সববাংলায়

গাঙ্গুবাই কাথিয়াওয়াড়ি

গাঙ্গুবাই কাথিয়াওয়াড়ি (Gangubai Kathiawadi) ১৯৬০ এর দশকে মুম্বাইয়ের কামাথিপুরা অঞ্চলের নিষিদ্ধপল্লীর প্রধানা ছিলেন যিনি পরবর্তীকালে মুম্বাইয়ের অন্ধকারজগতের মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী হিসেবে খ্যাতির চুড়ায় উঠেছিলেন।

গাঙ্গুবাইয়ের ব্যাক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায়না।১৯৩৯ সালে গুজরাতের কাথিয়াওয়াড় অঞ্চলের এক অভিজাত পরিবারে গাঙ্গুবাই কাথিয়াওয়াড়ির জন্ম হয়। তাঁর প্রকৃত নাম গঙ্গা হরজীবনদাস কাথিয়াওয়াড়ি। গুজরাতের কাথিয়াওয়াড় অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ার কারণে পরবর্তীকালে গাঙ্গুবাই কাথিয়াওয়াড়ি নামেই তিনি বেশি পরিচিত হয়েছিলেন। গাঙ্গুবাইয়ের পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই হয় আইনি পেশা না হয় শিক্ষা জগতের সাথে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া কাথিয়াওয়াড়ের রাজপরিবারের সাথেও তাঁদের পরিবারের সুসম্পর্ক ছিল। গাঙ্গুবাইয়ের বাবা এবং তাঁর ভাইয়েরা কঠোর অনুশাসনকারী ছিলেন। গাঙ্গুবাইয়ের পড়াশোনার প্রতি তাঁদের গভীর আগ্রহ ছিল।

তবে, কিশোরী গাঙ্গুবাইয়ের সমগ্র সত্তা তখন মুম্বই গিয়ে নায়িকা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। স্কুলে তাঁর যেসব বন্ধুরা এই মুম্বই গিয়েছিল তাদের থেকে মুম্বইয়ের বাড়ি, গাড়ি, সেখানকার নারী পুরুষ এবং সিনেমা সম্পর্কে যত গল্প শুনতেন ততই তাঁর মুম্বই যাওয়ার প্রতি উদগ্র আগ্রহ তৈরি হতে থাকে। এর মধ্যেই তাঁর বাবা রমনিক লাল নামে আঠাশ বছর বয়সী এক যুবককে তাঁর হিসাবরক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করলে গাঙ্গুবাই ক্রমেই তাঁর প্রেমে পড়েন এবং প্রথমে গাঙ্গুবাইয়ের প্রতি নিরাসক্ত হলেও শেষ অবধি গাঙ্গুবাইয়ের প্রেমে পড়েন এবং গাঙ্গুবাইকে বিয়ের প্রস্তাব দেন তাঁকে মুম্বই নিয়ে গিয়ে বলিউডের কোন সিনেমায় অভিনয় করার ব্যবস্থা করে দেবেন বলে। অবশেষে তাঁরা কাথিয়াওয়াড়ের এক মন্দিরে বিয়ে করে মুম্বইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এই সময়ে গাঙ্গুবাইয়ের বয়স ছিল ১৬।

মুম্বইয়ে প্রথম এক সপ্তাহ স্বপ্নের দিন যাপন করার পর একদিন রমনিক লাল গাঙ্গুবাইকে বলেন কিছুদিন তাঁর এক মাসির কাছে থাকতে। এর মধ্যে সে তাঁদের থাকবার জন্য সস্তার ছোট ঘরের বন্দোবস্ত করছে। তাঁর স্বামীর মাসি আছে শুনে গাঙ্গুবাই প্রথমে কিছুটা অবাক হলেও কারণ রমনিক তাঁকে বলেছিল মুম্বইয়ে তাঁর কোন আত্মীয় নেই, শেষ অবধি গাঙ্গুবাই এই বিষয়ে আর মাথা ঘামাননি। এরপর একদিন শীলা নামের এক মহিলা নিজেকে রমনিকের মাসি পরিচয় দিয়ে গাঙ্গুবাইকে নিতে আসেন। তাঁর উগ্র বেশভূষা ও সর্বদা পান খাওয়া গাঙ্গুবাইকে শুরু থেকেই তাঁর প্রতি বিরক্ত করে তোলে। শেষ পর্যন্ত এই মহিলার সাথে তাঁর স্বামীর ডেকে দেওয়া ট্যাক্সিতে উঠে গাঙ্গুবাই রওনা হন। এরপর ক্রমেই তিনি বুঝতে পারেন তাঁর স্বামী তাঁকে পাঁচশো টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিল মুম্বইয়ের এক নিষিদ্ধপল্লিতে বিক্রি করে দিয়েছে। বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন শুধুই কেঁদেছিলেন গাঙ্গুবাই। পরে অবশ্য ধীরে ধীরে নিজেকে মানিয়ে নেন।

গাঙ্গুবাই শীঘ্রই কামাতিপুরার সর্বাধিক জনপ্রিয় যৌনকর্মী হয়ে উঠলেন। নিষিদ্ধপল্লীর স্থানীয় নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তিনি নিজের নামের সাথে কাথিয়াওয়াড়ি শব্দটি যুক্ত করেন। তাঁর নিষিদ্ধপল্লী জীবনের প্রথম দিকে মাফিয়া ডন পাঠান করিম লালার দল পাখতুন জিরগাই হিন্দের এক সদস্য শৌকত খানের হাতে ভয়ানক নির্মমতার সাথে ধর্ষিত হন। এরফলে গাঙ্গুবাঈকে হাসপাতালে বেশ কিছুদিন কাটাতে পর্যন্ত হয়। এই অবমাননার প্রতিশোধ নিতে গাঙ্গুবাঈ করিম লালার সঙ্গে দেখা করে তাঁর হাতে রাখি বেঁধে তাঁকে তাঁর অবমাননার কথা বলেন। সব শুনে গাঙ্গুবাইয়ের সামনেই করিম লালা তাঁর দলের অভিযুক্ত সহকারীদের নির্মমভাবে বেত্রাঘাত করেন করিম। এর সাথে গাঙ্গুবাইকে তাঁর বোন স্বীকার করে তাঁর সহকারীদের সতর্কও করে দিয়েছিলেন যেন গাঙ্গুবাইয়ের গায়ে কোনও আঁচ না লাগে।

নিষিদ্ধপল্লীর কর্ত্রী হিসেবে গাঙ্গুবাই আজীবন খেয়াল রেখে গেছেন তাঁর কুঠির মহিলাদের। এমনকি তাঁর আশ্রয়ে তাঁর কুঠির মহিলাদের সন্তানরাও বড় হত। নিজের উপার্জনের একটা বড় অংশ তিনি খরচ করতেন অনাথ শিশুদের কল্যাণে এবং কামাথিপুরা এলাকার সার্বিক উন্নয়নে। বোম্বের আজাদ ময়দানে নারী ক্ষমতায়ন সম্পর্কে অনুষ্ঠিত একটি সভায় সমাজে পুরুষদের কামনা লালসা চরিতার্থে নিষিদ্ধপল্লীর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একটি অসামান্য বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তৎকালীন বোম্বের সমস্ত নিষিদ্ধপল্লীর যিনি সেন্ট অ্যান্টনি গার্লস হাই স্কুলের দুশো মিটারের মধ্যে থাকা কামাথিপুরা নিষিদ্ধপল্লীর বেশ কিছুটা অংশ থেকে যৌনকর্মীদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে স্থানীয় মানুষ ও স্কুল কর্তৃপক্ষের মিলিত বিরোধিতা মোকাবিলায় যৌনকর্মীদের হয়ে গাঙ্গুবাঈ জহরলাল নেহরুর সাথে পর্যন্ত দেখা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে গিয়ে। শোনা যায় এই সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী নেহরু নাকি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি পরবর্তীকালে নিজে আর বিয়ে করলেন না কেন?- উত্তরে গাঙ্গুবাঈয়ের সপাট উত্তর ছিল- আপনি বিয়ে করবেন আমাকে?- বস্তুত চরম বিড়ম্বিত হতভম্ব ও অপ্রস্তুত নেহরু তাঁর সামনে থেকে চলে গিয়েছিলেন।

গাঙ্গুবাঈ শেষ জীবন কাটিয়েছেন রানীর মত। সোনার প্রতি এক অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ ছিল তাঁর। নিজের একটা দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো ছিল। এমনকি যে শাড়ি পড়তেন তাঁর পাড়ে থাকত সোনা দিয়ে জরির কাজ। যে ব্লাউজ পড়তেন তার বোতাম এবং চশমার ফ্রেম সমস্ত কিছুই ছিল সোনায় তৈরি। দাগী অপরাধী থেকে পুলিশের কর্তা, রাজনীতির ক্ষমতাশালী নেতা সবার সঙ্গেই মধুর সম্পর্ক কামাথিপুরার অধীশ্বরী গাঙ্গুবাঈয়ের। তিনি সম্ভবত বোম্বের একমাত্র যৌনপল্লীর অধীশ্বরী ছিলেন যিনি বেন্টলি গাড়ির মালিক ছিলেন।

১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়।

সম্প্রতি তাঁর জীবন এবং উত্থানকে কেন্দ্র করে সঞ্জয় লীলা বনশালীর পরিচালনায় ‘গাঙ্গুবাই কাথিয়াওয়াড়ি’ নামে একটি সিনেমা তৈরি হয়েছে যেখানে নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন আলিয়া ভাট।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. মাফিয়া কুইনস অব মুম্বই- হুসেন জাইদি ও জেন বরজেসঃ  ট্রান্কুইবার প্রেসঃ দ্বিতীয় চ্যাপ্টার- দি   ম্যাট্রিযার্ক অব কামাথিপুরা
  2. https://www.anandabazar.com/
  3. https://www.newindianexpress.com/
  4. https://scroll.in/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading