ইতিহাস

মারি কুরি

মারি কুরি (Marie Curie) একজন পোলিশ তথা ফরাসী কিংবদন্তি পদার্থবিদ এবং রসায়নবিদ যিনি কুরি পরিবারের প্রথম সদস্যা হিসেবে ও বিশ্বের প্রথম মহিলা হিসেবে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। মাদাম কুরি (Madame Curie) নামেও পরিচিত এই মহীয়সী নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে, এখনও অবধি একমাত্র মহিলা হিসেবে এবং বিজ্ঞানের দুটি বিষয়ে একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে দু দুটি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন – পদার্থবিদ্যায় (১৯০৩) ও রসায়নে (১৯১১)। তেজস্ক্রিয়তা (radioactivity) নিয়ে গবেষণা এবং রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম নামক দুটি মৌল আবিষ্কারের জন্য মারি কুরি বিজ্ঞান জগতে তথা জনমানসে অমর হয়ে আছেন।

১৮৬৭ সালের ৭ নভেম্বর রুশ সাম্রাজ্যের অধীনস্থ পোল্যান্ডের ওয়ার শ মারি কুরির জন্ম হয়। তাঁর সম্পূর্ণ নাম মারি সালোমেয়া স্ক্লদভ্‌স্কা কুরি (Maria Salomea Skłodowska)। তাঁর বাবার নাম ভ্লাদিস্লাও স্ক্লোদভস্কি এবং মায়ের নাম বগুস্কা। তাঁর বাবা ছিলেন কৃষক পরিবারের সন্তান যিনি নিজের প্রচেষ্টায় উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীকালে ওয়ারশ হাইস্কুলের পদার্থবিদ্যার শিক্ষক হন। তাঁর মা ছিলেন মেয়েদের একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। তিনি খুব ভালো পিয়ানো বাজাতে পারতেন। মারি কুরি ছিলেন পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ। মারি কুরিকে ‘মারিয়া’ নামেও ডাকা হত। ১২ জুলাই, ১৮৯৫ সালে তরুণ অধ্যাপক পিয়ের কুরির সাথে তাঁর বিবাহ হয় যিনি পরবর্তীকালে মারি কুরির সাথে যুগ্মভাবে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। তাঁদের দুই সন্তান আইরিন জোলিও কুরি ও ইভ কুরি। আইরিন জোলিও কুরি তাঁর স্বামী ফ্রেডরিক জোলিও কুরির সঙ্গে যুগ্মভাবে ১৯৩৫ সালে ‘আর্টিফিশিয়াল রেডিওঅ্যাক্টিভিটির’ ওপর গবেষণার কারণে নোবেল পুরস্কার পান।

ছোটবেলা থেকেই মারি কুরি ছিলেন লেখাপড়ায় অত্যন্ত মেধাবী এবং মনোযোগী। মারি কুরি দশ বছর বয়সে সিকরস্কা পরিচালিত একটি বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি হলেও পরে তিনি অবশ্য বালিকাদের জিমনেশিয়ামে ভর্তি হন এবং ১৮৮৩ সালে স্কুলের শেষ পরীক্ষায় স্বর্ণপদক লাভ করেন। তিনি এরপর কিছু সময়ে গৃহ শিক্ষিকতা করেন। মেয়ে হওয়ার কারণে মারি কুরি কোনো নিয়মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারেননি। তিনি ও তাঁর বোন ব্রনিস্লাওয়া লুকিয়ে ফ্লাইং ইউনিভার্সিটি (flying university) নামে একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন যেখানে মেয়েরাও পড়তে পারত। পরে তিনি ফ্রান্সে চলে যান ও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৮৯৩ সালে পদার্থবিদ্যায় প্রথম স্থান এবং ১৮৯৪ সালে গণিতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন।

১৮৯৫ সালে উইলিয়াম রন্টজেন ‘এক্স রে’ বা ‘রঞ্জন রশ্মি’ আবিষ্কার করেন। এই রশ্মি আবিষ্কারের সাথে সাথে বিজ্ঞান মহলে হইচই পড়ে যায়। এই এক্স রে’র থেকেও আর কোনও তেজসম্পন্ন রশ্মি পাওয়া যায় কিনা তা নিয়ে বিশ্বের বিজ্ঞানীরা গবেষণা শুরু করে দেন। ফরাসি বিজ্ঞানী হেনরি বেকেরেল পিচব্লেন্ড নামক একটি খনিজ পদার্থ থেকে ইউরেনিয়াম যৌগ আবিষ্কার করেন। এই বেকেরেল যৌগ একধরণের রশ্মি নিঃসরণ করে যাদের কোন কিছু ভেদ করার ক্ষমতা এক্স-রে’র সমান। এছাড়াও বেকেরেল দেখান যে এই রশ্মি বাইরের কোন শক্তি ছাড়াই নিজে থেকে নির্গত হয়। এই আবিষ্কারের প্রতি কুরি দম্পতিও আকৃষ্ট হন। তাঁরা তখন অনুমান করেন যে, পিচব্লেন্ডে ইউরেনিয়াম ছাড়াও আরও শক্তিশালী কোনও পদার্থ হয়তো থাকতে পারে। আর সেই অনুমান নিয়ে তাঁরা হাঙ্গেরি থেকে কম দামে ইউরোনিয়াম বর্জিত পিচব্লেন্ড নিয়ে এসে তার উপর গবেষণা শুরু করেন। তখন পিচব্লেন্ড নিয়ে গবেষণার জন্য অ্যাসিড ও জল এবং নানান খনিজ পদার্থ ব্যবহার করা হ্ত যার ফলে সেই গবেষণাগারের পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়ত। সেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেও কুরি দম্পতি অজানার খোঁজে কাজ চালিয়ে গেছেন। এমনকি অনেক সময় দিনরাত এক করেও। স্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভাবের পাশাপাশি তাঁদের অর্থের অভাব ছিল। পিচব্লেন্ড নিয়ে গবেষণার জন্য যে প্রভূত পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন তা কুরি দম্পতির ছিল না। তখন তাঁদের সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এলেন ভিয়েনার বিজ্ঞান পরিষদ। তাঁরা তাঁদের কয়েক টন টাটকা পিচব্লেন্ড উপহার দিয়েছিলেন যা পেয়ে নিশ্চিন্তে গবেষণা চলতে থাকল কুরি দম্পতির। এই গবেষণার সাফল্য কয়েক বছরের মধ্যেই পাওয়া গেল। ১৮৯৮ সালে তাঁরা পিচব্লেন্ড থেকে প্রথমে একটি তেজস্ক্রিয় আদি বস্তুর সন্ধান পেলেন। সেই বস্তুটির নাম মারি কুরি তাঁর জন্মস্থান পোল্যান্ডের নামে রাখলেন ‘পোলোনিয়াম (Polonium)’। কিন্তু তিনি পোলোনিয়াম আবিষ্কার করেই ক্ষান্ত হলেন না। এরপর ১৯০২ সালে তিনি আরেক নতুন মৌলিক পদার্থ নিষ্কাশন করলেন, যার নাম ‘রেডিয়াম (Radium)’। এই রেডিয়াম এমনই এক তেজস্ক্রিয় মৌলিক পদার্থ যা তেজস্ক্রিয়তার দিক থেকে ইউরোনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার চেয়ে প্রায় দশ লক্ষ গুণ বেশি। আর এই রেডিয়াম আবিষ্কার বিজ্ঞান জগতের এক নব-দিগন্ত উন্মোচন করল। সারা বিশ্ব জুড়ে কুরি দম্পতির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল।

কুরি দম্পতির এই উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারের ফলে ১৯০৩ সালে তাঁরা যুগ্মভাবে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার লাভ করলেন। এরপর ১৯১১ সালে রেডিয়াম ক্লোরাইড থেকে তড়িৎ বিশ্লেষণ করে রেডিয়াম মৌলের প্রস্তুত করা ও তার পারমাণবিক ওজন নির্ণয়ের জন্য মারি কুরি আবার নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে, এখনও অবধি একমাত্র মহিলা হিসেবে এবং বিজ্ঞানের দুটি বিষয়ে একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে দু-দুটি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ১৯০৬ সালে দুর্ঘটনায় পিয়ের কুরির আকস্মিক মৃত্যুতে মারি কুরি ভেঙে পড়লেও বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজ এবং দুই মেয়ে আইরিন জোলিও কুরি এবং ইভ কুরিকে মানুষ করার কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি কোনোদিন কোনোভাবে আদর্শভ্রষ্ট হননি, নিজের লক্ষ্যে বরাবরই অটল ছিলেন। মারি কুরি তাঁর তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা কাজে লাগিয়েছিলেন ক্যান্সারের নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি উন্নত করার ক্ষেত্রে। তিনি তাঁর সারাটা জীবন ব্যয় করেছিলেন রেডিয়াম মৌলকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে কাজ করেন। তিনি এই বিষয়টি নিয়ে সক্রিয়ভাবে প্রচারও করেন।ক্যান্সার রোগের চিকিৎসায় রেডিয়াম খুবই কার্যকর বলে প্রমাণিত হল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, তাঁর মেয়ে আইরিনের সহায়তায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই দুর্ভোগ নিরসনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি তাঁর শহরে একটি তেজস্ক্রিয় ল্যাবরেটরি গঠনের জন্য নিরলস প্রচেষ্টা করেন। ১৯২৯ সালে ওয়ারশ শহরের ওই ল্যাবরেটরিকে বেরিয়াম কেনার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হুভার ৫০,০০০ আমেরিকান ডলার দান করেন। অত্যন্ত পরিশ্রমী মারি কুরি সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ছিলেন। তিনি ১৯১১ সাল থেকে আজীবন ‘কাউন্সিল দু ফিজিক সলভে’-র সদস্যা ছিলেন। ১৯২২ সাল থেকে তিনি তিনি ‘লীগ অব নেশনস’-এর ইন্টেলেকচুয়াল কর্পোরেশনের সদস্যা ছিলেন। অনেক নামকরা বিজ্ঞান পত্রিকায় তাঁর গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি ‘Recherches sur les Substances Radioactives (১৯০৪)’, ‘L’Isotopie et les Éléments Isotopes’ এবং ‘Traité’ de Radioactivité (১৯১০)’ নামে কিছু বইও রচনা করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর হাসপাতাল গড়ে তোলা এবং রেডিয়াম নিয়ে গবেষণাগার গড়ে তোলার জন্য তাঁকে অর্থ সংগ্রহের কাজও করতে হয়েছে। এভাবেই তিনি নানান সমাজসেবামূলক কাজেও যুক্ত থেকেছেন সারা জীবন। বৈজ্ঞানিক গবেষণার পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর অবদান রেখে গেছেন।

তিনি অনেক উল্লেখযোগ্য সম্মান লাভ করেছিলেন এবং অনেক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের তিনি সম্মানিত সদস্যা ছিলেন। স্বনামধন্য ‘রয়্যাল সোসাইটি’ থেকে তাঁকে ও তাঁর স্বামীকে ১৯০৩ সালে ‘ডেভি মেডেল’ প্রদান করা হয়। ইটালি থেকে ১৯০৪ সালে তাঁকে ‘মাতেউচি পদক’ প্রদান করা হয়। ১৯০৯ সালে ফ্রাঙ্কলিন ইনস্টিটিউট থেকে লাভ করেন ‘এলিয়ট ক্রেসন মেডেল’। ‘রয়্যাল সোসাইটি অব আর্টস’ তাঁকে প্রদান করে ‘অ্যালবার্ট মেডেল’। ১৯১২ সালে ফরাসি সরকার ‘কুরি ইনস্টিটিউট অফ রেডিয়াম’ নামে একটি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করলেন এবং তাঁরা মারি কুরিকে সেখানকার সর্বময় কর্ত্রী হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন। ১৯২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হার্ডিং আমেরিকার সমস্ত মহিলাদের তরফ থেকে তাঁকে তাঁর বৈজ্ঞানিক অবদানের জন্য এক গ্রাম রেডিয়াম উপহার দেন। ১৯২১ সালে আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির তরফ থেকে তাঁকে ‘উইলার্ড গিবস অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়। ১৯৩১ সালে মারি কুরি এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ক্যামেরন প্রাইজ ফর থেরাপিউটিক্স’ লাভ করেন।

মারি কুরির ১৯৩৪ সালের ৪ জুলাই ৬৬ বছর বয়সে ফ্রান্সের হাউতে-সাভইয়ের প্যাসিতে অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া (Aplastic anemia) রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্য হয়। রেডিয়ামের অদৃশ্য রশ্মির তেজে আস্তে আস্তে তাঁর জীবনীশক্তি ক্ষয় হতে থাকে। তিনি তাঁর ল্যাব কোটের পকেটে একটি টেস্টটিউবে রেডিয়াম নিয়ে ঘুরতেন। আর এই রেডিয়ামই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মেরী কুরির মৃত্যুর জন্যে দায়ী তাঁরই আবিষ্কার!

তথ্যসূত্র


  1. দেশ বিদেশের বিজ্ঞানী, আনন্দ পাবলিশার্স (প্রকাশক সুবীরকুমার মিত্র, দ্বাদশ মুদ্রণ)- অমরনাথ রায়, মাদাম ক্যুরী পৃষ্ঠা ১০৬
  2. নির্বাচিত বিজ্ঞানীদের জীবনী, আদ্রিশ পাবলিকেশন (প্রকাশক বিশ্বনাথ বেরা, প্রথম প্রকাশ)- পৃথ্বীরাজ সেন, মেরী কুরী পৃষ্ঠা ২৫৮ 
  3. https://www.britannica.com/
  4. https://en.wikipedia.org/
  5. https://www.biography.com/
  6. https://www.nobelprize.org/ 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন