পশ্চিমবঙ্গের ২৩টি জেলার মধ্যে মেদিনীপুর একটি অন্যতম জেলা।বর্তমানে মেদিনীপুর পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এই দুই ভাগে বিভক্ত।পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার একটি সদর শহর ও পৌরসভা এলাকা হল মেদিনীপুর।
এই জেলার নাম ‘মেদিনীপুর ‘ কিভাবে হল সেই প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক সাক্ষ্য প্রমাণের সাথে সাথে মেদিনীপুর নামটির উৎপত্তি বিষয়ে বেশ কিছু জনশ্রুতিও জনমানসে প্রচলিত আছে।
শুরুতে ঐতিহাসিক সাক্ষ্যপ্রমাণ কি বলে দেখা যাক।ঐতিহাসিক শ্রী হরি সাধন দাস তাঁর ‘মেদিনীপুর ও স্বাধীনতা’ গ্রন্থে যা লিখেছেন সে কথা মানলে বলতে হয় ১২৩৮ খ্রিস্টাব্দে গন্ডিচাদেশের (বর্তমান ওড়িশা) সামন্তরাজা প্রাণকরের পুত্র মেদিনীকর এই শহর প্রতিষ্ঠা করেন।সাল ১২০০ থেকে ১৪৩১ মেদিনীপুর কর বংশের রাজত্বকাল হিসেবে পরিচিত ।এই মেদিনীকর নাম থেকেই এই জেলার নাম হয় মেদিনীপুর।মেদিনীকর ‘মেদিনীকোষ’ নামে একটি সংস্কৃত অভিধান রচনা করেছিলেন- মনে করা হয় এই অভিধান থেকেও মেদিনীপুর নামের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে।
আবার আরো একটি মত অনুযায়ী সুদূর মদিনা থেকে মাদানীশাহ নামে এক পীর এই অঞ্চলে এসেছিলেন।’মাদানীশাহ’ ক্রমে মেদিনীপুর হয়েছে এ সম্ভাবনাও অনেকে উড়িয়ে দিতে পারেননা।
অন্য একটি মতে, ঔরঙ্গজেবের সময় স্থপতিকার মৌলানা মদিনী কিংবা উড়িষ্যার অনন্ত বর্মন চোঙ্গল রাজার রাজ্য ‘মিথুনপুর’ থেকেও মেদিনীপুর নাম এসে থাকতে পারে।দ্বাদশ শতাব্দীতে মেদিনীপুরের নাম ছিল মিথনপুর।ঐতিহাসিকদের মতে আইন – ই- আকবরী তে ‘মেদিনীপুর’ নগরী হিসেবে উল্লেখ হয়েছে।
কোন কোন ঐতিহাসিক আবার ভিন্ন মত পোষণ করেন।তাঁদের মত অনুযায়ী ‘মেদিনী মল্ল রায়’ নামে উড়িষ্যার এক শক্তিশালী রাজা ১৫২৪ সালে এই অঞ্চলটি জয় করে মেদিনীপুর নামকরণ করেছিলেন।
এ ছাড়াও আরেকটি মত ও এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বলে অনেকে মনে করেন।
জনশ্রুতি বলে মেদিনী মাতার মন্দির থেকেও মেদিনীপুর নাম হয়ে থাকতে পারে।কেউ বলেন একসময় এখানে মেদ নামে এক আদিম উপজাতির বাস ছিল।’মেদ’ শব্দের অর্থ হাতি বা মেদা থেকেও এই নামকরণ হয়ে থাকতে পারে কারণ জঙ্গল পূর্ন এই স্থানে এক সময় প্রচুর হাতি ছিল।
সঠিক অর্থে মেদিনীপুর নামকরনের কোন সরকারী স্বীকৃত মত পাওয়া যায়নি এখনো।যা পাওয়া গেছে সবই অনুমান ভিত্তিক। তেমনি একটি মত হল ‘মেদিনীবাবা’ নামের এক পিরের নাম থেকে মেদিনীপুর নামের উৎপত্তি।তবে কি ওপরে আলোচিত প্রচলিত মতের বাইরে আরও দুয়েকটি সম্ভাবনার কথাও অনেকে একেবারে উড়িয়ে দেননা। অভিধান মতে, ‘মেদিনী’ অর্থে পৃথিবী এবং ভূমি দুইই বোঝায়।মেদিনীপুর শুরুতে প্রধানত কৃষিজীবীদেরই একচেটিয়া বাসস্থান ছিল।ইতিহাসবিদ ও ক্ষেত্রসমীক্ষক সুধীরকুমার মিত্র লিখেছেন – ‘জনশ্রুতি এই যে, মাহিষ্যগণ ৮২২ শকাব্দতে মেদিনীপুর জেলায় প্রথম আসিয়া উক্ত জেলার অন্তর্গত তমুলক, বালিসীতা, তুরকা, সুজামুটা ও কুতবপুর নামক স্থানে, পাঁচটি স্বতন্ত্র রাজ্য গঠন করে এবং পরে মেদিনীপুর জেলা হইতে তাহারা বঙ্গের অন্যান্য স্থানে ছড়াইয়া পড়ে।’ তাঁর মত ধরলে, কামিং সাহেবের সেনসাস রিপোর্ট এবং হান্টার সাহেবের বইয়ে মাহিষ্যদের যে অনার্য বংশীয় বলে অভিহিত করা হয়েছে, আসলে কিন্তু তা নয়। মাহিষ্যরা আর্য-অনার্য সংকরজাতি। মূলত কৃষিজীবী মাহিষ্য সম্প্রদায়ের বাসভূমি ছিল বলে ভূমিকে কৃষিকার্যের জন্য ব্যবহার করাই ছিল সে যুগের রীতি।তাই একথা মনে করা যেতেই পারে ‘কৃষিভূমি’ অধ্যুষিত জনপদ বা গ্রামই হল ‘মেদিনীপুর’।
নামকরণ নিয়ে আবার…অন্য একটি মতও আছে।নতুন ধান খামারে উঠলে ধান ঝাড়াইয়ের পর পড়ে থাকা আকাঁড়ার মধ্যেও লেগে থাকত অনেক ধান। গাইগরু দিয়ে এই‘ধানমাড়াই’ হত। যে ‘কাঠের খুঁটি’কে কেন্দ্র করে বৃত্তাকারে ঘুরত গরু দু’টি, তাকে বলা হত ‘মেদি’ বা ‘মেধি’। এই খুঁটিটি পোঁতার কাজকে বলা হত ‘মেদি-নিখনন’। কোথাও কোথাও ‘মেদিনি’ নামেও পরিচিত ছিল কাঠ অথবা বাঁশের দণ্ডটি। তাই থেকেই কালক্রমে ‘মেদিনীপুর’ নাম এসে থাকতে পারে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান