ্যেই পাওয়া যায়। আবার মহাভারতে বর্ণিত আছে রাজা বিরাটের সময় দুই মুষ্টিযোদ্ধা বক্সিং-এর মতোই হাত ছাড়াও লাথি মেরে, হাঁটুতে আঘাত করে, মাথায় আঘাত করে, আঙুলের সাহায্যে আঘাত করে লড়াই করেছিলেন। অন্যদিকে প্রাচীন গ্রীসেও এই বক্সিং-এর মতো খেলা পিগমাচিয়া নামে পরিচিত ছিল। প্রাচীন রোমেও এই বক্সিং খেলা ছিল খুবই জনপ্রিয়। দ্বাদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যে ইতালির বিভিন্ন শহর ও প্রদেশে রক্ষণাবেক্ষণ করা বিভিন্ন মুষ্টিযুদ্ধের খেলার বিস্তারিত রেকর্ড রয়েছে। ১৬ শতকের গোড়ায় ইংল্যান্ডে বেয়ার-নাকল বক্সিং দেখা দিয়েছিল। এইভাবে সুদূর প্রাচীনকাল থেকে নানা বিবর্তনের পথ পেরিয়ে বক্সিং খেলাটি আধুনিক রূপ লাভ করেছে।

বক্সিং খেলোয়াড়রা হাতে গ্লাভস এবং সুরক্ষার জন্য মাথায় হেডগার্ড, এবং মুখের জন্য গামশিল্ড ব্যবহার করেন। এছাড়াও কুঁচকির কাছেও থাকে গার্ড। বক্সারদের গ্লাভসটি মূলত আট থেকে দশ আউন্সের হয়ে থাকে। তারা যে বর্গাকার বক্সিং রিং-এর মধ্যে খেলাটি খেলে তার চারপাশে দড়ি দিয়ে ঘেরা থাকে, যাতে লড়াই চলাকালীন যোদ্ধারা নীচে পড়ে না যায় এবং রিং-এর প্রতিটি পাশের পরিমাপ সাধারণত হয় ১৬ থেকে ২০ ফুট৷ রিং-এর চারটি কোণে থাকে চারটি পোস্ট। তার মধ্যে দুটি পোস্টের রঙ হয় লাল এবং নীল। ওই কোণদুটি দুই বক্সারদের জন্য নির্দিষ্ট থাকে। ম্যাচের মাঝে মাঝে স্বল্প সময়ের বিরতিতে ওই কোণে গিয়ে তাঁরা বিশ্রাম নেন, ওখানেই নিজেদের কোচের পরামর্শও নিয়ে থাকেন। অনেক সময় কোন বক্সার যে কোণটি নেন, সেই কোণের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে খেলার পোশাকটিও পরে আসেন। কেউ যদি লাল রঙের পোস্টটি বেছে নেয় তবে তার পরনে সাধারণত লাল প্যান্ট এবং জার্সি লক্ষ করা যায়।

১৮৬৭ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে মার্কি অফ কুইন্সবেরির ( Marquess of Queensberry) নিয়মগুলিকেই আধুনিক বক্সিং খেলার সাধারণ নিয়ম হিসেবে ধরা হয়। একটি বক্সিং ম্যাচ সাধারণত নয় থেকে বারো রাউন্ডের হয়ে থাকে এবং প্রত্যেক রাউন্ডের সময়সীমা থাকে তিন মিনিট। প্রতি রাউন্ডের মাঝে এক মিনিট করে বিশ্রামের সময় নির্ধারিত থাকে।

খেলাটি একজন রেফারি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় যিনি রিংয়ের মধ্যে থাকেন এবং খেলোয়াড়দের আচরণ বিচার ও নিয়ন্ত্রণ করেন। এছাড়াও আরও তিনজন বিচারক সাধারণত রিংসাইডে উপস্থিত থাকেন বক্সারদের নিয়মমাফিক পয়েন্ট বরাদ্দ করবার জন্য। বক্সিং বিচার পদ্ধতি অনেকটাই উন্মুক্ত শৈলীর হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে লড়াইয়ের ফলাফল নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

যে-লড়াইতে রাউন্ড পাসের সংখ্যা বিচারকদের দ্বারা পূর্বনির্ধারিত হয় সেটিকে বলা হয়ে থাকে ‘গো দ্য ডিস্টেন্স’। লড়াইয়ের শেষে সর্বোচ্চ স্কোর যাঁর হবে, তিনিই হবেন বিজেতা। প্রতিটি রাউন্ড মূলত দশ পয়েন্টের হয়। যে বক্সার দশ স্কোর করবেন তিনি হবেন সেই রাউন্ডের বিজেতা। যদি খেলা ড্র হয় সেক্ষেত্রে তিন বিচারক সর্বসম্মতভাবেও সিদ্ধান্ত দিতে পারেন আবার কেউ আলাদা কোন সিদ্ধান্তও জানাতে পারেন। আবার নক আউটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই কোন বক্সার বাউটেই জিতে যেতে পারেন।

কোন একজন বক্সারের ঘুঁষিতে যদি প্রতিপক্ষ বক্সার ছিটকে পড়েন, তাহলে পুনরায় সেই বক্সার নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ানোর আগে পর্যন্ত রেফারি কাউন্ট করতে থাকেন। কোন কোন নিয়ম অনুযায়ী রেফারি আট পর্যন্ত গুনতে পারেন যোদ্ধার ওঠার আগে। রেফারি যদি দশ পর্যন্ত গণনা করে ফেলেন এবং এই সময়ের মধ্যেও যদি পড়ে থাকা বক্সার না ওঠেন তবে সেই বক্সারকে নক আউট ঘোষণা করা হয় এবং অন্যজন বিজেতা হয়ে যান।

অনেকক্ষেত্রে গণনার পর কোন খেলোয়াড় নক আউট না হলেও রেফারি সেই বক্সারের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে দেখেন পুনরায় লড়াই করা সেই বক্সারের জন্য বিপজ্জনক কিনা।

সাধারণভাবে, বক্সারদের বেল্টের নীচে আঘাত করা, ধরে রাখা, ছিটকে যাওয়া, ধাক্কা দেওয়া, কামড়ানো বা থুতু ফেলা নিষিদ্ধ।

কুঁচকির জয়গাতে আঘাত করাও বারণ থাকে বক্সারদের। এর অন্যথা হলে রেফারি ফাউলের ঘোষণা করেন।

মুষ্টি ব্যতীত বাহুর কোন অংশে লাথি মারা, এমনকি কাঁধ বা কনুই দিয়ে আঘাত করাও নিষিদ্ধ।

যখন একজন বক্সার ছিটকে পড়েন, তখন অন্য বক্সারকে অবিলম্বে লড়াই বন্ধ করতে হবে এবং রিংয়ের সবচেয়ে দূরবর্তী নিরপেক্ষ কোণে চলে যেতে হবে যতক্ষণ না রেফারি হয় নকআউটের রায় দেন বা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

কোন বক্সার যদি উপরের নিয়মগুলি না মানেন এবং ইচ্ছাকৃত ফাউল করে প্রতিপক্ষকে গুরুতরভাবে আঘাত করেন তবে সেই বক্সারকে রেফারি অযোগ্য ঘোষণা করতে পারেন।

বক্সিং-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হল সমান ওজনের খেলোয়াড়দের মধ্যে একমাত্র লড়াই হবে।

তবে পেশাদার বক্সিং-এর পাশাপাশি অপেশাদার বক্সিংও অলিম্পিকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অপেশাদার বক্সিং-এর ক্ষেত্রে আবার নিয়মের কিছু হেরফের রয়েছে। অলিম্পিকে, কমনওয়েলথে এবং জাতীয় অ্যামেচার বক্সিং অ্যাসোসিয়েশনে তিন মিনিটের তিনটি করে রাউন্ড হয় এবং প্রতি রাউন্ডের মাঝে থাকে এক মিনিটের বিরতি। তবে দুই-তিন রাউন্ডের কয়েকটি পেশাদার লড়াইও রয়েছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বক্সিং-এও স্বাভাবিকভাবে কিছু পরিবর্তন এসেছিল। উনবিংশ এবং বিংশ শতকের প্রথম দিকের লড়াইয়ের ভঙ্গির তুলনায় আধুনিক ভঙ্গিতে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। বিশ শতকের প্রথমদিকে জ্যাক জনসনের মতো হুক পাঞ্চ ব্যবহারকারীদের তুলনায় এখনকার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে আরও বেশি খাড়া ও উল্লম্ব হাতের আড়াল লক্ষ করা যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নানা জনপ্রিয় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, বক্সিং যেসব প্রতিযোগিতার একটি অন্যতম অংশ হিসেবে থাকে। কোথাও আবার কেবল বক্সিংকে কেন্দ্র করেই আয়োজিত হয় প্রতিযোগিতা। তেমনই কয়েকটি প্রতিযোগিতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:আইবিএ মেনস ওয়ার্ল্ড বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপ এবং আইবিএ উইমেন ওয়ার্ল্ড বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপ, মেক্সিকোর গুয়ান্তেস ডি ওরো, ন্যাশানাল কলেজিয়েট বক্সিং অ্যাসোসিয়েশনের ন্যাশানাল চ্যাম্পিয়নশিপ টুর্নামেন্ট, ন্যাশানাল জুনিয়র কলেজ অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশন টুর্নামেন্ট। এছাড়াও অলিম্পিক এবং কমনওয়েলথের মতো প্রতিযোগিতাগুলি তো রয়েছেই।

বক্সিং খেলায় যে সমস্ত খেলোয়াড় সারা বিশ্বে দারুণ খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: মহম্মদ আলি, মেরি কম, মাইক টাইসন, আর্চি মুর, সুগার রে রবিনসন, ফ্লয়েড মে ওয়েদার জুনিয়র, ক্যানেলো আলভারেজ, জর্জ ফোরম্যান প্রমুখ। বক্সিং-এর ইতিহাসে আর্চি মুরের দীর্ঘতম পেশাদার কেরিয়ার। তিনি সর্বোচ্চ নকআউট বিজেতা। মাইক টাইসন দুবছরেরও বেশি সময় ধরে হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। তবে মহম্মদ আলিকে সর্বকালের সেরা বক্সার মনে করেন অনেকে। অলিম্পিকে স্বর্ণপদকও জিতেছিলেন তিনি।

ভারতবর্ষও বক্সিং খেলায় কৃতিত্বের জন্য বিশ্বের দরবারে সম্মানীয় আসন লাভ করেছে। ভারতে কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া অপেশাদার বক্সিং-এরই আধিক্য লক্ষণীয়। তবে এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস এবং অলিম্পিক সহ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ভারত নিয়মিত পদক লাভ করে বক্সিং-এ। ভারতের মেরি কম তো বক্সিং দুনিয়ার কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। ওয়ার্ল্ড অ্যামেচার বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে ছয়বার তিনি বিজেতার শিরোপা অর্জন করেছিলেন৷ এছাড়াও বিজেন্দর সিং, অখিল কুমার, জিতেন্দ্র কুমাররাও ভারতীয় বক্সার হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি অর্জন করেছেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading