সববাংলায়

ক্লিওপেট্রার মৃত্যুরহস্য

ক্লিওপেট্রা বললেই মিশরের ইতিহাসের এক টুকরো উঠে আসে। এই ঐতিহাসিক নারী চরিত্র ছিলেন মিশরের বিখ্যাত টলেমাইক রাজবংশের শেষ শাসক। প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে দীর্ঘদিন শাসন করা রাজবংশ ছিল এটি। কিন্তু মাত্র ৩৯ বছর বয়সে অকস্মাৎ ক্লিওপেট্রা সপ্তমের মৃত্যুই এই বংশের শাসনের ইতিহাসে ছেদ টেনেছিল এবং রোমান মিশরের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল। আলেকজান্দ্রিয়াতে ৩০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে ১০ কিংবা ১২ আগস্ট ক্লিওপেট্রার মৃত্যু হয়। ক্লিওপেট্রার মৃত্যু নিয়ে পন্ডিত ও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে নানারকম তত্ত্বের উদ্ভাবন ঘটেছে। স্ট্র্যাবো, প্লুটার্ক, ক্যাসিয়াস ডিওর মতো লেখকেরা ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর কারণ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তবে এতগুলি তত্ত্বের মধ্যে অবশ্য কোন তত্ত্বটি সত্য তা আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে ক্লিওপেট্রার মৃত্যুরহস্য যে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থেকে গেছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই কোন।

রোমান শাসক অ্যান্টনিওকে নিজের সৌন্দর্যের মোহে বশীভূত করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেছিলেন ক্লিওপেট্রা। প্রথম দর্শনেই অ্যান্টনিও ভালবেসে ফেলেছিলেন এই রাণীকে৷ অন্যদিকে তাঁদের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে রোমানরা ভাল চোখে দেখেননি। তাঁরা অ্যান্টনিওর শত্রুদের সঙ্গে বিশেষত অক্টাভিয়ানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেন, যে যুদ্ধ অক্টিয়ামের যুদ্ধ নামে পরিচিত। যুদ্ধে ক্লিওপেট্রা ও অ্যান্টনিওর বাহিনীর পরাজয় ঘটে, অক্টাভিয়ান জয়লাভ করেন। পরাজিত হয়ে ক্লিওপেট্রা ও অ্যান্টনিও মিশরে পালিয়ে আসেন। অক্টাভিয়ান মিশর আক্রমণ করে তাঁদের পরাস্ত করেন। অ্যান্টনিও আত্মহত্যা করেন এবং অক্টাভিয়ানকেও বশীভূত করবার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে আত্মসম্মান রক্ষার্থে ক্লিওপেট্রা আত্মহত্যা করেছিলেন। যদিও ক্লিওপেট্রার মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে৷

মাত্র ৩৯ বছর বয়সে টলেমাইক রাজবংশের শেষ শাসক রাণি ক্লিওপেট্রার রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলেছে। তাঁর মৃত্যু নিয়ে যে জনপ্রিয় বিশ্বাসটি রয়েছে, তা হল, ক্লিওপেট্রা নিজেই একটি বিষাক্ত মিশরীয় কোবরাকে দিয়ে নিজেকে দংশন করিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। ঐতিহাসিক স্ট্র্যাবোই প্রথম এই তত্ত্বটি ছড়িয়েছিলেন যে, হয় সর্পকে দিয়ে দংশন করিয়ে কিংবা কোন বিষাক্ত ত্বকের প্রলেপ প্রয়োগ করে আত্মহত্যা করেছিলেন। অন্যদিকে প্লুটার্ক আবার বলেছিলেন যে, ক্লিওপেট্রা হেয়ারপিন জাতীয় কোন সরঞ্জাম দিয়ে ত্বক ছেদন করে বিষাক্ত কোন পদার্থ শরীরে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিলেন। আরও একজন ঐতিহাসিক ক্যাসিয়াস ডিওর মতে, ক্লিওপেট্রার বাহুতে ধারালো কিছু দিয়ে খোঁচানোর ছোট ছোট ক্ষত পাওয়া গিয়েছিল এবং তিনিও প্লুটার্কের মতেরই, একপ্রকার প্রতিধ্বনি করেছিলেন, জানিয়েছিলেন মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কেউই জানে না। এছাড়াও সমসাময়িক ঐতিহাসিক ফ্লোরাস এবং ভেলিয়াস প্যাটারকুলাস কিন্তু আবার সর্প দংশনের তত্ত্বটিকেই সমর্থন করেছিলেন। রোমান চিকিৎসক গ্যালেন এবং রোমান ঐতিহাসিক সুয়েটোনিয়াস সর্পদংশনের গল্পটির কথাই বলেছেন।

লেখক টমাস ব্রাউন সিউডোডক্সিয়া এপিডেমিকাতে জানান ক্লিওপেট্রা কীভাবে মারা যান তা অনিশ্চিত এবং তাঁর হাতের ছোট ছোট সর্পদংশনের শৈল্পিক চিত্রগুলি আদতেই সেই স্থলচর মিশরীয় কোবরার (এএসপি) আকার সঠিকভাবে বোঝাতে ব্যর্থ হয়। অ্যানাটমিস্ট জিওভান্নি বাতিস্তা মর্গাগ্নি যুক্তি দেন সাপের কামড়েই ক্লিওপেট্রার মৃত্যু হয়, অন্যদিকে পোপ চিকিৎসক জিওভানি মারিয়া ল্যান্সিসির মতে, সর্পবিষ পান করাটি আরও যুক্তিযুক্ত। যদিও কোনও প্রাচীন গ্রীক-রোমান লেখক তাঁদের লেখায় এই রাণীর এই বিষপানের কোন উল্লেখ করেননি। তবে ল্যান্সিসি পাল্টা যুক্তি দিয়ে এই যুক্তিকে খন্ডন করেছিলেন এবং বলেছিলেন রোমান কবিদের দেওয়া বিবরণকে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নেওয়া ঠিক নয়, কারণ তাঁরা অনেক সময়তেই ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করেছেন। ১৭৭৭ সালে প্রকাশিত স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে জিন গৌলিন ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর কারণ হিসেবে মর্গাগ্নির সর্পদংশনের তত্ত্বকেই সমর্থন করেছিলেন।

আধুনিক পন্ডিতদের অনেকেই বিষধর সাপের কামড়ের কাহিনি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলে থাকেন, কোন উপলব্ধ ঐতিহাসিক বিবরণই ক্লিওপেট্রার চেম্বারে একটি বড় আকারের মিশরীয় কোবরা পাচার করবার অসুবিধা নিয়ে আলোকপাত করে না। বেলন দাবি করেন যে, বিষ কেবলমাত্র শরীরের একটি অংশে ইনজেক্ট করে দিলেও তা মারাত্মক ও প্রাণঘাতী হতে পারে। ডুয়ান রোলার আবার জানিয়েছেন এস্প (Asp) সর্পটিকে একসময় মিশরের রাজকীয়তার প্রতীক হিসেবে দেখা হত, তাই সেই সাপটিকেই আত্মহত্যার জন্য বেছে নেওয়া একজন রাণীর পক্ষে উপযুক্ত ছিল। তবে অনেক ঐতিহাসিক এমম আপত্তিও তুলেছেন যে, এই সর্পটি প্রায় পাঁচ থেকে আট ফুট লম্বা হয়, একটি ছোট ঝুড়িতে তা ধরা সম্ভব নয়। অধ্যাপক ক্রিস্টোফ শেফার জোর দিয়ে বলেছিলেন কোন কোবরা নয়, বরং হেমলক বিষ, উলফসবেন এবং আফিমের একটি মিশ্রণ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন ক্লিওপেট্রা।

ক্লিওপেট্রার মৃত্যুরহস্য সমাধানে আত্মহত্যার তত্ত্বের পরেই উঠে এসেছিল হত্যার তত্ত্ব। অনেক ঐতিহাসিক এমনটাই সন্দেহ করেছেন যে, আদতে ক্লিওপেট্রার মৃত্যুতে অক্টাভিয়ানের হাত ছিল। আসলে রাণী বেঁচে থাকলে যে তাঁর অসুবিধা হতে পারে এবং অবশ্যই রাণীর ওপর ক্ষুব্ধ রোমানরা তাঁকে মৃত দেখলে যে খুশি হবে, অক্টাভিয়ান তা নিশ্চিতভাবেই জানতেন। থ্রেসের ডেমোক্রিটাস ইউনিভার্সিটির মেডিসিনের ইতিহাসের লেকচারার গ্রেগরি সোউকালাস এবং থেসালি ইউনিভার্সিটির অ্যানাটমি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মার্কোস সাগান্টোসের মতে, প্রমাণ থেকে জানা যায় যে অক্টাভিয়ান ক্লিওপেট্রাকে বিষ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ‘মার্ডার অব ক্লিওপেট্রা’ বইতে ক্রিমিনাল প্রোফাইলার প্যাট ব্রাউন বলেছেন যে, ক্লিওপেট্রাকে খুন করা হয়েছিল এবং সেই বিবরণ রোমান কর্তৃপক্ষ গোপন করে রেখেছিল, প্রকাশ্যে আসতে দেয়নি৷ ফলত, অধিকাংশ প্রাথমিক সূত্রই তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে রিপোর্ট করেছিল। ইতিহাসবিদ প্যাট্রিসিয়া সাউদার্ন অনুমান করেন যে অক্টাভিয়ান সম্ভবত ক্লিওপেট্রাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরিবর্তে তাঁর মৃত্যুর পদ্ধতি বেছে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। ভেনাস জেনেট্রিক্সের মন্দিরে মূর্তি রয়েছে এমন একজন রাণীকে হত্যা করলে রাজনৈতিক নানা সমস্যা উঠতে পারে ভেবেই অক্টাভিয়ান হয়তো ক্লিওপেট্রাকে আত্মহননের কথা বলেছিলেন।

১৮৮৮ সালে আবার আরেকটি তত্ত্ব হাজির করেন অ্যামব্রোইস ভায়াড গ্র্যান্ড মারাইস। তিনি বলেন ক্লিওপেট্রা আসলে কার্বন মনোক্সাইডের বিষক্রিয়ায় মারা গিয়েছিলেন।

এত জল্পনা-কল্পনার পরেও রাণী ক্লিওপেট্রার মৃত্যুরহস্য আজও অমীমাংসীত থেকে গেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading