বজ্রপাত বা বিদ্যুৎ কোনো নতুন ঘটনা নয়। পৃথিবী সৃষ্টির সূচনাকাল থেকেই বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বজ্রগর্ভ মেঘ থেকে বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা গেছে, নেমে এসেছে প্রবল বজ্রপাত। আমরা অনেকেই জানি যে মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলেই এই বজ্রপাত সৃষ্টি হয়।(বজ্রপাতের কারণ সম্পর্কে বিশদ জানতে পড়ুন এখানে ) আর এর শক্তি সম্পর্কে যদি স্পষ্ট ধারণা না থাকে তাহলে বলতে হয় ঐ বিদ্যুতের মধ্যে লুকিয়ে থাকে প্রায় দশ হাজার ভোল্টের তড়িৎ কিংবা তারও বেশি। ইদানীং বিদ্যুৎ তথা বজ্রপাতের পরিমাণ এত বেড়ে গেছে চারপাশে যে প্রায়ই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাবার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন বায়ুদূষণ যত বাড়বে ততই বজ্রপাতের সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে। একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে বাতাসের উষ্ণতা যদি ১ ডিগ্রি বাড়ে তাহলে বজ্রপাতের পরিমাণ ১২ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এই অবসরে তাহলে জেনে নেওয়া যাক ক্রমবর্ধমান বজ্রপাত থেকে রক্ষার উপায় (How to protect from lightning) । প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতোই বজ্রপাতও জীবকুলে প্রভূত ক্ষতিসাধন করতে পারে, তাই আগাম সতর্কতা অবশ্যই জরুরি।
বজ্রপাতের সময় ঘরেই থাকা হোক বা বাইরে দুই ক্ষেত্রেই প্রভূত সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার। বজ্রপাতের পূর্বাভাস জেনে থাকলে সেই বুঝে বাইরে বেরোনো উচিত। বাজ পড়ার সময় কোনোপ্রকার ধাতব পদার্থ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কারণ আমরা সকলেই জানি যে বিদ্যুৎ তড়িৎ-সম্পৃক্ত থাকে আর তা কোনো ধাতব পদার্থের উপর পড়লে সেটিও তড়িদাহিত হয়ে যায়। ফলে কোনো লোহার দণ্ড, বাড়ির রেলিং, রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট ইত্যাদিতে হাত দিয়ে থাকলে যে কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতে পারেন। এমনকি বহু লম্বা কোনো রেলিং ধরে থাকলেও যদি ভেবে থাকেন যে বিদ্যুৎ যেখানেই পড়ুক কিছু হবে না, তা একেবারেই ভুল। বজ্রপাতের প্রবল তড়িৎ ঐ রেলিংয়ের মধ্যে দিয়ে খুব দ্রুত ধাতব মুক্ত ইলেকট্রনগুলিকে সচল করে তুলবে এবং তা আপনাকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করতে পারে। রাস্তায় থাকলে অবশ্যই কোনো নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিতে হবে। তবে কখনো কোনো উঁচু টিলা, পর্বতশিখর বা উঁচু কোনো গম্বুজের নীচে আশ্রয় নেওয়া যাবে না। গাড়ির ভিতরে থাকলে মনে রাখতে হবে যে গাড়ির ধাতব অংশের সঙ্গে দেহের যেন স্পর্শসংযোগ না ঘটে। জলাশয় বা রাস্তার জমা জল ইত্যাদি থেকে তুলনায় শুষ্ক অঞ্চলে আশ্রয় নেওয়া জরুরি। সবথেকে বড়ো বিষয় হল, কোনো ফাঁকা জায়গায় থাকা যাবে না। গ্রামাঞ্চলে যদি কেউ মাঠে কাজ করেন বা ধান রোপণ করেন, সেই জায়গা থেকে তৎক্ষণাৎ কোনো বাড়িঘর-ছাউনি ইত্যাদির নীচে আশ্রয় নেওয়া দরকার। এমন ভাবার কোনো কারণ নেই যে ফাঁকা জায়গায় বজ্রপাত হয় না। বজ্রপাতের কোনো নির্দিষ্ট স্থান নেই – যে কোনো জায়গায়, যে কোনো সময় হতে পারে। কখনোই উঁচু কোনো গাছের নীচে দাঁড়ানো যাবে না। অনেকেই শুনে থাকবেন তালগাছ, নারকেল গাছ বা সুপারি গাছেই বেশি বাজ পড়ে। ফলে ঐরকম উঁচু গাছের নীচে দাঁড়ালে গাছটির পাশাপাশি ব্যক্তিটিরও বিদ্যুৎ-স্পৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বজ্রপাতের সময় বাইরে থাকলে মাটিতে শুয়ে পড়া যাবে না, তাতে মাটিতে বজ্রপাত ঘটলে দ্রুত তড়িদাহিত হয়ে মারা যাবার সম্ভাবনা প্রবল। এবারে আসা যাক বাড়ির মধ্যেকার সুরক্ষাবিধির ব্যাপারে। বাড়ির ভিতর থাকলে সবার আগে অবশ্যই বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি সব বন্ধ করে এবং বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখতে হবে। বাড়িতে, অফিসে বা দোকানে থাকলে বজ্রপাতের সময় ৩০-৩০ নিয়মটি খুবই কাজে দেবে। নিয়মবিধিটি খুবই সহজ। যেহেতু আলোর গতিবেগ শব্দের থেকে বেশি তাই আকাশে বিদ্যুৎ পর ৩০ গুণতে হবে যদি তার আগে বজ্রপাতের শব্দ শোনা যায় তাহলে আশ্রয়স্থলে অপেক্ষা করতে হবে। বজ্রপাত শেষ হওয়ার পরে আরো ৩০ গুণে তারপর বাড়ি থেকে বেরোতে হবে। বজ্রপাতের সময় যথাসম্ভব জল থেকে দূরে থাকতে হবে, স্নান-বাসন ধোয়া ইত্যাদি করা যাবে না। কংক্রিটের মেঝে বা দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে বা শুয়ে থাকা কখনোই উচিত নয় বজ্রপাতের সময়। কারণ যদি কখনো বাড়িতে বজ্রপাত হয় তাহলে ঐ মেঝে বা দেওয়ালের মাধ্যমে তড়িদাহিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে উঁচু বাড়িতে ছাদে বজ্রনিরোধী দণ্ড লাগানো খুবই দরকার যা আসলে আর্থিং-এর কাজ করে। বাড়ির আর্থিং যদি সঠিকভাবে করা থাকে তাহলে বজ্রপাতের কারণে বৈদ্যুতিন যন্ত্র নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায় আর সেইসঙ্গে অন্য বিপদ থেকেও বাঁচা যায়। দেখা যাবে উঁচু উঁচু মন্দিরগুলির চূড়ায় এরকম লোহার দণ্ড বা বড়ো ত্রিশূল থাকে যার মূল উদ্দেশ্য বজ্রপাত প্রতিরোধ করা। মাঠে-ক্ষেতে কাজ করার সময় গবাদি পশুদের দিকে খেয়াল রাখা দরকার, তাদের জল থেকে সরিয়ে শুষ্ক স্থানে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
এই বজ্রপাতকে ঘিরে কিছু ভুল ধারণা রয়েছে যার কারণে প্রচুর মানুষ মারা যান। যেমন –
১) গাছের নীচে দাঁড়ানো তুলনায় নিরাপদ।
২) কোনোস্থানে একবারের বেশি বজ্রপাত হয় না।
৩) বিদ্যুৎ-স্পৃষ্ট কোনো ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে তড়িদাহিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
এই ধারণাগুলি একেবারেই ভ্রান্ত। গাছের নীচে দাঁড়ালেই নিরাপত্তা পাওয়া যাবে তা একেবারেই নয়। গাছটি যদি খুব উঁচু হয় এবং তার চারপাশে অন্য কোনো গাছপালা না থাকে তাহলে গাছে বজ্রপাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নীচে দাঁড়ানো ব্যক্তিরও ক্ষতি হবে। দ্বিতীয়ত বজ্রপাতের কোনো সংখ্যানির্দেশ থাকে না বলে একবারের পরিবর্তে বহুবার একইস্থানে বজ্রপাত ঘটতে পারে। সবশেষে বিদ্যুৎ-স্পৃষ্ট ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে কোনোভাবেই আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং তাঁকে সবার আগে প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করতে হবে। মোটামুটিভাবে এই বিধিগুলি মানা হলে আকস্মিক বজ্রপাত থেকে নিরাপদে সুরক্ষিত থাকা যেতে পারে। এগুলিই হল বজ্রপাত থেকে রক্ষার উপায় ।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান