ইদানিং এত বেশি বজ্রপাত হচ্ছে কেন

ইদানিং এত বেশি বজ্রপাত হচ্ছে কেন

বর্ষাকাল শুরু হলেই ভারত জুড়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টিপাত এক নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। আকাশে ঘন কালো কিউমুলোনিম্বাস মেঘ জমতে দেখলে এখন অনেকেই আশঙ্কিত হই আমরা। বৃষ্টির আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি বয়ে আনছে বজ্রপাতের ভয়াবহতাকে। বিধ্বংসী বজ্রপাত মানুষের প্রাণও কেড়ে নিতে পারে। বিগত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে ভারতে বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়েছে ক্রমশ আর একটি পরিসংখ্যান অনুসারে এক বছরে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন শুধু এই বজ্রপাতের কারণে। সত্যিই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে এই বজ্রপাত। ইদানিং এত বেশি বজ্রপাত হচ্ছে কেন ? এর পিছনে বৈজ্ঞানিক কারণটি ঠিক কী? আসুন এই অবসরে জেনে নিই এই প্রশ্নের উত্তরগুলি।

বজ্রগর্ভ মেঘের মধ্যে ঊর্ধ্বমুখী বরফের কেলাসগুলির সঙ্গে নিম্নগামী শিলার সংঘাত ঘটে এবং এই সংঘাতের ফলেই একটি তড়িৎ আধান সৃষ্টি হয় যা বিদ্যুৎ-স্ফূলিঙ্গের রূপ নেয়। বিদ্যুৎ-স্ফূলিঙ্গটিই শব্দসহযোগে মাটিতে নেমে এলে তাকে আমরা বজ্রপাত বলে থাকি। প্রায় দশ হাজার ভোল্টেজেরও বেশি তড়িৎ থাকে এই বিদ্যুৎ-এর মধ্যে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে ট্রান্সমিটারের প্রবাহিত বিপজ্জনক চিহ্নিত ৪৪০ ভোল্ট অপেক্ষা এই বজ্রপাত কতখানি বিধ্বংসী হতে পারে!

প্রথমেই কতগুলি পরিসংখ্যান দিয়ে মূল রহস্যে প্রবেশ করা যাক। বিখ্যাত জার্নাল জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটারস-এর সমীক্ষা অনুযায়ী শুধুমাত্র ভারতে ২০১০ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতের সংখ্যা গড়ে বছরে আঠারো হাজার বার থেকে বেড়ে এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ বারে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় আবহাওয়া মন্ত্রকের নিজস্ব সমীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা গেছে, ১৯৬৮ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে ভারতে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল বছরে গড়ে প্রায় ১৫০০ জন যা ছাড়িয়ে গিয়েছে বিগত কয়েক বছরে। ২০১৯ সালে সমগ্র ভারতে মাত্র এক বছরের মধ্যেই শুধু বজ্রপাতের কারণে মারা গিয়েছে ২৮৭৬ জন লোক। শুধুই ভারত নয়, বিশ্বের বেশ কিছু দেশে একইভাবে বজ্রপাত একটি বিরাট বড়ো প্রাকৃতিক বিপদে পরিণত হয়েছে। ‘লাইটনিং রেসিলিয়েন্ট ইণ্ডিয়া ক্যাম্পেইন’-এর পরিসংখ্যানের বিচারে, ২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের ৩১মার্চ পর্যন্ত ভারতে এক কোটি পঁচাশি লক্ষ বার বজ্রপাত ঘটেছে এবং শুধু তাই নয় বিগত দিনের ইতিহাস লক্ষ করে দেখা গেছে এই বজ্রপাতের পরিমাণ ২০১৯-২০২০ বর্ষের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেড়ে গেছে। এবার সত্যিই জানা দরকার ঠিক কী কারণ রয়েছে এই ভয়াবহ বজ্রপাতের বেড়ে যাওয়ার পিছনে।

প্রধানত অত্যধিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং বায়ুদূষণ এই দুটি কারণকেই চিহ্নিত করতে চেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ক্যালিফোর্ণিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে বাতাসের উষ্ণতা ১ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলে বজ্রপাতের পরিমাণ প্রায় ১২ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। শ্রীনগরের হেমাবতী নন্দন বহুগুণা গাড়োয়াল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভারতের কানপুর আইআইটির যৌথ গবেষণার ফলে জানা গেছে সিএনএন (CNN) অর্থাৎ ক্লাউড কনডেন্সেশন নিউক্লিয়াই-এর প্রভাবের কথা। কি এই সিএনএন? খুবই ক্ষুদ্রাকার কণা বা ড্রপলেট যার উপর জলীয় বাষ্পসমূহ ঘনীভূত হয় তাকেই সিএনএন বলে, একে অনেকে বীজমেঘও বলে থাকে। এখন এই সিএনএন-এর ঘনত্বের মাত্রা বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নরকম হয়ে থাকে যা মূলত ঐ স্থানের আবহাওয়ার উপরই নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে সকল অঞ্চলে পরবর্তীকালে প্রবল বৃষ্টি এবং দাবানল দেখা গেছে সেখানেই সিএনএন-এর ঘনত্ব অন্যান্য স্থানের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি হয়েছে। এর মানে হল সিএনএন বেশি হলে দাবানলের সম্ভাবনাও বাড়বে আর দাবানলের সম্ভাবনা বাড়লে তা নিশ্চিতভাবে বজ্রপাতের পরিমাণও বৃদ্ধি করবে, এমনটাই জানাচ্ছে ‘অ্যাটমোস্ফেরিক এনভায়রনমেন্ট’ পত্রিকার ৩০ জুন সংখ্যায় প্রকাশিত এই গবেষণার প্রতিবেদন। দাবানলের সঙ্গে বজ্রপাত কীভাবে সংযুক্ত তা ২০১৯-২০২০ সালের অস্ট্রেলিয়ার দাবানলই প্রমাণ করে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন দাবানলের কারণও যেমন বায়ুদূষণ, তেমনি অধিক বজ্রপাত বা অত্যধিক বৃষ্টির কারণও সেই বায়ুদূষণ। অস্ট্রেলিয়ার ২০১৯-২০ সালের বিধ্বংসী দাবানলের প্রসঙ্গে আসা যাক যা ‘ব্ল্যাক সামার’ নামে পরিচিত। এই দাবানলের মারাত্মক উত্তাপ প্রায় এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার বর্গ কিলোমিটার জমি পুড়িয়ে দিয়েছিল এবং প্রচুর পরিমাণ ধোঁয়ায় তাসমান সাগর পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাংশ পুরো ছেয়ে গিয়েছিল। দাবানলের সময় মহাসাগরের এক বিরাট অংশের উপরিস্তরের বায়ু ব্যতিক্রমীভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে আর এর ফলেই দেখা গেছে, বিগত বছরের একই সময়পর্বের তুলনায় ঐ বছর অস্ট্রেলিয়ার ঐ অঞ্চলে বিদ্যুৎ ও বজ্রপাতের পরিমাণ প্রায় ২৭০% বেড়ে গেছে। ভারতেও ঘটনাটা এইরকমই অনেকটা। তবে এই বায়ুদূষণ ছাড়া ভারতে ভৌগোলিক অবস্থানও একটি অন্যতম কারণ বলে মনে করেন অনেক বিজ্ঞানী। ভারতের তিনদিকে সমুদ্র যেখান থেকে ভারতে গরম-আর্দ্র বাতাস প্রবেশ করে আর উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল থেকে শীতল-শুষ্ক বাতাস প্রবেশ করে বলে একটা অস্থিতিশীল মেঘের সৃষ্টি হয় যা কিনা বজ্রপাতের অনুকূল। তবে ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণের কারণেই ইদানিং বজ্রপাতের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে বলেই ধরে নেওয়া যায় সমস্ত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে। অত্যধিক কল-কারখানা বেড়ে যাওয়ায় বাতাসে বেড়ে গেছে সালফার আর নাইট্রোজেনের পরিমাণ। গ্রিন হাউস গ্যাসগুলির মাত্রাও ক্রমবর্ধমান। ফলে পৃথিবীর ভূমিতলের উষ্ণতা এবং বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়েছে। যথেচ্ছ হারে গাছ কাটার ফলে বিশ্ব-উষ্ণায়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে। বর্ষাকালে সাধারণত যে দশ দিনের জন্য বৃষ্টিপাতে বিরতি থাকে, সেইসময়েই আসলে মেঘের মধ্যেকার বরফ-কেলাসগুলি পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধায় যা বজ্রপাত ডেকে আনে। এমনকি দেখা গেছে বজ্রগর্ভ মেঘের আয়তন যত বেশি হবে ততই ঐ বরফ-কেলাসগুলির ঘর্ষণ বৃদ্ধি পাবে। সবমিলিয়ে ক্রমশ বজ্রপাত একটি বিধ্বংসী দুর্যোগের আকার নিচ্ছে ভারতে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য বাংলাদেশে বজ্রপাতকে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

আশা করি বোঝা গেল এত বেশি বজ্রপাত হচ্ছে কেন । ক্রমবর্ধমান এই বজ্রপাত জীবনহানির কারণ হয়ে ওঠে মানুষের ক্ষেত্রে। বজ্রপাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মৃত্যুর পরিসংখ্যানও বেড়ে গেছে। তাই আমাদের উচিত আরো সতর্ক হওয়া, বজ্রপাত থেকে বাঁচার জন্য অবলম্বন করা দরকার কিছু বিশেষ নির্দেশিকা। তা নিয়ে আবার পরে কথা বলা যাবে।

আপনার মতামত জানান