ইতিহাস

গাঙ্গুবাই কাথিয়াওয়াড়ি

গাঙ্গুবাই কাথিয়াওয়াড়ি (Gangubai Kathiawadi) ১৯৬০ এর দশকে মুম্বাইয়ের কামাথিপুরা অঞ্চলের নিষিদ্ধপল্লীর প্রধানা ছিলেন যিনি পরবর্তীকালে মুম্বাইয়ের অন্ধকারজগতের মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী হিসেবে খ্যাতির চুড়ায় উঠেছিলেন।

গাঙ্গুবাইয়ের ব্যাক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায়না। গাঙ্গুবাই কাথিয়াওয়াড়ির জন্ম হয় পঞ্চাশের দশকে গুজরাতের কাথিয়াওয়াড় অঞ্চলের এক অভিজাত পরিবারে। তাঁর প্রকৃত নাম গঙ্গা হরজীবনদাস কাথিয়াওয়াড়ি। গুজরাতের কাথিয়াওয়াড় অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ার কারণে পরবর্তীকালে গাঙ্গুবাই কাথিয়াওয়াড়ি নামেই তিনি বেশি পরিচিত হয়েছিলেন। গাঙ্গুবাইয়ের পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই হয় আইনি পেশা না হয় শিক্ষা জগতের সাথে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া কাথিয়াওয়াড়ের রাজপরিবারের সাথেও তাঁদের পরিবারের সুসম্পর্ক ছিল। গাঙ্গুবাইয়ের বাবা এবং তাঁর ভাইয়েরা কঠোর অনুশাসনকারী ছিলেন। গাঙ্গুবাইয়ের পড়াশোনার প্রতি তাঁদের গভীর আগ্রহ ছিল।

তবে, কিশোরী গাঙ্গুবাইয়ের সমগ্র সত্তা তখন মুম্বই গিয়ে নায়িকা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। স্কুলে তাঁর যেসব বন্ধুরা এই মুম্বই গিয়েছিল তাদের থেকে মুম্বইয়ের বাড়ি, গাড়ি, সেখানকার নারী পুরুষ এবং সিনেমা সম্পর্কে যত গল্প শুনতেন ততই তাঁর মুম্বই যাওয়ার প্রতি উদগ্র আগ্রহ তৈরি হতে থাকে। এর মধ্যেই তাঁর বাবা রমনিক লাল নামে আঠাশ বছর বয়সী এক যুবককে তাঁর হিসাবরক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করলে গাঙ্গুবাই ক্রমেই তাঁর প্রেমে পড়েন এবং প্রথমে গাঙ্গুবাইয়ের প্রতি নিরাসক্ত হলেও শেষ অবধি গাঙ্গুবাইয়ের প্রেমে পড়েন এবং গাঙ্গুবাইকে বিয়ের প্রস্তাব দেন তাঁকে মুম্বই নিয়ে গিয়ে বলিউডের কোন সিনেমায় অভিনয় করার ব্যবস্থা করে দেবেন বলে। অবশেষে তাঁরা কাথিয়াওয়াড়ের এক মন্দিরে বিয়ে করে মুম্বইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এই সময়ে গাঙ্গুবাইয়ের বয়স ছিল ১৬।

মুম্বইয়ে প্রথম এক সপ্তাহ স্বপ্নের দিন যাপন করার পর একদিন রমনিক লাল গাঙ্গুবাইকে বলেন কিছুদিন তাঁর এক মাসির কাছে থাকতে। এর মধ্যে সে তাঁদের থাকবার জন্য সস্তার ছোট ঘরের বন্দোবস্ত করছে। তাঁর স্বামীর মাসি আছে শুনে গাঙ্গুবাই প্রথমে কিছুটা অবাক হলেও কারণ রমনিক তাঁকে বলেছিল মুম্বইয়ে তাঁর কোন আত্মীয় নেই, শেষ অবধি গাঙ্গুবাই এই বিষয়ে আর মাথা ঘামাননি। এরপর একদিন শীলা নামের এক মহিলা নিজেকে রমনিকের মাসি পরিচয় দিয়ে গাঙ্গুবাইকে নিতে আসেন। তাঁর উগ্র বেশভূষা ও সর্বদা পান খাওয়া গাঙ্গুবাইকে শুরু থেকেই তাঁর প্রতি বিরক্ত করে তোলে। শেষ পর্যন্ত এই মহিলার সাথে তাঁর স্বামীর ডেকে দেওয়া ট্যাক্সিতে উঠে গাঙ্গুবাই রওনা হন। এরপর ক্রমেই তিনি বুঝতে পারেন তাঁর স্বামী তাঁকে পাঁচশো টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিল মুম্বইয়ের এক নিষিদ্ধপল্লিতে বিক্রি করে দিয়েছে। বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন শুধুই কেঁদেছিলেন গাঙ্গুবাই। পরে অবশ্য ধীরে ধীরে নিজেকে মানিয়ে নেন।

গাঙ্গুবাই শীঘ্রই কামাতিপুরার সর্বাধিক জনপ্রিয় যৌনকর্মী হয়ে উঠলেন। নিষিদ্ধপল্লীর স্থানীয় নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তিনি নিজের নামের সাথে কাথিয়াওয়াড়ি শব্দটি যুক্ত করেন। তাঁর নিষিদ্ধপল্লী জীবনের প্রথম দিকে মাফিয়া ডন করিম লালার বেশ কিছু সহকারীর হাতে ধর্ষিত হন। এই অবমাননার প্রতিশোধ নিতে স্থানীয় ডন করিম লালার সঙ্গে দেখা করে তাঁর হাতে রাখি বেঁধে তাঁকে তাঁর অবমাননার কথা বলেন। সব শুনে গাঙ্গুবাইয়ের সামনেই করিম লালা তাঁর দলের অভিযুক্ত সহকারীদের নির্মমভাবে বেত্রাঘাত করেন করিম। এর সাথে গাঙ্গুবাইকে তাঁর বোন স্বীকার করে তাঁর সহকারীদের সতর্কও করে দিয়েছিলেন যেন গাঙ্গুবাইয়ের গায়ে কোনও আঁচ না লাগে।

নিষিদ্ধপল্লির কর্ত্রী হিসেবে গাঙ্গুবাই আজীবন খেয়াল রেখে গেছেন তাঁর কুঠির মহিলাদের। এমনকি তাঁর আশ্রয়ে তাঁর কুঠির মহিলাদের সন্তানরাও বড় হত। নিজের উপার্জনের একটা বড় অংশ তিনি খরচ করতেন অনাথ শিশুদের কল্যাণে এবং কামাথিপুরা এলাকার সার্বিক উন্নয়নে।

১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে কোন এক সময়ে বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর মৃত্যু হয়।

সম্প্রতি তাঁর জীবন এবং উত্থানকে কেন্দ্র করে সঞ্জয় লীলা বনশালীর পরিচালনায় ‘গাঙ্গুবাই কাথিয়াওয়াড়ি’ নামে একটি সিনেমা তৈরি হয়েছে যেখানে নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন আলিয়া ভাট।

তথ্যসূত্র


  1. মাফিয়া কুইনস অব মুম্বই- হুসেন জাইদি ও জেন বরজেসঃ  ট্রান্কুইবার প্রেসঃ দ্বিতীয় চ্যাপ্টার- দি   ম্যাট্রিযার্ক অব কামাথিপুরা
  2. https://www.anandabazar.com/
  3. https://www.newindianexpress.com/
  4. https://scroll.in/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

রচনাপাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান?



এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন