জৈনধর্মের প্রধান দুটি উৎসব হল মহাবীর জয়ন্তী (Mahavir Jayanti) ও জৈন দীপাবলি। জৈনধর্মের প্রবর্তক মহাবীরের জন্মতিথি উপলক্ষে মহাবীর জয়ন্তী আর মহাবীরের নির্বাণ বা মুক্তিলাভ উপলক্ষে জৈন দীপাবলি পালন করা হয়। মহাবীর জয়ন্তী উৎসবকে মহাবীর জন্ম কল্যাণক (Mahavira Janma Kalyanaka) বলাও হয়।
২০২৬ সালের মহাবীর জয়ন্তী কবে?
- বাংলা তারিখ: ১৬ চৈত্র, ১৪৩২
- ইংরাজি তারিখ: ৩১ মার্চ, ২০২৬
মহাবীর ছিলেন জৈনদের চব্বিশতম তথা শেষ তীর্থঙ্কর বা ধর্মগুরু। তাঁর জন্ম সাল নিয়ে কিছু সংশয় আছে। জৈন ধর্মের শ্বেতাম্বর সাধকরা বিশ্বাস করেন যে, ভগবান মহাবীরের জন্ম হয় ৫৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দের চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে। তবে দিগম্বর সন্ন্যাসীরা মনে করেন মহাবীরের জন্ম হয় ৬১৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। তাঁর জন্মস্থান বিষয়েও নানা বির্তক রয়েছে। কেউ মনে করেন বিহারের ক্ষত্রিয়কুন্ড আবার কেউ মনে করেন বিহারের কুন্ডগ্রাম বা কুন্ডলপুর হল মহাবীরের জন্মস্থান। ইক্ষাকু রাজবংশের রাজা সিদ্ধার্থ ও রাণী ত্রিশলার ঘরে মহাবীরের আবির্ভাব হয়। তাঁর জন্মের আগে রাণী ত্রিশলা ষোলটি শুভ স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং উপলব্ধি করেছিলেন কোনও মহান আত্মার আবির্ভাবের সংকেত। মহাবীরের জন্মের পর রাজা সিদ্ধার্থের রাজ্যের সুখ ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছিল তাই মহাবীরের নাম দেওয়া হয় বর্ধমান অর্থাৎ ‘যিনি বৃদ্ধি করেন’। ছোট থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত, সহানুভূতিশীল ও আত্মবিশ্বাসী। মহাবীর মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে সংসারের মোহ ত্যাগ করে সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর প্রায় বারো বছর কঠিন সাধনা করে তিনি আত্মজ্ঞান বা মোক্ষ লাভ করেন। ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণের অসাধারণ দক্ষতার জন্যই তিনি মহাবীর নামে পরিচিত হন আর একারণেই ভক্তরা তাঁকে ‘জিন’ বা বিজয়ী উপাধিও দেয়। এছাড়া মহাবীরের মোক্ষ লাভের পর ভক্তরা তাঁকে সর্বোজ্ঞ বা কেবলই বলে মনে করত। এই ‘জিন’ উপাধি থেকেই মহাবীর প্রবর্তিত ধর্মের নাম হয় জৈনধর্ম।
জৈন ধর্মাবলম্বী মানুষেরা মহাসমারোহে মহাবীর জয়ন্তী উদযাপন করে। সাধারণত চৈত্র মাসের শুক্ল পক্ষের ত্রয়োদশ তিথি ধরে এই উৎসব পালন করা হয় তাই প্রতি বছর এই অনুষ্ঠান একই তারিখে হয় না। মোটামুটি বলা যায় যে, মার্চ-এপ্রিল মাসে এই উৎসব আয়োজিত হয়। প্রায় ২৬০০ বছর ধরে জৈনরা এই উৎসব উদযাপন করে চলেছে। ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের মধ্যে দিয়েই মহাবীরের করুণা, অচৌর্য, সত্য, ব্রহ্মচর্য, অপরিগ্রহ ও অহিংসার বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা করা হয়। মহাবীর যে শান্তি ও সম্প্রীতির বাণী প্রচার করেছিলেন তার প্রতীক হিসাবেই এই উৎসব পালিত হয়। এই দিনে জৈন ধর্মাবলম্বী মানুষেরা দান-ধ্যান করে ও নানা ধর্মীয় শোভাযাত্রার আয়োজন করে। এছাড়া সাত্ত্বিক খাবার খেয়ে ও নানা রকম সৎকর্ম করে তারা এই দিনটি উদযাপন করে।
মহাবীর জয়ন্তীর দিনে জৈনমন্দিরগুলি খুব সুন্দরভাবে সাজানো হয়। এইদিনে জৈন মন্দির বা জৈন দেবাসর বা বাসাদি দর্শনকে অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। এছাড়া জৈন ধর্মাবলম্বী মানুষেরা এইদিনে মহাবীর ছাড়াও অন্যান্য তীর্থঙ্করদের প্রতিমূর্তি দর্শন বা স্মরণের মধ্যে দিয়ে তাঁদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। আবার কিছু ভক্ত মহাবীর জয়ন্তীতেই নিজের বাড়িতে ভগবান মহাবীরের মূর্তি স্থাপন করে নানা রকম ফুল,ফল, মিষ্টির উপাচারে পূজার ব্যবস্থা করে। এইদিনে প্রায় সব জৈন মন্দিরেই নানারকম পূজার আয়োজন করা হয়। মহাবীর জয়ন্তী উপলক্ষে শহর ও মন্দিরগুলিকে পতাকা দিয়ে সুন্দরভাবে সাজানো হয়। জৈন ধর্মাবলম্বী মানুষেরা এইদিনে খুব ভোরে স্নান করে শুচিবস্ত্র পরে মন্দিরে যায়। প্রথমে মন্দিরে প্রার্থনা করে, তারপর তারা ভগবান মহাবীরের সুসজ্জিত রথযাত্রা বা শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে। সাধারণত পালকি বা ঘোড়ার গাড়িতে করে মহাবীরের প্রতিমূর্তি সমস্ত নগর পরিভ্রমণ করানো হয়। এই শোভাযাত্রায় ভক্তবৃন্দ মহাবীরের স্তুতি, বাণী আবৃত্তি করে এবং জৈন ধর্মগুরু মন্ত্রোচ্চারণ করে মহাবীরের মহিমা প্রচার করে। এরপর দুধ, জাফরন, জল, সুগন্ধি তেল দিয়ে মহাবীরের মূর্তিকে স্নান করানো হয়, যা আধ্যাত্মিক শুদ্ধির প্রতীক। এখানে ভাত, ফুল, ফল, দুধ দিয়ে বিশেষ পূজার ব্যবস্থাও করা হয়। তারপর জৈন ধর্মগ্রন্থ আচারঙ্গ সূত্র, কল্পসূত্র ও বিভিন্ন স্তোত্র পাঠ করা হয়। এছাড়া জৈন সন্ন্যাসীরা এইদিনে ভক্তদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেন। আবার জৈনরা ধ্যানের মধ্যে দিয়ে মহাবীরের আদর্শকে স্মরণ করে এবং তা পালনের সংকল্পও গ্রহণ করে। এইদিনে জৈন মন্দিরগুলিতে মহাবীরের অহিংসা, প্রেম, মমত্ববোধ ও মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হয়। জৈন ধর্মাবলম্বী মানুষ ছাড়াও অন্যান্য ধর্মের মানুষেরাও এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। এইদিন জৈনরা সাত্ত্বিক খাবার বা পিঁয়াজ-রসুন ছাড়া তরতাজা খাবার খায়। তাছাড়া এইদিনে তারা খিচুড়ি, পনির টিক্কা, দহিভা ধোকলি, বড়া পাও, বেকড চাকলি, ডাল ঢোকলির মতো ঐতিহ্যবাহী নানা খাবার তৈরি করে। আবার কিছু ভক্ত মহাবীরকে শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে এইদিন উপবাস ব্রতও পালন করে। জৈনরা এইদিনে দরিদ্রদের খাদ্য দান করে, পশুসেবা করে এবং দুঃস্থ মানুষদের নানাভাবে সাহায্য করে মহাবীরের আদর্শকে প্রচার করে।
বিশ্বজুড়ে সমস্ত জৈনরা মহাসমারোহে মহাবীর জয়ন্তীর অনুষ্ঠান পালন করে। ভারতের পাশাপাশি আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, ইউরোপের মতো নানা দেশের জৈন ধর্মাবলম্বী মানুষেরা প্রবল উৎসাহে এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে। ভারতের দিল্লি, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশেও মহাবীর জয়ন্তী পালন করা হয়।
ভগবান মহাবীর সুস্থ ও সাধারণ জীবনযাপনের কথা বললেও কিছু কিছু মন্দিরে মহাবীরের জন্মতিথি উপলক্ষ্যে বেশ জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে এই অনুষ্ঠান বিভিন্নভাবে পালিত হয়, যেমন – রাজস্থানের খান্ডেলওয়ালা অঞ্চলে প্রতি বছর দিগম্বর জৈন সমাজ উইলসন গার্ডেনে এক বিশাল রথযাত্রার ব্যবস্থা করে। এই রথযাত্রায় হাজার হাজার ভক্ত অংশগ্রহণ করে। এই সমাবেশে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে মহাবীরের রথের চারপাশে ধর্মীয় নৃত্য ও সঙ্গীত পরিবেশন করে ভক্তরা।
কর্ণাটকের দেবানহল্লির শ্রী নাকডা আভাতি ১০৮ জৈনমন্দিরে খুব জমকালোভাবে মহাবীর জয়ন্তী পালন করা হয়। এইসময় প্রচুর ভক্ত মন্দিরে আসে। তারা প্রার্থনা ও ধ্যানের মাধ্যমে জৈনধর্মের অহিংসা, শান্তি, সরল জীবনযাপনের কথা স্মরণ করে।
এছাড়া আমেরিকাতেও মহাবীর জয়ন্তী গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়। এইদিনে আমেরিকার ওকলাহোমার (Oklahoma) তুলসা (Tulsa) শহরের শিশুরা মহাবীরের স্নান উৎসবে অংশগ্রহণ করে। সানফ্রান্সিস্কোর নানা অঞ্চলে এইদিনে শিশুরা মহাবীরের জন্মের আগে তাঁর মা ত্রিশলার দেখা স্বপ্নগুলো অভিনয় করে দেখায়। সাধারণত এই সব অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য হল মহাবীরের জীবনদর্শন, নীতি, বাণী দ্বারা ছাত্রছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করা।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে লন্ডনের হাউস অফ কমনসে মহাবীর জয়ন্তী উপলক্ষ্যে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।
তাছাড়া কর্ণাটকের গোমতেশ্বর, শ্রবণবেলগোলা, ঝাড়খণ্ডের মধুবনের পরেশনাথ, গুজরাতের পালিতানা, জুনাগড়, বিহারের বৈশালী, ভাগলপুর, নালন্দা, রাজস্থানের রণকপুর, শ্রী মহাবীরজির মন্দিরেও ধুমধাম করে মহাবীর জয়ন্তী উদযাপন করা হয়।
জৈনদের ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে একমাত্র মহাবীর জয়ন্তীতেই ভারত সরকার আনুষ্ঠানিক ভাবে ছুটি ঘোষণা করেছে। এছাড়া সমস্ত জৈন প্রতিষ্ঠানগুলি এইদিন বন্ধ থাকে। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে মহাবীর জয়ন্তীতে ভগবান মহাবীরের ২৫৫০তম নির্বাণ লাভ উপলক্ষ্যে ভারত সরকার একটি বিশেষ স্মারক ষ্ট্যাম্প ও মুদ্রা চালু করেছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান