আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “কড়ায় গণ্ডায়”। এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: সম্পূর্ণ বা পুরোপুরি; সঠিকভাবে বললে অতি নিঁখুতভাবে সম্পূর্ণ হিসেব। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হিসেবের সূক্ষ্মতাকে “কড়াক্রান্তি” হিসেব বলেও উল্লেখ করা হয়ে থাকে।
“কড়ায় গণ্ডায়” প্রবাদটির উৎস ঠিক কোন সময়ে হয়েছিল সঠিকভাবে বলা না গেলেও এটুকু বোঝা যায় যে, এর উৎস সেই সময়ে যখন টাকা পয়সা বা যেকোন জিনিসের হিসেব কড়া, গন্ডা ইত্যাদিতে করা হত। কড়া, গণ্ডা কিংবা ক্রান্তির হিসেব যেমন জমির পরিমাপে ব্যবহৃত হত, ঠিক তেমনই মুদ্রা হিসেবেও এই হিসেব ব্যবহারের নমুনা অতীতে রয়েছে।
আমাদের দেশে গত শতাব্দীর পঞ্চাশ-ষাট দশকেও কড়াকিয়া, গণ্ডাকিয়া, বুড়িকিয়া ইত্যাদি হিসেবের প্রচলন ছিল। বর্তমানে সেই সব হিসেব হারিয়ে গেলেও গ্রামের দিকের পুরনো যুগের মানুষেরা গন্ডা, পণ, কাহন ইত্যাদির হিসেব গণনায় ব্যবহার করে থাকেন।
এখানে সংক্ষেপে হিসেবটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। ৩ ক্রান্তিতে হয় ১ কড়া বা কড়ি। কড়া বা কড়ির আরেক নাম কপর্দক বা বাটক। ৪ কড়ায় হয় ১ গণ্ডা। ২০ গণ্ডায় হল ১ পণ বা ১ আনা। আবার ১৬ পণ/আনা বা ৩২০ গণ্ডা বা ১২৮০ কড়াতে ১ কাহন বা ১ টাকা। এখানে আর বিস্তারিত আলোচনা না করে হিসেবের সূক্ষ্ম বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এককের পরিচিতি সংক্ষেপে বলা হল। হিসেবের এই পদ্ধতি থেকেই “কড়ায় গণ্ডায়” কথাটি চালু আছে বলে মনে করা যায়। “কড়াক্রান্তি” হিসেবের কথাও এসেছে প্রাচীনকালে প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থা ও পরিমাপ থেকে। “কড়ায় গণ্ডায়” হিসেব বুঝে নেওয়া বলতে সম্পূর্ণ হিসেব বুঝে নেওয়াকে বোঝায়।
পাঠকের সুবিধার্থে সে যুগের হিসেব করার পদ্ধতিটি আবার দেওয়া হল-
৩ ক্রান্তি = ১ কড়া
১২ ক্রান্তি = ৪ কড়া = ১ গণ্ডা
৫ গণ্ডা = ২০ কড়া = ১ বুড়ি = ১ পয়সা
৪ পয়সা = ৪ বুড়ি = ২০ গণ্ডা = ৮০ কড়া = ১ আনা
১৬ আনা = ৬৪ বুড়ি = ৬৪ পয়সা = ৩২০ গণ্ডা = ১২৮০ কড়া = ১ টাকা
৩ পাই = ১ পয়সা
১২ পাই = ৪ পয়সা = ১ আনা
‘কড়ায় গণ্ডায়’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:
১। তোমার ঋণ আমি রাখব না, টাকা পেলেই কড়ায় গণ্ডায় মিটিয়ে দেব।
২। আগের খেলায় হেরে ছিলাম, এই খেলায় কড়ায় গণ্ডায় শোধ তুলব।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ৪৩ পৃঃ


আপনার মতামত জানান