ইতিহাস

রাজেন্দ্র প্রসাদ

রাজেন্দ্র প্রসাদ (Rajendra Prasad) একজন স্বনামধন্য রাজনীতিবিদ যিনি ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং সেই পদে দুবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী, আইনজীবী এবং শিক্ষক ছিলেন।

১৮৮৪ সালে ৩ ডিসেম্বর বিহারের সিওয়ান জেলার জিরাদেই গ্রামে রাজেন্দ্র প্রসাদের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম মহাদেব সাহাই শ্রীবাস্তব এবং তাঁর মার নাম ছিল কমলেশ্বরী দেবী। তাঁর বাবা সংস্কৃত এবং ফারসি ভাষার পন্ডিত ছিলেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবথেকে ছোট। ছোট থেকেই তিনি মায়ের কাছে রামায়ণ এবং মহাভারতের গল্প শুনে বড় হয়েছিলেন। খুব অল্প বয়সেই তাঁর মায়ের মৃত্যু হয় এবং তারপর থেকে তিনি তাঁর বড় দিদির কাছে মানুষ হন।

রাজেন্দ্র প্রসাদের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় একজন স্থানীয় মৌলভীর কাছে। তাঁর কাছে তিনি ফারসি ভাষা, হিন্দি ভাষা এবং গণিত শিক্ষা পান। এরপর তিনি ছাপড়া জেলা স্কুলে ভর্তি হন। স্কুলে পড়াকালীন  মাত্র বারো বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় রাজবংশী দেবীর সাথে। এরপর তিনি ও তাঁর বড় ভাই পাটনা চলে যান দু’বছরের জন্য। সেখানে তাঁরা টি কে ঘোষেস অ্যাকাডেমিতে (T K Ghosh’s Academy) পড়াশোনা করেন। স্কুলের পাঠ শেষ করে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম হয়ে প্রতি মাসে ত্রিশ টাকা বৃত্তি নিয়ে ১৯০২ সালে বিজ্ঞান নিয়ে তিনি  কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯০৪ সালে এফ এ পাস করেন এবং ১৯০৫ সালের মার্চ মাসে ফার্স্ট ডিভিশনে স্নাতক হন। ১৯০৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম.এ পাস করেন।

ছাত্র থাকাকালীন তিনি সমাজসেবামূলক অনেক কাজ করেছিলেন এবং ‘দ্য ডন সোসাইটির’ (The Dawn Society) সদস্য ছিলেন। সেই সময় তিনি ‘সার্ভেন্টস অফ ইন্ডিয়া সোসাইটি’ থেকে ডাক পেয়েছিলেন। কিন্তু পারিবারিক কারণবশত তাঁকে সেই ডাক উপেক্ষা করতে হয়। ১৯০৬ সালে রাজেন্দ্র প্রসাদ পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিহারী স্টুডেন্ট কনফারেন্স করতে সাহায্য করেছিলেন। এই সংগঠন থেকে অনেক নেতা উঠে এসেছিল যাঁরা পরে স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

রাজেন্দ্র প্রসাদের কর্মজীবন শুরু হয় একজন শিক্ষক হিসেবে। বিহারের মজঃফরপুরে ল্যাংগাট সিং কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে তিনি কাজ শুরু করেন। এরপর তিনি সেই কলেজের প্রিন্সিপাল পদে উত্তীর্ণ হন। তারপর একটা সময়ে তিনি সেই কলেজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে কলকাতার রিপন কলেজ আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। এই কলেজে পড়াকালীনই তিনি কলকাতার সিটি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯১৫ সালে তিনি আইনের স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় সোনার মেডেল সহ পাস করেন। পরে ১৯৩৭ সালে তিনি এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে ডক্টরেট করেন। আইন নিয়ে পড়াশোনা করে তিনি বিহার এবং ওড়িশার হাইকোর্টে কিছুদিন কাজ করেছিলেন। ১৯১৭ সালে তাঁকে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেনেট এবং সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়। তিনি কিছুদিন ভাগলপুরেও ওকালতি করেছিলেন।

১৯০৬ সালে কলকাতায় থাকাকালীনই তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। সেই বছরে হওয়া ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতার বার্ষিক অধিবেশনে তিনি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগদান করেছিলেন। এরপর ১৯১১  সালে তিনি সরাসরি কংগ্রেস পার্টির সদস্য হন। ১৯১৬ সালে কংগ্রেসের লখনৌর অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধীর সাথে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি মহাত্মা গান্ধীর দ্বারা প্রবল ভাবে প্রভাবিত এবং উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯২০ সালে গান্ধীজী যখন অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন তখন রাজেন্দ্র প্রসাদ তাঁর ওকালতির কাজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার  কাজ ছেড়ে দিয়ে সেই আন্দোলনে যোগ দেন। গান্ধীজীর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি বয়কট আন্দোলনেও যোগদান করেছিলেন এবং নিজের ছেলেকে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে ভারতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। তিনি প্রখ্যাত লেখক রাহুল সাংকৃত্যায়নের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি সেই সময় বহু পত্রপত্রিকায় নানান বিষয় নিয়ে লেখালেখি করতেন যার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘দেশ পত্রিকা’ এবং ‘সার্চলাইট’ পত্রিকা। ১৯১৪ সালে বিহার এবং বাংলায় যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল তিনি সেই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের অনেক ভাবে সাহায্য করেছিলেন। তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বিপদে আপদে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। ১৯৩৪ সালে বিহার যখন ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তিনি সেই সময় কারাবন্দি থাকলেও তাঁর বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন। 

১৯৩৪ সালে কংগ্রেসের বোম্বে অধিবেশনের সময় তাঁকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর রাজেন্দ্র প্রসাদকে আবার সেই পদে মনোনীত করা হয়। ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে কংগ্রেস ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু করে, এর ফলে বহু কংগ্রেসের নেতাদের ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেপ্তার করে যাঁদের মধ্যে রাজেন্দ্র প্রসাদ অন্যতম ছিলেন। তাঁকে গ্রেফতার করে বিক্রমপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়। তিন বছর কারাবন্দী থাকার পর ১৯৪৫ সালে ১৫ই জুন তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। জেলবন্দি থাকাকালীন তিনি তাঁর আত্মজীবনী ‘আত্মকথা’ রচনা করেছিলেন, যেটি ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হয়।

১৯৪৬ সালে জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার গড়ে তোলা হয়েছিল তার খাদ্য এবং কৃষি বিভাগের দায়িত্ব তাঁকে গ্রহণ করতে হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে তিনি আবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট পদে নিযুক্ত হন। স্বাধীনতার আড়াই বছর পর ১৯৫০ সালে ২৬শে জানুয়ারি ভারতে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ সালে রাজেন্দ্র প্রসাদকে ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত করা হয়। তিনি ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়েছিলেন। ভারতের সাথে অন্যান্য দেশের সুসম্পর্ক গড়ে তোলাই ছিল তাঁর সেইসব বিদেশ সফরের মূল উদ্দেশ্য। ১৯৫৭ সালে তিনি আবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন। এখনো পর্যন্ত তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রপতি যিনি দুইবার এই পদে নির্বাচিত হয়েছেন।

দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের মুঘল উদ্যান তিনি রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ভারতের সাধারণ নাগরিকদের জন্য খুলে দিয়েছিলেন। এই উদ্যানটি এখনো ভারতীয় নাগরিকের কাছে একটি আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এই উদ্যানটি দেখতে আসে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে গেছিলেন যেমন হিন্দু কোড বিল (Hindu Code Bill) কে আইনে পরিণত করা, বিভিন্ন রাজ্যের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা ইত্যাদি। ১০ বছর রাষ্ট্রপতি পদে থাকার পর তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৬২ সালের মে মাসে অবসর গ্রহণের পর তিনি পাটনায় ফিরে যান। সেই বছরই সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়। এরপর তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ ভারতীয় নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন প্রদান করা হয়। তিনি বেশ কিছু বই লিখে গেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হল সত্যাগ্রহ অ্যাট চম্পারন (Satyagraha at Champaran, 1922), আত্মকথা (Atmakatha, ১৯৪৬), অ্যাট দ্য ফিট অফ মহাত্মা গান্ধী(At the feet of Mahatma Gandhi, ১৯৫৪), ডিভিশন অফ ইন্ডিয়া (Division of India, ১৯৪৬), সাইন্স  ইন্ডিপেন্ডেন্স (Science Independence, ১৯৬০) ইত্যাদি।

রাজেন্দ্র প্রসাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৬৩ সালে ২৮শে ফেব্রুয়ারি ৭৮ বছর বয়সে মৃত্যু হয়। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে পাটনা শহরে রাজেন্দ্র স্মৃতি সংগ্রাহালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

  • telegram sobbanglay

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বুনো রামনাথ - এক ভুলে যাওয়া প্রতিভা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন