সববাংলায়

মার্ক টোয়েন

ইংরেজি সাহিত্যে শিশু-কিশোরদের উপযোগী সাহিত্য রচনার জন্য বিখ্যাত মার্কিন লেখক মার্ক টোয়েন (Mark Twain)। তাঁর লেখা ‘অ্যাডভেঞ্চারস অফ হাকল্‌বেরি ফিন’ এবং ‘অ্যাডভেঞ্চারস অফ টম সয়্যার’ নামে দুটি উপন্যাসই তাঁকে আবিশ্ব পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। বিশ্ব সাহিত্যে আজও মার্ক টোয়েনের লেখা এই দুটি উপন্যাসকে ধ্রুপদী সাহিত্যের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ‘ইনোসেন্টস অ্যাব্রড’, ‘লাইফ অন দ্য মিসিসিপি’ ইত্যাদি তাঁর লেখা বিখ্যাত সব ভ্রমণ কাহিনী। কখনো সাংবাদিকতা, কখনো বক্তৃতাদান, কিংবা কখনো আবার খনিজীবী হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। আজীবন ছদ্মনামেই পরিচিত মার্ক টোয়েন আমেরিকার অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিদের একজন, অত্যাশ্চর্যভাবে যার নিজের মৃত্যু সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী মিলে গিয়েছিল।

১৮৩৫ সালের ৩০ নভেম্বর ফ্লোরিডার মিসৌরি নামের এক ছোট্ট গ্রামে মার্ক টোয়েনের জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম স্যামুয়েল ল্যাংহর্ন ক্লেমেন্স। মার্ক টোয়েন হল তাঁর ছদ্মনাম, যদিও এই নামেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত। তাঁর বাবা জন মার্শাল ক্লেমেন্স এবং মা জেন ক্লেমেন্সের ষষ্ঠ সন্তান ছিলেন তিনি। তাঁর অন্যান্য ভাই-বোনেদের মধ্যে দুই ভাই ওরিয়ন ও হেনরি এবং এক বোন পামেলাই বেঁচে ছিলেন। বাকি ভাই-বোনেরা খুব অল্প বয়সেই মারা যায়। তাঁর চার বছর বয়সে তাঁর পরিবার হ্যানিব্যাল নামের একটি ছোট্ট নদীবেষ্টিত শহরে গিয়ে ওঠে। মার্ক টোয়েনের বাবা জন ক্লেমেন্স অর্থ উপার্জনের জন্য কখনো গুদাম-রক্ষক, কখনো আইনজীবী, কখনো আবার জমি পরিদর্শকের কাজ করেছেন, কিন্তু কিছুতেই আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করতে পারেননি তিনি। মাঝেমাঝে তাঁর পক্ষে পরিবারের মুখে দুটি অন্ন তুলে দেওয়াও কষ্টকর হয়ে পড়ত। অনেকে বলেন, কিশোর মার্ক কখনোই তাঁর বাবাকে হাসতে দেখেননি। হয়তো জীবনের এই যন্ত্রণা, অভাব সবকিছুই তাঁর জীবন থেকে হাসিটুকু কেড়ে নিয়েছিল। অন্যদিকে মার্কের মা ছিলেন আনন্দপ্রিয়, উচ্ছল, হাসিখুশি। মাঝে মাঝে কোন শীতের রাতে তিনি পরিবারের সকলকে গল্প শুনিয়েই রাত পার করে দিতেন। ১৮৪৭ সালে মার্কের মাত্র এগারো বছর বয়সে তাঁর বাবা জন ক্লেমেন্স নিউমোনিয়া রোগে মারা যান। ফলে মার্ক ও তাঁর পরিবার যারপরনাই সমস্যায় পড়েন। পরবর্তীকালে ১৮৭০ সালে অলিভিয়া ল্যাংডনকে বিবাহ করেন মার্ক টোয়েন।

বাবার মৃত্যুতে বাধ্য হয়েই অন্নসংস্থানের জন্য ‘হ্যানিব্যাল কুরিয়ার’ নামের একটি পত্রিকার প্রকাশকের অধীনে শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন মার্ক টোয়েন। এই সময় কাজে যোগ দেওয়ার জন্য প্রাথমিক স্কুলে মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েই স্কুল ছেড়ে দিতে হয় তাঁকে। ১৮৫১ সালে একজন মুদ্রক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন মার্ক এবং ‘হ্যানিব্যাল ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন’ পত্রিকায় বহু ছবি আঁকতে শুরু করেন। এই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন মার্কেরই ভাই ওরিয়ন। ১৮ বছর বয়সে হ্যানিব্যাল শহর ত্যাগ করে নিউ ইয়র্ক সিটি, ফিলাডেলফিয়া, সেন্ট লুইস প্রমুখ স্থানে ঘুরে ঘুরে প্রকাশকের কাজ করেন মার্ক। ১৮৫৭ সালে মিসিসিপি নদীতে বাষ্পচালিত নৌকা চালানো শিখতে শুরু করেন তিনি। এইভাবে নৌকা চালিয়ে সমুদ্রে পাড়ি দেওয়া তাঁর কাছে বহুদিনের এক অধরা স্বপ্ন ছিল। বহু আগে হ্যানিব্যালে থাকার সময় মিসিসিপি নদীতে বয়ে চলা বাষ্পচালিত নৌকাগুলি তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করত। ১৮৫৯ সালে একজন লাইসেন্স সম্বলিত বাষ্পচালিত নৌকাচালক হিসেবে আনন্দের সঙ্গে তিনি কাজ করতে থাকেন। ১৮৬১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তাঁর নৌচালনায় ছেদ পড়ে। এরপরে ঐ বছরই কনফেডারেট সেনাবাহিনীতে যোগ দেন মার্ক। কিন্তু খুব বেশিদিন তিনি সেনাবাহিনীতে কাজ করেননি। বলা হয় তাঁর এই ছদ্মনাম মার্ক টোয়েনের উৎস ছিল এই নৌ-চালনা। জাহাজের পরিভাষায় ‘মার্ক টোয়েন’ কথার অর্থ হল ‘১২ ফুট গভীর জল’।

১৮৬১ সালের জুলাই মাসে ভাই ওরিয়নকে সঙ্গে নিয়ে পশ্চিমের দিকে পাড়ি দেন মার্ক টোয়েন। ভার্জিনিয়া সিটি এবং নেভাদা শহরের সোনা ও রূপোর খনি দেখে সেখানে খনি শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছিলেন মার্ক। কিন্তু এই কাজেও ব্যর্থ হন তিনি এবং অবশেষে সেপ্টেম্বর মাসে ভার্জিনিয়া সিটির ‘দ্য টেরিটোরিয়াল এন্টারপ্রাইজ’ সংবাদপত্রে কাজ নেন। এই পত্রিকাতেই প্রথম একটি রম্য রচনায় এই মার্ক টোয়েন ছদ্মনামটি ব্যবহার করেন তিনি। সংবাদকে হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করতে শুরু করেন মার্ক এবং একইসঙ্গে ব্যঙ্গচিত্র আঁকাতেও পটু হয়ে ওঠেন তিনি। সংবাদ লেখার পাশাপাশি ছোটোগল্প লেখাতেও মনোনিবেশ করেন মার্ক। খনিতে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে নিয়ে প্রথম মার্ক টোয়েন লিখে ফেলেন একটি হাস্যরসাত্মক গল্প ‘জিম স্মাইলি অ্যাণ্ড হিজ জাম্পিং ফ্রগ’। এরপরে ক্রমশ তাঁর গল্প, ভ্রমণ কাহিনী এবং পরবর্তীকালে উপন্যাস প্রকাশ পেতে শুরু করে। ক্যালিফোর্নিয়া ভ্রমণের সময় লোকমুখে শোনা একটি অবাস্তব কাহিনিকে একটি গল্পে রূপ দিয়ে মার্ক টোয়েন লিখে ফেলেন ‘দ্য সেলিব্রেটেড জাম্পিং ফ্রগস অফ ক্যালাভারাস কান্ট্রি’ নামে যা ১৮৬৫ সালে নিউ ইয়র্ক স্যাটারডে প্রেসে প্রকাশ পায়। এই ছোটোগল্পটি জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছিল।

সাহিত্য জীবনের একেবারে প্রাথমিক পর্বে ১৮৬৭ সালে তিনি লেখেন ‘ইনোসেন্টস অ্যাব্রড’ যেখানে পর্যটক হিসেবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে প্যালেস্টাইন যাত্রার রোমাঞ্চকর কল্পিত কাহিনী বর্ণনা করেন মার্ক। তাঁর শৈশবের প্রবল ইচ্ছা ছিল নাবিক হয়ে সমুদ্রযাত্রা করার আর সেই অপূর্ণ ইচ্ছেরই প্রতিফলন ঘটে এই রচনায়। প্রথম প্রকাশের পরেই ৭০ হাজার কপি বিক্রি হয় এই বই যা তাঁকে খুব অল্প সময়ে জনপ্রিয় করে তোলে। পরবর্তীকালে মার্ক টোয়েন নিজেই মজার ছলে এই বইটির নতুন নাম দেন ‘দ্য নিউ পিলগ্রিমস প্রোগ্রেস’। ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর অন্যতম বিখ্যাত উপন্যাস ‘অ্যাডভেঞ্চারস অফ টম সয়্যার’। ১৮৮৪ সালে ‘অ্যাডভেঞ্চারস অফ টম সয়্যার’ বইটির ধারাক্রমেই লেখা ‘অ্যাডভেঞ্চারস অফ হাকলবেরি ফিন’ প্রকাশিত হয়। এই বইটির জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছেন মার্ক টোয়েন। অনেকে বলেন ‘অ্যাডভেঞ্চারস অফ টম সয়্যার’ বইটি লেখার পরে দ্বিতীয় ধারাক্রমটি ৪০০ পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপি তৈরি করার পরেও মার্ক টোয়েনের নিজের পছন্দ হয়নি। পরে তা নিজের কাছে বেশ কিছুদিন রেখে দেওয়ার পরে ১৮৮৪ সালে তা প্রকাশ পায়। আর এই উপন্যাস লেখার সময়েই বিরতিতে ইংল্যাণ্ডের রাজাদের বিষয়ে শিশু-কিশোরদের জানানোর জন্য একটি বুদ্ধির বোর্ড গেম তৈরি করেছিলেন তিনি। পরে সেই খেলার পেটেন্টেও নিজের নামে করে নিয়েছিলেন মার্ক। এছাড়াও স্ক্রাপবুক এবং মোজা আটকানোর বিশেষ একধরনের ফিতেও তৈরি করেছিলেন তিনি। লেখক ও সাংবাদিক সত্ত্বার পাশাপাশি তাঁর উদ্ভাবনী সত্ত্বাও ছিল প্রখর। হাকলবেরি ফিন উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পরে খুব শীঘ্রই আমেরিকার একজন অন্যতম ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন মার্ক টোয়েন। তিনি নিজের একটি প্রকাশনা সংস্থা খোলেন ১৮৮৫ সালে। এই প্রকাশনা সংস্থা থেকে আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস. এস. গ্রান্টের স্মৃতিকথা বই আকারে প্রকাশ করলে বহুল অর্থ উপার্জন করেন মার্ক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই প্রকাশনা সংস্থা কয়েক বছরের মধ্যে দেউলিয়া হয়ে যায়। কল্পবিজ্ঞানের জগতেও তাঁর বেশ আগ্রহ ছিল। বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলার সঙ্গে তাঁর আলাপ ও সখ্যতার কারণে এই বিষয়ে আকৃষ্ট হন মার্ক। ১৮৮৯ সালে মার্ক টোয়েনের লেখা প্রথম কল্পবিজ্ঞানের গল্প প্রকাশিত হয় ‘এ কানেক্টিকাট ইয়াংকি ইন কিং আর্থারস কোর্ট’ নামে। শুধু কল্পবিজ্ঞান কাহিনী লেখাই নয়, বিভিন্ন রকম বৈজ্ঞানিক যন্ত্রাদি নির্মাণেও অর্থব্যয় করতেন মার্ক। সেই সময় আমেরিকায় প্রায় লাখ দুয়েক মার্কিন ডলার খরচ করে মার্ক টোয়েন একটি স্বয়ংক্রিয় টাইপসেটিং যন্ত্র নির্মাণ করেন। এই সরকম খেয়ালিপনার কারণে বহু ক্ষতি হয় তাঁর, মানসিক চাপ বাড়ে। লেখায় মন দিতে পারেন না তিনি।

মার্ক টোয়েনের লেখা অন্যান্য বিখ্যাত বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – লাইফ অন দ্য মিসিসিপি (১৮৮৩), ‘দ্য ট্র্যাজেডি অফ পুডলনহেড উইলসন’ (১৮৯৪), ‘দ্য ক্রনিকল অফ ইয়ং স্যাটার্ন’ ইত্যাদি। শেষ বইটি তাঁর একটি অসমাপ্ত রচনা।

তাঁর বিড়াল পোষার অদ্ভুত শখের কথা বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত। শোনা যায় তাঁর বাড়িতে ১৯টি বিড়াল ছিল যার প্রতিটির আলাদা আলাদা নাম দিয়েছিলেন মার্ক নিজেই। ১৯০৯ সালে তাঁর বন্ধু থমাস এডিসন মার্ক টোয়েনের একটি গতিচিত্র রেকর্ড করেছিলেন যা মার্ক টোয়েনের একমাত্র গতিচিত্র ছিল। নিজের মৃত্যু সম্পর্কেও তিনি নাকি ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে তাঁর জন্মের সময় যেমন আকাশে দেখা গিয়েছিল হ্যালির ধূমকেতু, ঠিক তেমনি আবার হ্যালির ধূমকেতু দেখা দিলেই তাঁর মৃত্যু ঘটবে। অদ্ভুতভাবে এই ভবিষ্যৎবাণী মিলে গিয়েছিল।

১৯১০ সালের ২১ এপ্রিল মার্ক টোয়েনের মৃত্যু হয়। কাকতালীয়ভাবে ৭৫ বছর পর এই দিনেই আকাশে দেখা গিয়েছিল হ্যালির ধূমকেতু।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading