সববাংলায়

মির্জা গালিব

উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে মির্জা গালিব (Mirza Ghalib) এক চিরস্থায়ী নাম। বিশেষত তাঁর শায়েরি এবং ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের মাধ্যমে উর্দু ভাষায় আধুনিক গদ্যের বিকাশে তিনি এক অনন্য ভূমিকা পালন করেন।উর্দু ও ফারসি—উভয় ভাষাতেই তিনি অসামান্য কাব্যরূপময় রচনা রেখে গেছেন।

শায়েরির পাশাপাশি অজস্র গজল লিখে গিয়েছেন গালিব যেগুলি পরবর্তীকালে জগজিৎ সিং, মেহেদি হাসান, গুলাম আলী প্রমুখ সঙ্গীতশিল্পীদের কণ্ঠে সুরের জাদুতে শ্রেষ্ঠ গানের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। মোগল সাম্রাজ্যের পতন এবং ভারতে কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার যুগসন্ধিক্ষণের কবি তিনি। উর্দু ভাষায় রচিত তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে ‘দিওয়ান-এ-গালিব’, ‘খুতুত-এ-গালিব’, ‘কাত্‌আত-এ-গালিব’ এবং ফারসি ভাষায় ‘মেহর-এ-নিমরোজ’, ‘দুয়া-এ-সাহর’, ‘মুয়াসির-এ-গালিব’। এই রচনাগুলি ভারতীয় সাহিত্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।

সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের দরবারে তিনি কখনও তৈমুর বংশের ইতিহাস রচনার কাজে নিযুক্ত ছিলেন, আবার পরে বাদশাহের ওস্তাদ পদও অলঙ্কৃত করেন। সমগ্র জীবন জুড়ে তাঁর একমাত্র সঙ্গী ছিল দারিদ্র্য। এমনকি জুয়া খেলার অপরাধে তাঁকে কারাবন্দীও হতে হয়েছে। তবু তাঁর শায়েরি, তাঁর গজল সবই সিক্ত হয়েছে ভালোবাসা-প্রেম-মিলনের সুতীব্র আকুতিতে।

১৭৯৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর আগ্রার কালামহলে এক মোগল পরিবারে মির্জা গালিবের জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম মির্জা আসাদউল্লাহ বেগ খান। মির্জা গালিবের পিতামহ সেলজুক তুর্কী সৈনিক কুক্কান বেগ ভাগ্যান্বেষণের জন্য প্রথম ভারতে আসেন এবং লাহোরে সম্রাট শাহ আলমের দরবারে চাকরি করা শুরু করেন। কিছুদিন আগ্রাতেও ছিলেন তিনি এবং পরে সমরখন্দে স্থানান্তরিত হন। মির্জা গালিবের পিতা আবদুল্লা বেগ প্রথমে লক্ষ্ণৌয়ের নবাবের অধীনে এবং পরে হায়দ্রাবাদের নিজামের সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। পরে তিনি আলওয়ারের মহারাজা বক্তাওর সিং-এর সেনানায়ক হন। গালিবের মা ইজ্জৎ-উন্নিসা বেগম একজন কাশ্মীরি মহিলা ছিলেন। ১৮০৩ সালে এক বিদ্রোহ দমনের সময় তাঁর মৃত্যু হলে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পিতৃহীন হন গালিব। তখন থেকেই গালিব তাঁর কাকা মির্জা নাসরুল্লাহ্‌ বেগ খানের কাছেই মানুষ হয়েছেন। ১৮০৬ সালে হাতির পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে চূড়ান্তভাবে আহত হন নাসরুল্লা বেগ এবং তার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়। কাকার মৃত্যুর পরে নবাবের সৌজন্যে বড়লাটের কাছ থেকে বার্ষিক ৭৫০ টাকা ভাতা পেতেন গালিব। তখন থেকেই দারিদ্র্য গ্রাস করে গালিবের জীবন।

১৩ বছর বয়সে ১৮১০ সালে নবাব ইলাহী বক্সের কন্যা উমরাও বেগমকে বিবাহ করেন মির্জা গালিব। কিন্তু এই দাম্পত্য সম্পর্ক তাঁর জীবনে সুখের ছিল না। একটি চিঠিতে গালিব লিখেছিলেন যে, বিবাহ যেন দিল্লির কারাগারে পত্নী নামক একটি বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে গালিবের পায়ে। বিবাহের পরে গালিব তাঁর ভাই মির্জা ইউসুফকে নিয়ে দিল্লি চলে যান। ইউসুফ স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন এবং ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় মারা যান। গালিবের সাত সন্তানের সকলেই বাল্যকালে মারা যায়।

আগ্রার এক মাদ্রাসা পাঠাশালায় মহম্মদ মুয়াজ্জমের কাছে প্রাথমিক পড়াশোনা করেছিলেন মির্জা গালিব। মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতিতে তখন আরবি ও ফারসি ভাষার উপরেই বেশি জোর দেওয়া হত। গালিবও ফার্সি ও আরবি ভাষা শিখতে শুরু করেন। আবদুস সামাদ নামের জনৈক পণ্ডিতের থেকে আরবি ও ফার্সি ভাষা শেখেন তিনি। ১৮১০ থেকে ১৮১২ সাল পর্যন্ত আবদুস সামাদ গালিবের পরিবারের সঙ্গেই ছিলেন। ১৮৩৭ সালে শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহের ফারসি কবিতার সংকলন তৈরি করে দিয়েছিলেন মির্জা গালিব।

আগ্রায় যখন মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছিলেন তিনি, সেই সময় থেকেই শায়েরি লেখা শুরু হয় তাঁর। আবদুস সামাদের কাছ থেকে বিখ্যাত ফারসি কবি রুমি, আসির, জামিদ প্রমুখদের লেখাপত্রের সন্ধান পান এবং তাঁদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন তিনি। ইতিমধ্যে আরেক সুন্দরী নারীর প্রেমে পড়েন মির্জা। গালিবের চিঠিতে ডোমনি নামে এক নারীকে উদ্দেশ্য করে প্রেম নিবেদনের কাহিনি দেখা যায়। কিন্তু এই ডোমনি আসলে ছিলেন উচ্চবংশীয়া ডাকসাইটে সুন্দরী এক মহিলা। অনেকে মনে করেন তাঁর প্রেমিকা ছিলেন এক তাওয়ায়েফ অর্থাৎ নৃত্য-গীত পটিয়সী নারী। যদিও এ সম্পর্কে গালিব নিজেও কিছু স্পষ্ট করে লিখে যাননি।

সেই সময়ের বিখ্যাত কবি মীরের কাছে একবার গালিবের লেখা কিছু গজল নিয়ে পড়ে শুনিয়েছিলেন গালিবের এক অনুরাগী হুসামুদ্‌দৌল্লা। কবি মীর গালিবের লেখার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। নতুন আইনে গালিবের পরিবারকে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক দশ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়, কিন্তু পরে তা পরিবর্তন করে কমিয়ে পাঁচ হাজার টাকা ধার্য করা হয় সে কথা গালিব জানতেন না। তাই সরাসরি ব্রিটিশ বড়লাট লর্ড মেটক্যাফের সঙ্গে কথা বলবেন বলে ১৮২৬ সালে দিল্লি থেকে পায়ে হেঁটে, ডিঙি নৌকায় চড়ে, কখনো বা ঘোড়ায় চড়ে কলকাতায় এসে ওঠেন মির্জা গালিব। শিমলা বাজার এলাকার একটি বাড়িতে এসে বসবাস করতে শুরু করেন তিনি। নিজের এই কলকাতা সফরকে নিয়ে পরে গালিব লিখেছেন ‘সফর-এ-কলকাত্তাহ্‌’। দিল্লির বাদশাও তখন ইংরেজ সরকারের অনুগ্রহভোগী, ফলে গালিবের আবেদন খারিজ হল। ১৮২৯ সালে কলকাতা থেকে ফিরে গেলেন গালিব। কলকাতায় থাকাকালীন জনৈক ব্যক্তির সঙ্গে এক শের-পাঠের অনুষ্ঠানে উর্দু ভাষার সঙ্গে কেবল ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে কথা উঠলে রুষ্ট গালিব জানান যে উর্দু ভাষা সমগ্র ভারতের, কোন বিশেষ ধর্ম কখনই ভাষার উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। উর্দুর সৃষ্টি হয়েছে ভারতের সেনা ছাউনিতে, আক্ষরিকভাবে ‘উর্দু’ শব্দের অর্থ হল ছাউনি। এই সংবাদ সেদিন কলকাতার সারা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল।

১৮৪১ সালে মোট এগারোশোটি শায়েরী একত্র করে প্রথম ‘দিওয়ান’ প্রকাশ করেন তিনি। এই সময় দিল্লি কলেজে ফার্সি ভাষা শেখানোর জন্য অধ্যাপক পদে যোগ দেওয়ার অনুরোধ আসে গালিবের কাছে। ফার্সি ভাষার অধ্যাপক হিসেবে কলেজে যোগ দেন গালিব, কিন্তু সে চাকরিও বেশিদিন করেননি তিনি। প্রথমদিনই কেউ তাঁকে অভ্যর্থনা না জানানোয় তিনি কবির দম্ভ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাইরে। পরে কলেজের অধ্যক্ষ থম্পসন বাইরে এলে তাঁকে অভিযোগ জানান গালিব এবং থম্পসন তাঁকে কলেজের সামান্য এক চাকুরিজীবি বলায় চাকরিতে তৎক্ষণাৎ অব্যাহতি দেন গালিব। ১৮৫০ সালে বাহাদুর শাহের দরবারে তৈমুর বংশের ইতিহাস রচয়িতা হিসেবে মাসিক ছয়শো টাকা বেতনে কাজে নিযুক্ত হন মির্জা গালিব। পরে ১৮৫৪ সালে বাদশাহের ওস্তাদ পদে উন্নীত হন তিনি। সিপাহি বিদ্রোহের সময়কার ঘটনা নোট আকারে টুকে রাখতেন গালিব যা পরে একত্রে প্রকাশ পায় ‘দাস্তাম্বু’ নামে। এই বইটি সিপাহি বিদ্রোহের সমকালীন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কিছুদিন তাঁর ভাতা বন্ধ থাকার পরে ১৮৬০ সালে আবার চালু হয় এবং ১৮৬৩ সালে বাদশাহের দরবারে যোগ দেন গালিব। সিপাহি বিদ্রোহের পরে রামপুর রাজ্যের সভাকবি হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।

মোগল বাদশাহ বাহাদুর শাহের কাছ থেকে দাবির-উল-মুল্ক, নজ্‌ম-উদ্‌-দৌল্লা ইত্যাদি উপাধি পেয়েছিলেন মির্জা গালিব। ঈশ্বরচিন্তা, প্রেম, ভালোবাসার নিবিড় আকুতিতে ভরা গালিবের কাব্যভুবন। উর্দু ভাষায় লেখা তাঁর ‘গুল্‌-এ-রানা’, ‘দিওয়ান-এ-গালিব’, ‘খুতুত-এ-গালিব’, ‘কাদির নামা’ ইত্যাদি গ্রন্থ এবং ফারসিতে লেখা ‘মেহের-এ-নিমরোজ’, ‘দোয়ায়ে সবাহ্‌’, ‘মুয়াসির-এ-গালিব’ ইত্যাদি গ্রন্থগুলি ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

১৮৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পুরানো দিল্লির চাঁদনি চকে তাঁর বাড়িতে মির্জা গালিবের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর আজও তাঁর জীবন ও সাহিত্যকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে বহু চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ধারাবাহিক। ২০১৯ সালে মুম্বাইয়ের নাগপাড়া অঞ্চলে মির্জা গালিব রোডে তাঁর স্মরণে একটি ম্যুরাল চিত্রও নির্মিত হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading