ইতিহাস

কমলা ভট্টাচার্য

কমলা ভট্টাচার্য (Kamala Bhattacharya) ভারত তথা বিশ্বের প্রথম এবং ভারতের একমাত্র মহিলা ভাষা শহীদ যিনি মাত্র ষোলো বছর বয়সে ১৯৬১ সালের বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন।

১৯৪৫ সালে অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন শ্রীহট্ট তথা বর্তমান সিলেট জেলায় কমলা ভট্টাচার্যের জন্ম হয়। তাঁর বাবা রামরমণ ভট্টাচার্য এবং মা সুপ্রবাসিনী দেবী। সাত ভাই-বোনের মধ্যে কমলা ছিলেন বাবা-মায়ের পঞ্চম সন্তান। তাঁরা চার বোন ও তিন ভাই ছিলেন। শৈশবেই কমলা পিতৃহারা হয়েছিলেন।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তাঁর পরিবার ভারতে না গিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সিলেটে থেকে যায়। কিন্তু ১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও হিংসা শুরু হলে তাঁর পরিবার সিলেট ছেড়ে ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকার তৎকালীন অবিভক্ত কাছাড় জেলার শিলচরে একটি পাবলিক স্কুল রোডে একটি ভাড়ার বাড়িতে বসবাস করতে শুরু করে। কমলার বড়দিদি বেণু ভট্টাচার্য নার্সিং ট্রেনিং নিতে শিমূলগুড়ি চলে যান এবং মেজ দিদি প্রতিভা ভট্টাচার্য অনেক সংগ্রাম করে একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। মেজদিদি প্রতিভার সামান্য আয়ের উপর তাঁদের পুরো পরিবারকে নির্ভর করতে হত। ।

কমলার শিক্ষাজীবন শুরু হয় শিলচরের ছোটেলাল শেঠ ইন্সটিটিউট থেকে। কমলার মায়ের পক্ষে তাঁর সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কেনার সামর্থ্য ছিল না। সেজন্য মেধাবী কমলাকে সহপাঠীদের কাছ থেকে পাঠ্যপুস্তক ধার নিয়ে লিখে লিখে নিয়ে পড়াশোনা চালাতে হত। কমলা অবশ্য কখনোই হাল ছাড়েননি, এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ ছিলেন তিনি। ১৯৬১সালে কমলা ভট্টাচার্য (ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বসেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল পরীক্ষার পর ফলাফল প্রকাশ পাওয়ার আগের সময়টুকুতে টাইপরাইটিং শিখে নেবেন। তারপর স্নাতক সম্পন্ন করে নিজের এবং পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবেন। যথাসময়েই তাঁর ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়, সেখানে তিনি ভালোভাবেই পাশ করেন। কিন্তু তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনের মতোই অসম্পূর্ণ থেকে যায় তাঁর স্বপ্নও।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে ভারতের আসাম রাজ্যে বসবাসকারী স্থানীয় অসমীয়া জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পূর্ব বাংলা থেকে অভিবাসিত বাঙালিদের মধ্যে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তৈরি হতে থাকে। ধীরে ধীরে আসামের রাজনীতি, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঙালিরা প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতে শুরু করলে এই দ্বন্দ্ব সংঘাতে রূপ নেয়। এমনকি বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ও বিশেষ উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে “বাঙা খেদা” প্রচারাভিযান চালানো হয় এবং বাঙালিদের উপর আক্রমণের ঘটনাও ঘটতে থাকে। সেই সময় প্রায় ৫০ হাজার বাঙালি অসম ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। আরও ৯০ হাজার মানুষ, যারা রাজ্য ছাড়তে চাননি তাঁরা বরাক উপত্যকায় গিয়ে পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেন। এমন একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর আসামের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চলিহা অসমীয়া ভাষাকে আসামের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে উত্তর করিমগঞ্জ থেকে নির্বাচিত বিধায়ক রণেন্দ্রমোহন দাস তীব্র আপত্তি তুলে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। কিন্তু অসমীয়া জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অসমীয়া ভাষাকে সরকারি ভাষা করা হয় এবং অন্তবর্তী সময় পর্যন্ত ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের বিধান রেখে সেই বছরের ২৪ অক্টোবর প্রস্তাবটি “Assam (Official) Language Act, 1960” নামে আইন হিসেবে আসামের বিধানসভায় পাস করানো হয়।

বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে আসামের বরাক উপত্যকার বাঙালি অধ্যুষিত হাইলাকান্দি, শিলচর ও করিমগঞ্জ এলাকায় একের পর এক আন্দোলন সংগঠিত হতে শুরু করে। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শিলচরে গঠিত হল ‘কাছার গণ সংগ্রাম পরিষদ’। নীলকান্ত দাস, রথীন্দ্রনাথ সেন, বিভুতিভূষণ চৌধুরীর নেতৃত্বে শিলচর, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জের মতো এলাকায় শুরু হল বাংলাভাষার সরকারি স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন। সেই বছরই ১৪ এপ্রিল পালন করা হল সংকল্প দিবস হিসেবে। ২৪ এপ্রিল থেকে এই দাবিতে বরাক উপত্যকার সর্বত্র শুরু হল ১৫ দিন ব্যাপী পদযাত্রা। উদ্দেশ্য ছিল ওই এলাকার মানুষকে সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একত্রিত করা। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা রথীন্দ্রনাথ সেন ঘোষণা করেন ১৩ই মে’র মধ্যে বাংলা ভাষাকে অসমের সরকারি ভাষার স্বীকৃতি না দেওয়া হলে ১৯ মে হরতাল পালন করা হবে বরাক উপত্যকায়। কিন্তু আন্দোলনকারীদের কোনও হুমকি, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ কিছুই কাজে এলনা। ১৮ই মে পর্যন্ত বাংলাকে অসমের সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হল না। অতএব, ১৯ মে সকাল থেকে পূর্ব-পরিকল্পনা অনুসারে শুরু হল হরতাল। শিলচর রেল স্টেশন, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ সহ একাধিক এলাকায় সকাল থেকেই হরতালের সমর্থনে শুরু হয় পিকেটিং। তাঁদের আন্দোলনের জেরে বন্ধ হয় যায় রেল চলাচল। এদিকে, অশান্তির আঁচ করে আগে থেকেই অসম সরকারের পক্ষ থেকে বরাক উপত্যকাজুড়ে মোতায়েন করা হয় আধাসেনা। হরতালকে বানচাল করতে ও আন্দোলনকে প্রতিহত করতে জায়গায় জায়গায় গ্রেফতার করা হয় আন্দোলনকারীদের। তবুও চলে বিক্ষোভ। পূর্বঘোষিত আন্দোলনের কর্মসূচি অনুযায়ী তত্‍কালীন কাছাড় জেলাব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল শুরু হয়। বিখ্যাত চন্দ পরিবারের বধূ বিদূষী জ্যোত্‍স্না চন্দের ডাকে সাড়া দিয়ে ছোটো বোন মঙ্গলা,ভাই বকুল আর বড়দির ছেলে বাপ্পাসহ আরো কুড়ি-বাইশ জন মেয়ের সঙ্গে শিলচর রেলস্টেশনে পিকেটিং-এর জন্য বেরিয়ে পড়েন কমলা৷ মায়ের মনকে শান্ত করতে কাঁদানে গ্যাস থেকে বাঁচতে নিয়ে গেছিলেন এক টুকরো কাপড়। “জান দেবো, তবু জবান দেবো না” এবং “মাতৃভাষা জিন্দাবাদ, বাংলা ভাষা জিন্দাবাদ” স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল পুরো শিলচর রেলওয়ে স্টেশন চত্বর। দুপুরে কমলার মা দুই মেয়ের খোঁজে রেলস্টেশনে গেলে কমলা মায়ের ধুলোমাখা পা জল দিয়ে ধুয়ে দেন এবং শরবত খেতে চান৷ কিন্তু মা শরবত দিতে পারেননি। কেবল কমলার পরামর্শ মতো বকুল আর বড়দির ছেলে বাপ্পাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। তারপরেই শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ৷ লাঠির ঘা আর বন্দুকের কুঁদোর আঘাতে আহত ছোটো বোন মঙ্গলাকে বাঁচাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হলেন কমলা৷ পুলিশের গুলি কমলার একটি চোখ ভেদ করে ঢুকে মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়। হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কমলা সহ ১৫জন আন্দোলনকরীর মধ্যে ১১জনের মৃত্যু হয়। মঙ্গলা দীর্ঘ একমাস সংজ্ঞাহীন ছিলেন৷ পরে জ্ঞান ফিরলেও তিনি বাকি জীবনের জন্য মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে বেঁচে থাকেন। আজ বাঙালি তাঁদের মনে রাখেনি ঠিকই, কিন্তু সেদিনের শহীদদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। সরকার বাংলাকে অসমের সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

শিলচরে সেই ভাষা শহীদদের স্মরণে তৈরি করা হয়েছে একটি শহীদ বেদী। সেই রেলস্টেশনের নামকরণ করা হয়েছে ‘ভাষা শহীদ স্টেশন’। বিশ্বের প্রথম মহিলা ভাষা শহীদ কমলা ভট্টাচার্যের স্মরণে শিলচর পাবলিক স্কুল রোডের নাম ‘কমলা ভট্টাচার্য রোড’ হয়েছে। এছাড়াও ২০১১ সালে আসামে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সু্বর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠান ছোটেলাল শেঠ ইন্সটিটিউটে তাঁর একটি আবক্ষ ব্রোঞ্জনির্মিত ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন