মানবকল্যাণমূলক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক স্তরে বিখ্যাত রেড ক্রসের জনক বলা হয় সুইশ ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী জন হেনরি ডুনান্ট বা জ্যঁ অঁরি দ্যুনঁ-কে (Jean Henry Dunant)। তিনিই ছিলেন প্রথম সুইশ নোবেল প্রাপক। সলফারিনোর যুদ্ধে বিপর্যস্ত ইতালিকে দেখে স্মৃতিকথামূলক একটি বই লেখেন তিনি ‘এ মেমোরি অফ সলফারিনো’ নামে যার অনুপ্রেরণাতেই আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি গড়ে ওঠে। ১৮৬৪ সালে জেনেভা সম্মেলনে ডুনান্টের পরিকল্পনা অনুযায়ী যুদ্ধে আহত সৈনিকদের সেবাকর্মের জন্য একটি পৃথক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সংস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ গৃহীত হয়। ওয়াইএমসিএ (YMCA) অর্থাৎ ইয়ং মেন্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের সুইশ শাখার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হেনরি ডুনান্ট।
১৮২৮ সালের ৮ মে সুইজারল্যাণ্ডের জেনেভায় জন হেনরি ডুনান্টের জন্ম হয়। তাঁর বাবা জন জ্যাকুইস ডুনান্ট ছিলেন একজন প্রথিতযশা ব্যবসায়ী এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল আঁতোয়ানেৎ ডুনান্ট কোলাডন। বরাবরই তাঁর পরিবারের সমাজকল্যাণমূলক কাজে উৎসাহ ছিল। তাঁর বাবা নিজে অনাথ শিশুদের সাহায্য করতেন আর তাঁর মা দুঃস্থ-দরিদ্র ও অসুস্থ মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। সেই সঙ্গে ক্যালভিনিস্ট হওয়ার সুবাদে জেনেভার সমাজে যথেষ্ট সম্মান ও খ্যাতি ছিল হেনরি ডুনান্টের পরিবারের।
ডুনান্টের বড় হয়ে ওঠার সময়ই জেনেভায় রেভেইল ধর্ম আন্দোলন চলছিল। মাত্র আঠারো বছর বয়সে ডুনান্ট এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জেনেভা সোসাইটিতে যোগ দেন সেবামূলক কাজে যুক্ত হওয়ার জন্য। পরবর্তীকালে তিনি ‘থার্সডে অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি সংগঠন খোলেন যেখানে তাঁর বয়স্যরা সকলে মিলে বাইবেল পাঠ-আলোচনা এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজ করতেন। ১৮৫২ সালের ৩০ নভেম্বর জেনেভাতেই ইয়ং মেন্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (YMCA) গড়ে তোলেন তিনি এবং এর তিন বছর পরে প্যারিসে এই সংস্থার আন্তর্জাতীয়করণ বিষয়ে একটি সভায় অংশ নেন।
এক নজরে জন হেনরি ডুনান্ট-এর জীবনী:
- জন্ম: ৮ মে, ১৮২৮
- মৃত্যু: ৩০ অক্টোবর, ১৯১০
- কেন বিখ্যাত: হেনরি ডুনান্ট একজন সমাজসেবী ও ব্যবসায়ী। সলফারিনোর যুদ্ধে বিপর্যস্ত ইতালিকে দেখে স্মৃতিকথামূলক একটি বই লেখেন তিনি ‘এ মেমোরি অফ সলফারিনো’ নামে যার অনুপ্রেরণাতেই আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি গড়ে ওঠে। তিনিই ছিলেন প্রথম সুইশ নোবেল প্রাপক।
- পুরস্কার ও স্বীকৃতি: ১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। হেইডেনে তাঁর বাসস্থানটিতে হেনরি ডুনান্ট সংগ্রহশালা নির্মিত হয়েছে। সুইজারল্যাণ্ডের দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গের নাম রাখা হয় ডুনান্ট শৃঙ্গ। থাই রেডক্রস সোসাইটির সদর সপ্তরের রাস্তাটির নাম রাখা হয় হেনরি ডুনান্ট রোড।
কলেজে ভর্তি হলেও ১৮৪৯ সালে মাত্র একুশ বছর বয়সে খুব খারাপ ফল করার দরুণ ‘কলেজ ডি জেনেভে’তে পড়া ছেড়ে দেন হেনরি ডুনান্ট।
পড়াশোনা ছেড়ে হেনরি ডুনান্ট মুদ্রা-পরিবর্তনকারী সংস্থা ‘লুলিন এট সটার’-এ শিক্ষানবিশি হিসেবে কাজে যোগ দেন। এই শিক্ষানবিশি শেষ হওয়ার পরে ব্যাঙ্কের একজন কর্মচারী হিসেবে পাকাপাকিভাবে নিযুক্ত হন হেনরি ডুনান্ট।
১৮৫৩ সালে আলজিরিয়া, তিউনিশিয়া ও সিসিলি ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লিখে ফেলেন তাঁর প্রথম বই ‘অ্যান অ্যাকাউন্ট ইন দ্য রিজেন্সি ইন তিউনিস’ যা ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত হয়। ১৮৫৬ সালে বিদেশি কলোনিগুলিতে ব্যবসা করার জন্য ফরাসি-অধিকৃত আলজিরিয়া তাঁকে কিছু পরিমাণ জমির অনুমোদন দেয় এবং সেখানেই ডুনান্ট গড়ে তোলেন ‘ফাইনান্সিয়াল অ্যাণ্ড ইণ্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানি অফ মন্স-জেমিলা-মিলস্’। কিন্ত জমি এবং জলের অধিকার সংক্রান্ত বিষয়টি স্পষ্ট ছিল না এবং একইসঙ্গে কলোনি-কর্তৃপক্ষের কোনরূপ সহযোগিতা ছিল না। ফলে এই জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে ডুনান্ট সিদ্ধান্ত নেন ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের দ্বারস্থ হবেন তিনি।
সে সময় পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার কাছে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে যুদ্ধরত ছিল ফ্রান্স। ইতালির অধিকাংশ অঞ্চল তখন অস্ট্রিয়ার দখলে ছিল। ছোট্ট শহর সলফারিনোতে নেপোলিয়নের দপ্তর ছিল। সম্রাটের সম্পর্কে অত্যন্ত প্রশস্তিমূলক একটি বই লিখে তিনি তৃতীয় নেপোলিয়নের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান ১৮৫৯ সালের ২৪ জুন আর সেই দিনই উভয়পক্ষের যুদ্ধে তেইশ হাজার মানুষ আহত হন আর যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে থাকে শবদেহের মিছিল। এই ঘটনায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে সে সময় হেনরি ডুনান্ট নিজেই দায়িত্ব নিয়ে এলাকার মহিলা আর কিশোরীদের একত্রিত করে আহত সৈনিকদের সেবায় নিয়োজিত হন। কিন্তু তাঁদের কাছে না ছিল যথাযথ ওষুধ, না ছিল চিকিৎসার সরঞ্জাম। তখন নিজেই অর্থসাহায্য করে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আনিয়ে তিনি তাদের হাসপাতালে ভর্তি করার ব্যবস্থা করেন। নিকটবর্তী ক্যাস্টিগলিওন ডেল স্টিভিয়ার শহরের সকল মহিলা একযোগে পরম ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্দীপ্ত হয়ে সৈনিকদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ডুনান্টের প্রচেষ্টাতেই ফরাসিদের নিকট বন্দী অস্ট্রিয়ান ডাক্তাররা মুক্ত হন এবং তাঁরা এসে সৈনিকদের চিকিৎসায় মনোনিবেশ করেন।
ইতালির জেনেভায় ফিরে ডুনান্ট এই অভিজ্ঞতা সম্বল করে একটি বই লেখেন যার নাম ‘এ মেমোরি অফ সলফারিনো’ যা পরে ১৮৬২ সালে প্রকাশ পায়। ডুনান্টের নিজের খরচে ছাপা এই বই প্রথম সংস্করণেই ষোলোশো কপি বিক্রি হয়ে যায়। এই বইতে একইসঙ্গে তিনি যেমন যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছেন, যুদ্ধের অর্থব্যয়ের পরিসংখ্যান-যুদ্ধপরবর্তী বিশৃঙ্খলার বর্ণনা দিয়েছেন, ঠিক তেমনই এই বইতেই ডুনান্ট প্রথম বলেন যুদ্ধাহত সৈনিকদের সেবার জন্য একটি নিরপেক্ষ জনহিতকারী সংস্থার উপস্থিতি আশু প্রয়োজন। সমগ্র ইউরোপে তাঁর এই ধারণা প্রশংসিত হয় এবং জেনেভা সোসাইটির ১৮৬৩ সালের একটি অধিবেশনের বিষয় হয়ে ওঠে ডুনান্টের বইতে বিবৃত ধারণা সম্পর্কিত আলোচনা। ক্রমেই জেনেভা সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেন তিনি। তাঁর ধারণাটি বিচার করার জন্য যে পাঁচজন সদস্যের কমিটি বসে সেখানে উপস্থিত ছিলেন গুস্তাভ মোনিয়ের, সুইশ আর্মি জেনারেল হেনরি ডুফ্যোর এবং দুইজন ডাক্তার লুইস অ্যাপিয়া ও থিওডর ম্যানর। ১৮৬৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে তাঁদের প্রথম অধিবেশনেই আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি স্থাপিত হয়েছিল। যারা সৈনিকদের সেবা করবে নিরপেক্ষভাবে তাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দিকটিও ভেবে দেখার কথা জানিয়েছিলেন ডুনান্ট। কিন্তু ক্রমশই ডুনান্ট এবং মোনিয়েরের মধ্যে মতাদর্শগত বিরোধ প্রবল হচ্ছিল।
১৮৬৩ সালের অক্টোবর মাসে, আহত সৈনিকদের সেবা-যত্ন আরো কীভাবে উন্নত করা যায় সে ব্যাপারে জেনেভায় আয়োজিত একটি অধিবেশনে ১৪টি রাজ্য অংশ নেয় এবং ১৮৬৪ সালে আরেকটি অধিবেশনে ১২টি রাজ্য প্রথম জেনেভা সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে। ১৮৬৭ সালের এপ্রিল মাসে একটি দূর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে। ‘ক্রেডিট জেনেভোয়িস’ নামে আলজিরিয়ার একটি ফিনান্সিয়াল ফার্ম দেউলিয়া হয়ে যায় যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে হেনরি ডুনান্টের নাম। হেনরি ডুনান্ট নিজেও দেউলিয়া ঘোষণা করেন নিজেকে। এই অবস্থায় বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি থেকে তাঁকে সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নিতে হয়। ১৮৬৮ সালের ১৭ আগস্ট জেনেভা ট্রেড কোর্টে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য প্রতারণার দায়ে নিন্দিত হন জন হেনরি ডুনান্ট। ঐ ফার্মে তাঁর নিজেরও অর্থ সঞ্চিত ছিল, ফলে তিনি নিজেও পরিবার-সন্তানাদি নিয়ে মহা সমস্যায় পড়লেন। ১৮৬৮ সালে তাঁর মা মারা গেলে YMCA থেকেও তাঁকে বহিষ্কার করা হয়।
জেনেভা শহর চিরদিনের জন্য ত্যাগ করেন ডুনান্ট এবং প্যারিসে পৌঁছে সেখানকার ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়ান যুদ্ধে তিনি নিজ উদ্যোগে কমন রিলিফ সোসাইটি গড়ে তোলেন। এত দুরবস্থার মধ্যেও সেবাধর্ম থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। সেই সময় আন্তর্জাতিক বিবাদ মেটানোর জন্য একটি আন্তর্জাতিক আদালতের উপস্থিতির কথা ঘোষণা করেছিলেন তিনি এবং একইসঙ্গে একটি বিশ্ব গ্রন্থাগার স্থাপনের পরিকল্পনাও করেছিলেন। ক্রমেই অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ড, প্রাশিয়া, স্পেন, সুইডেন প্রভৃতি দেশে এই রেডক্রস আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে থাকে, কিন্তু সেই আগের মতোই ঋণ-জর্জরিত হয়ে পড়েন ডুনান্ট। দারিদ্র্যের কারণে বিভিন্ন শহরে ঘুরতে ঘুরতে ১৮৮১ সালে স্টুটগার্টের এক বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্রে তিনি চলে আসেন হেইডেনে আর সেখানেই বাকি জীবনটা কাটিয়েছিলেন ডুনান্ট।
এখানেই উইলহেল্ম সনডেরেগার ও তাঁর স্ত্রী সুসানার সঙ্গে পরিচয় হয় যাঁরা তাঁকে নিজের জীবন-অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করতে উৎসাহ দেন। সুসানা নিজ দায়িত্বে হেইডেনে রেডক্রসের একটি শাখা তৈরি করে তাঁর সভাপতি নির্বাচন করেন হেনরি ডুনান্টকে। ১৮৯৫ সালে জার্মান পত্রিকা ‘উবের্ ল্যাণ্ড উন্দ মির্’-এ তাঁকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ‘হেনরি ডুনান্ট, দ্য ফাউণ্ডার অফ দ্য রেডক্রস’ নামে যা পরে ইউরোপের আরো অন্যান্য পত্রিকায় পুনর্প্রকাশিত হতে থাকে। এরপর থেকেই অবস্থা বদলাতে শুরু করে হেনরি ডুনান্টের। সুইস বিনে-ফেণ্ড পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি এবং তখন থেকেই নানা মানুষের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য আসতে থাকে।
১৯০১ সালে আন্তর্জাতিক রেডক্রস আন্দোলন শুরু করার জন্য এবং জেনেভা সম্মেলন চালু করার সুবাদে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন জন হেনরি ডুনান্ট। সুইশ নোবেল-প্রাপক হিসেবে তিনিই ছিলেন সর্বপ্রথম। যদিও তিনি এবং ফ্রেডেরিক প্যাসে নামে অপর এক ফরাসি শান্তিকামীকে ঐ একই নোবেল পুরস্কার যৌথভাবে দেওয়া হয়েছিল। পুরস্কারমূল্য স্বরূপ এক লক্ষ চার হাজার সুইস ফ্রাঙ্ক লাভ করেছিলেন ডুনান্ট, যদিও বাকি জীবনে সেই অর্থ তিনি একবারের জন্যেও ব্যবহার করেননি। ১৯০৩ সালে হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল বিভাগের অধ্যাপকবৃন্দ তাঁকে সম্মানজ্ঞাপক ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত করেন।
১৯১০ সালের ৩০ অক্টোবর হেইডেন নার্সিংহোমে জন হেনরি ডুনান্টের মৃত্যু হয়।তাঁর মৃত্যুর পরে হেইডেনে তাঁর বাসস্থানটিতে হেনরি ডুনান্ট সংগ্রহশালা নির্মিত হয়েছে। ডুনান্টের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য সুইজারল্যাণ্ডের দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গের নাম রাখা হয় ডুনান্ট শৃঙ্গ। থাই রেডক্রস সোসাইটির সদর সপ্তরের রাস্তাটির নাম রাখা হয় হেনরি ডুনান্ট রোড।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান