বিজ্ঞান

ওয়ার্মহোল

ওয়ার্মহোল

এই মহাবিশ্বে রহস্যের সীমা নেই। আমাদের সৌরজগতকে ছাড়িয়েও অসীম মহাবিশ্বের আঁধারে আজও বহু না জানা তথ্য লুকিয়ে রয়েছে। এই মহাবিশ্বেই যেমন ব্ল্যাক হোল রয়েছে, তেমনই রয়েছে ওয়ার্মহোল (Wormhole)। কৃষ্ণগহ্বর যেমন তার চারপাশের সব কিছুকেই টেনে নেয়, ওয়ার্মহোল তেমনটা না হলেও সংক্ষেপে একে সময় এবং শূন্যতার মধ্যে এক সংযোগসাধনকারী বলা যায়। যদিও এটি আসলে একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তাত্ত্বিক উপস্থাপনা। চলুন আরও বিশদে ওয়ার্মহোল সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

একেবারে সহজভাবে বুঝতে হলে বলা যায়, যদি কোনও ব্যক্তিকে একটি কাগজের এক প্রান্তে বসিয়ে দেওয়া যায় এবং বলা হয় অন্য প্রান্তে পৌঁছাতে, তাহলে সেই ব্যক্তি সাধারণ বুদ্ধিতে সমগ্র কাগজের ক্ষেত্রটি পেরিয়ে তবেই অন্য প্রান্তে পৌঁছাবেন। কিন্তু যদি কাগজটিকে দু-ভাঁজ করে দেওয়া যায়, তবে কাগজের ঐ দুই প্রান্তের মধ্যে ব্যবধান থাকে খুব সামান্য। তাই সেই ব্যক্তি অনায়াসেই ঐ দূরত্বটি অতিক্রম করতে পারবেন মাত্র একটি ছোট্ট লাফ দিয়ে। ওয়ার্ম হোলের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই হয়। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় ওয়ার্ম হোল আসলে মহাবিশ্বের দুই প্রান্ত অথবা দুই মহাবিশ্বের মধ্যে স্থান ও কালের ক্ষুদ্র সুড়ঙ্গ। ১৯১৬ সালেই আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব থেকে এই ওয়ার্ম হোলের ধারণা পাওয়া যায়। তবে তাত্ত্বিকভাবেই এই ওয়ার্ম হোলের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত মহাবিশ্বে কোনও বাস্তব ওয়ার্ম হোল আবিষ্কার করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, মহাবিশ্বের দুই প্রান্তের মধ্যে যদি কয়েক কোটি আলোকবর্ষেরও ব্যবধান থাকে তাহলেও এই ওয়ার্ম হোলের মাধ্যমে খুব কম সময়েই এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

বিখ্যাত বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার সূত্রের ক্ষেত্র সমীকরণ থেকে গাণিতিক সমাধান নির্ণয়ের সময় এই ওয়ার্ম হোলের কল্পনা করা হয়। তবে আইনস্টাইনের সঙ্গে আরেক বিজ্ঞানী ন্যাথান রোসেনের (Nathan Rosen) নামও করা হয়। অনেক সময় এই ওয়ার্ম হোলকে অনেকে ‘আইনস্টাইন-রোসেন ব্রিজ’ও বলে থাকেন। অস্ট্রিয়ার পদার্থবিদ লুডউইগ ফ্ল্যাম এর একটি অন্য সমাধানও নির্ণয় করেন। ফ্ল্যাম ব্ল্যাক হোলের মত হোয়াইট হোলেরও (White Hole) কল্পনা করেন যা তাত্ত্বিকভাবে ব্ল্যাক হোলের বিপ্রতীপ সময়ের প্রতিরূপ। এই ব্ল্যাক হোল এবং হোয়াইট হোলের প্রবেশদ্বার একটি স্থান ও কালের সংযোগকারী সুড়ঙ্গের মাধ্যমে যুক্ত। বিজ্ঞানীরা বলছেন এই ওয়ার্মহোলের দুটি মুখ বা প্রবেশ পথ (Mouth of Wormhole) থাকে এবং ঐ মুখের সংযোগকারী একটি গলা (Throat) বা নালি থাকে। এই প্রবেশ পথগুলি সম্ভবত গোলাকার এবং গলাটি হয় দীর্ঘ প্রসারিত এক পথ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ আপেক্ষিকতা সূত্রের সমাধান হিসেবে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন এই ওয়ার্মহোলের দুটি মুখ আসলে দুটি পৃথক ব্ল্যাক হোল। কিন্তু সাধারণভাবে মহাবিশ্বে একটি ব্ল্যাক হোল ওয়ার্মহোলের জন্ম দেয় না।

অনেক কল্পবিজ্ঞানের গল্পে এই ওয়ার্মহোলের মধ্য দিয়ে সময়-ভ্রমণের (Time Travel) কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু আদপেই সেই সময় ভ্রমণের প্রক্রিয়া অনেক অনেক জটিল। প্রাইমর্ডিয়াল ওয়ার্মহোল (Primordial Wormhole) আসলে আকারে আণুবীক্ষণিক, এর আকার আনুমানিক ১০-৩৩ সেন্টিমিটার। তবে মহাবিশ্বের আকার যত বাড়তে থাকবে, তত এই ওয়ার্মহোলের আকারও বাড়তে থাকবে বলেই অনুমান করেন বিজ্ঞানীরা। তাছাড়া এর স্থিতিশীলতা নিয়েও অনেক প্রশ্ন থেকে যায়। আইনস্টাইন-রোসেন ওয়ার্মহোলগুলি খুব দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায় বলে এর মধ্য দিয়ে সময়-ভ্রমণ অসম্ভব। সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে যে, যে সমস্ত ওয়ার্মহোলের মধ্যে বহিরাগত উপাদান থাকে, সেগুলি বহু সময় ধরে উন্মুক্ত এবং অপরিবর্তিত থাকতে পারে। এই বহিরাগত উপাদান বলতে আসলে ঋণাত্মক শক্তি ঘনত্ব এবং এক বিশাল ঋণাত্মক চাপের কথাই বলা হয়। ব্ল্যাক হোলের চারপাশে যে ইভেন্ট হরাইজন (Event Horizon) থাকে, তা থেকে কোনও প্রকার কণা বা তরঙ্গ বের হয়ে আসতে পারে না। এই ইভেন্ট হরাইজনের ক্ষেত্রে আইনস্টাইন-রোসেন ব্রিজ সমীকরণ ব্যবহার করে তাত্ত্বিকভাবে শোয়ার্ডসচাইল্ড ওয়ার্মহোল (Schwarzschild wormhole) পাওয়া যায়। ১৯৮৮ সালে কিপ থর্ন (Kip Thorne) ট্রান্সভার্সিবল ওয়ার্মহোলের (Transversible Wormhole) ধারণা দিয়েছিলেন। স্থান ও সময় আসলে চতুর্মাত্রিক (Four Dimensional) হলেও তার মধ্যে একটি ত্রিমাত্রিক স্থান রয়েছে। সেই ত্রিমাত্রিক স্থানে কোনও ছিদ্র করা হলে তার আকার তখন একটি গোলকের মত হবে বলেই ধারণা দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু এই ওয়ার্মহোলের ভিতরের আকার সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনও কোনও ধারণা দিতে পারেননি। আমরা সাধারণভাবে ত্রিমাত্রিক বস্তুর ধারণাই কেবল কল্পনা করতে পারি, ফলে ওয়ার্মহোলের ভিতরের পরিবেশ কল্পনা করা আমাদের পক্ষে দুঃসাধ্য হবে। এই ওয়ার্মহোলের মধ্য দিয়ে যেহেতু দুটি পৃথক মহাবিশ্বের সঙ্গেও সংযোগ স্থাপন সম্ভব, ফলে কোনও ব্যক্তি ওয়ার্মহোলে প্রবেশ করলে সে এর অন্য প্রান্তে এক অন্য সময় ও এক অন্য শূন্যতার মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করবে। একে অনেকে সমান্তরাল মহাবিশ্ব বা প্যারালাল ইউনিভার্স (Parallel Universe) বলে থাকেন।

তাত্ত্বিকভাবে দুই ধরনের ওয়ার্মহোলের কল্পনা করেছেন বিজ্ঞানীরা –

  • লরেন্টজাইন ওয়ার্মহোল (Laurentziam Wormhole)
  • ইউক্লিডিয়ান ওয়ার্মহোল (Euclidian Wormhole)

যদিও বর্তমানে বিজ্ঞানীরা কৃত্রিমভাবে ওয়ার্মহোল তৈরি করা যায় কিনা সে বিষয়ে বিস্তর গবেষণা করছেন। যে সমস্ত ওয়ার্মহোল উভয় দিক দিয়েই অতিক্রম করা যায়, সেগুলিকে ‘ট্র্যাভার্সেবল ওয়ার্মহোল’ বলা হয়। লরেন্টজাইন ওয়ার্মহোলগুলির সাহায্যে মহাবিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে উভয় দিকেই অতিক্রম করা সম্ভব, এমনকি এক মহাবিশ্ব থেকে অন্য মহাবিশ্বেও ভ্রমণ সম্ভব। বিজ্ঞানীরা আরও বলেছেন যে, যদি একান্তই অতিক্রমযোগ্য ওয়ার্মহোলের অস্তিত্ব থাকে, সেক্ষেত্রে তা দিয়ে সময় ভ্রমণ সম্ভব। এই ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে সময় প্রসারণের কারণে একটি প্রবেশপথ দিয়ে কোনও ভ্রমণকারী প্রবেশ করলে তার আসল বয়স যা থাকবে, অন্য প্রান্তে পৌঁছানোর সময়েও একই বয়স থাকবে কারণ আলোর চেয়েও বেশি গতিবেগে সে ভ্রমণ করেছে, কিন্তু তার চারপাশের পরিবেশের সময় হয়তো কয়েক শতাব্দী বেড়ে গিয়েছে। এই তাত্ত্বিক কল্পনা আমাদের স্বাভাবিক সময়ের সকল হিসেব গুলিয়ে দেয়। এখনও পর্যন্ত ওয়ার্মহোল সংক্রান্ত সমস্ত ধারণাই তাত্ত্বিকভাবে প্রমাণিত, এর কোনও বাস্তব অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। কিন্তু বিজ্ঞান থেমে নেই, এই মহাবিশ্বের এরকম আরও রহস্য উন্মোচনের পথে সে ক্রমশ এগিয়ে চলেছে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন