ক্রিকেট

ক্রিকেট

সমগ্র বিশ্বে একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য দলগত আউটডোর খেলা ক্রিকেট (Cricket)। ইংল্যাণ্ডে এই খেলার জন্ম হলেও বিশ্বের প্রায় বেশিরভাগ দেশেই এই খেলাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইংল্যাণ্ড, অস্ট্রেলিয়া, জিম্বাবোয়ে, নিউজিল্যাণ্ড, দক্ষিন আফ্রিকা, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কায় ক্রিকেট একটি জনপ্রিয় খেলা। বেশিরভাগ কমনওয়েলথ দেশেই ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে।

দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যাণ্ডে স্যাক্সন বা নর্ম্যান আমলেই মোটামুটিভাবে ১৬১১ সাল নাগাদ ক্রিকেট খেলার জন্ম হয় বলে মনে করা হয়। তবে প্রথমে এটিকে ছেলেদের খেলা বলেই মনে করা হত। সপ্তদশ শতকের শুরু থেকেই গ্রামীণ ক্রিকেটের উৎপত্তি হয় এবং এই শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধেই প্রথম ইংরেজ ‘কাউন্টি দল’ গড়ে ওঠে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকে লণ্ডন ও ইংল্যাণ্ডের দক্ষিণ-পূর্বাংশে ক্রিকেট জনপ্রিয়তা অর্জন করতে শুরু করে। ১৭৪৪ সালে প্রথম ক্রিকেটের আইন লেখা হয়। ১৭৮৭ সালে প্রথম মেলবোর্ন ক্লাব স্থাপিত হয় লর্ডসে। প্রথমদিকে হকি-স্টিকের মতো করে ক্রিকেটের ব্যাট চালনা করা হত। কিন্তু ১৭৬০ সাল নাগাদ এই পদ্ধতি পালটে যায়। ১৭৮৭ সালে হ্যাম্পশায়ারের হ্যাম্বলডন ক্লাব তৈরি করে এমসিসি যা প্রায় তিরিশ বছর ধরে খেলার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে ইংরেজ উপনিবেশগুলির মাধ্যমে উত্তর আমেরিকায় ক্রিকেট খেলার প্রচলন হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের মাধ্যমে ওয়েস্ট ইণ্ডিজে এবং ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ভারতে এই খেলার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ১৭৮৮ সালের শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিকেট খেলা শুরু হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নেপোলিয়নের যুদ্ধের কারণে এই খেলা সেভাবে জনপ্রিয়তা না পেলেও ১৮১৫ সাল নাগাদ এর জনপ্রিয়তা ফিরে আসে। ১৮৩৯ সালের মধ্যে ইংলিশ কাউন্টি ক্লাবগুলির মধ্যে প্রথম স্থাপিত হয় সাসেক্স ক্লাব। ১৮৪৬ সালে একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগে ‘অল ইণ্ডিয়া ইলেভেন’ নামে একটি দল গঠিত হয়।মহিলা ক্রিকেটের সূচনা হয় উনিশ শতকে। ১৮১১ সালে বিশ্বে প্রথম মহিলা ক্রিকেট ম্যাচ খেলা হয়। ইংল্যাণ্ডের দক্ষিণাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় ধীরে ধীরে মহিলা ক্রিকেট জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ১৮৬৪ সালে প্রথম ওভার-আর্ম বোলিংকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং এই বছরই প্রথম উইজড্যান ক্রিকেটার্স অ্যালম্যানাক প্রকাশিত হয়। ১৮৪৪ সালে ইংল্যাণ্ডের সেন্ট জর্জ ক্লাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৫৯ সালে প্রথম একটি ইংরেজ ক্রিকেট দল উত্তর আমেরিকা সফর করে এবং ১৮৬২ সালে এই ইংরেজ ক্রিকেট দল অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ করে। ১৮৭৭ সালে অস্ট্রেলিয়ায় বিশ্বের প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলা হয়। ১৮৮৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় তৃতীয়বার টেস্ট ম্যাচ আয়োজিত হয়। ১৮৯০ সালে ইংল্যাণ্ডে প্রথম কাউন্টি ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হয়। এই সময় থেকেই ক্রিকেটের স্বর্ণযুগ শুরু হয়। গ্রেস, উইলফ্রেড রোডস, সি. বি. ফ্রাই এবং রঞ্জিত সিংজি, ভিক্টর ট্রাম্পার প্রমুখ মহান খেলোয়াড়েরা এই ম্যাচের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯০৯ সালে তৈরি হয় ইম্পেরিয়াল ক্রিকেট কনফারেন্স বা আইসিসি। প্রথমদিকে ইংল্যাণ্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যাণ্ড, ওয়েস্ট ইণ্ডিজ, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশ এই সংস্থার সদস্য ছিল। ১৯০৬ সালে প্লাঙ্কেট শিল্ড, ১৯৩৪ সালে রঞ্জি ট্রফি এবং ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানে কায়েদ-ই-আজম ট্রফি ম্যাচ চালু হয়। ১৯৭৩ সালে প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়।

১৯৫০-এর দশকে কাউন্টি ক্রিকেট একটি রক্ষণাত্মক চেহারা নেয়। ১৯৬৩ সালে ইংলিশ কাউন্টি দলের সর্বোচ্চ ওভারের দুটি ইনিংস খেলার চল শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে সীমিত ওভারের ক্রিকেট খেলার সূচনা হয় এবং এই ধরনের খেলাই জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৭০ সালে বর্ণবাদের কারণে আফ্রিকাকে আন্তর্জাতিক খেলা থেকে বাদ দেওয়া হয়, পরে ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপে পুনরায় আফ্রিকা খেলার সুযোগ পায়। মেলবোর্নে প্রথম একটি আন্তর্জাতিক সীমিত ওভারের টেস্ট ম্যাচ আয়োজিত হয় ১৯৭১ সালে। ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপেই প্রথম ফ্লাডলাইট, রঙিন পোশাক এবং একটি সাদা বল ব্যবহার করা হয়। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের মধ্যে টেস্ট সিরিজে প্রথম তৃতীয় আম্পায়ারের প্রথা শুরু হয়। বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে এসে টেস্ট সিরিজের বদলে এসেছে চূড়ান্ত রোমাঞ্চকর ‘টি-টোয়েন্টি’ অর্থাৎ ২০ ওভারের ম্যাচ। ভারতে সম্প্রতি আইপিএল নামের একটি ২০ ওভারের খেলা খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

ক্রিকেটের সমস্ত নিয়ম স্থির করে আইসিসি অর্থাৎ ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল। তবে কিছুদিন আগে পর্যন্তও এই ক্রিকেটের সব নিয়ম-কানুন নির্ধারণ করত এমসিসি অর্থাৎ মেলবোর্ন ক্রিকেট কাউন্সিল। মূলত এগারো জন খেলোয়াড়ের দুটি দল একটি ঘাসযুক্ত মাঠে খেলতে নামে। সাধারণত মাঠের আকৃতি হয় ডিম্বাকার আর এই মাঠের মধ্যেই একটি জায়গায় ২২ গজের একটি ঘাসবিহীন অঞ্চল থাকে যাকে ‘পিচ’ বলা হয়। পিচের দুই প্রান্তে তিনটি করে কাঠের উইকেট থাকে আর এই উইকেটের মাঝে থাকে ‘বেল’। খেলার শুরুতে একটি কয়েন দিয়ে ‘টস’ করা হয়, টসে জয়লাভকারী দল নিজেদের ইছেমতো ব্যাটিং বা বোলিং করতে নামে। মাঠে দুটি দলের খেলোয়াড়ই উপস্থিত থাকে। তবে ব্যাটিং দলের মাত্র দুজন থাকে মাঠে যার মধ্যে একজন রানার এবং একজন মূল ব্যাটসম্যান। তবে বোলিং দলের এগারোজন খেলোয়াড়ই মাঠে উপস্থিত থাকে যার মধ্যে একজন থাকে বোলার এবং বাকিরা মাঠের বিভিন্ন জায়গায় নিজস্ব অবস্থানে ‘ফিল্ডিং’ করে। এদের মধ্যে একজন সর্বদা ব্যাটসম্যানের উইকেটের পিছনে কিপিং করে, তাকে বলে উইকেট কিপার। খেলায় যে দল বেশি রান করতে পারে, সেই দলই জয়ী হয়। আন্তর্জাতিক খেলার নিয়ম অনুসারে তিনজন আম্পায়ার থাকেন এই খেলায় – একজন ফিল্ড আম্পায়ার যিনি বোলারের দিকের উইকেটের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকেন, একজন স্কোয়ার লেগ আম্পায়ার এবং অন্য আরেকজন ম্যাচ রেফারি খেলার সময় মাঠের বাইরে থেকে খেলাটি আইন অনুযায়ী হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করেন। এছাড়াও তৃতীয় আম্পায়ার তো থাকেই। পিচের মধ্যে যে উইকেট থাকে তা যদি বোলারের বলে আঘাত লেগে পড়ে যায় তাহলে ব্যাটসম্যানকে আউট বলে ধরা হয়। তখন তাঁর বদলে অন্য আরেকজন ব্যাটসম্যান মাঠে নামেন। ব্যাটসম্যান আউট হয়েছেন কিনা তা বোঝার জন্য পিচের মধ্যে একটি রেখা টানা থাকে যাকে ক্রিজ বলে। ডান হাত কিংবা বাঁ হাত যেকোনো হাতেই ব্যাটসম্যান ব্যাট করতে পারেন যেটা তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য। খেলাটি সামগ্রিকভাবে নির্ণীত হয় ওভারের দ্বারা। ছয়টি বল নিয়ে একটি ওভার তৈরি হয়। একেকটি ওভার শেষ হলে বোলার বদলে যায়। তবে একজন বোলার একাধিক ওভারেও বল করতে পারেন যার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। সামগ্রিকভাবে একটি খেলায় দুটি ইনিংস থাকে। ব্যাটিং করে এক দল, এই সময় ওভার শেষ বা অল আউট হলে সেই ইনিংস শেষ হয়। এরপরে বোলিং করছে যে দল সেই দল ব্যাট করতে নামে। ব্যাটসম্যান বলে আঘাত করেই ছুটে পিচের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারেন, একে রান নেওয়া বলে। সেই সময় অপর প্রান্তের অন্য রানারও নিজের স্থান বদল করেন। এই রান নেওয়ার সময়ে যদি বোলার বা ফিল্ডার উইকেটে বল ছুঁড়ে দেন তাহলে ব্যাটসম্যান রান-আউট হন। এরকমই বিভিন্নভাবে আউট হন ব্যাটসম্যান। ব্যাটসম্যানের মারা বল কোন ফিল্ডার ক্যাচ করলে, তিনি কট-আউট হন। আবার বল যদি সোজা উইকেটের কোন স্টাম্পে লাগে, তাকে বলে বোল্ড আউট। আবার কোন ক্ষেত্রে ব্যাটসম্যানের পায়ে বল লাগলে তাকে বলা হয় এল.বি.ডব্লিউ। রান নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতি রানের স্কোর হয় ১ রান। এছাড়া ব্যাটসম্যানের বল মাঠের বাউণ্ডারি পেরিয়ে গেলে চার বা ছয় রান হয়। বল যদি এক লাফে বাউণ্ডারি পেরোয় তা হবে ছয় রান আর যদি বাউণ্ডারি পেরোনোর সময় মাঠের কোথাও ছুঁয়ে যায় সেটাকে চার রান বলে ধরা হয়।  

১৭৪৪ সাল থেকে ১৭৮৮ সাল পর্যন্ত এমসিসি বহুবার ক্রিকেটের ‘কোড অফ ল’ পরিবর্তন করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বদল হল –

  • পপিং ও বোলিং ক্রিজের মধ্যে দূরত্ব নির্ণীত ছিল ৪৬ ইঞ্চি যা ১৮১৯ সালে ৪৮ ইঞ্চিতে বাড়ানো হয়।
  • বহু পরিবর্তনের পরে ১৯৪৭ সালে উইকেটের মাপ স্থির হয়েছে ২৮ ইঞ্চি / ৯ ইঞ্চি।
  • ১৭৪৪ সালে চারটি বলে এক ওভার ধরা হত, যেখানে বর্তমানে অনেক বিবর্তনের পর ৬ বলে এক ওভার মানা হয়।

এছাড়াও আরও বহু সূক্ষ্ম নিয়ম রয়েছে যা পরিবর্তিত হয়েছে। আগেকার খেলার থেকে আজকের খেলা অনেক উন্নত এবং নিয়মনিষ্ঠ।

আন্তর্জাতিক স্তরে আইসিসি অনেকগুলি ম্যাচ আয়োজন করে। এর মধ্যে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপের জনপ্রিয়তা সর্বাধিক। তাছাড়াও রয়েছে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ইত্যাদি। এছাড়া দেশীয় উদ্যোগেও বহু খেলা আয়োজিত হয়ে থাকে। ১৯৭৫ সালে প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ আয়োজিত হয় ইংল্যাণ্ডে। যদিও সেই সময় এই খেলার নাম ছিল প্রুডেন্সিয়াল বিশ্বকাপ। আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া ৫ বার, ওয়েস্ট ইণ্ডিজ ২ বার, ভারত ২ বার, পাকিস্তান ও ইংল্যাণ্ড ১ বার করে জয়লাভ করেছে। এছাড়া আইসিসির চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও নানা দেশ নানা সময় জিতেছে। বর্তমানে আই.সি.সি এর পূর্ণ সদস্য দেশের সংখ্যা বারোটি যারা নিয়মিতভাবে ক্রিকেট খেলে থাকে, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবোয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড। বিশ্ব ক্রিকেটের উল্লেখযোগ্য ক্রিকেটারদের মধ্যে কয়েকজন হলেন – ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান, শচীন তেন্ডুলকর, ক্লাইভ লয়েড, মুথাইয়া মুরলীধরণ, জাভেদ মিয়াঁদাদ, ইমরান খান, সুনীল গাভাস্কার, কপিল দেব, শেন ওয়ার্ন প্রমুখ।

ভারতেও ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। অনেক কাল ধরেই ভারত আন্তর্জাতিক স্তরের নানা ম্যাচে অংশগ্রহণ করে আসছে। ভারতের জাতীয় দল সংগঠিতভাবে ক্রিকেট খেলার চর্চা করে আসছে। আন্তর্জাতিক খেলা ছাড়া ভারতের মধ্যে ইণ্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ, রঞ্জি ট্রফি, বিজয় হাজারে ট্রফি, দলীপ ট্রফি ইত্যাদি ম্যাচ আয়োজিত হয়।   

আপনার মতামত জানান