ইতিহাস

শ্রীনিবাস রামানুজন

শ্রীনিবাস রামানুজন (Srinivasa Ramanujan) একজন ভারতীয় গণিতবিদ যাঁকে ভারতের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। সমগ্র বিশ্বে গণিতের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বলা যেতে পারে বিংশ শতাব্দীর এক অন্যতম আশ্চর্য গাণিতিক প্রতিভা ছিলেন রামানুজন যিনি বিশুদ্ধ গণিতের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই মাত্র ৩২ বছরের জীবৎকালে প্রায় চার হাজার বিস্ময়কর সূত্র এবং উপপাদ্য আবিষ্কার করেছেন যা বর্তমান সুপার-কম্পিউটারের যুগেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংখ্যাতত্ত্বের ক্ষেত্রে রামানুজন এক কিংবদন্তী গণিতবিদ হিসেবে আজও আদৃত। রামানুজনের জন্মদিবস উপলক্ষে প্রতি বছর ২২ ডিসেম্বর সারা ভারত জুড়ে জাতীয় গণিত দিবস পালিত হয়।

১৮৮৭ সালের ২২ ডিসেম্বর তামিলনাড়ুর ইরোদ্‌-এ মামার বাড়িতে এক দরিদ্র তামিল ব্রাহ্মণ আয়েঙ্গার পরিবারে শ্রীনিবাস রামানুজনের জন্ম হয়। তাঁদের আদি নিবাস ছিল থাঞ্জাভুর জেলায়। রামানুজনের বাবা কুপ্পুস্বামী শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার একটি শাড়ির দোকানে কেরানির কাজ করতেন এবং মা কোমালতাম্মাল স্থানীয় মন্দিরে গান গাইতেন। রামানুজনের জন্মের পর তাঁরা কুম্বকোনাম্‌ শহরের সড়ঙ্গপানি সন্নিধি স্ট্রিটের এক সাধারণ বাড়িতে বসবাস করতে শুরু করেন। তাঁদের আরেক সন্তান সাদাগোপান মাত্র তিন মাস বয়সেই মারা যায়। পরে কোমলতাম্মালের আরো দুই পুত্র জন্মালেও দুর্ভাগ্যক্রমে কেউই জীবিত থাকেনি। ১৮৮৯ সালে রামানুজন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন এবং সৌভাগ্যক্রমে বসন্ত মহামারী রূপে দেখা দিলেও রামানুজন সুস্থ হয়ে উঠলে তাঁর পরিবার বাসস্থান বদল করে চেন্নাইয়ের কাছে কাঞ্চীপুরমে থাকতে শুরু করে।

১৮৯২ সালের ১ অক্টোবর স্থানীয় বিদ্যালয়ে রামানুজনের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়। পরে কুম্বকোনামের কঙ্গায়ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি ভর্তি হন। ১৮৯৭ সালে ইংরেজি, তামিল, ভূগোল এবং পাটিগণিতে প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে টাউন উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। কৈশোরেই তাঁর বিস্ময়কর মেধার বিকাশ ঘটতে থাকে। স্কুলে পড়ার বয়সেই তিনি উচ্চতর ত্রিকোণমিতি সহ কঠিন সমস্ত উপপাদ্য অনায়াসেই আয়ত্ত করে ফেলতেন। স্কুলে পড়াকালীনই জ্যামিতি এবং সংখ্যাতত্ত্বের অসীম ক্রম (Infinite Series) বিষয়ের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ জন্মায়। ১৯০৩ সালে এক বন্ধুর থেকে রামানুজন একটি বই পান জি. এস. কারের লেখা ‘ এ সিনোপসিস অফ এলিমেন্টারি রেজাল্টস ইন পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিক্স’(A Synopsis of Elementary Results in Pure and Applied Mathematics)। হাজার পাঁচেক গাণিতিক উপপাদ্য সমৃদ্ধ এই বইটি রামানুজনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরের বছরই তিনি নিজের প্রচেষ্টায় বার্ণৌলির সংখ্যা এবং ইউলার-ম্যাক্রোনির ধ্রুবকের ১৫ দশমিক স্থান পর্যন্ত আবিষ্কার করেন। ১৯০৪ সালে টাউন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হওয়ার পরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণস্বামী আইয়ার তাঁকে কে. রঙ্গনাথা রাও পুরস্কারে সম্মানিত করেন। মাদ্রাজের পাচাইয়াপ্পা’স কলেজে (Pachaiyappa’s College) ভর্তি হলেও গণিত ব্যতিরেকে ইংরাজি, সংস্কৃত, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেননি রামানুজন। ১৯০৬ সালে এফ.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি তিনি এবং এফ.এ ডিগ্রি ছাড়াই তিনি কলেজ ছাড়েন। এরপর তিনি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় স্বতন্ত্র গবেষণা চালাতে থাকেন গণিত বিষয়ে। তবে দারিদ্র্য, অনাহার-অর্ধাহার ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী।

১৯১২ সালের গোড়ার দিকে শ্রীনিবাস রামানুজন মাদ্রাজের হিসাবরক্ষক জেনারেল অফিসে ২০টাকা বেতনের অস্থায়ী চাকরিতে নিযুক্ত হন। পরে রামানুজন বাধ্য হয়ে মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টে ৩০ টাকা বেতনের স্থায়ী চাকরিতে যোগ দেন। এর মধ্য দিয়েই তাঁর কর্মজীবনের সূচনা ঘটে। এই সংস্থার কর্মকর্তা স্যার ফ্রান্সিস স্প্রিং এবং এস. নারায়ণা আইয়ার রামানুজনের গাণিতিক গবেষণায় যথেষ্ট উৎসাহ দিতেন এবং উল্লেখ্য যে তাঁরা দুজনেই ইণ্ডিয়ান ম্যাথমেটিকাল সোসাইটির কোষাধ্যক্ষ ছিলেন।

১৯১০-এ ইণ্ডিয়ান ম্যাথমেটিকাল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ভি. রামাস্বামী আইয়ারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটলে মাদ্রাজের গণিতবিদ মহলে পরিচিত হতে শুরু করেন রামানুজন এবং তাঁর সহায়তায় মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের উপর গবেষণায় নিযুক্ত হন রামানুজন।  ইতিমধ্যে ১৯০৯ সালে জানকীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেছে। রামাস্বামী আইয়ারের সহায়তায় তিনি নেল্লোর শহরের কালেক্টর এবং ইণ্ডিয়ান ম্যাথমেটিকাল সোসাইটির সম্পাদক দেওয়ান রামচন্দ্র রাওয়ের কাছে যান। তাঁর গণিতের প্রতিভা দেখে বিস্মিত হয়ে সেইসব আবিষ্কারের নিজস্বতা সম্পর্কে রামচন্দ্র রাও সন্দেহ প্রকাশ করলে তাঁর সন্দেহ নিরসন করেন রামানুজনের বন্ধু সি. ভি. গোপালাচারী। এলিপ্টিক ইন্টিগ্রাল (Elliptic integrals), হাইপারজিওমেট্রিক সিরিজ (Hypergeometric Series) ইত্যাদি বিষয়ে রামানুজনের গভীর জ্ঞান ও নতুন ভাবনা শোনার পর রামচন্দ্র রাও আশ্বস্ত হন এবং তাঁর অর্থকষ্ট দূর করতে বৃত্তিসহ গবেষণায় নিযুক্ত করেন তাঁকে।

তবু রামানুজনের দারিদ্র্য ঘুচল না। রামচন্দ্র রাওয়ের সহায়তায় ইণ্ডিয়ান ম্যাথমেটিকাল সোসাইটির জার্নালে রামানুজনের গবেষণাকর্ম প্রকাশিত হল। ১৯১১ সালে প্রথম বার্ণৌলির সংখ্যার উপর তাঁর ১৭ পাতার একটি গবেষণাপত্র সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়। কিন্তু তাঁর এই কাজ নিয়ে বহু মানুষ সন্দেহ প্রকাশ করলে বন্ধুদের পরামর্শে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদদের উদ্দেশে তিনি এই কাজের স্বীকৃতি চেয়ে চিঠি লেখেন। পরপর দু’বার চিঠির উত্তর না এলেও তৃতীয়বার গণিতবিদ হার্ডির কাছ থেকে তিনি উত্তর পান। হার্ডির অনুমোদন মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে রামানুজনের গুরুত্ব বৃদ্ধি করে, তাঁর বৃত্তির পরিমাণ বেড়ে যায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গবেষণার বিষয়ে তাঁকে ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন জমা করতে বলে। ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ গডফ্রে হার্ডির সঙ্গে কাজ করা শুরু করেন রামানুজন। হার্ডির সহায়তাতেই তিনি কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ অনুদান লাভ করেন। এই অনুদান গ্রহণে হার্ডি রামানুজনকে ইংল্যাণ্ডে আসার জন্য অনুপ্রাণিত করেন আর তাঁর কথাতেই সমস্ত ধর্মীয় বাধা কাটিয়ে ১৯১৪ সালে ইংল্যাণ্ডে পাড়ি দেন রামানুজন। গণিত সম্পর্কে রামানুজনের জ্ঞান এবং গবেষণার পরিসর দেখে চমকে উঠেছিলেন কেমব্রিজের গণিতবিদেরা। রামানুজন আধুনিক গণিতের বিষয়ে প্রায় কিছুই জানতেন না। তা সত্ত্বেও ভগ্নাংশ এবং দশমিকে তাঁর অবিরাম প্রচেষ্টা গণিতবিদদের বিস্মিত করেছিল। তাঁর গবেষণা ছিল মূলত এলিপ্টিক ইন্টিগ্রাল, হাইপারজিওমেট্রিক সিরিজ, রিম্যান সিরিজ, জিটা ফাংশানের সমীকরণ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে। তাঁর মৌলিক সংখ্যার উপরে একাধিক উপপাদ্যের মধ্যে বেশিরভাগই ভুল প্রমাণিত হলে ইংল্যাণ্ড গিয়ে অধ্যাপক হার্ডির সহায়তায় রামানুজন পুনরায় প্রথাগত শিক্ষাপদ্ধতিতে মনোনিবেশ করেন। ১৯১৬-তে মার্চ মাসে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এস.সি ডিগ্রি লাভ করেন উচ্চতর যুগ্ম সংখ্যার (Highly Composite Number) উপর যুগান্তকারী গবেষণার জন্য। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রামানুজন দীর্ঘ পাঁচ বছর অধ্যাপক হার্ডির সঙ্গে কাজ করেন। হার্ডি এবং রামানুজনের জুটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর। একদিকে হার্ডি ছিলেন গভীর বিশ্লেষক আর অন্যদিকে রামানুজন ছিলেন এক বিরল প্রতিভা। প্রতিভা ও অন্তর্দৃষ্টি সত্ত্বেও সুসংহত ভাবে কোনো ফলাফলের রূপ দিতে অক্ষম ছিলেন রামানুজন। কিন্তু তবু তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হার্ডি, গণিতবিদ ইউলার এবং জ্যাকোবির সঙ্গে রামানুজনের তুলনা করেন। হার্ডি-রামানুজনের যুগ্ম প্রচেষ্টায় আবিষ্কৃত হয় ‘P(n) এর সূত্র’। P(n) হল n ধনাত্মক সংখ্যার প্রভেদ (partition) যা আসলে অক্রমান্বয়ী সকল ধনাত্মক সংখ্যার সমষ্টি। এই সূত্রটি গণিতবিদ ইউলারের আবিষ্কার ছিল যেটি হার্ডি-রামানুজন যুগ্মভাবে সমাধান করেন। ‘১৭২৯’ এই সংখ্যাটি ‘হার্ডি-রামানুজন সংখ্যা’ হিসেবে পরিচিত।

গণিতের জগতে বিভাজন ফাংশান, গামা ফাংশান, অসীম ধারা (infinite series), অপসারী ধারা (divergent series), টাউ ফাংশানের বিষয়ে অনুমিতি, অবিচ্ছিন্ন ভগ্নাংশ ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে রামানুজন তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। নোটবুকে তিনি বিভিন্ন প্রতিপাদ্য নিয়ে যে সকল নোটস টুকে রাখতেন তা তাঁর মৃত্যুর পরে চার খণ্ডে প্রকাশিত হয় গণিতবিদ বি.এম উইলসন, জি. এন. ওয়াটসন এবং ব্রুস বেণ্ডিটের সম্পাদনায়। ১৯৭৬ সালে আবিষ্কার হওয়া এই চারটি নোটবুকে বহু অধ্যায় বিভাজন ছিল। ১৯২৭ সালে প্রকাশ পায় ‘কালেক্টেড পেপারস অফ শ্রীনিবাস রামানুজন’ গ্রন্থ যেখানে রামানুজনের ৩৭টি প্রবন্ধ সংকলিত ছিল। রবার্ট কানিগেলের লেখা ‘ দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি : এ লাইফ অফ জিনিয়াস রামানুজন’ নামে জীবনী অবলম্বনে ২০১৫ সালে এডওয়ার্ড প্রেসমেন ও ম্যাথিউ ব্রাউনের পরিচালনায় ‘দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি’ নামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র তৈরি হয় যেখানে রামানুজনের চরিত্রে অভিনয় করেন দেব পটেল। হার্ডিকে লেখা তাঁর চিঠি অবলম্বন করে ডেভিড লেভিট একটি উপন্যাস লেখেন ‘দ্য ইণ্ডিয়ান ক্লার্ক’। ২০১২ সালে রামানুজনের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গুগল একটি ডুড্‌ল-এর মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। রামানুজনের জন্মদিন উপলক্ষ্যে ২২ ডিসেম্বর তামিলনাড়ুতে পালিত হয় ‘প্রাদেশিক আই.টি দিবস’। ১৯৬২ সালে তাঁর স্মৃতিতে ভারত সরকার একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে। গাণিতিক গবেষণার জন্য ১৯১৮ সালে তিনি লণ্ডনের রয়্যাল সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেন।

যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ইংল্যান্ডে দূর্ভিক্ষের মধ্যে পড়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৯১৯ সালে যক্ষ্মা এবং ভিটামিন-স্বল্পতায় আক্রান্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন তিনি। অবশেষে ১৯২০ সালের ২৬ এপ্রিল মাত্র ৩২ বছর বয়সে শ্রীনিবাস রামানুজনের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তি


শ্রীকান্ত জিচকর
শ্রীকান্ত জিচকর

এনার সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন