বিজ্ঞান

বজ্রপাত হয় কেন

বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক দূর্যোগ যাকে আমরা চলতি ভাষায় বাজ পড়া বলে থাকি। বিদ্যুতের ঝলকানির সঙ্গে প্রচণ্ড শব্দ সহযোগে বাজ পড়লে আমরা সকলেই ভয় পাই, অনেকে ঈশ্বরকে স্মরণ করেন এমনকি বাজ কমানোর জন্য শঙ্খধ্বনিও দেওয়া হয়। বাজ পড়া নিয়ে কতরকম ধারণা রয়েছে মানুষের মনে। একটা প্রচলিত ধারণা আছে মেঘে মেঘে সংঘর্ষ হলেই নাকি বজ্রপাত হয়। বিজ্ঞান কিন্তু আসলে তা বলে না। এখন অনেকেই লক্ষ করে থাকবেন বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বাজ পড়ার মাত্রাও বেড়ে গেছে অনেক। বজ্রপাতে মৃত্যু প্রায় নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রশ্ন জাগে বজ্রপাত হয় কেন? আসুন জেনে নিই বাজ পড়ার পিছনের এই গোপন রহস্য।

আমরা জানি সূর্যের তাপে জলাশয়ের জল বাষ্পীভূত হয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে। উষ্ণ-আর্দ্র, হালকা বায়ু দ্রুত বেগে উপরের দিকে উঠতে থাকলে ঠাণ্ডায় ঘনীভূত হয়ে কিউমুলোনিম্বাস মেঘের সৃষ্টি করে। এই মেঘ ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার পর্যন্ত উপরে উঠে যেতে পারে। কিউমুলোনিম্বাস মেঘ থেকেই বজ্র সৃষ্টি হয়। উপরের দিকে ধাবমান জলীয় বাষ্পের তাপমাত্রা যখন হিমাঙ্কের নিচে নেমে যায়, তখন জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে জলকণা বা বরফে পরিণত হয়। এই শীতল জলকণা যুক্ত ভারী বাতাস নিচের দিকে নেমে যায় এবং উষ্ণ হয়ে আবার উপরের দিকে উঠে যায়। বাতাসের এই পর্যায়ক্রমিক উত্থান-পতন একটি বর্তনী (Circuit) তৈরি করে যার নাম পরিবহন কোষ বা কনভেকশন সেল (Convection Cell)। এই ঘটনা যদি অল্প পরিমাণে হয় তাহলে শুধুই মেঘ তৈরি হয় আর যদি এটি বেশিমাত্রায় হয় তবেই ওই মেঘ থেকে বজ্র তৈরি হয়।

পরিবহন কোষের গঠনের উপর নির্ভর করে বজ্র তিন ধরনের হতে পারে।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


একক কোষ বজ্র (Single Cell Thunderstorm): একটি মাত্র পরিবহন কোষ দিয়ে এই বজ্র তৈরি হয়। এই বজ্রের আকার ক্ষুদ্র, প্রভাব ক্ষণস্থায়ী ও সাধারণ প্রকৃতির। এই বজ্রপাত সাধারণত গ্রীষ্মকালে কিউমুলোনিম্বাস মেঘ থেকে হয়। বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টিপাত বা শিলাবৃষ্টিও এই ক্ষেত্রে হতে পারে।

বহু কোষ বজ্র (Multi Cell Thunderstorm): অনেকগুলি পরিবহন কোষ দিয়ে তৈরি এই বজ্র একটি একক ক্ষেত্র হিসাবে কাজ করে। অনেকসময় পরিবহন কোষগুলি এক একটি স্তরে সজ্জিত থাকে ও বজ্রপাতের এক একটি চক্র তৈরি করে। অর্থাৎ পর পর অনেকগুলি চক্রে বজ্রপাত হতে থাকে। এই ঝড়ের অভিমুখে শীতল বা উষ্ণ বায়ু থাকে। উষ্ণ বাতাস শীতল বাতাসের উপরে বায়ুমন্ডলে সজোরে ধাবিত হয়। কখনো কখনো এক একটি সরলরেখা তৈরি হয় যাকে বলা হয় ‘স্কোয়্যাল লাইন’ (Squall Line)। স্কোয়্যাল লাইন হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। এক্ষেত্রে বজ্রপাতের পূর্বে গরম বাতাস প্রবাহিত হতে থাকে।

বিশালাকৃতি কোষ বজ্র (Super cell thunderstorm): গভীর, ঘূর্ণায়মান বাতাসযুক্ত বিশালাকৃতি কোষ সমন্বিত বজ্র খুব বড় হয়। এর প্রভাব বেশ কয়েক ঘন্টা থাকে। এর থেকে প্রচুর পরিমাণ বৃষ্টি হয় ও বেসবলের আকৃতির শিলা বৃষ্টি হয়। বিশালাকৃতি বজ্রকোষের ঘূর্ণন খুব মারাত্মক। একটি বিশালাকৃতি বজ্রের মাধ্যমে পরপর অনেকগুলি টর্নেডো হতে পারে, দুশো আশি কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা বেগে হওয়া বইতে পারে। আবহমণ্ডলে আঠারো কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত মেঘ বিস্তৃত থাকতে পারে।

জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে যখন মেঘে পরিণত হয়, তখন তার মধ্যে প্রচুর পরিমাণ স্থির তড়িৎ জমা হতে থাকে। উপরের দিকে উঠতে থাকার সময় কিছু কিছু জলীয়বাষ্প এর পরমাণু ইলেকট্রন বর্জন করে। জলীয়বাষ্পের যে পরমাণুগুলি ইলেকট্রন বর্জন করে সেগুলি ধনাত্মক আধানযুক্ত হয় আর যে পরমাণুগুলি এই ইলেকট্রনগুলি গ্রহণ করে সেগুলি ঋণাত্মক আধানযুক্ত হয়। অপেক্ষাকৃত হালকা ধনাত্মক আধানযুক্ত জলীয়বাষ্প মেঘের উপরের অংশে চলে যায় যাকে পজিটিভ বজ্র বলে। ভারী ঋণাত্মক আধানযুক্ত জলীয় বাষ্প জমা হয় মেঘের নিচের অংশে বা মাঝামাঝি অংশে যাকে বলে নেগেটিভ বজ্র।

ধনাত্মক আধান এবং ঋণাত্মক আধানের পরিমাণ বায়ুমন্ডলে বাড়তে থাকলে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধান পরস্পরকে আকর্ষণ করতে থাকে আর তখন শুরু হয়ে যায় ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক ডিসচার্জ (Electrostatic Discharge) প্রক্রিয়া। আমরা জানি যখন দুটি বিপরীত তড়িৎ-আধানযুক্ত বস্তু পরষ্পরের সংস্পর্শে এলে হঠাৎ বিদ্যুৎপ্রবাহ শুরু হয়, একেই বলে ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক ডিসচার্জ। এই ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক ডিসচার্জ তিনভাবে হতে পারে:

১) ইন্ট্রা-ক্লাউড ডিসচার্জ (Intra Cloud Discharge): এক্ষেত্রে একই মেঘের নিজস্ব ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধানের মধ্যে ডিসচার্জ প্রক্রিয়াটি হওয়ার ফলে ঋণাত্মক ও ধনাত্মক স্ট্রিম মিলে গিয়ে প্রশমিত হয়ে যায়। এই কারণেই প্রচন্ড শব্দ সহযোগে শর্ট সার্কিট হয়। এই ধরনের বজ্রপাত মেঘের মধ্যেই হয় বলে একে ইন্ট্রা-ক্লাউড লাইটনিং (Intra Cloud Lightning) বলে।

২) ক্লাউড টু ক্লাউড ডিসচার্জ (Cloud To Cloud Discharge): এই ক্ষেত্রে একটি মেঘের ধনাত্মক বা ঋণাত্মক আধানের সঙ্গে অন্য আরেকটি মেঘের ঋণাত্মক বা ধনাত্মক আধানের মধ্যে ডিসচার্জ প্রক্রিয়াটি হয়।

৩) ক্লাউড টু গ্রাউণ্ড ডিসচার্জ (Cloud To Ground Discharge): এই ক্ষেত্রে মেঘের সঙ্গে ভূমির বিক্রিয়া ঘটে মেঘের মধ্যে সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ আধান মেঘ থেকে সরাসরি ভূমির উপর আঘাত হানে এবং প্রশমিত হয়ে যায়। মেঘের নিচের দিকে বা মাঝামাঝি অংশে সঞ্চিত ঋণাত্মক আধানের ইলেক্ট্রন-প্রবাহ সরাসরি ভূমিতে এসে প্রশমিত হয়। এটিকে বলা হয় ‘নেগেটিভ বজ্রপাত’। এই বজ্রপাতে কুড়ি থেকে পঞ্চাশ হাজার অ্যাম্পিয়ার তড়িৎ থাকে আর তার ভোল্টেজের মাত্রা হয় তিরিশ থেকে কয়েক হাজার ভোল্ট। ‘নেগেটিভ বজ্রপাত’ সাধারণত বৃষ্টি চলাকালীন হয়।

তবে সবচেয়ে মারাত্মক হল পজিটিভ বজ্রপাত। মেঘের উপরিভাগে সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ পজিটিভ চার্জ সরাসরি ভূমিতে এসে ভূমির গভীরে চলে যায় বা ভূমি থেকে ইলেক্ট্রনের প্রবাহ উপরে উঠে মেঘকে প্রশমিত করে। ক্লাউড টু গ্রাউণ্ড বজ্রপাতের পাঁচ শতাংশ হল এই ধরনের বজ্রপাত যার মধ্যে ভোল্টেজ থাকে একশো কোটি ভোল্ট আর তড়িতের পরিমাণ থাকে তিন লক্ষ অ্যাম্পিয়ার। বৃষ্টির মধ্যে এই বজ্রপাত হয় না। প্রচণ্ড ঝোড়ো হওয়ার সঙ্গে এই বজ্রপাত হয়। এই বজ্রপাতের ফলে বন-জঙ্গলে আগুন লেগে যায়, ইলেকট্রিকের বড় বড় সাবস্টেশন পুড়ে যায়।

এবার আমরা জেনে নেবো বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ চমকায় কেন এবং তার সঙ্গে প্রচণ্ড শব্দ উৎপন্ন হয় কেন। আসলে এই সময় মেঘে জমা হওয়া উচ্চশক্তি সম্পন্ন স্থির-তড়িৎ বাতাসের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। কিন্তু আমরা জানি বাতাস তড়িতের অপরিবাহী। এই কারণে বাতাসের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হবার সময় এই তড়িৎশক্তি বাতাসের মধ্যে একটি সরু চ্যানেলকে আয়নিত (Ionised) করে এবং একটি পরিবাহী পথ (Conductive Path) বানিয়ে ফেলে আর তাই বাতাসের আয়নিত পরমাণুগুলি শক্তি বিকিরণ করতে থাকে। আয়নিত পরমাণুগুলির বিকীৰ্ণ শক্তি থেকে তীব্র আলোকচ্ছটা সৃষ্টি হয় যাকে আমরা বিদ্যুৎ বলে থাকি। এই সময় বিদ্যুতের তাপমাত্রা প্রায় সাতাশ হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। বাতাসের চাপ স্বাভাবিক চাপের চেয়ে প্রায় দশ থেকে একশো গুন হয়ে যায়। তাপ ও চাপের এই ব্যাপক পরিবর্তন হতে সময় লাগে মাত্র এক সেকেন্ডের কয়েক হাজার ভাগের এক ভাগ। এত অল্প সময়ের মধ্যে এই ব্যাপক পরিবর্তন বায়ুমণ্ডলকে প্রচণ্ড গতিতে আলোড়িত করে। বিস্ফোরণের মতো প্রচণ্ড শব্দ উৎপন্ন হয়। বজ্রপাতের সময় এই শব্দই আমরা শুনি। ভূপৃষ্ঠ থেকে তিন মাইল দূরের বজ্রপাত এক বিলিয়ন থেকে দশ বিলিয়ন জুল শক্তি উৎপন্ন করে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে বজ্রপাতের ফল কী মারাত্মক।

এখানে বজ্রপাত হয় কেন সে সম্পর্কে জানা গেল এবং বজ্রপাত সম্পর্কিত ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার এরই সঙ্গে দূর হবে তা আশা করা যায়।

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: বজ্রপাত থেকে রক্ষার উপায় | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য