ইতিহাস

মুন্সী প্রেমচাঁদ

হিন্দি ও ঊর্দু ভাষার একজন কালজয়ী সাহিত্যিক হলেন মুন্সী প্রেমচাঁদ (Munshi Premchand)। তাঁর প্রকৃত নাম ধনপত রায় শ্রীবাস্তব, তবে তিনি সাহিত্য জগতে মুন্সী প্রেমচাঁদ নামেই খ্যাত হয়ে আছেন৷ তিনি ‘উপন্যাস সম্রাট’ নামে সাহিত্যের ইতিহাসে খ্যাত হয়ে আছেন।

১৮৮০ সালের ৩১ জুলাই বেনারসের কাছে লামহী নামে একটি স্থানে মুন্সী প্রেমচাঁদের জন্ম হয়৷ মুন্সী প্রেমচাঁদের বাবা ছিলেন মুন্সী আজয়ীব রায় এবং মা ছিলেন আনন্দী দেবী৷ প্রেমচাঁদ ছিলেন তাঁর মা বাবার চতুর্থ সন্তান। তাঁর ডাক নাম ছিল নবাব৷ প্রথম দিকে নবাব রায় নামটিকে তিনি ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহার করতেন ৷ মাত্র আট বছর বয়সে তিনি তাঁর মা’কে হারানোর পর তিনি তাঁর দিদিমার কাছে মানুষ হয়েছিলেন৷ প্রেমচাঁদের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন কিন্তু সৎ মায়ের কাছ থেকে তিনি তেমন স্নেহ পাননি৷

মুন্সী প্রেমচাঁদের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় বেনারসের লামহীর কাছাকাছি অবস্থিত লালপুর মাদ্রাসা বিদ্যালয়ে৷ সেখানে তিনি উর্দু ও মাদ্রাসা ভাষা শিখেছিলেন৷ ছোটোবেলা থেকেই তিনি ভিন্ন স্বাদের বই পড়তে ভালোবাসতেন৷ তিনি মিশনারী স্কুলে ইংরাজি শিক্ষা নিয়েছিলেন৷  চাকরিসূত্রে তাঁর বাবা জামনিয়াতে ট্রান্সফার হয়ে গেলে তিনি ১৮৯৫ সালে বেনারসের কুইন কলেজে পড়াশোনা করেন ৷ ম্যট্রিকুলেসন পরীক্ষায় তাঁর ফল ভালো হয় নি, দ্বিতীয় বিভাগে তিনি পাশ করেন৷ এরপর তিনি সেন্ট্রাল হিন্দু কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন কিন্তু অঙ্কে অপরিমিত দক্ষতার জন্য তা সম্ভব হয় নি।  তিনি এরপর প্রথাগত পড়াশোনা থেকে অব্যাহতি নেন৷ তবে পরবর্তীকালে ১৯১৯ সালে প্রেমচাঁদ এলাহাবাদ থেকে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। 

প্রেমচাঁদের ব্যক্তিগত জীবন খুব একটা সুখকর ছিল না। মাত্র ১৫ বছর বয়সে প্রেমচাঁদের বিয়ে হয়েছিল। তাঁর স্ত্রী তাঁর থেকে বয়সে বড় ছিলেন এবং প্রেমচাঁদের বই প্রীতি নিয়ে অত্যন্ত বিরক্ত ছিলেন৷ 

মুন্সী প্রেমচাঁদের প্রাথমিক কর্মজীবন শুরু হয়েছিল শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। তাঁর সংগৃহীত বই বিক্রি করতে তিনি একটি বইয়ের দোকানে গিয়েছিলেন। সেখানে চুনারের একটি মিশনারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত হয় যিনি তাঁকে সেই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জন্য প্রস্তাব দেন মাসিক ১৮ টাকা বেতনের বিনিময়ে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছাড়াও এছাড়া তিনি একজন ছাত্রের গৃহ শিক্ষক হিসেবে মাসিক ৫ টাকার বিনিময়ে পড়াতেন। ১৯০০ সালে প্রেমচাঁদ বাহরাইচের সরকারী জেলা বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসাবে মাসিক ২০ টাকা বেতনে নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে তিনি কানপুরে বদলি হয়ে যান।

প্রেমচাঁদ কানপুরে শিক্ষকতা করাকালীন গ্রীষ্মের ছুটিতে তাঁর গ্রাম লামাহীতে যান৷ সেখানে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাঁর স্ত্রী এবং তাঁর সৎ-মায়ের মধ্যে ঝগড়ার কারণে তিনি ঘরোয়া অশান্তির মধ্যে জড়িয়ে পড়েন, যা তাঁর সাহিত্যচর্চায় বাধা সৃষ্টি করে। প্রেমচাঁদের স্ত্রী আত্মহত্যা করার ব্যর্থ চেষ্টা করলে ক্রুদ্ধ প্রেমচাঁদ তাঁকে তিরস্কার করেন। তাঁর স্ত্রী দুঃখে নিজের বাবার বাড়ি চলে গেলে প্রেমচাঁদ তাঁকে আর ফিরিয়ে আনতে যাননি৷ ১৯০৬ সালে প্রেমচাঁদ ফতেপুরের কাছে একটি গ্রামে বাড়িওয়ালার কন্যা শিবরানি দেবী নামে এক বাল্য বিধবাকে বিবাহ করেন। তাঁর এই পদক্ষেপ তাঁকে প্রবল সামাজিক বিরোধিতার মুখোমুখি ফেলেছিল। প্রেমচাঁদের মৃত্যুর পরে শিবরানী দেবী তাঁর ওপর ‘প্রেমচাঁদ ঘর মেইন’ নামে একটি বই লিখেছিলেন।

কোন একদিন এক তামাকের দোকানে তিনি ফার্সি ভাষার রূপকথা ‘তিলিজম-ই-হশরুবা’ (Tilism-e-Hoshruba) থেকে একটি গল্প শুনেছিলেন, যা তাঁর পড়ার আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল৷ তিনি একটি বইয়ের দোকানে কাজ নেন যাতে বিক্রির মাঝে অনেক বই পড়ার সুযোগ পান৷

তিনি প্রথমে ‘নবাব রায়’ ছদ্মনামে লিখতেন। তাঁর প্রথম সংক্ষিপ্ত পরিসরের উপন্যাসটি ছিল ‘আসরার ই মাবিদ’ ( Asrar e Ma’abid)। এই উপন্যাসে মন্দিরের পুরোহিতদের মধ্যে দুর্নীতি এবং দরিদ্র মহিলাদের ওপর যৌন নির্যাতনের কথা ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। উপন্যাসটি বেনারস-ভিত্তিক একটি উর্দু সাপ্তাহিক ‘আওয়াজ-ই-খাল্ক (Awaz-e-Khalk) ‘-এ ১৯০৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে ১৯০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর এই উপন্যাস সাহিত্য মহলে বেশ সমালোচিত হয়েছিল৷ 

১৯০৫ সালের মে থেকে ১৯০৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত তিনি কানপুরে প্রায় চার বছর ছিলেন। সেখানে তিনি উর্দু ম্যাগাজিন ‘ ‘জামানা’ র সম্পাদক মুন্সী দায়ের নারায়ণ নিগমের সঙ্গে সাক্ষাত করেন।  তিনি পরবর্তীকালে ‘জামানা’য় বেশ কয়েকটি নিবন্ধ এবং গল্প প্রকাশ করেছিলেন। ১৯০৫ সালে জাতীয়তাবাদী কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রেমচাঁদ ‘জামানা’য় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস নেতা গোপাল কৃষ্ণ গোখলেকে নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন।

প্রেমচাঁদের প্রথম প্রকাশিত গল্পটি ছিল ‘দুনিয়া কা সবসে আনমোল রতন’ যেটি ১৯০৭ সালে ‘জামানা’য় প্রকাশিত হয়েছিল৷ একই বছর ‘বেনারস মেডিকেল হল প্রেস’ থেকে প্রকাশিত হয় ‘কৃষ্ণা’ নামে আরেকটি ছোটো গল্প৷ তাঁর লেখা দ্বিতীয় উপন্যাস হল, ‘হুমখুর্মা ও হুমসবাব’ যেটি পরবর্তী কালে ১৯০৭ সালে ‘ প্রেমা’ নামে হিন্দীতে প্রকাশিত হয়৷ এরপর তাঁর লেখা ‘সেবাসদন’ উপন্যাসটি তাঁকে হিন্দী সাহিত্যে স্থায়ী আসন এনে দেয়।

১৯১৬ সালের আগস্ট মাসে তিনি পদোন্নতি পেয়ে গোরক্ষপুরে স্থানান্তরিত হন৷ গোরক্ষপুরের নর্মাল হাই স্কুলে তিনি সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন৷ ১৯১৯ সালে তাঁর চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল। প্রেমচাঁদের ‘সেবাসদন’ উপন্যাসটি হিন্দি ভাষায় প্রকাশিত এই বছরেই প্রকাশিত হয়েছিল। উপন্যাসটি মূলত ছিল উর্দুতে ‘বাজার-ই-হুসন’ ( Bazaar-e-Husn) নামে৷ কলকাতার এক প্রকাশকের দ্বারা বইটি হিন্দীতে প্রকাশিত হয়েছিল৷  উপন্যাসটিতে একজন অসুখী গৃহবধূর কাহিনী বলা হয়েছে। সর্বত্র এই উপন্যাস প্রশংসিত হয়েছিল।

১৯২১ সালের মধ্যে তিনি গোরক্ষপুরের একটি  বিদ্যালয়ের উপ-পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারিতে গোরক্ষপুরের একটি সভায় মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসাবে সবাইকে সরকারী চাকরি থেকে পদত্যাগ করতে বলেন। প্রথমে মুন্সী প্রেমচাঁদ দ্বিধাবোধ করলেও পরে তাঁর স্ত্রীর সম্মতিতে তিনি সরকারী চাকরি থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। ভাগ্যান্বেষণে প্রেমচাঁদ  ১৯৩৪ সালের ৩১ মে মুম্বাইতে ( তৎকালীন বোম্বাই) যান৷ সেখানে অজন্তা সিনেটোন নামক একটি প্রোডাকশন হাউসে চিত্রনাট্য লেখার কাজ পেয়েছিলেন বাৎসরিক ৮০০০ টাকা বেতনে ৷ তিনি ভেবেছিলেন নতুন এই কাজ তাঁর ভালো লাগবে৷ ‘মজদুর’ সিনেমার স্ক্রিপ্টও তিনি লিখেছিলেন৷ তবে বোম্বাই চলচ্চিত্রের শিল্প-সাহিত্যের বাণিজ্যিক পরিবেশের সঙ্গে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না৷ তিনি প্রোডাকশন হাউসের সঙ্গে এক বছরের চুক্তিতে আবদ্ধ থাকায় বেনারসে ফিরে আসতেও পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত এক বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল তিনি বোম্বাই ছেড়ে চলে আসেন৷

বেনারসে ফিরে এসে ১৯৩৩ সালে তিনি একটি মুদ্রণ প্রেস এবং প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন নাম দেন ‘সরস্বতী প্রেস’। প্রেমচাঁদ প্রথম হিন্দি লেখক যাঁর লেখায় চরম বাস্তবতার ছাপ দেখা যায়। তাঁর উপন্যাসগুলিতে মধ্যবিত্তদের সমস্যার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি প্রায় তিনশোটি গল্প এবং চোদ্দটির মতন উপন্যাস লিখেছিলেন।

১৯৩৬ সালে লখনৌতে প্রগতিশীল লেখক সমিতির প্রথম সভাপতি হিসেবে তিনি নিযুক্ত হন৷  তাঁর মৃত্যুর পর অনেক উপন্যাস ইংরাজি  এবং রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকীর্তিগুলি হল, ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ (১৯২৪),  ‘নির্মলা’ (১৯২৫), ‘গবন’ (১৯৩১) ‘কর্ম-ভূমি’ (১৯৩২), ‘ঈদগাহ’ (১৯৩৩), ‘গো-দান’ (১৯৩৬) ইত্যাদি৷

‘গো-দান’ ছিল তাঁর লেখা উপন্যাসগুলির মধ্যে শ্রেষ্ঠ। ‘নির্মলা’ উপন্যাসটি ভারতের যৌতুক প্রথার সাথে সম্পর্কিত একটি উপন্যাস। উপন্যাস হিসাবে প্রকাশিত হওয়ার আগে ১৯২৫ সালের নভেম্বর মাস থেকে ১৯২৬ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত ‘চাঁদ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক হিসেবে এটি প্রকাশিত হয়েছিল।

১৯৭৭ সালে সত্যজিৎ রায় প্রেমচাঁদের লেখা গল্প ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’ নিয়ে ওই নামেই একটি হিন্দি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন যা হিন্দিতে সেরা ফিচার ফিল্ম হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পেয়েছিল। ‘সেবাসদন ‘ উপন্যাস নিয়েও পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র তৈরী হয়েছে। 

১৯৩৬ সালের ৮ অক্টোবর মুন্সী প্রেমচাঁদের মৃত্যু হয়। 

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।