ভারতের ইতিহাসের ভয়ংকরতম যুদ্ধগুলির যদি একটি তালিকা করা যায় তবে সেখানে খুব উপরদিকেই স্থান পাবে কলিঙ্গ যুদ্ধ (Kalinga War)। ভারতের ইতিহাসের এই রক্তাক্ত অধ্যায়টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহান সম্রাট অশোকের নাম। অশোকের চন্ডাশোক থেকে ধর্মাশোকে রূপান্তরিত হওয়ার সেই রোমহষর্ক ইতিহাস এই কলিঙ্গ যুদ্ধের সঙ্গেই জড়িত। সম্রাট অশোকের সিংহাসন আরোহণের পর মৌর্য সাম্রাজ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। প্রায় এক লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল এই যুদ্ধ। মৌর্য সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এই যুদ্ধ বিজয়ের মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকলেও নিষ্ঠুরতা থেকে যে শান্তির বীজ উপ্ত হয়েছিল এই যুদ্ধ থেকে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই পরিলক্ষিত হয়। কলিঙ্গ যুদ্ধ সম্পর্কে অশোকের প্রতিক্রিয়া তাঁর বিখ্যাত শিলালিপিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
আনুমানিক ২৬১ খ্রীস্টপূর্বাব্দে সম্রাট অশোকের অধীনস্থ মৌর্য সাম্রাজ্য এবং কলিঙ্গের মধ্যে দয়া নদীর তীরে অবস্থিত ধৌলি পাহাড়ে কলিঙ্গ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই কলিঙ্গ বর্তমানে ওড়িশা রাজ্যের পূর্ব উপকুলে এবং অন্ধ্রপ্রদেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। কলিঙ্গ সে সময় একটি স্বাধীন সামন্ত রাজ্য ছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সুদামা মিশ্রের মতে, কলিঙ্গ জনপদ মূলত পুরী ও গঞ্জাম জেলার অন্তর্ভুক্ত এলাকা নিয়ে গঠিত।
পুরাণ অনুসারে, ৩২জন ক্ষত্রিয় রাজা মহাভারতের যুদ্ধের পর থেকে মহাপদ্মানন্দের সময় পর্যন্ত কলিঙ্গ শাসন করেছিল। তারপর সেই ৩২জনকে পরাজিত ও হত্যা করে ৩৬২ খ্রীস্টপূর্বাব্দে কলিঙ্গের দখল নেন মহাপদ্মানন্দ। এরফলে কলিঙ্গ স্বাধীনতা হারালেও নন্দ বংশের অধীনে কলিঙ্গ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল।
মহাপদ্মানন্দের পর তাঁর আট পুত্র একের পর এক কলিঙ্গ শাসন করেছিলেন। শেষ নন্দরাজা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কর্তৃক পরাজিত হন। এই চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য মগধে মৌর্য সাম্রাজ্যের পত্তন করেছিলেন। এই শেষ নন্দ রাজার বিরুদ্ধে চন্দ্রগুপ্তের বিদ্রোহের সময়তেই কলিঙ্গ নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করেছিল এবং নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে শুরু করেছিল। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বা তাঁর পুত্র বিন্দুসার কেউই কলিঙ্গকে মগধের অধীনস্থ করতে পারেননি।
বিন্দুসারের পর তাঁর পুত্র অশোক সিংহাসনে আরোহণ করেন। এই অশোকই তাঁদের পিতা ও পিতামহের ধারাকে অব্যহত রাখেন এবং কলিঙ্গ দখল করতে চান। সেই উদ্দেশ্যেই অশোক কলিঙ্গ আক্রমণ করলে কলিঙ্গ যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। এখানে একটি কিংবদন্তির উল্লেখ করা যাক। ওড়িয়া জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি গল্প প্রচলিত আছে যে, অশোক জেলেদের কন্যা এবং কলিঙ্গের রাজকুমারের বাগদত্তা করুবতীর প্রেমে পড়ার পর কলিঙ্গ আক্রমণ করেছিলেন। অনেকে এটিকে সত্য বলে মানেন, কারণ করুবতী নামে অশোকের এক স্ত্রী ছিলেন।
যাই হোক, কলিঙ্গ যুদ্ধের পটভূমি নিয়ে ঐতিহাসিকদের নানারকম মত রয়েছে। কোন কোন পন্ডিত মনে করেন, স্বাধীন শক্তি কলিঙ্গ একপ্রকার ত্রাসের সঞ্চার করেছিল মৌর্যদের অভ্যন্তরে। তাঁদের ভয় ছিল যে, কলিঙ্গ মৌর্য রাজধানী পাটলিপুত্র এবং মধ্য ভারতীয় উপদ্বীপের মধ্যে যোগাযোগ বিঘ্নিত করতে পারে। মনে রাখতে হবে, কলিঙ্গ বঙ্গোপসাগরে বাণিজ্যের জন্য উপকুলরেখা নিয়ন্ত্রণ করত।
কলিঙ্গ ছিল খুবই সমৃদ্ধ এবং শান্তিপ্রিয় একটি জনপদ। বহু শিল্পী ব্যক্তিদের বাস ছিল সেখানে। কলিঙ্গের উত্তরের অংশটি উৎকল নামে পরিচিত ছিল। তারা এই অঞ্চল থেকে প্রথম নৌবাহিনী ব্যবহার করে এবং বাণিজ্যের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপকূলে ভ্রমণ করে। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজত্বকাল থেকেই মালয়, সিলন এবং জাভা প্রভৃতি অঞ্চলের সাথে বাণিজ্য সম্পর্কের জন্য এবং তার সামরিক শক্তির জন্য কলিঙ্গ বিখ্যাত ছিল। দক্ষ একটি নৌবাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল কলিঙ্গ এবং তারা গড়ে তুলেছিল বেশ কয়েকটি বন্দর। এমন একটি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী জনপদকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, বিন্দুসার প্রমুখ মগধের সঙ্গে সংযুক্ত করে ক্ষমতার বিস্তারে ব্যর্থ হয়েছিলেন এবং উত্তর প্রজন্ম অশোকও শান্তি আনয়ন ও ক্ষমতা দখলের জন্য কলিঙ্গ আক্রমণ করেছিলেন বলেই ঐতিহাসিকদের মত।
অন্যদিকে, তিব্বতি লেখক লামা তারানাথ, তাঁর লেখায় অশোক ও নাগাদের শত্রুতার কথা লেখেন। নাগারা নাকি অশোকের গহনা চুরি করেছিল। এই নাগারা উপমহাদেশে প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য কলিঙ্গ বন্দর ব্যবহার করত। তাই প্রতিহিংসা চরিতার্থতার জন্য অশোক কলিঙ্গ আক্রমণ করেছিলেন, এমন মতও প্রচলিত।
অনেকে বলেন, কেবল ধর্মপ্রচারের কারণে, কলিঙ্গের অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে বৌদ্ধধর্মের মহিমা প্রচারের জন্য একটি পবিত্র যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন অশোক, যদিও এই যুক্তি যথেষ্ট নড়বড়ে।
অশোক তাঁর রাজত্বের কিছু বৎসর পরে কলিঙ্গের শাসককে একটি বার্তা পাঠান, যাতে কলিঙ্গকে মৌর্যদের কাছে আত্মসমর্পণের কথা লেখা ছিল। তবে কলিঙ্গ শাসক অশোকের এই প্রস্তাব অস্বীকার করলে আনুমানিক ২৬১ খ্রীস্টপূর্বাব্দে সিংহাসন আরোহণের আট বছর পর অশোক কলিঙ্গ আক্রমণ করেছিলেন। কলিঙ্গ সেনাবাহিনীতে মাত্র ৬০,০০০ পদাতিক, ১০০০ অশ্বারোহী এবং ৭০০টি হাতি ছিল। অন্যদিকে, গ্রীক রাষ্ট্রদূত মেগাস্থিনিসের বর্ণনা অনুযায়ী মৌর্যদের সামরিক শক্তি ছিল প্রায় লক্ষাধিক। মৌর্যশক্তির তুলনায় এত কম পরিমাণ সামরিক শক্তি নিয়েও বীরত্বের সঙ্গে দুর্ধর্ষ লড়াই করেছিল কলিঙ্গ। ঐতিহাসিকরা বলেন, কলিঙ্গের যোদ্ধারা তাঁদের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন। যদিও সম্রাট অশোকের দুর্ধর্ষ এবং বিপুল পরিমাণ সেনার কাছে কলিঙ্গ পরাস্ত হয়েছিল। প্রচলিত আছে যে, এমনই ভয়ংকর যুদ্ধ হয়েছিল, এত বিপুল সংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছিলেন যে, তাদের রক্তে পার্শ্ববর্তী দয়া নদীর জল টকটকে লাল হয়ে গিয়েছিল।
কলিঙ্গ যুদ্ধের এক গভীর প্রভাব পড়েছিল স্বয়ং সমরাট অশোকের উপরে। অশোকের শিলালিপি থেকে জানতে পারা যায় যে, কলিঙ্গের প্রান্তরে কলিঙ্গেরই প্রায় এক লক্ষ বা তারও বেশি মানুষ নিহত হয়, প্রায় দেড় লক্ষ মানুষকে বন্দি করা হয়। হাজার হাজার নারী পুরুষকে কলিঙ্গ থেকে বিতাড়িত করা হয়, তারা বসতি স্থাপনের জন্য পোড়ো জমি পরিষ্কারের কাজ করতে শুরু করেছিল। দূর থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে অশোক ঘোড়া, হাতি এবং সৈন্যদের মৃতদেহ দেখতে পেয়েছিলেন। সর্বত্র রক্তের স্রোত দেখা যাচ্ছিল, অসহায় শিশুরা সেখানে কাঁদছিল, আহত মানুষ মাটিতে পড়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। সেই বীভৎস এবং করুণ দৃশ্য তাঁর অন্তর্জগতে আলোড়ন তুলেছিল। এই দৃশ্য দেখে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি পাটলিপুত্রের দিকে রওনা দিয়েছিলেন। অশোকের আদেশ থেকে জানা যায়, তিনি মানুষের মৃত্যু আর বন্দীত্ব সহ্য করতে পারছিলেন না, সেই কারণে যুদ্ধের ধারণা ত্যাগ করেছিলেন। যুদ্ধ ত্যাগ করে অশোক বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করতে শুরু করেন এবং সকল জীবের শান্তি, আনন্দ ও নিরাপত্তা কামনা করেন। অহিংসা ও ধর্মের প্রচারে মনোনিবেশ করেন তিনি। মানবকল্যাণকর নানারকম কাজ, যেমন তীর্থযাত্রীদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণ, পশু চিকিৎসালয় নির্মাণ ইত্যাদি কাজ করেন। কলিঙ্গ যুদ্ধ তাঁকে চন্ডাশোক থেকে ধর্মাশোকে রূপান্তরিত করে দেয়।
এখানে উল্লেখ্য, কিছু ঐতিহাসিকের মতে অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধের দু’বছর আগেই বৌদ্ধধর্ম অনুসারী হয়েছিলেন। অশোকের কোন শিলালিপিতে স্পষ্ট করে যুদ্ধের পরে তাঁর বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের ইঙ্গিত নেই। তাছাড়াও অশোকের অনুশোচনা প্রকাশকারী শিলালিপিটি যুদ্ধের স্থান থেকে অনেক দূরে আফগানিস্তানের কান্দাহারের কাছে অবস্থিত বলে বিশ্বাস করা হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান