ভূগোল

কোগ্রাম

পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া সাব ডিভিশনের কেতুগ্রাম ১ সম্প্রদায় উন্নয়ন ব্লকের অন্তর্গত একটি পল্লী গ্রাম হল কোগ্রাম।ভূমন্ডলের পরিচয়ে ২৩o৩২’২০” উত্তর এবং ৮৭৫৩’৫৩”  পূর্ব আক্ষিকে কোগ্রামে’র অবস্থান।গুড়াপ ষ্টেশন থেকে মাত্র ১৬ কিমি দূরে অজয় ও কুনুর নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত মনোরম এই গ্রামটি যথেষ্ট ঐতিহ্য বহন করে।অজয় নদের প্রধান উপনদী  কুনুর।একদা মঙ্গলকাব্যে ‘ভ্রমরাদহ’ নামে পরিচিত এই কুনুর নদী বর্ধমান জেলার উখড়া থেকে উৎপন্ন হয়ে মঙ্গলকোট থানার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অজয় নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে এই কোগ্রামে।

বৰ্দ্ধমান জেলার অন্তৰ্গত কাটোয়া মহকুমার অধীন মঙ্গলকোট থানার অন্তৰ্গত পরগণা আজমৎসাহীর মধ্যে উজানি নগর অবস্থিত। “উজানি নগর’ বললে এখন এখন অবশ্য কেউ বুঝবে না।বাংলার রাজধানী হিসেবে গৌড়ের পতনের সাথে উজানির গৌরবও ম্লান হয়ে আসে।কথিত আছে একসময়  ধনী ব্যবসায়ীদের জাহাজগুলি ভ্রমরার ঘাটে বাঁধা থাকত। তখন এই স্থানের নাম ছিল উজানি ; মুসলমান বাদশাহী দপ্তরে উজনির নাম হয় “সুগ্ৰাম’। চৈতন্যমঙ্গল-প্ৰণেতা লোচনদাস তাঁর জন্মভূমির নাম ‘কোগ্রাম’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।কোগ্রামের আদি নাম কা গ্রাম।  গোবর্ধন মিশ্রের একটি কুলগ্রন্থে “কাগ্ৰাম” ও আর একটিতে ”কাগ্রাম স্থলে বিহরণ” বলে উল্লেখ আছে।পরে অবশ্য  লোচন দাসের চৈতন্য মঙ্গলে এই কাগ্রামের বানান “কোগ্রাম” হয়েছে।কোগ্রাম- পল্লীগ্রামটির নামকরণ বিষয়ে একটি জনপ্রিয় গল্প আছে।  জনশ্রুতি অনুযায়ী  চৈতন্যমঙ্গল রচয়িতা লোচনদাসের বাড়ি এই গ্রামেই। অল্প বয়েসে তার বিয়ে হয়। বউকে ভাল করে দেখার সুযোগও হয়নি, সেই ছোট থেকেই সে বাপেরবাড়িতে। তার কৈশোর বয়েসের ভুলো মন সংসারের চাপ কাঁধে নিতে অনীহা প্রকাশ করে। সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায় সে মনের খেয়ালে। একবার তার শ্বশুরবাড়ি থেকে আসে নিমন্ত্রণ। কিন্তু সে তো শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথ চেনে না! পথে এক যুবতীকে তাঁর শ্বশুরের নাম জিজ্ঞেস করে বলেন, “মা, ওখানে যাবার পথ বলতে পারেন?” যুবতীর নির্দেশিত পথে তিনি শ্বশুরবাড়ি পৌঁছান। রাতে স্ত্রী কাছে এলে লোচনদাস চমকে ওঠেন। কারণ, একেই তো আজ সকালে তিনি “মা” বলে ডেকে পথ জানতে চেয়েছেন। পরেরদিন সকালেই তিনি নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। ক্ষুব্ধ স্ত্রী স্বামীর এই ব্যবহারে রেগে গিয়ে লোচনের গ্রামের নাম দেন কু- গ্রাম। কালক্রমে নামটি পরিবর্তন হয়ে কোগ্রামে দাঁড়ায়।গ্রামবাসীরা সতীর সন্মান রক্ষার জন্য ‘কু’গ্ৰাম” এবং লোচনদাসের সম্মানের জন্য ‘কোগ্রাম’ দুই নামই ব্যবহার করেন। ৰাদশাহী সু-গ্ৰাম” নামের ব্যবহার অবশ্য এখন আর নেই।এই কোগ্রামে একটি সতীপীঠ রয়েছে।ভরতচন্দ্র  অন্নদামঙ্গলে এই পীঠের উল্লেখ করতে গিয়ে “উজ্জয়নী” বলেননি, বলেছেন “উজানী। শোনা কথা অনুসারে  এই স্থানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন মঙ্গলচণ্ডীর ভক্ত শ্রীমন্ত সওদাগর। প্রচলিত আছে, উজানীতে সতীর কফোনি বা  কনুই পড়েছিল। পীঠদেবী মঙ্গলচণ্ডী, ভৈরব কপিলেশ্বর।মঙ্গলসাহিত্য থেকে জানা যায় দেবী মঙ্গলচন্ডীর পুজো প্রচলন করার জন্যই অভিশাপগ্রস্থ স্বর্গের অপ্সরাকে খুল্লনা রূপে এই উজানিনগরে পাঠানো হয়েছিল। খুল্লনাকে বিয়ে করেন ধনপতি সওদাগর। কিন্তু পরম শিবভক্ত ধনপতি মঙ্গলচন্ডীর পুজো মানতে পারেননি। বানিজ্যে বেরনোর সময় দেবীর ঘটে লাথি মেরে চলে যান ধনপতি। দেবীর ক্রোধে আর ফিরতে পারেননি উজানিতে। অনেক বছর পর খুল্লনার পুজোয় সন্তুষ্ট হন মা চণ্ডী। ধনপতিও ফিরে আসেন উজানিতে। কালিকা পুরাণ মতে উজানির সতীপীঠের দেবীচণ্ডী কালী রূপ ধারন করেই ভক্তের কষ্ট দূর করেছিলেন। সেই থেকে এই সতীপীঠে কালী পুজো শুরু হয়। কালীর কোনও প্রতিমা থাকেননা এখানে। ঘটেই কালী পুজো সারেন ভক্তরা।

এই এলাকার অন্যতম বিখাত উৎসব হল উজানির মেলা। অজয় নদের চরে প্রতি বছর ১ লা মাঘে এই মেলা বসে।  পূর্ব বর্ধমান – বীরভূম জেলার হাজার হাজার পুণ্যার্থী  এখানে আসেন মকর স্নানের জন্য। ‘মনসা মঙ্গল’ কাব্য অনুযায়ী  উজানিনগরের রাজা তাঁর প্রজাদের মকরসংক্রান্তির স্নানের জন্য কোগ্রামে অজয় নদের চরকে বেছে নিয়েছিলেন।এই সময়ে জনসমগমে গমগম করে ওঠে এই গ্রাম।

একসময় এই উজানি কোগ্রামে এসেছিলেন  ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।এই গ্রাম থেকেই জৈন তীর্থঙ্কর শান্তিনাথের জৈনবিগ্রহ নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

কোগ্রাম চন্ডীমঙ্গল কাব্যের শ্রীমন্ত সওদাগর এর জন্মস্থান। আবার মনসামঙ্গল কাব্যের বেহুলার বাপের বাড়ি অর্থাৎ সায়বেনের বাড়িও ছিল এই কোগ্রামে ।

সতীপীঠ ছাড়াও এই গ্রাম বিখ্যত  কবি লোচন দাসের জন্মস্থান ও সমাধি এবং পল্লীকবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের জন্মস্থান হিসেবে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে পল্লীকবি হিসেবে খ্যাত কুমুদরঞ্জন মল্লিকের স্মরনে প্রতিবছর ওনার জন্মদিনে  ‘কুমুদ সাহিত্য মেলা’ র আয়োজন হয় যেখানে সমাজের বিশিষ্ট জনদের সম্মানিত করা হয়।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!