ইতিহাস

প্লেটো

প্লেটো

সক্রেটিসের যোগ্য শিষ্য এবং উত্তরসূরি বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক প্লেটো (Plato) তাঁর চিন্তাধারা ও দর্শন ভাবনার জন্য চিরকালীন স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর লেখা সবথেকে আলোচিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘রিপাবলিক’। অনেক সমালোচকের মতে তাঁর ‘একাডেমি’র মাধ্যমেই গ্রিসে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি এবং গণিত বিষয়ে তাঁর যুগান্তকারী চিন্তাভাবনা উন্মুক্ত করে দিয়েছে বহু জ্ঞানচর্চার পথ। তর্কশাস্ত্র, জ্ঞানতত্ত্ব, নন্দনতত্ত্বের উপর তাঁর রচনাগুলি আজও চিন্তকদের অনুপ্রাণিত করে। গুরু সক্রেটিসের দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত ছিলেন তিনি এবং তাঁর শিষ্য অ্যারিস্টটলের মধ্যেও নিজের চিন্তাধারা রোপিত করেছিলেন প্লেটো। তাঁকে পাশ্চাত্য রাজনৈতিক দর্শনের উদ্‌গাতা বলেও মনে করা হয়। দর্শনচর্চার ক্ষেত্রে লিখিত কথোপকথন এবং কথ্য ভাষার প্রয়োগের বিষয়টি তাঁরই প্রবর্তিত। সক্রেটিস-পূর্ব দার্শনিক অর্থাৎ পিথাগোরাস, হেরাক্লিটাস, পার্মেনিডেসের মতো প্লেটোর দর্শনচিন্তা বিষয়ক লেখাগুলিও প্রায় ২৪০০ বছর ধরে মানুষের চর্চার বিষয় ছিল এবং আজও তার গুরুত্ব একটুকুও কমেনি।

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪২৮-৪২৭ অব্দের মধ্যে গ্রিসের অন্যতম প্রধান নগররাষ্ট্র এথেন্সে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে প্লেটোর জন্ম হয়। তবে তাঁর জন্মসাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। তাঁর আসল নাম ছিল অ্যারিস্টোক্লেস। কিন্তু তাঁর আয়তাকার কাঁধের জন্য লোকমুখে তিনি প্লেটো নামে পরিচিত হন আর পরবর্তীকালে এই নামই তাঁর আসল পরিচয় হয়ে ওঠে। তাঁর বাবার নাম ছিল অ্যারিস্টন এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল পেরিক্টিওন। গ্রিক দার্শনিকদের জীবনীকার ডায়োজিনিস লিরটিয়াসের মতে, এথেন্সের রাজা কডরাস এবং মেসেনিয়ার রাজা মেলেন্থাস ছিলেন প্লেটোর পূর্বপুরুষ। প্লেটোর দুই দাদার নাম ছিল যথাক্রমে অ্যাডেইমান্টুস এবং গ্লাউকোন। তাঁর একমাত্র বোনের নাম ছিল পোটোনে। তবে প্লেটো তাঁর ‘রিপাবলিক’ বইতে এই তথ্য স্বীকার করলেও ঐতিহাসিক জেনোফোনের মতে গ্লাউকোন ছিলেন প্লেটোর ছোটো ভাই। অনেক অল্প বয়সেই প্লেটোর বাবার মৃত্যু হয় এবং তাঁর মা প্লেটোর দূরসম্পর্কের কাকা পাইরিল্যাম্পসকে বিবাহ করেন। সৎ ভাইদের অর্থনৈতিক সহায়তাতেই প্লেটো বড় হয়েছেন। পাইরিল্যাম্পস সেই সময়ের গ্রিসে রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন এবং প্লেটোর আরেক কাকা চার্মিডেস সক্রেটিস কথিত গ্রিসের ‘টাইর‍্যাণ্ট থার্টি’র সদস্য ছিলেন।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

শৈশব থেকেই বিনয়ী প্লেটো পড়াশোনার পাশাপাশি শরীরচর্চা করতেন নিয়মিত। শিক্ষালাভ এবং জ্ঞানার্জনের প্রতি অসম্ভব আগ্রহ ছিল তাঁর। তাই যে কোন বইই খুব দ্রুত পড়ে শেষ করে ফেলতে পারতেন তিনি। সম্ভ্রান্ত পরিবারের রীতি অনুযায়ী গৃহশিক্ষকের কাছে পড়াশোনার সুযোগ পান প্লেটো। ফলে অল্প বয়সেই ব্যাকরণ, সঙ্গীত, শারীরবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানলাভ করেছিলেন তিনি। অনেকে মনে করেন যে দার্শনিক হেরাক্লিটাসের অনুগামী ক্রেটিলাসের কাছেও দর্শন ও অন্যান্য বিষয়ের পাঠ নিয়েছিলেন প্লেটো। তবে অনেক ঐতিহাসিকের মতে কুড়ি বছর বয়সে সক্রেটিসের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সক্রেটিসের মৃত্যুর সময় প্লেটো ছিলেন এথেন্সে। সক্রেটিসের মৃত্যুর পর ২৮ বছর বয়সে প্লেটো এথেন্স ত্যাগ করে প্রথমে মেগরাতে যান এবং ইউক্লিডের সাহায্যে একটি দর্শন-চিন্তার আখড়া স্থাপন করেন। এরপরে দীর্ঘ বারো বছর ধরে সিসিলি, ইতালি, মিশর, সাইরিন ইত্যাদি জায়গা ভ্রমণ করেন প্লেটো।

এই ভ্রমণকালেই সাইরাকিউজ নামক এক স্থানে পিথাগোরাসের বেশ কিছু শিষ্যের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং এই অঞ্চলের শাসকের সঙ্গেও প্লেটোর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ৩৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি নিজের শহর এথেন্সে ফিরে আসেন এবং এখানেই ৩৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিসের একজন কিংবদন্তী বীর যোদ্ধা অ্যাকাডেমাসের নামানুসারে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। প্লেটোর সেই প্রতিষ্ঠানই বিশ্ববিখ্যাত ‘দ্য অ্যাকাডেমি’। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান পদে বহাল ছিলেন প্লেটো। গণিত, জীববিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন ও রাজনীতির নানা বিষয় এখানে চর্চা হত এবং প্লেটো এখানে পড়ানোর জন্য কোন বেতন নিতেন না। তবে অ্যাকাডেমিতে পড়ার জন্য বিশেষ প্রকার কঠিন এক নির্বাচনী পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল। অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠার পিছনে প্লেটোর মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রিসের রাজনীতিতে কয়েকজন শিক্ষিত, দক্ষ ও দূরদর্শী নেতা তথা পরিচালক তৈরি করা। গ্রিসের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভার তিনি তাঁর ছাত্রদের হাতেই দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। ৩৬৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সাইরাকিউজে বন্ধু ডায়নের আমন্ত্রণে গিয়ে প্লেটো জানতে পারেন যে সাইরাকিউজের শাসক দ্বিতীয় ডায়োনিসাসের গৃহশিক্ষক হওয়ার জন্যেই ডায়ন তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছেন। এই সংবাদে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন প্লেটো কারণ তাঁর ইচ্ছা ছিল ডায়োনিসাসকে শিক্ষিত করে একজন দার্শনিক রাজা করে তুলবেন তিনি। কিন্তু এর উলটো অর্থ করে বসলেন ডায়োনিসাস। ডায়ন আর প্লেটো তাঁর বিরুদ্ধে একত্রে ষড়যন্ত্র করছেন মনে করে ডায়নকে নির্বাসনে পাঠান তিনি এবং তাঁর নির্দেশেই প্লেটো গৃহবন্দী হন। পরে কৌশলে সাইরাকিউজ থেকে পালিয়ে আসেন প্লেটো। আসলে প্লেটোর দর্শনচিন্তা বুঝতে পারেননি রাজা ডায়োনিসাস। সাইরাকিউজ থেকে এথেন্সে ফিরে আবার অ্যাকাডেমির কাজে ও অধ্যাপনায় নিমগ্ন হন তিনি। ঐতিহাসিকদের মতে, ৩৫৫ থেকে ৩৫৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে আরেক বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল প্লেটোর অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন। দীর্ঘ কুড়ি বছর তিনি প্লেটোর কাছে শিক্ষালাভ করেন।

প্লেটোর জীবনের অধিকাংশ লেখাই সক্রেটিসকে কেন্দ্র করে লেখা। তবে কিছু কিছু লেখাতে নিজের দর্শনও ফুটে উঠেছে প্লেটোর। কথোপকথনের মাধ্যমে এই দর্শন সংক্রান্ত ধারণাগুলি ফুটিয়ে তুলতেন তিনি। তাঁর লেখা প্রথম দিককার ‘ডায়লগ’গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘দ্য অ্যাপোলজি অফ সক্রেটিস’, ‘চার্মিডেস’, ‘ক্রিটো’, ‘হিপিয়াস মেজর’, ‘হিপিয়াস মাইনর’, ‘লাইসিস’, ‘রিপাবলিক বুক ওয়ান’ ইত্যাদি। তাত্ত্বিকদের মতে এই লেখাগুলিতে সবই সক্রেটিসের বাণী বা চিন্তা উদ্ধৃত হয়েছে। চরিত্রের নামের আড়ালে কথোপকথনগুলিতে মূল চরিত্র হিসেবে আছেন সক্রেটিস। এই পর্বের লেখায় প্লেটো বলতে চেয়েছেন ঈশ্বর সর্বজ্ঞানী এবং মৃত্যুর পরে যদি কোনো জীবন থাকে তবে সেখানে ভালো আত্মারা পুরস্কার আর খারাপ আত্মারা শাস্তি পাবে। এর পরের দিকে ‘রিপাবলিক বুক টু’ থেকে ‘রিপাবলিক বুক টেন’, ‘সিম্পোসিয়াম’, ‘ফায়েডো’ ইত্যাদি লেখার মধ্যে সক্রেটিসের জবানবন্দিতে প্লেটো বলেন যে মানুষের আত্মার তিনটি অংশ রয়েছে যার এক অংশ যুক্তি ও সত্যের খোঁজ করে, অন্য অংশটি জয়-পরাজয় এবং সম্মান নিয়ে চিন্তা করে এবং সর্বশেষ অংশটি ক্ষুধা-তৃষ্ণা-লোভ-লালসা এই সব বৃত্তিকে ধারণ করে। এই পর্বের ‘সিম্পোসিয়াম’ গ্রন্থে ভালোবাসার দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্লেটো যাকে ‘থিওরি অফ এরোস’ বলা হয়। এই তত্ত্বকে পণ্ডিতরা ‘প্লেটোনিক লাভ’ বলে চিহ্নিত করেছেন যা বলে প্রকৃত ভালোবাসায় যৌনতার কোনো স্থান নেই। একেবারে জীবনের শেষ দিকে প্লেটো লেখেন ‘পারমেনিডেস’, ‘সোফিস’, ‘ক্রিটিয়াস’, ‘ফিলেবাস’ ইত্যাদি ডায়লগ। তাঁর বিখ্যাত ‘রিপাবলিক’ বইতেই তিনি আদর্শ রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিয়েছেন এবং তাঁর রূপ-রীতি, কাঠামো কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছেন আর এই বইতেই আদর্শ রাষ্ট্র থেকে কবিদের বিতাড়নের কথা ঘোষণা করেছেন প্লেটো।

মোটামুটিভাবে ৩৬টি গ্রন্থ রচনা করেছেন প্লেটো আর তার সঙ্গে ছিল কিছু চিঠিপত্র। প্লেটোর দর্শনের মোটামুটিভাবে তিনটি বিভাগ – ১) ডায়ালেক্টিক, ২) পদার্থবিদ্যা এবং ৩) নীতিবিদ্যা। ডায়ালেক্টিক হল আকার সম্পর্কীয় মতবাদ যাকে ‘থিওরি অফ ফর্মস’ বলা হয়। পদার্থবিদ্যার তাত্ত্বিক আলোচনায় প্রকৃতিতে অবস্থিত বস্তুসকল এবং ইহজগতের অস্তিত্ব, আত্মার দেহান্তর ইত্যাদিই মুখ্য বিষয় হয়ে আছে। নাগরিক হিসেবে মানুষের কর্তব্য কী হওয়া উচিত, ব্যক্তির নৈতিকতা কীরূপ হওয়া উচিত ইত্যাদি বিষয়গুলি হল প্লেটোর নীতিবিদ্যার আলোচ্য।       

আনুমানিক ৩৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এথেন্সে আশি বছর বয়সে প্লেটোর মৃত্যু হয়।       

 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন