শিল্প-সাহিত্য

ঋত্বিক ঘটক

ঋত্বিক ঘটক (Ritwik Ghatak) একজন প্রবাদপ্রতিম ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক। চলচ্চিত্র জগতে পরিচালক, সহকারী পরিচালক ছাড়াও চিত্রনাট্যকার ও অভিনেতা রূপেও কাজ করেছেন তিনি। দেশবিভাজন ট্রিলজি নামে পরিচিত ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’ এবং ‘সুবর্ণরেখা’ এই তিনটি ছবি চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তাঁর সেরা কাজ রূপে বিবেচনা করা হয়। সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেনের সমসাময়িক এবং সমান্তরাল চলচ্চিত্র নির্দেশক হয়েও তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র। ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্র বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন, ৫০টির কাছাকাছি প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লিখেছেন। অপরদিকে নাট্য জগতেও নির্দেশক ,নাট্যকার এবং অভিনেতা সব রূপে সমান স্বাচ্ছন্দ্যে বিরাজ করেছেন তিনি। শিল্পের নানা মাধ্যমে বারবার ফিরে এসেছে সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশা, চাওয়া পাওয়া, তৎকালীন সমাজে নারীদের অবস্থা, দেশভাগের নির্মমতার খণ্ডচিত্র, প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বামপন্থী প্রতিবাদী ভাবাবেগ। শিল্পের নানা ক্ষেত্রে সাবলীলভাবে বিচরণকারী এই মানুষটিকে তাই ১৯৭০ সালে ভারত সরকার শিল্পকলা বিভাগে পদ্মশ্রী সম্মান প্রদান করে। 

৪ নভেম্বর ১৯২৫ সালে অবিভক্ত বাংলার ঢাকাতে জন্ম হয় ঋত্বিক ঘটকের। তিনি ও তাঁর যমজ বোন প্রতীতিদেবী ছিলেন বাবা সুরেশচন্দ্র ঘটক ও মা ইন্দুবালা দেবীর নয় সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। সংস্কৃতের কৃতী ছাত্র সুরেশচন্দ্র পেশাগত জীবনে উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মচারী (ম্যাজিস্ট্রেট) ছিলেন । ঋত্বিকের বড় দাদা মণীশ ঘটক ছিলেন ইংরেজির অধ্যাপক, কল্লোলযুগের সুপরিচিত ঔপন্যাসিক ও কবি ও তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম মুখ, যাঁর কন্যা মহাশ্বেতা দেবী বাংলা সাহিত্যের রত্ন। আবার তাঁর আরেক দাদা আশিষচন্দ্র ঘটকের নাতি পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় এখনকার সময়ের স্বনামধন্য অভিনেতা, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার। সক্রিয় বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী সাধনা রায়চৌধুরীর ভাগ্নী সুরমা দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ঋত্বিক ঘটক। তাঁদের তিন সন্তান ঋতবান, সংহিতা ও শুচিস্মিতা ঘটক। চিত্রপরিচালক ঋতবান ‘ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্টে’র সঙ্গে যুক্ত এবং ঋত্বিকের অসমাপ্ত তথ্যচিত্র ‘রামকিংকর’ সম্পূর্ণ করেছেন ও ‘অসমাপ্ত ঋত্বিক’ নামক একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন । পাশাপাশি বাবার প্রথম দিকের কাজ ‘বগলার বঙ্গদর্শন’, ‘রঙের গোলাম’এর মত ছবি পুনরূদ্ধার করেছেন। তাঁর বড় মেয়ে সংহিতাও তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন।

ঋত্বিক ঘটকের প্রাথমিক পড়াশোনার সূচনা হয় ময়মনসিংহের মিশন স্কুলে। এরপর দাদা মণীশ ঘটক তাঁকে কলকাতার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি করে দেন। এই সময়েই ঋত্বিকের নাটকে হাতেখড়ি। ঋত্বিকের প্রথম দিকের নাট্য অভিনয় ‘চন্দ্রগুপ্ত।’(১৯৩৬)। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের এই নাটকে ঋত্বিক চাণক্যের ভূমিকায় অভিনয় করতেন রিচি-রোড, ম্যাডক্স স্কোয়ারে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হলে, রাজশাহী ফিরেও নাটক থেকে সরে যাননি। এরপর ১৯৪২ সালে ঋত্বিক ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাশ করেন। বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ১৯৪৮ সালে বি.এ. পাশ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তি হন। তবে লেখালেখি ও নাট্য চর্চার নেশায় এম.এ.এর পাঠ অসমাপ্তই থেকে যায় তাঁর।

কলকাতায় এসে স্কুলে পড়াশোনার সময় থেকেই প্রেমের কবিতার মধ্যে দিয়ে লেখালেখির সূচনা হয় তাঁর। ১৯৪৭-এ ‘গল্পভারতী’তে তাঁর লেখা প্রথম গল্প ছাপা হয়। এরপর ‘দেশ’ ‘অগ্রণী’ ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর গল্প। ১৯৪৭ সালেই নিজস্ব কাগজ ‘অভিধারা’ প্রকাশ করা শুরু করেন ঋত্বিক। চোখ,কমরেড, গাছ, আকাশগঙ্গা ইত্যাদি তাঁর লেখা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গল্প। বাংলা বিভাজন দুই বাংলার বিক্ষুব্ধ সময়ের চিত্র,প্রেম, সামাজিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল তাঁর লেখার মূল বিষয়। তাঁর কম বয়সের কাঁচা হাতের লেখা পড়ে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় তাঁকে একজন ‘শক্তিমান নবীন লেখক ‘বলে আখ্যা দিয়েছেন।

 গল্প লিখতে লিখতে একসময় তাঁর মনে হয় ‘‘গল্পটা inadequate।’’ফলত নাটকের জগতে তাঁর প্রবেশ। প্রথমে রবীন্দ্রনাথের নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে শুরু করেন নাট্যজীবন। এরপর ধীরে ধীরে গণনাট্যের সঙ্গে পরিচয় হয়। ১৯৪৮ সালে ‘বহুরূপী’ ‘নবান্ন’ নাটকের শো করে। শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায় তাতেও অভিনয় করলেন ঋত্বিক। এইসময়ে লিখলেন প্রথম নাটক ‘কালো সায়র’। ‘নবান্ন’ নাটকে সাফল্যের পরে ১৯৪৯-এ গণনাট্যের নতুন নাটক ‘ঢেউ’তে বৃদ্ধ কৃষকের ভূমিকায় নিজেই অভিনয় করলেন। ১৯৫১ সালে যুক্ত হন ভারতীয় গণনাট্য মঞ্চের (Indian People’s Theatre Academy-IPTA) সঙ্গে । ১৯৫২ সালে নিজের লেখা ‘দলিল’ নাটকটি নিয়ে তিনি ১৯৫৩ সালে পাড়ি দেন বোম্বেতে–গণনাট্যের কনফারেন্সে । নাটকটির পরিচালক ও প্রধান অভিনেতা ছিলেন ঋত্বিক নিজেই। এই নাটকটি ঐ প্রর্দশনীতে প্রথম হয়। এছাড়া ১৯৫৫-তে তাঁর লেখা ও নির্দেশনাতে ‘সাঁকো’ খুবই প্রশংসা পায়। অভিনেতা ঋত্বিকের পরের নাটক বিজন ভট্টাচার্যের নির্দেশনায় দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ। ‘জাগরণ’-এর জিন্না থেকে ‘বিসর্জন’-এর রঘুপতি, ‘ঢেউ’-এর বৃদ্ধ কৃষক, ‘নীলদর্পণ’-এ তাঁর অভিনয়, তাঁর নির্দেশনা মাতিয়ে তুলেছিল আপামর নাটকপ্রেমী বাঙালিকে।

নাটক করতে করতেই তাঁর মনে হয়, কয়েক হাজার নয়, লক্ষ মানুষের কাছে যেতে হবে। তখন সহ-পরিচালকরূপে নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল'(১৯৫০) এর মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ। এরপর ‘বেদেনী'(১৯৫১) চিত্রনাট্যকার রূপে ‘মধুমতী’ ইত্যাদি নানা ছবি করেছেন।

নির্দেশক ঋত্বিকের আটটি পূর্ণ দৈর্ঘ্য ছবি ছিল-নাগরিক (১৯৫২) ,অযান্ত্রিক (১৯৫৮),বাড়ী থেকে পালিয়ে (১৯৫৮),মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০),কোমল গান্ধার (১৯৬১), সুবর্ণরেখা (১৯৬২) তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩) এবং যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৪)। এর মধ্যে সুবর্ণরেখা ১৯৬৫ সালে আর নাগরিক ১৯৭৭ সালে মুক্তি পায়। সাধারণ মানুষ, তাঁদের জীবনের দৈনিক সংগ্রাম, দেশভাগের যন্ত্রণা বারবার ফিরে আসে তাঁর ছবিতে। ছবিকে তিনি শিল্প নয় বরং সমাজের, নিজের ভাবনা, প্রতিবাদ, আবেগ,দাবী প্রকাশ করার মাধ্যম রূপে বিবেচনা করতেন। এছাড়া ইন্দিরা গান্ধী, পুরুলিয়ার ছৌ, ভয়, বিহার, আমার লেনিন ইত্যাদি বিবিধ বিষয় নিয়ে তিনি স্বল্পদৈর্ঘ্যের  তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেন।

১৯৬৬ সালে পুণের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ার সঙ্গে অধ্যাপক রূপে যুক্ত হন। সেখানে তাঁর সমসাময়িক উল্লেখযোগ্য ছাত্র ছিলেন মণি কৌল(Mani Kaul), সুভাষ ঘাই(Subhas Ghai ), কুমার সাহানি( Kumar Sahani ),বিধুবিনোদ চোপড়া (VidhuVinod Chopra) ,আদূর গোপালকৃষ্ণন (Adoor Gopalakrishnan) প্রমুখরা। কিন্তু সেখানকার শৃন্খলাবদ্ধ জীবনেও বেশী দিন টিকে থাকতে পারেনি তাঁর শিল্পী মন। কিন্তু চলচ্চিত্র বিষয়ক তাঁর প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলি আজও নানা চলচ্চিত্র বিষয়ক ছাত্র ও গবেষকের কাছে মূল্যবান নথি বলে গণ্য। 

১৯৬৯ সালে, জীবনের শেষবেলায়, গোবরা মানসিক হাসপাতালেই লিখে ফেলেন ‘সেই মেয়ে।’ নিজের নির্দেশনায় সে নাটক অভিনয় করালেন হাসপাতালের রোগী ও কর্মী-চিকিৎসকদের দিয়ে। জীবনে যখনই গল্প লিখতে লিখতে, ছবি করতে করতে অস্থির হয়েছেন নাটকই সেই খরার দিনে তাঁর বক্তব্য প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বার বার ভাঙা দেশ, জীবন আর কলোনির গল্প ফিরে এসেছে মঞ্চের সংলাপে। তাঁর বন্ধুরাই বলছেন, ‘হি ওয়াজ নেভার সিনসিয়ার টু দ্য থিয়েটার’, কিন্তু, শেষ পর্যন্ত গণনাট্য আন্দোলনের ইতিহাসে ঋত্বিক এক স্থায়ী স্থানের দাবিদার হয়ে রয়ে গেছেন। তাই শোভা সেন তাঁকে যথার্থই বলছেন, ‘নাট্য-আন্দোলনের হোতা বা পুরোহিত!’

চলচ্চিত্রের জন্য সত্যজিৎ রায়ের মতো জীবদ্দশায় বাণিজ্যিক বা আন্তর্জাতিক সাফল্যের মুখ সেভাবে দেখেননি ঋত্বিক ঘটক। ১৯৫৭ সালে ‘মুসাফির’ ছবি তৃতীয় সেরা কাহিনী চিত্র(feature film) হিসেবে জাতীয় পুরস্কার মঞ্চে সার্টিফিকেট অব মেরিট অ্যাওয়ার্ডে (Certificate of Merit Award) ভূষিত হয়। ১৯৫৮তে হিন্দি ছবি ‘মধুমতী’ ফিল্ম ফেয়ারের জন্য সেরা গল্পরূপে মনোনয়ন পায়। ১৯৭০ সালে ‘হীরের প্রজাপতি’ সেরা শিশু চলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কারে প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক লাভ করে। ১৯৭৪ -এ ‘যুক্তি,তক্কো আর গপ্পো’ ছবির গল্প জাতীয় পুরস্কার মঞ্চে রজত কমল পুরস্কার পায়। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’এর জন্য বাংলাদেশ সিনে জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন তাঁকে সেরা নির্দেশক পুরস্কারে ভূষিত করে। ২০০৭ সালে এই ছবি ‘ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে’র একটি সমালোচক দলের দ্বারা নির্মিত বাংলাদেশের সেরা দশটি চলচ্চিত্রের তালিকায় শীর্ষস্থান লাভ করে। ১৯৯৮সালে এশীয় পত্রিকা সিনেমায়ারের তৈরী সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রের তালিকাতে ‘সুবর্ণরেখা’ ১১তম স্থান পায়। আন্তর্জাতিক স্তরে এই সাফল্য দেখে তাই তাঁর স্ত্রীয়ের স্মৃতিচারণে আক্ষেপ হয়ে বারবার ফিরে এসেছিল শেষ জীবনে তাঁর বলে যাওয়া কটা কথা-“লক্ষ্মী , টাকাটা তো থাকবে না, কাজটাই থাকবে। তুমি দেখো আমার মৃত্যুর পর সবাই আমাকে বুঝতে পারবে।”

দীর্ঘদিন ব্যাপী হতাশা ও অত্যাধিক মদ্যপানের ফলে ১৯৭৬ সালে ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় ঋত্বিক ঘটকের মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন