ইতিহাস

মিঠুন চক্রবর্তী

বাংলা চলচ্চিত্র জগতে অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হলেন মিঠুন চক্রবর্তী। তাঁর প্রকৃত নাম গৌরাঙ্গ চক্রবর্তী। তিনি সিনেমা জগতে ‘মিঠুনদা’ নামে বেশী খ্যাত৷

১৯৫২ সালের ১৬ জুন বাংলাদেশের বরিশালের ঝালকাঠি জেলায় মিঠুন  চক্রবর্তীর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম বসন্তকুমার চক্রবর্তী এবং মায়ের নাম শান্তিময়ী  চক্রবর্তী।  তাঁদের দুই ছেলে এবং তিন মেয়ে ছিল৷ মিঠুনের বাবা ক্যালকাটা টেলিফোনসে চাকরি করতেন।

মিঠুন চক্রবর্তীর প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় বরিশাল জিলা স্কুলে। তারপর তিনি ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতায় আসার পর  কেমিস্ট্রি নিয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন৷ গ্র্যাজুয়েশনের পরে তিনি পুণে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন৷

মিঠুন চক্রবর্তী তাঁর প্রাথমিক জীবনে নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন৷ তাঁর ভাই সেই সময় একটি ইলেকট্রিক দুর্ঘটনায় মারা যান৷ এরপরেই তিনি নকশাল আন্দোলন ছেড়ে ঘরে ফিরে আসেন৷ ১৯৭৬ সালে পরিচালক  মৃণাল সেনের হাত ধরে তিনি সিনেমা জগতে পা রাখেন৷ তাঁর প্রথম সিনেমা ‘মৃগয়া’  জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় এবং মিঠুন সেরা অভিনয়ের জন্য পুরস্কৃত হন৷ এরপর দো আনজানে (১৯৭৬) এবং ফুল খিল হেইন গুলশান গুলশান (১৯৭৮) এর মতো কয়েকটি চলচ্চিত্রে কয়েকটি পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করার পরে ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত ‘মেরা রক্ষক’ চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেন৷ তাঁর অভিনয় প্রতিভার মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে দর্শকদের মন জয় করে নিচ্ছিলেন৷ এরপর তিনি রবিকান্ত নাগাইচ পরিচালিত স্বল্প বাজেটের একটি সিনেমা ‘সুরক্ষা’য়(১৯৭৯) অভিনয় করার পর তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে৷ মিঠুনের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে ‘ডিস্কো ডান্সার’ ছবির জন্য। এই সিনেমায় মিঠুন চক্রবর্তীর নাচের স্টেপ এখনও খ্যাত হয়ে আছে৷  দেশের বাইরেও তাঁর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। একসময়  অমিতাভ বচ্চন এবং রেখার ব্যাগ বয়ে নিয়ে যাওয়া স্পটবয় মিঠুন রাজ কাপুরের পর একমাত্র অভিনেতা যিনি বিদেশে প্রবল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন৷

বলা যায় ১৯৮০ র দশকে মিঠুন চক্রবর্তীর হাত ধরে শাসিত হয়েছিল সমগ্র বলিউড৷ মুঝে ইনসাফ চাহিয়ে, ঘর এক মন্দির, পিয়ার ঝুঁকতা নেহী, সুয়াগ সে সুন্দর, পিয়ার কা মন্দির একের পর এক হিট সিনেমায় তিনি অভিনয় করে যাচ্ছিলেন৷ তাঁকে এরপর আর ফিরে তাকাতে হয় নি৷  তখনও পর্যন্ত তিনি ১১০টিরও বেশী সিনেমায় অভিনয় করে ফেলেছিলেন৷ তিনি বিভিন্ন সিনেমায় নানা রকম চরিত্রে অভিনয় করেছেন৷ কখনও অ্যাকশন কখনও বা পারিবারিক নাটক, রোম্যান্স এবং কমেডি চরিত্রেও নিপুনতার সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত-হম পাঁচ সিনেমায় তিনি অনেকগুলি বলিউড তারকাদের সঙ্গে একত্রে অভিনয় করেন।

এরপর  মিঠুন ট্যাক্সি চোর- সিনেমায় (১৯৮০) প্রথমবারের জন্য দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং পরবর্তী কালে আম্নে সামনে(১৯৮২), কসম পয়দা করনে ওয়ালো কি(১৯৮৪) এবং রক্তবন্ধন(১৯৮৪) এর মতো বেশ কয়েকটি ছবিতে দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করেন। সব মিলিয়ে সাড়ে তিনশোরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন মিঠুন। বাংলা, হিন্দি ছাড়াও তামিল, তেলুগু, কন্নড় ছবিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।

১৯৮০-এর দশকে তিনি টলিউডে তিনটি ব্লকবাস্টার সিনেমায় অভিনয় করেন যথা উত্তম কুমার পরিচালিত কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী (১৯৮১), এরপর গৌতম মুখার্জি পরিচালিত  ত্রয়ী(১৯৮২) এবং শক্তি সামন্তের পরিচালনায় অন্যায় অবিচার(১৯৮৫)।  পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত পরিচালিত ‘তাহাদের কথা’- সিনেমায় অভিনয় করেন যেটি ১৯৯২ সালে তাঁকে দ্বিতীয়বারের জন্য জাতীয় পুরস্কার এনে দেয় । ২০০২ সালে তিনি ঋতুপর্ণ ঘোষের পরিচালনায় অপর্ণা সেনের সঙ্গে ‘তিতলি’ সিনেমায় অভিনয় করেন৷ ২০০৮ সালে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘কালপুরুষ’-এ অভিনয় করেন। পরবর্তীকালে তিনি ‘শুকনো লঙ্কা’ এবং ‘টার্গেট: দ্য ফাইনাল মিশন’ ছবিতেও অভিনয় করেন৷ তাঁর অভিনিত প্রথম ভোজপুরি সিনেমা ‘ভোলে শঙ্কর’ সাফল্যের মুখ দেখেছিল৷ একই ভাবে ওড়িয়া ভাষায় তাঁর প্রথম সিনেমা ‘আয়ে জুগারা ক্রুষ্ণা সুদামা’ বক্স অফিসে যথেষ্ট সাফল্য পেয়েছিল৷ এই সিনেমায় তিনি ওড়িয়া সিনেমার বিখ্যাত নায়ক উত্তম মোহান্তির সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন৷ 

ত্রয়ী, মুঝে ইনসাফ চাহিয়ে, কসম পয়দা করনে ওয়ালে কি, পেয়ার কা মন্দির, ওয়াক্ত কি আওয়াজ, জিতে হ্যা শান সে, কমাণ্ডো, প্রেম প্রতিজ্ঞা, দালাল, আদমি, তাদিপার, ফুল অউর অঙ্গার, তাহাদের কথা, দিল আশনা হ্যায়, ঘর জামাই, তিতলী, সবসে বড়কর হাম, এমএলএ ফাটাকেষ্ট, মিনিস্টার ফাটাকেষ্ট, হাঁদা ভোঁদা, নোবেল চোর প্রভৃতি সিনেমায় তিনি অভিনেতা হিসেবে নজর কেড়েছেন। তাঁর প্রতিভার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র। জনপ্রিয়তা শিখরে পৌঁছে গেছিলেন তিনি৷

১৯৮৯ সালে মুখ্য অভিনেতা হিসাবে ১৯টি সিনেমায় অভিনয় করে যে রেকর্ড গড়েছিলেন তা আজও অটুট আছে৷ ১৯৯২ সালে তিনি দিলীপ কুমার এবং সুনীল দত্তের সঙ্গে সিনেমা অ্যান্ড টি.ভি আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (সিএনটিএএ) নামক একটি ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই ট্রাস্ট অভাবী অভিনেতাদের সাহায্য করত৷ এছাড়া তিনি ‘স্টুডিওস সেটিং অ্যান্ড মিত্র মজদুর ইউনিয়ন’এর অধিকর্তা ছিলেন যা সিনেমা কর্মীদের দাবি ও সমস্যা সমাধান নিয়ে কাজ করে থাকে।

শারীরিক অসুস্থতার কারণে একসময় সিনেমা জগৎ থেকে প্রায় নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। প্রায় তিন বছর বাংলা সিনেমায় দেখা যায়নি তাঁকে। তারপর তিনি জনপ্রিয় টিভি শো ‘ডান্স ইন্ডিয়া ডান্স’ -এ বিচারকের ভূমিকায় আসেন৷ এছাড়া জি বাংলায় সম্প্রচারিত ‘ দাদাগিরি আনলিমিটেড ‘ এবং বাংলায় সম্প্রচারিত ‘বিগ বস ‘ অনুষ্ঠানেও হোস্ট এর ভূমিকায় তাঁকে দেখা গেছে৷

সিনেমা ও টিভির জগত থেকে বেরিয়ে তাঁকে দেখা গেছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যসভা বিধানসভা নির্বাচনে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বারা রাজ্যসভা সংসদ নির্বাচনের জন্য তিনি মনোনীত হন৷২০১৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মিঠুন চক্রবর্তী সংসদ সদস্য হিসাবে যোগদান করেন৷ যদিও ২০১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর তিনি রাজ্যসভার সাংসদ হিসাবে পদত্যাগ করেন।

মিঠুন চক্রবর্তী তাঁর অভিনয় জীবনে বহু পুরস্কার অর্জন করেছেন৷ মৃগয়া সিনেমায় সেরা অভিনেতা হিসেবে অভিনয়ের জন্য ১৯৭৬ সালে তিনি জাতীয় পুরস্কার পান৷ আবার ১৯৯২ সালে  ‘তাহাদের কথা’ সিনেমায় সেরা অভিনয়ের জন্য জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন।  ‘স্বামী বিবেকানন্দ’ সিনেমায় সহায়ক অভিনেতা হিসেবে অভিনয়ের জন্য ১৯৯৫ সালে জাতীয় পুরস্কার পান। এছাড়া ‘অগ্নিপথ’ এবং ‘জল্লাদ’ সিনেমার জন্য ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড তাঁর ঝুলিতে আসে।

মিঠুন চক্রবর্তীকে নিয়ে বেশ কিছু বই লেখা হয়েছে যার মধ্যে উল্লেখ্য হল সুমিত দে’ র লেখা  ‘অন্য মিঠুন’, ইংরেজি ভাষায় সুধা রাজগোপালনের লেখা ‘Leave Disco Dancer Alone’,  ইংরেজি ভাষায় লিখিত আরও একটি বই’ Tribute To Mithun Chakraborty’ যেটি লিখেছেন আমেরিকান লেখিকা সারা জনসন।  মিঠুন চক্রবর্তী নিজে একটি বই লিখেছেন তাঁর ভক্তদের জন্য  ‘ সিনেমায় নামতে হলে’৷

১৯৮২ সালের জুলাই মাসে তিনি যোগীতা বালীকে বিয়ে করেন।  তাঁদের চারটি সন্তান রয়েছে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।