ইতিহাস

জগজিৎ সিং

জগজিৎ সিং

আধুনিক কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভারতীয় গজল গায়ক হিসেবে জগজিৎ সিং (Jagjit Singh) সারা বিশ্বে সুবিদিত। একাধারে ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পী, সুরকার এবং বাদ্যযন্ত্রী জগজিৎ সিংকে তাঁর সমগ্র জীবনের কৃতিত্ব স্বরূপ ‘গজলের রাজা’ (The Ghazal King) অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে। পণ্ডিত রবিশঙ্করের পরে স্বাধীন ভারতে তিনিই ছিলেন সবথেকে জনপ্রিয় ও বহুশ্রুত গায়ক এবং সঙ্গীতশিল্পী। জীবদ্দশায় ৬০টিরও বেশি অ্যালবাম রেকর্ড করেছিলেন তিনি। গজলের পাশাপাশি ঠুমরি, ভজন ইত্যাদি লঘু চালের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতেও তাঁর পারদর্শিতা ছিল অসামান্য। মূলত গজল গানে প্রতিটি শব্দের অর্থ আর সুরের মাধুর্যের প্রতি গুরুত্ব দিতেন জগজিৎ যা তাঁর এক স্বতন্ত্র গায়নরীতি তৈরি করেছিল যাকে সাঙ্গীতিক ভাষায় বলা হয় বোল-প্রধান গায়কী। ‘প্রেম গীত’ (১৯৮১), ‘অর্থ’ (১৯৮২), ‘সাথ সাথ’ (১৯৮২) ইত্যাদি হিন্দি চলচ্চিত্র এবং ‘মির্জা গালিব’ নামে একটি হিন্দি ধারাবাহিকের সঙ্গীত নির্মাণের ক্ষেত্রেও তিনি এই বিশেষ রীতি ব্যবহার করেছিলেন। পদ্মভূষণজয়ী জগজিৎ সিং মুম্বাইয়ের সেন্ট মেরিজ স্কুল, বম্বে হাসপাতাল, ‘ক্রাই – সেভ দ্য চিলড্রেন’ নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং ‘এ.এল.এম.এ’ নামের গ্রন্থাগারে নানা সময় জনহিতকর কাজে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন।

১৯৪১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাজস্থানের গঙ্গানগরে জগজিৎ সিং-এর জন্ম হয়। তাঁর নামের অর্থ হল যিনি বিশ্বকে জয় করেছেন। তাঁর বাবা সর্দার অমর সিং ধীমান একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। অন্যদিকে তাঁর মা সর্দারনি বচ্চন কৌর এক ধর্মীয় পারিবারিক পরিবেশে বড় হয়েছিলেন। জগজিৎ ছাড়াও তাঁদের আরও চার কন্যা ও দুই পুত্র ছিল। জগজিৎ সিংয়ের পৈতৃক নিবাস ছিল পাঞ্জাবের রোপার জেলার দাল্লা গ্রামে। ছোটবেলায় তাঁকে সকলে ‘জিৎ’ নামেই ডাকত। পরবর্তীকালে বাঙালি গজল গায়ক চিত্রা সিং-এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয় এবং পরে বিবেক নামে তাঁদের এক পুত্রসন্তানও জন্মায়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

গঙ্গানগরের খালসা হাই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন জগজিৎ সিং । তারপর ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে এফ. এ ক্লাসে ভর্তি হন। এরপর জলন্ধরের দয়ানন্দ অ্যাংলো বৈদিক কলেজ থেকে শিল্পকলা নিয়ে স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি। হরিয়ানার কুরুক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এর পরে ইতিহাস নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন জগজিৎ। তাঁর বাবা চাইতেন যে ভারতীয় প্রশাসনিক বিভাগে চাকরি করুক জগজিৎ। কিন্তু সঙ্গীতের জগতে জগজিৎকে ধীরে ধীরে সম্মান ও প্রশংসা অর্জন করতে দেখে তিনি খুবই খুশি হন। পণ্ডিত ছগনলাল শর্মার কাছে জগজিৎ ধ্রুপদী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন তিনি। ক্রমেই খেয়াল, ঠুমরি, ধ্রুপদ জাতীয় গানে দক্ষতা অর্জন করেন জগজিৎ। পরে মাইহার ঘরানার ওস্তাদ জামাল খানের কাছেও তালিম নেন তিনি। কৈশোরকালে বহু মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন তিনি, বহু গানে সুরও দিয়েছেন।

১৯৬১ সালে জলন্ধরের সর্বভারতীয় বেতার সংস্থায় সঙ্গীত পরিবেশন এবং সঙ্গীতে সুরারোপ করার কাজে যোগ দেন জগজিৎ সিং । ১৯৬৫ সালে পরিবারের কাউকে কিছু না বলে বম্বেতে ভাগ্যান্বেষণের জন্য চলে আসেন তিনি। বিয়ের অনুষ্ঠানে গান গাওয়া এবং বিজ্ঞাপনের জন্য কিছু কিছু ‘জিঙ্গল’ (Jingle) গাওয়ার মধ্য দিয়েই সঙ্গীত জীবনের সংগ্রাম শুরু হয় তাঁর। বিজ্ঞাপনের জগতে জিঙ্গল গাওয়ার সময় চিত্রা নামে আরেক গায়কের সঙ্গে দেখা হয় তাঁর। ১৯৬৯ সালে দীর্ঘ দুই বছর প্রেম-পরিণয়ের পরে তাঁরা বিবাহ করেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই অসম্ভব সুরেলা কণ্ঠে গজল গাইতেন। পরে দুজনে একত্রে বহু অ্যালবাম রেকর্ড করেছিলেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘এক্সট্যাসিস’, ‘এ সাউণ্ড অফ অ্যাফেয়ার’, ‘প্যাশনস’। ১৯৭০ সাল নাগাদ গজলের জগতে নূরজাহান, মালেকা পোখরাজ, বেগম আখতার, তালাত মাহমুদ, মেহেদী হাসান প্রমুখ শিল্পীদের আধিপত্য ও প্রাধান্য ছিল। ‘দ্য আনফরগটেবলস্‌’ জগজিৎয়ের প্রথম অ্যালবাম। তাঁর সুরেলা কণ্ঠের জাদুতে প্রথম অ্যালবামেই সকলকে মুগ্ধ করেছিলেন তিনি। ক্রমে এই অ্যালবামটির অসংখ্য কপি বিক্রি হয় এবং শ্রোতাদের কাছে তা অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৭৭ সালে তাঁর এই অ্যালবামটির প্রকাশের পর থেকেই তথাকথিত পাকিস্তানি শিল্পীদের আধিপত্যকে ছিন্ন করে ভারতীয় সঙ্গীতের জগতে সুপ্রতিষ্ঠিত হন জগজিৎ এবং চিত্রা সিং। এই অ্যালবামে দুজনের মিলিত সঙ্গীত সাধনা তাঁদের দুজনকেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। ২০১১ সালে ‘দ্য ইণ্ডিপেণ্ডেন্ট’ পত্রিকা এই অ্যালবামটিকে ভারতীয় গজল গানের ধারায় এক মাইলস্টোন বলে ঘোষণা করে। আধুনিক পদ্ধতিতে সঙ্গীতায়োজন করে মোট দশটি গান রেকর্ড করেছিলেন তাঁরা। এর মধ্যে দুটি গানে দ্বৈতভাবে গলা মিলিয়েছিলেন জগজিৎ এবং চিত্রা এবং বাকি আটটি গান দুজনে সমানভাবে ভাগ করে গেয়েছিলেন। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে তাঁরা একত্রে ‘বিয়ণ্ড টাইম’ নামে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করেছিলেন। শব্দ, সঙ্গীত এবং সুরের নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন জগজিৎ এই অ্যালবামে। এই সময় দুর্ভাগ্যক্রমে ২১ বছর বয়সে একটি দুর্ঘটনায় তাঁদের পুত্র বিবেকের মৃত্যু হয়। এই ঘটনা জগজিৎ এবং চিত্রা উভয়কেই প্রবল শোকাহত করেছিল। ‘সামওয়ান সামহোয়্যার’ অ্যালবামের পর চিত্রা সিং গান গাওয়া ছেড়ে দেন। এই অ্যালবামের গানগুলি চূড়ান্ত আবেগপূর্ণ এবং সন্তান হারানোর বেদনায় অশ্রুসিক্ত যা খুব সহজেই শ্রোতাদের আকৃষ্ট করেছিল। জগজিৎ সিং তাঁর সঙ্গীতচর্চা চালিয়ে যান এবং ক্রমে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ‘হোপ’, ‘ইন সার্চ’, ‘ইন সাইট’, ‘মিরাজ’, ‘ভিশনস’, ‘কাহ্‌কাশান’, ‘লাভ ইজ ব্লাইণ্ড’, ‘চিরাগ’ ইত্যাদি একের পর এক অ্যালবামগুলি জগজিৎ সিং-এর জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়িতে তোলে। সেই সময় থেকেই দেশের শীর্ষ গজল গায়কদের মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠেন তিনি। লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে ‘সাজদা’ নামে একটি ধ্রুপদী গজল গানের অ্যালবামে গান গেয়েছিলেন জগজিৎ সিং।

শুধু হিন্দি গানই নয়, অসংখ্য পাঞ্জাবি গানও গেয়েছেন তিনি। বহু হিন্দি চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক গায়ক হিসেবে গান গেয়েছেন জগজিৎ। ‘প্রেম গীত’ (১৯৮১), ‘অর্থ’ (১৯৮২), ‘সাথ সাথ’ (১৯৮২), ‘তুম বিন’, ‘সরফরোশ’, ‘দুশমন’, ‘তরকিব’ ইত্যাদি হিন্দি চলচ্চিত্র এবং ‘মির্জা গালিব’ নামে একটি হিন্দি ধারাবাহিকে গান গেয়েছিলেন তিনি। এছাড়াও ‘বহুরূপী’ (১৯৬৬), ‘আবিষ্কার’ (১৯৭৪), ‘এক বার কাহো’ (১৯৮০), ‘রাভান’ (১৯৮৪), ‘অভিষেক’ (১৯৮৭), ‘খলনায়ক’ (১৯৯৩), ‘লীলা’ (২০০২) ইত্যাদি ছবিতেও গান গেয়েছেন জগজিৎ সিং । ১৯৮০ সালে প্রকাশিত ‘দ্য লেটেস্ট’ অ্যালবামে তাঁর গাওয়া ‘ও কাগজ কি কশ্‌তি, ও বারিষ কা পানি’ গানটি আজও সমান জনপ্রিয়তায় আসীন। ২০০৭ সালের ১০ মে ভারতীয় লোকসভার সেন্ট্রাল হলে একটি অনুষ্ঠানে বিহু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগতের দিক্‌পাল ব্যক্তিদের সামনে জগজিৎ সিং বাহাদুর শাহ জাফরের বিখ্যাত গজল ‘লাগতা নেহি হ্যায় দিল মেরা তো’ গানটি উপস্থাপন করেন ভারতীয় সিপাহি বিদ্রোহের ১৫০ বছর পূর্তির কথা মাথায় রেখে। ১৯৯৬ সালে ‘মিরাজ’, ১৯৯৮ সালে ‘সিলসিলে’ এবং ২০০০ সালে ‘শহের’ নামে বিখ্যাত সব অ্যালবাম রেকর্ড করেছিলেন জগজিৎ সিং ।

২০১২ সালে জগজিৎ সিং-এর প্রায় ৪০ ঘন্টারও বেশি সময় ধরে নেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে তাঁর একটি জীবনী প্রকাশিত হয় ‘বিয়ণ্ড টাইম’ নামে। আশরানি মাথুর এই বইয়ের সম্পাদনা করেছিলেন। ‘কাগজ কি কশ্‌তি’ নামে একটি জীবনীমূলক তথ্যচিত্রও নির্মিত হয়েছিল তাঁর জীবনের উপর। ব্রহ্মানন্দ এস সিং এই ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন।

১৯৯৮ সালে মির্জা গালিবের রচনাগুলিকে জনপ্রিয় করে তোলার কৃতিত্বের জন্য জগজিৎ সিংকে ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ঐ বছরই রাজস্থান সরকার তাঁকে ‘সাহিত্য কলা অ্যাকাদেমি’ পুরস্কারে সম্মানিত করেছে। তার পরের বছর ১৯৯৯ সালে দয়াবতী মোদী পুরস্কার, ২০০৩ সালে ভারতের তৃতীয় শ্রেষ্ঠ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মভূষণ’ পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। ২০০৩ সালেই কুরুক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানীয় ডি.লিট উপাধি প্রদান করে। ২০০৫ সালে দিল্লি সরকার তাঁকে ‘গালিব অ্যাকাডেমি’ পুরস্কারে ভূষিত করে। ২০১২ সালে রাজস্থানের রাজ্য সরকার তাঁদের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘রাজস্থান রত্ন’ দিয়ে সম্মানিত করেছে জগজিৎ সিংকে। ২০১৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জগজিৎ সিং-এর ৭২তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে গুগল ডুডল এঁকে তাঁকে সম্মান জানিয়েছে।

২০১১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে জগজিৎ সিংয়ের মৃত্যু হয়।  

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন