ইতিহাস

পিয়ের ক্যুরি

পিয়ের ক্যুরি(Pierre Curie)একজন খ্যাতনামা ফরাসি বিজ্ঞানী৷ ১৯০৩ সালে তিনি তাঁর স্ত্রী ম্যারি ক্যুরির সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান৷ তিনি ক্রিস্টালোগ্রাফি, ম্যাগনেটিজম, পাইজোইলেক্ট্রিসিটি এবং তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে পরীক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ।

১৮৫৯ সালের ১৫ মে  প্যারিসে পিয়ের ক্যুরি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ছিল ইউজিন ক্যুরি এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল শোফি-ক্লেয়ার ক্যুরি। পিয়ের ক্যুরি তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু করেন তাঁর বাবার কাছে৷ অল্প বয়স থেকেই তিনি গণিতে, বিশেষ করে জ্যামিতিতে দক্ষ ছিলেন৷ যখন তাঁর বয়স মাত্র ষোলো বছর, তিনি গণিতে ডিগ্রি লাভ করেন৷ তারপর মাত্র আঠারো বছর বয়েসে আরও উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করলেও খারাপ আর্থিক অবস্থার কারণে তখনই তিনি ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য পড়াশুনা করতে পারেননি। এই সময়ে পরীক্ষাগারে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন তিনি৷ 

পিয়ের ক্যুরির কর্মজীবন শুরু হয়  জঁ গুস্তাভে বউরবোজ (Jean-Gustave Bourbouze) এর পরীক্ষাগারে কাজ করার মধ্য দিয়ে৷ বিজ্ঞান বিভাগে গ্র্যাজুয়েশন পড়াকালীন তিনি এই কাজে নিযুক্ত হয়েছিলেন৷ পিয়ের ক্যুরির কর্মজীবন বলতে তাঁর গবেষণা কার্যের কথাই বলতে হয়৷ 
পিয়ের ক্যুরির ডক্টরেট ডিগ্রির গবেষণা কার্য চৌম্বকতত্ত্ব (Magnetism)হিসেবে বিখ্যাত। তবে তার আগে তিনি ম্যাগনেটিক কো-এফিসিয়েন্ট (magnetic coefficients) নির্ণয় করার জন্য খুব সংবেদনশীল টর্শন ব্যালান্স (torsion balance) এর ডিজাইন করেন ও তা তৈরিও করেন৷ পিয়ের ক্যুরি তাঁর ডক্টরাল থিসিসের জন্য ফেরোম্যাগনেটিজম, প্যারাম্যাগনেটিজম এবং ডায়াগ্যাগনেটিজম বিষয়ে গভীর পড়াশোনা করেন এবং প্যারাম্যাগনেটিজমে তাপমাত্রার প্রভাব আবিষ্কার করেছিলেন যা বর্তমানে ‘ক্যুরির সূত্র’ হিসাবে পরিচিত৷ ক্যুরির সূত্রে ব্যবহৃত ধ্রুবক ‘ক্যুরি ধ্রুবক’ (Curie constant) নামে পরিচিত। তিনি দেখিয়েছিলেন ফেরোম্যাগনেটিক পদার্থগুলিকে একটি নির্দিষ্ট উষ্ণতার (critical temperature) বেশি গরম করলে চৌম্বকত্ব হারায় – সেই নির্দিষ্ট উষ্ণতাকে ঐ পদার্থের ‘ক্যুরি উষ্ণতা’ বলে।

১৮৮০ সালে তিনি ও তাঁর বড় ভাই পল জ্যাকস ক্যুরি মিলে প্রমাণ করেছিলেন যে স্ফটিকে (crystal) চাপ দিয়ে সঙ্কুচিত করলে ইলেকট্রিক বিভব বা ভোল্ট তৈরি হয় যা পাইজোইলেক্ট্রিসিটি (piezo-electricity) নামে পরিচিত। এই কাজটির জন্য তাঁরা পাইজোইলেক্ট্রিক কোয়ার্টজ ইলেক্ট্রোমিটার আবিষ্কার করেছিলেন। পরের বছর তাঁরা এর বিপরীত প্রভাবও দেখিয়েছিলেন অর্থাৎ স্ফটিকে বিদ্যুৎ পাঠিয়ে তাকে বিকৃত করা যেতে পারে। বর্তমানে প্রায় সব ডিজিটাল ইলেকট্রনিক সার্কিট এই ধর্মের উপর নির্ভর করে বানানো হয়। এই কারণে আজকাল ঘড়িতে কোয়ার্টজ কথাটিও লেখা থাকে।

১৮৯৫ সালে  ম্যারি ক্যুরির ( Marie Skłodowska-Curie) সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয় ৷ তারপরই তাঁরা দুজন একত্রে রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম নামক তেজস্ক্রিয় পদার্থ আলাদা করার বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন৷ তাঁরাই প্রথম তেজস্ক্রিয়তা (radio-activity) শব্দটি ব্যবহার করেন এবং এই পরীক্ষার ক্ষেত্রে তাঁরা অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁদের জীবনযাত্রা ছিল খুবই কষ্টকর কিন্তু সমস্ত কষ্ট স্বীকার করে দুজনে গবেষণা চালিয়ে যান৷ শেষ পর্যন্ত এই গবেষণা কার্য সফলতা আনে। ১৮৯৮ সালে ক্যুরি দম্পতি ও বেমোন্ট (M G Bemont) একত্রে রেডিয়াম, পোলোনিয়াম আলাদা করার পদ্ধতির বিষয়ে পেপার প্রকাশ হয় করেন। ২০১৫ সালে আমেরিকার কেমিক্যাল সোসাইটি এই কাজটি রসায়নজগতের ইতিহাসে অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই কাজের জন্য ক্যুরি দম্পতি যৌথভাবে বিজ্ঞানী বেকারেলের (Henry Becquerel) সঙ্গে ১৯০৩ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান৷

পরীক্ষাগারে কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি প্রকৃত আনন্দ লাভ করতেন৷ পিয়ের ক্যুরি পদোন্নতির জন্য রাজনীতি বা চাটুকারিতা পছন্দ করতেন না অথচ সেই সময় প্যারিসে এটি ছাড়া কোন পদ পাওয়াও যেত না। দুর্ভাগ্যের কথা সেই জন্য তিনি যোগ্য হয়েও অনেক পদ পাননি। যেমন ১৯০২ সালে ফ্রেঞ্চ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সে যোগ দিতে চেয়ে পাননি বা ১৯০৩ সালে খনিবিদ্যা ( Mineralogy)  প্রফেসরের চাকরি পাননি। তাঁর স্ত্রী ম্যারি ক্যুরি এবং তিনি বেশীরভাগ সময়ই গবেষণা কাজের মধ্যে নিজেদের লিপ্ত রাখতেন৷ ম্যারি ক্যুরি বলেছেন, “My husband and I were so closely united by our affection and our common work that we passed nearly all of our time together.”  ম্যারি ক্যুরি তাঁর স্বামীর প্রতি যা অবিচার হয়েছিল তার জন্য কখনই প্যারিসকে ক্ষমা করতে পারেননি৷ পিয়ের ক্যুরিকে যেমন ল্যাবরেটরীর সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল তেমন উপযুক্ত সম্মানও তাঁকে দেওয়া হয়নি৷ 

নোবেল পুরস্কার ছাড়া তিনি আরও বেশ কিছু পুরস্কার অর্জন করেন৷ রয়্যাল সোসাইটি অফ লন্ডন দ্বারা ডেভি মেডেল ( Davy Medal) পুরস্কার পান৷ কেমিস্ট্রির কোনও শাখায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে৷ রেডিয়াম বিষয়ক আবিষ্কারের জন্য ১৯০৩ সালে ম্যারি ক্যুরি এবং পিয়ের ক্যুরি যৌথ ভাবে এই পুরস্কার অর্জন করেন৷ এরপর পিয়ের ক্যুরি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে যৌথ ভাবে ম্যাটেউকি মেডেল (Matteucci Medal) লাভ করেন৷ পদার্থবিদ্যার জন্য ইতালি থেকে এই পুরস্কার প্রদান করা হত৷ ১৯০৯ সালে তিনি পান মরণোত্তর এলিয়ট ক্রেশন মেডেল ( Elliott Cresson Medal) যা ফ্র্যাঙ্কলিন ইনস্টিটিউট থেকে দেওয়া সর্বোচ্চ পুরস্কার৷ 

উনিশ শতকের শেষের দিকে পিয়ের ক্যুরি সাধারণ চৌম্বকবাদের রহস্যগুলি নিয়ে গবেষণার সময় অন্যান্য ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের যেমন চার্লস রিচেট এবং ক্যামিল ফ্লেমারিওনের আধ্যাত্মবাদী পরীক্ষাগুলি সম্পর্কে জানতে পারেন। তিনি আধ্যাত্মিকতাবাদ সম্পর্কে বেশ কিছু বই পড়েন৷ এই বিষয় সম্পর্কে জানতে তিনি আগ্রহী হয়ে ছিলেন৷ তাঁর লক্ষ্য কখনই আত্মার সাথে যোগাযোগ করা ছিল না। তিনি বিষয়টির গভীরে গিয়ে তার ব্যখ্যা জেনে বোঝার চেষ্টা করেন৷ তবে আধ্যাত্মিকতা অধ্যয়ন করেও পিয়ের ক্যুরি ছিলেন নাস্তিক ।

১৯০৬ সালের ১৯ এপ্রিল পথ দুর্ঘটনায় পিয়ের ক্যুরির মৃত্যু হয়। এক বৃষ্টির দিনে তিনি ব্যস্ত রু ডাফাইন ( Rue Dauphine) রাস্তা পেরোতে গিয়ে পিছলে পড়ে যান এবং একটি ঘোড়ার গাড়ি তাঁর মাথার উপর দিয়ে চলে যায়৷ তাঁর বাবা ও তাঁর সহকারীদের কথায় জানা যায় যে তিনি তাঁর ভাবনার জগতে সর্বদা ডুবে থাকতেন ও স্বভাবগত ভাবেই অন্যমনস্ক ছিলেন। তবে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে গবেষণা করার সময় তাঁর স্ত্রীয়ের মত তিনিও প্রচুর পরিমাণে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রভাবে আসেন এবং পথ দুর্ঘটনায় মারা না গেলেও বিকিরণজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতেন যা তাঁর স্ত্রী ম্যারি ক্যুরি, মেয়ে আইরিন ও জামাই ফ্রেডেরিক জোলিও এর ক্ষেত্রে হয়েছিল। এমনকি ১৮৯০ এর দশকে তাঁদের গবেষণা সংক্রান্ত কাগজপত্র আজও তেজস্ক্রিয় হয়ে আছে ও বিশেষ ভাবে তৈরি সীসার বাক্সে সেগুলি রাখা আছে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।