ইতিহাস

রাহুল সাংকৃত্যায়ন

রাহুল সাংকৃত্যায়ন (Rahul Sankrityayan) ছিলেন ভারতের একজন স্বনামধন্য পর্যটক এবং হিন্দি ভ্রমণ সাহিত্যের জনক। বৌদ্ধসহ বিভিন্ন শাস্ত্রে তিনি ছিলেন পন্ডিত। সংস্কৃত সাহিত্যেও ছিল তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। তিনি ছিলেন মার্কসীয় শাস্ত্রে দীক্ষিত। তাঁর জীবনের ৪৫ বছর তিনি ব্যয় করেছেন বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে। তিনি বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাকার হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। কাশীর পন্ডিতমন্ডলী তাঁকে ‘মহাপন্ডিত’ আখ্যা দিয়েছিলেন।

রাহুল সাংকৃত্যায়নের পিতৃদত্ত নাম ছিল কেদারনাথ পান্ডে। ১৮৯৩ সালের ৯ এপ্রিল সনাতন হিন্দু ভূমিহার ব্রাহ্মণ পরিবারে তার জন্ম হয়। উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ের পানহা নামে একটি ছোট্ট গ্রাম, সেখানেই তাঁর জন্ম হয়। ছোটবেলাতেই তিনি মাকে হারান। মায়ের নাম ছিল ফুলবন্তি। মাত্র ২৮ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তাঁর পিতার নাম ছিল গোবর্ধন পান্ডে। তিনি  ছিলেন একজন শিক্ষিত ব্যক্তি। ইংরেজি সাহিত্যেও তাঁর দখল ছিল। কিন্তু অবসর জীবনে তিনি গ্রামে এসে কৃষকের জীবন বেছে নেন। তিনি মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মারা যান। রাহুল সাংকৃত্যায়নের মাতামহ তাঁকে একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেন। এটাই ছিল তাঁর জীবনে একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। এখানে তিনি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছিলেন। তিনি উর্দু ও সংস্কৃতের ওপর প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি বহু ভাষায় শিক্ষা লাভ করেছিলেন। হিন্দি এবং সংস্কৃত ছাড়াও উর্দু, বাংলা, পালি, আরবি, ফারসি, ইংরেজি, তিব্বতি ও রুশ  ভাষায় তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল।

সরকারি বৃত্তির অভাবে রাহুলের প্রথাগত শিক্ষা শেষ হয় উর্দু মিডল স্কুলে। তেরো বছর বয়সে তিনি বাড়ি ছাড়লেন। কলকাতায় এসে জীবিকা নির্বাহের জন্য নানান কাজ করেছেন তিনি। কখনও বা ফেরিওয়ালা, কখনো রেলের হেলপার, কখনো বা কারো রাঁধুনির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। এই শহর তাঁকে একেবারে পাল্টে দিল। রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠলেন তিনি। ইংরেজি পড়তে শিখলেন, নানান অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হলেন। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি বিহারের ছাপরার কাছে পারসা মঠের সাধু  হিসেবে যোগ দেন। এ সময় তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তাঁর নতুন নাম হয় সাধু রামোদর। পরে সংস্কৃত শাস্ত্রগ্রন্থাদি নিয়ে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে দক্ষিণ ভারতের তিরুমিশির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এই যাত্রাপথে অধিকাংশ রাস্তা তিনি পায়ে হেঁটে গিয়েছিলেন। দক্ষিণ ভারত ভ্রমণকালে তিনি তামিল ভাষায় পারদর্শিতা লাভ করেন। ১৯১৪ সালে তিনি আবার পারসা মঠে ফিরে আসেন। পরবর্তীকালে ১৯১৫ সালে তিনি লাহোর পাড়ি দেন। ১৯১৮ সালে বিভিন্ন পত্রিকা মারফত তিনি রুশ বিপ্লবের খবর পান। ১৯২০ সালে তিনি বারানসী যান এবং সেখান থেকে বুদ্ধের পরিনির্বাণ স্থল, কপিলাবস্তু, লুম্বিনী প্রভৃতি স্থান ঘুরে দেখেন। অশোকের অনুশাসন তাঁকে আকৃষ্ট করে। ১৯২১-১৯২৩ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁর পরিব্রাজক জীবনে ছেদ পড়ে। ১৯২৩ সালের মার্চ মাসে নেপাল যাত্রা করেন। সেখানে দেড় বছর অবস্থানের পর বহু বৌদ্ধ পন্ডিতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে বৌদ্ধ দর্শনের জ্ঞান লাভ করেন। ১৯২৭-২৮ সালে শ্রীলংকায় সংস্কৃত ভাষার শিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯৩০ সালে তিনি তিব্বত পাড়ি দেন বৌদ্ধ দর্শনের জ্ঞান আহরণের জন্য। ভ্রমণ ও জ্ঞান পিপাসা এই দুই ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী তিনি মোট চারবার তিব্বতে যান। তিব্বত ছাড়াও তিনি জাপান, কোরিয়া, সোভিয়েত রাশিয়া, ইরান প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন। তিনি  তিনবার বিবাহ করেছিলেন। ১৯৪৩ সালে তিনি উত্তরাখণ্ডে যাত্রা শুরু করেন। ১৯৪৪-৪৭ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত রাশিয়ার লেলিনগ্রাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে ছিলেন। ১৯৪৭ সালে তিনি ভারতে ফিরে আসেন। ১৯৫৯-৬১ সালে রাহুল সাংকৃত্যায়ন শ্রীলঙ্কায় দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন।

১৯১৯ সাল থেকে শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবন। এ সময় ইংরেজ বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তাঁকে আটক করা হয় এবং তিন বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। কারাবাসের এই সময়টিতে তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ এর সংস্কৃত অনুবাদ করেন। এছাড়াও পালি ভাষা শিখে তিনি মূল বৌদ্ধ গ্রন্থগুলো পড়া শুরু করেন। এই সময় তিনি বৌদ্ধ ধর্ম দ্বারা আকৃষ্ট হন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন রাহুল সাংকৃত্যায়ন। বুদ্ধের পুত্রের নাম রাহুল এবং  সাংকৃত্যায়ন শব্দের অর্থ ‘আত্তীকরণ করে যে’। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি বিহারে চলে যান এবং ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ এর সঙ্গে কাজ শুরু করেন। তিনি গান্ধীজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন এবং এই সময় তিনি গান্ধীজীর বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগদান করেন। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক কারণে তাঁকে আবার হাজারীবাগ ও দেউলী জেলে ২৯ মাস থাকতে হয়। এই সময় জেলে বসে তিনি তাঁর বিখ্যাত বই “দর্শন দিগদর্শন” রচনা করেন। বক্সার জেলে বন্দী থাকার পর জেলা কংগ্রেসের সভাপতি হন ১৯২২ সালে। এরপর তিনি সাম্যবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। ১৯৩৯ সালে কৃষক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪০ সালে মতিহারি কৃষক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। এই সময় তাঁর কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্যপদ বাতিল করা হয়। ১৯৪৩ সালে হাজারীবাগ কারাগারে বসেই কথাসাহিত্যের আদলে লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত বই ‘ভোলগা সে গঙ্গা’।

তিনি মূলত পরিব্রাজক হলেও এর পাশাপাশি তিনি ছিলেন মহাজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, জাতীয়তাবাদী। তাঁর পরিচয় একজন লেখক, ঐতিহাসিক, দার্শনিক, বহু ভাষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক হিসেবে উল্লেখযোগ্য। তেরশো খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজী নালন্দা ও বিক্রমশিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার পুড়িয়ে ফেলার পর ভারতে সেই অর্থে সংস্কৃত ভাষার তেমন কোন কাজ খুঁজে পাওয়া যায় না। রাহুল সাংকৃত্যায়নের মূল উদ্দেশ্য ছিল হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃত পুঁথি উদ্ধার করা, বিশেষত বৌদ্ধ ধর্মের উপর যেগুলো ছিল। তিনি তিব্বত থেকে পালি ও সংস্কৃতের কিছু মূল্যবান বই নিয়ে আসেন। এছাড়া কিছু চিত্রকর্মও নিয়ে এসেছিলেন। পাটনার জাদুঘরের রাহুল অংশে সংরক্ষিত আছে।

রাহুল সংকৃত্যায়ন কুড়ি বছর বয়স থেকে লেখালেখি শুরু করেন। তিনি প্রতিদিন দিনলিপি লিখতেন সংস্কৃত ভাষায়। পরবর্তীকালে তাঁর আত্মজীবনী “মেরি জীবন যাত্রা” লিখতে এটি কাজে লেগেছিল। তাঁর মাতৃভাষা ছিল ভোজপুরি। তবে তিনি মূলত সংস্কৃতে লেখালেখি করতেন। এছাড়া হিন্দি ভাষাতেও লিখতেন। তাঁর ভ্রমণ, সমাজ, বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম প্রভৃতি বিষয়ের উপর অনেক গ্রন্থ আছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল – “ভোলগা থেকে গঙ্গা”, “মধ্য এশিয়ার ইতিহাস”, “দর্শন দিকদর্শন”, “কিন্নর দেশে আমি”, “যাত্রাপথে”, “মানব সমাজ” ইত্যাদি। “মেরি জীবনযাত্রা” বইয়ের ভূমিকায় বুদ্ধকে তাঁর শিক্ষক, গুরু আখ্যা দিয়ে তিনি লিখেছেন “নানা অভিমতকে আমি গ্রহণ করেছি একটা নৌকার মতো যাতে নদী পেরিয়ে বিপরীত দিকে যেতে পারি কিন্তু সেই অভিমতগুলোকে এমন বোঝা করে তুলিনি যাতে মনটাই পাষাণভার হয়ে যায়”।এছাড়াও “আমার লাদাখ যাত্রা”, “ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের উত্থান পতন”, “তিব্বতের সওয়া বছর”, “ভবঘুরে শাস্ত্র”, “ইসলাম ধর্মের রূপরেখা”, “মাও সে তুং”, “আকবর”, “স্তালিন”, “বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ” প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

তাঁর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ “ভোলগা থেকে গঙ্গা ‘দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ কুড়িটি সামাজিক ছোটগল্পের সংকলন, সামাজিক জীবনের উত্তরণ চিত্রিত হয়েছে এই গ্রন্থে। এই রচনার পর ভারতের সমস্ত অঞ্চল থেকে তাঁকে তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এটি ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয়।৬০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে ভলগা নদীর তীরে যে মানব গোষ্ঠী পরিবার স্থাপন করেছিল তাদেরই আবাস জীবন নিয়ে রচিত হয়েছে প্রথম গল্পটি। ক্রমে সেই মানুষ মধ্য ভলগা তটে অগ্রসর হয়ে মধ্য-এশিয়া অতিক্রম করেছিল। এক সময় সমগ্র গান্ধার এলাকাজুড়ে বসতি স্থাপন করেছিল আর্যরা। ইতিহাসের এই ধারা বিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে সমাপ্ত হয়েছে এবং গ্রন্থটিও এখানে শেষ হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা নিয়ে রচিত হয়েছে প্রতিটি গল্পের দৃশ্যপট। রাহুল সাংকৃত্যায়ন এর রচিত, সম্পাদিত, অনূদিত পুস্তকের সংখ্যা প্রায় দেড়শ। তিব্বত যাত্রায় আবিষ্কার করেন ৩৬৮ টি পুঁথি  এবং ৫৫টি আলোকচিত্র।

কাশী পন্ডিত সভা রাহুল সাংকৃত্যায়নকে ‘মহা পন্ডিত’ উপাধিতে ভূষিত করেন। শ্রীলংকা তাঁকে ‘ত্রিপিটকার্য’ উপাধি প্রদান করে। এছাড়া এলাহবাদ এর হিন্দি সাহিত্য সম্মেলন তাঁকে ‘সাহিত্য বাচস্পতি’ উপাধি দেয়। ভাগলপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও শ্রীলংকার বিদ্যালঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘ডিলিট’ ডিগ্রি দান করে। ভারত সরকার এই মহাপন্ডিতকে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করেন।

১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁর স্মৃতিভ্রংশ হয়। ১৯৬২-৬৩ সালে তিনি সাত মাসের জন্য চিকিৎসা করাতে সোভিয়েত রাশিয়া যান। এর পর দেশে ফিরে এলেও অসুস্থতা কাটেনি। ১৯৬৩ সালে ১৪ই এপ্রিল দার্জিলিং শহরের হিডেন হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।