সববাংলায়

পঙ্কজ রায়

ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে সুনীল গাভাস্কারের আগে অন্যতম জনপ্রিয় ক্রিকেট-তারকা ছিলেন পঙ্কজ রায় (Pankaj Roy)। প্রথম বাঙালি ক্রিকেটার হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে শতরান করে ইতিহাসে নজির গড়ে তোলেন তিনি। চেন্নাইয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বিনু মাঁকড়ের সঙ্গে ওপেনিং জুটিতে ৪১৩ রান তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। তিনি প্রথম বাঙালি ক্রিকেটার যিনি টেস্টে ভারতের হয়ে আধিনায়কত্ব করেছিলেন।

১৯২৮ সালের ৩১ মে উত্তর কলকাতার কুমোরটুলিতে এক ধনী, অভিজাত পরিবারে পঙ্কজ রায়ের জন্ম হয়। তাঁর পূর্বপুরুষরা ঢাকা বিক্রমপুরের ভাগ্যকুল গ্রামের জমিদার ছিলেন। তাঁরা এতটাই ধনী ছিলেন যে শোনা যায় একসময় পঙ্কজ রায়ের ঠাকুরদাদা প্রমথনাথ রায় নাকি নিজে ভারতীয় ব্যাঙ্ককে মোটা অঙ্কের টাকা ধার দিয়েছিলেন। তাঁর ছেলে প্রণব রায় ভারতের হয়ে দুটি টেস্ট ম্যাচে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর ভাইপো অম্বর রায়ও ভারতীয় দলের হয়ে টেস্ট খেলেছেন। ছোটবেলায় তিনি ক্রিকেটফুটবল দুই খেলাতেই সমানভাবে দক্ষ ছিলেন। বিখ্যাত বাঙালি ফুটবলার চুনী গোস্বামীর মতে পঙ্কজ রায় ক্রিকেটের বদলে যদি ফুটবলকেও বেছে নিতেন, তাহলে সেখানেও তিনি চূড়ান্ত সাফল্য পেতে পারতেন।

১৯৪৬-৪৭ সালে রঞ্জি ট্রফির ম্যাচের মধ্য দিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট জগতে অভিষেক হয় পঙ্কজ রায়ের। ইডেন গার্ডেন্সে যুক্ত প্রদেশের বিপক্ষে প্রথম খেলতে নেমেছিলেন তিনি। সেই ম্যাচে বাংলার তখন ৮৪ রানে ৫ উইকেট পড়ে গেছে। কিন্তু পঙ্কজ রায় ১১২ রানের অপ্রতিরোধ্য ইনিংস খেলেন। তাঁর দক্ষতার কারণেই সেই ম্যাচে বাংলার দল ১৪৫ রানে জিতে যায়। অভিষেকের পরে পরেই তিনি শতরানের রেকর্ড করেন এবং পরবর্তীকালে বেশ কিছু আন্তঃ-বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট ম্যাচে দক্ষতার পরিচয় রাখেন পঙ্কজ রায়। বাংলার ক্রিকেট দলের হয়ে প্রথমে ভারতীয় ডোমেস্টিক ক্রিকেটের জগতে তাঁর হাতেখড়ি হয় এবং ফার্স্ট-ক্লাস ক্রিকেট ম্যাচে তিনি মোট ৩৩টি শতরান করেন। ভারতে স্বাধীনতার আশেপাশের সময়ে তখনও ডোমেস্টিক ক্রিকেটের প্রচলন ছিল বেশি। তাই ১৯৪৬-৪৭ সময়পর্বে মাত্র দুটি ফার্স্ট-ক্লাস ক্রিকেটে অংশ নিতে পেরেছিলেন পঙ্কজ রায়। এর পরের বছর কলকাতায় হোলকারের বিরুদ্ধে আরেকটি ম্যাচ খেলেন তিনি। ১৯৪৮-৪৯ সালে সেকালের অত্যন্ত শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য শতরান করার জন্য তিনি আজও সমানভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। বেঙ্গল গভর্নরস ইলেভেন দলের হয়ে সেই বছর খেলতে নামেন পঙ্কজ রায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২৫৫ রান ছিল, বাংলার দল তখন ৮ উইকেট হারিয়ে মাত্র ১৪৪ রান করেছে। সেই সময় সুরযুরাম গিরিধারীর সঙ্গে নবম উইকেটে খেলতে নেমে একত্রে ১৭৩ রান করতে সক্ষম হন পঙ্কজ রায় এবং তিনি নিজে ১০১ রানে অপরাজিত থাকেন। প্রায়োর জোন্স, জন গোডার্ড এবং ডেনিস অ্যাটকিনসন প্রমুখ বিখ্যাত বোলারদের প্রতিহত করেছিলেন পঙ্কজ রায়। তারপর কলকাতায় হোলকারের বিরুদ্ধে আবার একটি ম্যাচে ১৬৩ রান করে রেকর্ড গড়ায় বম্বে সফরে আসা এমসিসি (MCC)-র বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির হয়ে খেলতে নামার সুযোগ পান পঙ্কজ রায়।

এরপরেই টেস্ট ক্রিকেটের জগতে পা রাখেন পঙ্কজ। সেই সময় মুশতাক আলী, বিজয় বণিক, লালা অমরনাথ প্রমুখ বিখ্যাত ক্রিকেটারদের জমানা শেষের পথে। এই কিংবদন্তী খেলোয়াড়দের প্রতিস্থাপন করা একপ্রকার অসম্ভব ছিল। ১৯৫১-৫২ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দিল্লী টেস্টে তাঁর অভিষেক হয়। ১৯৫১ সালের ২ নভেম্বর শুরু হওয়া টেস্টে প্রথম দিন ব্যাট না পেলেও দ্বিতীয় দিন ব্যাট করতে নেমে মাত্র ১২ রানে আউট হয়ে যান। তবে দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচেই করে ফেলেন জীবনের প্রথম টেস্ট শতরান। প্রথম বাঙালি হিসেবে আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরির মালিক পঙ্কজ রায় সেই ম্যাচে ১৪০ রান করেন। মাদ্রাজে সিরিজের শেষ টেস্ট ম্যাচেও আবার একটি শতরান করে নজির করেন পঙ্কজ, মাদ্রাজের ম্যাচে তিনি ১১১ রান করেছিলেন। আর এর ফলেই ভারতীয় ক্রিকেট দল প্রথম ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে এবং প্রথম টেস্ট ক্রিকেটে জয়লাভের শিরোপা অর্জন করে। তারপর থেকেই পঙ্কজ রায়কে দ্বিতীয় বিজয় মার্চেন্ট হিসেবে অভিহিত করা হয়।

সেই আত্মবিশ্বাসে ভর করে ১৯৫২ সালে ইংল্যান্ড সফরে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সফরে তিনি চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হন। সাতটি ইনিংসের মধ্যে তিনি পাঁচটিতেই শূন্য করে আউট হন, তার মধ্যে চারটি পরপর ইনিংসে শূন্য করেন পঙ্কজ রায়। প্রশ্ন উঠতে শুরু করে তাঁর ক্রিকেটীয় দক্ষতা নিয়ে। তবে ১৯৫৩ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে আবার নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করেন তিনি। কিংস্টনের চূড়ান্ত টেস্টে ১৫০ রান করেছিলেন পঙ্কজ। বিজয় মঞ্জরেকরের সঙ্গে জুটি বেঁধে ২৩৭ রান করেন যা ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ভারতীয়দের সব থেকে বড় জুটিগত রান। পরবর্তী ২৬ বছর ধরে এই নজির অটুট ছিল।

১৯৫৬ সালে মাদ্রাজে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট ম্যাচে পঙ্কজ রায় বিনু মাঁকড়ের (Vinoo Mankad) সঙ্গে ওপেনিং জুটিতে রেকর্ড ৪১৩ রান করেছিলেন। এই রেকর্ড তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল। ৫২ বছর পর ২০০৮ সালে সাউথ আফ্রিকার নীল ম্যাকেঞ্জি এবং গ্রেম স্মিথ বাংলাদেশের বিপক্ষে ৪১৫ রান করে সেই রেকর্ড ভাঙেন। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচে তিনি ১৭৩ রান করেন ও বিনু মাঁকড় দ্বিশত রান করেছিলেন। অনেকে বলে থাকেন সেই ম্যাচে পঙ্কজ রায়ের দ্বিশত রান না করার পিছনে এক চক্রান্তই দায়ী ছিল। শোনা যায় মুম্বইয়ের এক বিখ্যাত ক্রিকেটার খেলার মাঝে তাঁকে বার্তা পাঠান ‘হিট আউট। উই আর ডিক্লেয়ারিং সুন’। এই বার্তা পেয়ে চালিয়ে খেলতে গিয়েই তিনি আউট হন। তবে তাঁর আউট হওয়ার পরেও পলি উমরিগড় ৭৯ রান করেছিলেন। আবার এই ম্যাচের আগে থেকে দৃষ্টিশক্তির কিছু সমস্যা অনুভব করছিলেন তিনি এবং তাতে ক্রিকেট খেলতেও বেশ সমস্যা হচ্ছিল তাঁর। সেই সব বাধা উপেক্ষা করে মাদ্রাজের সেই ম্যাচে তাঁর দক্ষতা প্রদর্শন এক যোগ্য জবাব ছিল।

চোখের অসুবিধার জন্য তাঁকে চশমা নিতে হয়, অনেকেই প্রশ্ন তোলেন যে এরপর আর তিনি ভাল খেলতে পারবেন কিনা! কিন্তু সকলকে ভুল প্রমাণ করেছিলেন তিনি। পাশাপাশি অনেকেই বলতেন তিনি নাকি ফাস্ট বোলিং খেলতে পারেন না। তারও জবাব তিনি মাঠে ব্যাট হাতেই দিয়েছিলেন ১৯৫৮-৫৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে তাদের বিশ্বত্রাস ফাস্ট বোলিং-এর বিরুদ্ধে ৩৩৪ রান করে। দিল্লী ও মুম্বই লবির শাসনে ভারতীয় ক্রিকেট চলায় সেই সময় তাঁর ব্যাটিং কৌশল বা পদ্ধতি নিয়ে অনেকে সমালোচনা করলেও তিনি নিয়মিত রান করে সেই সব সমালোচনার যোগ্য জবাব দিয়েছেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের পর ছিল ইংল্যান্ড সফর। এই সফরের আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভয়ানক বোলিং-এর বিরুদ্ধে পঙ্কজ রায়ের ব্যাটিং দক্ষতা দেখে আপামর ভারতবাসী ভেবেছিলেন যে ইংল্যান্ড সফরে তাঁকেই অধিনায়ক করা হবে। শোনা যায়, ঐ সময় টাকার হিসেবে পাউন্ডের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের খরচ অনেকটাই বৃদ্ধি পায় আর এই বর্ধিত খরচের সিংহভাগ বহন করতে সম্মত হন বরোদার তৎকালীন মহারাজ। তবে তাঁর দুটি শর্ত ছিল – প্রথমত তিনিই হবেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের ম্যানেজার এবং দ্বিতীয়ত বরোদার ক্রিকেটার দত্তাজিরাও গায়কোয়াড়কেই দলের অধিনায়ক পদে অধিষ্ঠিত করতে হবে। মাত্র ছয়-সাতটি টেস্ট ম্যাচ খেলা গায়কোয়াড় অধিনায়ক নির্বাচিত হলেও লর্ডসের ম্যাচের আগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে লর্ডস টেস্টে আর নামা হয় না তাঁর। তার ফলে সেই ম্যাচে অধিনায়কত্ব করার সুযোগ পান সফরের সহ অধিনায়ক পঙ্কজ রায়। একটি ম্যাচের জন্য হলেও তিনিই ছিলেন ভারতীয় দলের প্রথম বাঙালি অধিনায়ক। 

তবুও ১৯৬০-৬১ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে মাত্র ২৩ রান করার পরে তাঁকে ভারতীয় ক্রিকেট দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। তারপরে জাতীয় স্তরের খেলায় তিনি নিয়মিত ভাল রান করলেও তাঁকে আর সুযোগ দেওয়া হয়নি। পাকিস্তানের সঙ্গে টেস্ট ম্যাচটাই তাঁর ক্রিকেট জীবনের অন্তিম খেলা ছিল। ৪৩টি টেস্টে তিনি মোট ২৪৪২ রান করেছিলেন এবং তার মধ্যে ৫টি শতরানও ছিল। এছাড়া ১ টি উইকেটও তিনি পেয়েছিলেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১৮৫ ম্যাচ খেলে ১১,৮৬৮ রান করেছিলেন, নিয়েছিলেন ২১ টি উইকেট। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর সর্বোচ্চ রান ১৭৩ ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর সর্বোচ্চ রান অপরাজিত ২০২।

মূলত ডিফেন্সিভ খেলার ধরনেই অভ্যস্ত ছিলেন পঙ্কজ রায়, তবে সময় বিশেষে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং-ও করেছেন তিনি। একাগ্রতা আর কঠোর সঙ্কল্প ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। তবে ক্রিকেট ছাড়াও আইএফএ (IFA) দলের হয়ে বর্মার বিরুদ্ধে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন পঙ্কজ রায়। কলকাতায় প্রথম ডিভিশন ফুটবল খেলা থেকে শুরু করে রাইফেল শ্যুটিং-এ সর্বভারতীয় স্তরে তৃতীয় স্থান অর্জন করা এবং একজন ভাল সাঁতারু হিসেবেও তিনি ছিলেন সর্বজনবিদিত এক অলরাউন্ডার স্পোর্টসম্যান। অনেকেই বলেন, ক্রিকেট না খেলে ফুটবল খেললেও তিনি একই রকম সুনাম অর্জন করতে পারতেন।

পরবর্তীকালে তিনি জাতীয় নির্বাচক দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৭৫ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়। ২০০০ সালে কলকাতার শেরিফ মনোনীত হন তিনি। ২০১৬ সালে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড তাঁকে মরণোত্তর ‘সিকে নায়ুডু লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট’ পুরস্কারে সম্মানিত করে।

২০০১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ৭২ বছর বয়সে পঙ্কজ রায়ের মৃত্যু হয়।  


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading