শ্যামলকুমার সেন

শ্যামলকুমার সেন

ভারতবর্ষের রাজনীতিতে এমন কিছু ব্যক্তিত্বের অবদান প্রণিধানযোগ্য, যাঁরা আজীবন ভীষণ সক্রিয় রাজনীতি করেননি। বাঙালি আইন বিশেষজ্ঞ তথা বিচারপতি শ্যামলকুমার সেন ( Shyamal Kumar Sen) তেমনই একজন মানুষ। অবশ্য সক্রিয় রাজনৈতিক ক্ষেত্রের সঙ্গে তাঁর জীবন জুড়ে গিয়েছে নানা সময়ে এবং নিজের কর্তব্য, দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করে তাঁরা প্রমাণ করেছেন নিজেদের সামর্থ্য। অত্যন্ত পাণ্ডিত্য, ক্ষুরধার বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং স্থিতধী চরিত্র তাঁকে আইনের জগতে সম্মান এবং খ্যাতি এনে দিয়েছিল। নিজের দক্ষতায় তিনি সাধারণ একজন আইনজীবী থেকে হয়ে উঠেছিলেন বিচারপতি। যদিও রাজনীতির ক্ষেত্রে পদার্পণ এবং তদন্ত-কেন্দ্রিক ক্রিয়াকলাপের জন্য শ্যামলকুমার সেনকে ঘিরে বিরোধীরা কিছু বিতর্কও উসকে দিয়েছিলেন তাঁর কাজকে লক্ষ্য করে। 

১৯৪০ সালের ২৫ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরে শ্যামলকুমার সেনের জন্ম হয়। 

স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে তিনি আইন নিয়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে সম্মানের সঙ্গে সাফল্য লাভ করেছিলেন শ্যামলকুমার সেন। 

প্রথমে ১৯৬৪ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি বাণিজ্যিক এবং শিল্প আইনের একজন আংশিক সময়ের প্রভাষক হিসেবে পড়িয়েছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা সিটি কলেজে। এছাড়াও তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক হিসেবে ১৯৭১ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তাঁর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কলকাতা হাইকোর্টে শ্যামলকুমার মূল এবং আপিল উভয় ক্ষেত্রেরই চর্চা করেছিলেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেওয়ানি এবং সাংবিধানিক মামলায় তিনি উপস্থিত থেকেছেন। ১৯৮৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি শ্যামলকুমার নিজের দক্ষতা এবং অধ্যবসায়ের জোরে হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি পদে উন্নীত হন। পরবর্তীকালে তাঁর আরও পদোন্নতি ঘটেছিল। ১৯৯৯ সালের ২৯ এপ্রিল কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন শ্যামলকুমার সেন। আরও পরে এলাহাবাদ হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নির্বাচিত হন তিনি। এই পদে বসবার জন্য তিনি শপথ গ্রহণ করেছিলেন ২০০০ সালের ৮ মে। সেবছরই অর্থাৎ ২০০০ সালের ১৮ জুলাই মাত্র দুমাসের ব্যবধানেই তিনি এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির পদের জন্য শপথ গ্রহণ করেছিলেন। মাত্র দু-বছর তিনি এই পদের দায়িত্ব সামলেছিলেন। ২০০২ সালের ২৪ নভেম্বর শ্যামলকুমার এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবেই অবসর গ্রহণ করেন। 

এমন একজন পেশাদার এবং সুদক্ষ আইনজীবী পরবর্তীকালে সক্রিয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও পদার্পণ করেছিলেন। পূর্বতন রাজ্যপাল এ. আর. কিদওয়াইয়ের পদত্যাগের পর মাত্র আট মাসের জন্য শ্যামলকুমার সেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের পদে বহাল ছিলেন। ১৯৯৯ সালের ১৮ মে তিনি পশ্চিমবঙ্গের সপ্তদশ রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৯ সালের ৪ ডিসেম্বর শ্যামলকুমার এই পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা নিঃসন্দেহে সারদা চিটফান্ডের প্রতারণা। বিপুল সংখ্যক মানুষের দীর্ঘদিনের জমানো অর্থ রাতারাতি দুঃস্বপ্নের মতো গায়েব হয়ে যায় যেন। এই কেলেঙ্কারির জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। ‘কলকাতা গেজেট-এ প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শ্যামলকুমার সেনের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিশন নিয়োগ করেছেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। শ্যামলকুমার এই তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন এবং কমিশনে ছিল আরও চারজন সদস্য। এই কমিশন মূলত ‘সেন কমিশন’ নামেই পরিচিত। কেবল সারদা নয়, সারদার সঙ্গে সম্পর্কিত এমন আরও কিছু কোম্পানি ও স্কিম কোম্পানিগুলিও তাদের তদন্তের আওতায় ছিল। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে ৪০৪ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট রাজ্য সরকারকে জমা দিয়েছিল সেন কমিশন। সারদা সম্পদ পুনরুদ্ধারের ফলে ২.৩৯ কোটি টাকা কমিশনের কাছে জমা হয়। এছাড়াও কমিশন জানায় পঞ্জি স্কিমের প্রতারিতদের জন্য রাজ্য সরকারের কাছ থেকে ২৮৭ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। যদিও কমিশনের রিপোর্টেও সন্তুষ্ট হতে পারেননি অনেকে।

আপনার মতামত জানান