বিজ্ঞান

অধিকাংশ ঘড়িতে কোয়ার্টজ লেখা থাকে কেন

অনেকেই হয়ত দেখে থাকবেন, অনেক ঘড়িতে কোয়ার্টজ লেখা তা সেই ঘড়িটি যে ব্র্যান্ডেরই হোক না কেন। কখনও ভেবে দেখেছেন যে কেন কোয়ার্টজ (quartz) কথাটি লেখা থাকে? এখানে ঘড়িতে কোয়ার্টজ লেখা থাকে কেন এবং এই ঘড়িগুলির বিশেষত্ব ও কার্যপ্রণালী কেমন তা ব্যাখ্যা করব।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সময় নির্ণয় করার পদ্ধতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং সব ক্ষেত্রেই মূল লক্ষ্য নির্ভুল সময় নির্ণয় করা। সেই পথ ধরেই সূর্যঘড়ি, বালি ঘড়ি, পেন্ডুলাম ঘড়ি, মেকানিক্যাল ঘড়ি ইত্যাদি পেরিয়ে এসে কোয়ার্টজ, অ্যাটোমিক ঘড়িতে এসে পৌঁছেছে ঘড়ির বিবর্তন। এর মধ্যে এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত সব থেকে নির্ভুল ঘড়ি অ্যাটোমিক ঘড়ি যদিও তা এখনও সকলের জন্য সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি। বর্তমান সময়ে সর্বাধিক প্রচলিত ‘নির্ভুল’ ঘড়ি হল কোয়ার্টজ ঘড়ি। তাই বর্তমান সময়ের অধিকাংশ ঘড়িতে কোয়ার্টজ লেখা থাকে।

ঘড়ির ইতিহাসে গ্যালিলিও গ্যালিলেই এর আবিষ্কার করা পেন্ডুলাম ঘড়ি অন্যতম প্রধান ঘটনা যা সেই যুগে নির্ভুল সময় নির্ণয় করতে অনেকটাই সাহায্য করেছিল। এই ঘড়ি পদ্ধতির প্রয়োগ এখনও দেখা যায় বিশেষ করে কয়েক বছর আগেও বাড়িতে বাড়িতে পেন্ডুলামের ঘড়ি দেখা যেত। পেন্ডুলাম ঘড়ির মূল নীতি হল একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের দন্ডকে পেন্ডুলামের মত দোলালে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে সবসময় একই সময় নেবে। কিন্তু পেন্ডুলাম ঘড়ির সমস্যা হল উষ্ণতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দন্ডের দৈর্ঘ্য পাল্টায়, অভিকর্ষ বলের সাথে সাথে দোলনকাল পাল্টায় অর্থাৎ পাহাড়ে ও সমুদ্রতলে সময় আলাদা হয় এবং ঘড়ি চালু রাখতে নিয়মিত দম দিতে হয়। সেই সব সমস্যার সমাধান দিল কোয়ার্টজ ঘড়ি।

কোয়ার্টজ খুব সহজ লভ্য একটি খনিজ। এটি সিলিকন-ডাই-অক্সাইড নামে একটি রাসায়নিক যৌগ এবং এটি বালি ও বেশিরভাগ পাথরেই পাওয়া যায়। কোয়ার্টজ প্রধানত তার পাইজোইলেক্ট্রিক (piezoelectric) গুণের জন্য ঘড়িতে কাজে লাগে। অর্থাৎ যদি কোয়ার্টজ স্ফটিকে চাপ দেওয়া হয় তাহলে এটি খুব সামান্য হলেও বৈদ্যুতিক ভোল্টেজ তৈরি করে। আবার উল্টোদিকে কোয়ার্টজ টুকরোটিতে সামান্য ভোল্টেজ প্রয়োগ করলে এটি একটি সুনির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে স্পন্দিত হয়। কোয়ার্টজ এর কম্পাঙ্ক ৩২৭৬৮ অর্থাৎ এক সেকেন্ডে ৩২৭৬৮ বার স্পন্দিত হয়। বর্তমান ঘড়িতে একটি ডিজিটাল কাউন্টার থাকে যা এই কম্পন সংখ্যা গুণে সেকেন্ড এবং সেই সেকেন্ড গুণে মিনিট, ঘন্টা এইভাবে সময়ের হিসেব রাখে। এই ঘড়ি চালু রাখতে খুব সামান্য ভোল্ট বিদ্যুতের চাহিদা থাকায় ঘড়িতে একটি ছোট ব্যাটারি রাখলেই চলে যা দিয়ে বেশ কয়েক বছর নির্ভুল সময় পাওয়া যায় ফলে দম দিতে ভুলে যাওয়ার ব্যাপার নেই। পেন্ডুলামের মত অভিকর্ষজ বল জনিত সমস্যাও নেই, তাই সর্বত্র সময় একই রকম দেয়। তবে এক্ষেত্রেও গরম ও ঠান্ডা হলে খুব সামান্য প্রভাব পড়ে তবে তা পেন্ডুলামের ঘড়ির মত নয়।

তাই কোয়ার্টজের এই সকল সুবিধাকে কাজে লাগাতে সুরশলাকার (Tuning fork) আকারে কাটা কোয়ার্টজ ক্রিস্টাল ঘড়িতে রাখা হয় এবং এই ছোট্ট ক্রিস্টালটির কম্পাঙ্ক মেপে সময় নির্ধারণ করা হয়। সময়ের নির্ভুলতা, কোয়ার্টজের সহজলভ্যতা, ব্যবহারের সুবিধা ইত্যাদি নানা কারণে কোয়ার্টজ ঘড়ি খুব সহজেই জনপ্রিয় হয়েছে আর তাই অধিকাংশ ঘড়িতে কোয়ার্টজ লেখা দেখতে পাই আমরা।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন