কোলার গোল্ড ফিল্ড (Kolar Gold Field) বা সংক্ষেপে কেজিএফ (KGF) হল ভারতের কর্ণাটকের কোলার জেলায় অবস্থিত একটি সোনার খনি । সম্প্রতি ভারতীয় চলচ্চিত্র দুনিয়ায় ঝড় তোলা একটি দক্ষিণী ছবি ‘কে. জি. এফ’ এবং তার দ্বিতীয় পর্ব ‘কে. জি. এফ ২’-কে ঘিরেই এই নষ্ট হতে বসা সম্ভাবনাহীন সোনার খনির গল্প ফের জনমানসে ছাপ ফেলেছে। ভারতের সবথেকে প্রাচীন সোনার খনি ছিল এটাই। যে দক্ষিণ আফ্রিকা তার সোনার খনির জন্য সুপরিচিত সেখানকার কোনও খনিই কোলার খনির মত এত গভীর নয়। সোনার লোভে বহু মানুষের প্রাণ কেড়েছে এই খনি, ক্রীতদাসদের খাটিয়ে মেরে বহু ব্রিটিশ কিছু না পাওয়ার হতাশায় ডুবে গিয়েছেন। হাতুড়ি-ছেনি দিয়ে খনন থেকে শুরু করে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তা কিছুই বাদ যায়নি কোলার খনির বুক থেকে সোনা খুঁজে আনার জন্য।
বর্তমান ব্যাঙ্গালোর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কর্ণাটকের কোলার জেলার এই স্বর্ণ খনির ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীন। মনে করা হয়, আজ থেকে প্রায় ২ হাজার বছর আগে থেকেই এই খনি থেকে সোনা উত্তোলিত হয়ে আসছে। ইতিহাসে বহু মানুষ এখানে সোনা খোঁজার আশায় ভাগ্যান্বেষণে এসেছিলেন। এই খনির সম্পূর্ণ ইতিহাস সংকলন করেছিলেন মালদ্বীপ ও কোলারের পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট ফ্রেড গুডউইল। তাঁর গবেষণা-ঋদ্ধ নিবন্ধগুলি ‘মিথিক সোসাইটি’র ত্রৈমাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে পশ্চিমের গঙ্গ রাজবংশ নির্মাণ করেছিল এই কোলার খনি। প্রায় হাজার বছরেরও বেশি সময় তাঁরা ক্ষমতায় ছিল এবং সেই সময় এই খনিকে তাঁরা ‘কুভালালা-পুরবরেশ্বর’ নামে অভিহিত করত যার অর্থ কোলারের দেবতা। এরপরে তাঁরা চলে যায় তাঁদের রাজধানী তালাকাডুতে। তালাকাডু থেকেই পশ্চিমের গঙ্গরা গঙ্গাবাড়ি শাসন করত যেখানে আগে কন্নড়দের আদি বাসস্থান ছিল। ১০০৪ সালে চোল রাজাদের অধীনে আসে কোলার অঞ্চল। তাঁরা এই অঞ্চলের নাম রাখে ‘নিকারিলি-চোলামণ্ডল’। তারপর ১১১৭ সাল নাগাদ বিষ্ণুবর্ধনের নেতৃত্বে হোয়শালা বংশীয়রা চোলদের মহীশূর থেকে বিতাড়িত করে কোলার ও তালাকাডুর দখল নেয়। বীর সোমেশ্বর তাঁর দুই পুত্রের মধ্যে সমগ্র সাম্রাজ্য ভাগ করে দিলে কোলার অঞ্চলটি পায় রামনাথ। এরপরে পশ্চিম গঙ্গরা কোলারকে রাজধানী করে কোয়েম্বাটোর, সালেম এবং মহীশূর অঞ্চলে শাসন কায়েম করে। চোল শাসনকালে চোল রাজারা কোলার অঞ্চলে বহু শিব মন্দির স্থাপন করেছিলেন এবং সেই মন্দিরের গায়ে রাজাদের উৎকীর্ণ প্রস্তরলিপিতে এই কোলার স্বর্ণখনির উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু এই কোলার স্বর্ণখনির মাহাত্ম্য সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল একটিমাত্র সংস্থার সুবাদে – জন টেলর অ্যান্ড সন্স। ১৮৮০ সালে তৃতীয় জন টেলর এই খনির ভার নিলে তাঁর হাত ধরেই বিশ্বের অন্যতম গভীর স্বর্ণ খনি খোদিত হয় কোলার অঞ্চলে। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত এই সংস্থা খনিটি চালাত। পরে মহীশূর সরকার এই খনিটি অধিগ্রহণ করে ‘জেমস টেলর অ্যান্ড সন্স’ কোম্পানিকে খনন-পরামর্শদাতা হিসেবে নিযুক্ত করে। সেই সময় প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক এই কোলার গোল্ড ফিল্ডে কাজ করত, একইসঙ্গে এই খনি অঞ্চলেই তাঁদের পরিবার-সন্তানাদি বাস করত। ফলে সব মিলিয়ে নানা জাতির মানুষ একত্রে এসে থাকত এখানে। কর্ণওয়াল থেকে দক্ষ খননকারীদের নিয়ে আসা হত এখানে। খনির কাজ শুরু হলে স্থানীয় মানুষদের কেউই সেখানে কাজ করতে চাইত না, কারণ এখানে খনির মজদুরি করা খুবই বিপজ্জনক কাজ ছিল। ফলে তামিলনাড়ু থেকেই বেশিরভাগ শ্রমিকদের আনা হয় এবং সেই কারণে কোলার গোল্ড ফিল্ড অঞ্চলে তামিলই হয়ে ওঠে প্রধান ভাষা। খননের ফলে উঠে আসা সোনা ইংল্যান্ডে রপ্তানি করে দেওয়া হত, ফলে এই খনির ব্রিটিশ অংশীদারিরা প্রভূত বিত্তবান হয়ে ওঠে। তখনও বৈষম্য ছিল অটুট। সাধারণ ভারতীয় শ্রমিকরা মাটির বাড়িতে থাকত আর ব্রিটিশ কর্মীদের থাকার জন্য ছিল বিরাট বিরাট বাংলো। এই খনি এলাকাতেই ব্রিটিশরা হাসপাতাল, স্কুল, সামাজিক ক্লাব, একটি বোটিং হ্রদ, গলফ কোর্ট, জিমখানা ইত্যাদি স্থাপন করেছিল। কোলার গোল্ড ফিল্ড সেকালে সমস্ত খনি শ্রমিকদের পরিবারকে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা দিত। কোলার গোল্ড ফিল্ড মূলত গড়ে উঠেছিল দ্য মাইসোর গোল্ড মাইন, চ্যাম্পিয়ন রিফ মাইন, নাডিড্রুগ মাইন, ওরিগাম মাইন, ট্যাংক ব্লক মাইন, বালাঘাট মাইন, করমণ্ডল মাইন, নাইন রিফস মাইন ইত্যাদি অজস্র সোনার খনি নিয়ে। ১৯০২ সালে জন টেলর অ্যান্ড সন্স কোম্পানির উদ্যোগেই কোলার স্বর্ণ খনিতে প্রথম বিদ্যুৎ পরিষেবা নিয়ে আসা হয়। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ভারতে প্রথম বিদ্যুৎ-সংযোগ এসেছিল এখানেই প্রথম, তার আগে ভারতের অন্যান্য খনিতেও সেভাবে বিদ্যুৎ পরিষেবা ছিল না। ১৪০ কিমি দূরবর্তী কাবেরী পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে এখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হত। নিকটবর্তী শিবসমুদ্রম থেকে জলবিদ্যুৎও এই কোলার গোল্ড ফিল্ডে সরবরাহ করা হত। এখানকার খনিগুলির সংবাদ নিত্যদিন প্রকাশিত হত ‘কোলার গোল্ড ফিল্ড নিউজ’ পত্রিকায়। কত পরিমাণ সোনা উত্তোলিত হল, কীভাবে খনি শ্রমিকদের মধ্যে প্লেগ রোগ দেখা দিল মহামারী আকারে, তারা কখন কোন সময় নিজেদের বাড়ি ফিরত এই সমস্ত ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হত সেই সংবাদপত্রে। ১৯৫৬ সালে এখানকার খনিগুলির জাতীয়করণ হয় এবং সেই সময় কোলার গোল্ড ফিল্ড থেকে ৯০০ টনেরও বেশি সোনা উত্তোলিত হত। কিন্তু তার পরেও পরিবেশগত এবং আর্থিক কারণে এই সোনার খনিটি বন্ধ হয়ে যায়।
২০০১ সালে এই কোলার গোল্ড ফিল্ড সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। বহু বহু শ্রমিক কাজ হারান এবং বাধ্য হয়ে ব্যাঙ্গালোরে এসে দিনে ৪ ঘন্টা যাতায়াত করে অন্য কারখানায় কাজ খুঁজতে বাধ্য হন। খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ চলে যায়, জল সরবরাহের ব্যবস্থাও অন্তর্হিত হয়। কেবল বিষাক্ত সায়ানাইড পাহাড় খনি এলাকা জুড়ে জেগে থাকে। অপ্রক্রিয়াজাত এই বিষাক্ত বর্জ্য ক্রমে ক্রমে দূষিত করেছে মাটি, জল এমনকি বাতাসকেও। ২ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষ আজও এই খনি অঞ্চলে বসবাস করেন। কিন্তু কাজের অভাবে ব্যাঙ্গালোরে এসে নিত্যদিন কাজ করতে হয় তাঁদের বহু দূরের পথ অতিক্রম করে। ভারত গোল্ড মাইন্স লিমিটেডের অধীনে একদা পরিচালিত এই কোলার গোল্ড ফিল্ড তবু আজও এক সোনালি অতীতের নিশান নিয়ে স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে উড্ডীন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to বিভা চৌধুরী | সববাংলায়Cancel reply