সববাংলায়

মহাবীর

বিভাগঃ ,

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাচীন ধর্মমতগুলির মধ্যে অন্যতম প্রাচীন ধর্মমত হল জৈন ধর্ম। এই ধর্মের চব্বিশ জন ‘তীর্থঙ্কর’ বা ‘পথপ্রদর্শক’দের মধ্যে ২৪তম বা শেষ তীর্থঙ্কর হলেন মহাবীর (Mahavira)। তিনিই এই ধর্মকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন। তাঁর সময় থেকেই ভারতে জৈনধর্ম প্রসারতা লাভ করে।

আনুমানিক ৫৯৯ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে চৈত্র মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে বর্তমান বিহার রাজ্যের অন্তর্গত বৈশালী নগরের কাছে অবস্থিত কুন্ডগ্রামে এক ক্ষত্রিয় রাজপরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল ‘সিদ্ধার্থ’ এবং তিনি ছিলেন ‘ইক্ষ্বাকু’ রাজবংশের সন্তান। মহাবীরের মায়ের নাম ছিল ‘ত্রিশলা’, তিনি ছিলেন ‘লিচ্ছবি’ বংশের কন্যা। তাঁরা দুজনেই ছিলেন জৈন ধর্মের তেইশতম তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের ভক্ত। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল ‘বর্ধমান’। তাঁর জন্মের পর তাঁর বাবার রাজ্যের অনেক সমৃদ্ধি হয়েছিল। তাই তাঁর নাম ‘বর্ধমান’ (যিনি বৃদ্ধি পান, বৃদ্ধিশীল) রাখা হয়। বিভিন্ন জৈন গ্রন্থে উল্লিখিত আছে, তাঁর জন্মের পর দেবরাজ ইন্দ্র ছাপান্ন জন দিগকুমারীর সঙ্গে পৃথিবীতে এসেছিলেন এবং মেরু পর্বতের উপর তাঁর অভিষেক করেছিলেন। অনেক জৈন মন্দিরে এই ঘটনার ছবি আঁকা আছে। ছোটবেলায় তিনি অনেকবার নিজের শৌর্য বীর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন বলে তিনি ‘মহাবীর’ নামেই বেশি পরিচিত।

রাজপুত্র হওয়ার কারণে তিনি ছোটবেলা থেকেই রাজকীয় বিলাস-ব্যসনের মধ্যে বড় হয়েছিলেন। তাঁর বিয়ে হয়েছিল কিনা এই বিষয় নিয়ে জৈনদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে মতভেদ আছে। দিগম্বর সম্প্রদায়ের মতে, তাঁর বাবা-মা চেয়েছিলেন যে তিনি যশোদা নামে এক মহিলাকে বিয়ে করেন। কিন্তু তিনি বিয়ে করতে রাজি হননি। আবার শ্বেতাম্বর সম্প্রদায়ের মতে, তাঁর সঙ্গে খুব কম বয়সেই যশোদার বিয়ে হয়েছিল এবং তাঁদের প্রিয়দর্শনা বা অনোজ্জা নামে একটি কন্যাসন্তান ছিল।

বিয়ের পর মহাবীরের মনে ভাবান্তর দেখা দেয়। তিনি সংসারের অনিত্যতা সম্পর্কে ধারণা করতে থাকেন। তাঁর বাবার মৃত্যুর পর মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে তিনি রাজকীয় জীবনের সুখ ছেড়ে, নিজের বাড়ি ও স্ত্রী-সন্তানকে ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করার জন্য সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তিনি একটি অশোক গাছের নিচে বসে কঠোর তপস্যা শুরু করেন এবং নিজের পোষাকপরিচ্ছদ ত্যাগ করেন। তিনি যে কঠিন পরিস্থিতি ও অপমানজনক অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় আচারাঙ্গ সূত্র গ্রন্থে। কল্পসূত্র অনুসারে, মহাবীর অস্তিকাগ্রাম, চম্পাপুরী, প্রতিচম্পা, বৈশালী, বনীজগ্রাম, নালন্দা, মিথিলা, ভদ্রিকা, অলভীকা, পাণিতাভূমি, শ্রাবস্তী ও পাওয়াপুরীতে চল্লিশটি বর্ষাকাল অতিবাহিত করেছিলেন।

জৈনদের বিশ্বাস অনুসারে, তিনি বারো বছর ধরে কঠোর তপস্যা করার পর তেতাল্লিশ বছর বয়সে জৃম্ভিকাগ্রামের কাছে ঋজুবালিকা নদীর তীরে একটি শাল গাছের নিচে ‘কেবল জ্ঞান’ (সর্বজ্ঞান বা অসীম জ্ঞান) লাভ করেন। সংসার জীবনের সবরকম লোভ, হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা তাঁর মন থেকে দূরে চলে যায়। এই ঘটনার বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় জৈনশাস্ত্র উত্তর পুরাণ ও হরিবংশ পুরাণ গ্রন্থে। আচারাঙ্গ সূত্র গ্রন্থে মহাবীরকে ‘সর্বদর্শী’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। জৈনরা বিশ্বাস করেন তাঁর দেহ সবথেকে বেশি শুভ ছিল (পরমৌদারিক শরীর) এবং তিনি সর্বজ্ঞতা অর্জন করার সময় আঠারোটি অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্ত ছিলেন। শ্বেতাম্বর সম্প্রদায়ের মতে, তিনি অসীম জ্ঞান অর্জন করার পর নিজের মত প্রচার করার জন্য সারা ভারত ঘুরেছিলেন।

জৈনদের ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী, তাঁর প্রথম শিষ্য ছিলেন এগারোজন ব্রাহ্মণ। এঁদের ‘একাদশ গণধর’ নামে অভিহিত করা হয়। এই ব্রাহ্মণদের নেতা ছিলেন ইন্দ্রভূতি গৌতম। বাকিদের নাম ছিল অগ্নিভূতি, বায়ুভূতি, অকম্পিত, আর্য ব্যক্ত, সুধর্মণ, মন্দিতাপুত্র, মৌর্য্যপুত্র, অকালব্রত, মেত্রয়া এবং প্রভাস। মনে করা হয় এই গণধররা মহাবীরের মৃত্যুর পর তাঁর ধর্মমত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। কল্পসূত্র অনুসারে, মহাবীরের ১৪০০০ জন সাধু (পুরুষ সন্ন্যাসী শিষ্য), ৩৬০০০ জন সাধ্বী (মহিলা সন্ন্যাসিনী শিষ্যা), ১৫৯০০০ জন শ্রাবক (পুরুষ গৃহস্থ শিষ্য) এবং ৩১৮০০০ জন শ্রাবিকা (মহিলা গৃহস্থ শিষ্যা) ছিলেন। মহাবীর মূলত জৈনধর্মের তেইশতম তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের উপদেশাবলিকে অনুসরণ করে ধর্মপ্রচার শুরু করেছিলেন। পার্শ্বনাথের উপদেশগুলির মূল কথা ছিল চারটি, যথা- অহিংসা, সত্য কথা বলা, চুরি না করা ও অপরিগ্রহ। এই চারটি উপদেশকে একসঙ্গে ‘চতুর্যাম’ বলা হত। মহাবীর এই চারটি উপদেশের সঙ্গে ‘শুচিতা’ বা ‘ব্রহ্মচর্য পালন’ নামের একটি নতুন উপদেশ যোগ করেছিলেন। ফলে এই পাঁচটি বিধানের একসঙ্গে নতুন নামকরণ হয় ‘পঞ্চ মহাব্রত’। তাঁর মতগুলি সঙ্কলিত আছে ‘উত্তরাধ্যায়ণ সূত্র’ নামের গ্রন্থে।

জৈনধর্মাবলম্বীরা অহিংসায় বিশ্বাসী। তাঁদের মতে, সবচেয়ে বড় পাপ হল জীবহত্যা। তাঁরা বিশ্বাস করেন, সবকিছুর মধ্যে আত্মা বর্তমান। জৈনধর্মের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হল — ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করা । সর্বশক্তিমান কোন সত্ত্বায় বিশ্বাস নেই জৈন ধর্মাবলম্বীদের। জৈন ধর্মের মূল উদ্দেশ্য তিনটি – সৎবিশ্বাস, সৎজ্ঞান ও সৎআচরণ। অনুমান করা হয়, মহাবীর প্রায় বাহাত্তর বছর বেঁচেছিলেন। শেষ জীবনে তিনি প্রায় সারাক্ষণ বনে ঘুরে বেড়াতেন। খুব কমই লোকালয়ে আসতেন। কারোর সাথে খুব বেশি কথা বলতেন না। কোন জায়গায় একরাতের বেশি থাকতেন না। কথিত আছে, রাস্তায় চলার সময় তিনি রাস্তা ঝাঁট দিতে দিতে চলতেন, যাতে তাঁর পায়ের চাপে কোনো কীট-পতঙ্গও যেন মারা না যায়।

মোক্ষলাভের পর মহাবীর ত্রিশ বছর ধরে ধর্মপ্রচার করেছিলেন। তারপর শ্বেতাম্বর সম্প্রদায়ের মতে খ্রীষ্টপূর্ব ৫২৭ অব্দে এবং দিগম্বর সম্প্রদায়ের মতে খ্রীষ্টপূর্ব ৪৬৮ অব্দে কার্তিক মাসের অমাবস্যার দিন বর্তমান বিহারের অন্তর্গত পাওয়াপুরীতে তিনি দেহত্যাগ করেন। কথিত আছে যে রাতে তাঁর মৃত্যু হয়, সেই রাতে তাঁর প্রধান শিষ্য ইন্দ্রভূতি গৌতম সর্বজ্ঞতা লাভ করেন।

তাঁর মৃত্যুর পর জৈনদের মধ্যে বিভিন্ন আচরণ নিয়ে মতভেদ শুরু হয়। এই কারণে খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে জৈনধর্মাবলম্বীরা ‘শ্বেতাম্বর’ ও ‘দিগম্বর’ নামে দুটি সম্প্রদায়ে ভাগ হয়ে যায়। শ্বেতাম্বররা বিশ্বাস করতেন ধর্মলাভে স্ত্রী ও পুরুষ দুজনেরই অধিকার আছে এবং সাধনা করলে যে কেউ মোক্ষলাভ করতে পারে। তাঁরা সাদা পোশাক পড়তেন। অন্যদিকে দিগম্বর সম্প্রদায়ের মতে মোক্ষলাভের অধিকার একমাত্র পুরুষদেরই আছে। তাঁরা কোনোরকম পোশাক পড়তেন না।

মহাবীরের মূর্তিতে তাঁকে সাধারণত পদ্মাসনে বসা বা দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে পাওয়া যায়। তাঁর পায়ের নিচে খোদাই করা থাকে একটি সিংহ। জৈনদের মতে, প্রতিটি তীর্থঙ্করের একটি নিজস্ব প্রতীক চিহ্ন আছে, যা থেকে উপাসকরা একই রকম মূর্তিগুলিকে আলাদা করতে পারেন। শ্বেতাম্বর সম্প্রদায়ের মতে, মহাবীরের মূর্তির বুকে একটি ‘শ্রীবৎস চিহ্ন’ আঁকা থাকে। দিগম্বরদের মতে, মহাবীরের চোখের দৃষ্টি নিচের দিকে থাকে এবং শ্বেতাম্বররা মনে করেন মহাবীরের দৃষ্টি সামনের দিকে থাকে। মহাবীরের প্রাচীনতম মূর্তিটি উত্তর ভারতের মথুরা থেকে পাওয়া গেছে, যা আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকে খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত হয়েছিল।

ঐতিহাসিক জন কোর্ট (John Court)-এর মতে, ভারতে মহাবীরের সবচেয়ে প্রাচীন মন্দিরটি রাজস্থানের যোধপুরে অবস্থিত। অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে এই মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছিল। ভারতের নানা জায়গায় অবস্থিত মহাবীরের মন্দিরগুলি হল- বিহারের পাওয়াপুরীতে অবস্থিত জাল মন্দির। কথিত আছে, এই স্থানেই মহাবীর দেহত্যাগ করেন। তামিলনাড়ুর কাঞ্চিপুরমে অবস্থিত ত্রৈলোক্যনাথ মন্দির, কর্ণাটকের রামনগরে অবস্থিত সানকিঘাটা মন্দির, কর্ণাটকের মেগুটি মন্দির যা ইউনেস্কো (UNESCO)-এর বিশ্বের ঐতিহ্যময় স্থান (World Heritage Site)-এর অস্থায়ী তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

মহাবীরের সাথে যুক্ত জৈনদের দুটি প্রধান বার্ষিক উৎসব হল মহাবীরের জন্মজয়ন্তীদীপাবলী। প্রতি চৈত্র মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে মহাবীরজয়ন্তী পালন করেন জৈনরা। এই সময় তাঁরা মহাবীরের জীবনের পাঁচটি শুভ ঘটনা অভিনয়ের আকারে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন। কার্তিক মাসের অমাবস্যায় মহাবীরের মৃত্যুবার্ষিকীর দিনটিকে জৈনরা হিন্দুদের সঙ্গে একইসাথে ‘দীপাবলী’ হিসাবে পালন করেন। এই দীপাবলীর দিনটি থেকেই জৈন ধর্মাবলম্বীদের নতুন বছর শুরু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading