ইতিহাস

সক্রেটিস

সক্রেটিস (Socrates) গ্রিসের একজন বিখ্যাত দার্শনিক যিনি পাশ্চাত্য দর্শনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং পশ্চিমী নৈতিক চিন্তাধারার প্রথম নৈতিক দার্শনিক হিসাবে খ্যাত। জীবদ্দশায় তিনি কোন গ্রন্থ বা পাঠ্য রচনা না করলেও তাঁর সমকালীন বিভিন্ন লেখকদের লেখার মাধ্যমে বিশেষত তাঁর শিষ্য প্লেটো এবং জেনোফোনের লেখার মাধ্যমে তাঁর সম্পর্কে জানতে পারা যায়। মূলত সক্রেটিসকে নিয়ে প্লেটোর লেখা সংলাপগুলির মধ্য দিয়েই নীতিশাস্ত্র এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সক্রেটিস তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য বিশ্বে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন।

খ্রীষ্টপূর্বাব্দ ৪৭০ থেকে ৪৬৯ এর মধ্যে প্রাচীন গ্রিসের গণতান্ত্রিক নগররাষ্ট্র এথেন্সের এক দরিদ্র পরিবারে সক্রেটিসের জন্ম হয়। তাঁর বাবা সফ্রেনিস্কাস ছিলেন একজন পরিচিত গ্রীক স্থপতি। মা ফিনারিটি ছিলেন একজন ধাত্রী। বাবা ও মা দুজনেই উপার্জন করলেও সক্রেটিসের পরিবারে অভাব-অনটন বেশ ভালোমতোই ছিল। পঞ্চাশ বছর বয়সে সক্রেটিস জ্যান্তিপ্পে (Xanthippe) নামে এক বদমেজাজি মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন। সক্রেটিসের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন মায়ার্ত। এই দুই স্ত্রীর গর্ভে তাঁর মোট তিনটি পুত্র সন্তান জন্মায় যথা- ল্যাম্প্রোকলস, সোফ্রোনিসকাস এবং মেনেক্সেনাস। এই তিন পুত্রের শিক্ষা দানের ব্যাপারে কখনও অবহেলা করেননি সক্রেটিস। তিনি কষ্ট করে হলেও পুত্রদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেছিলেন।

দারিদ্রতার কারণে ছোট বয়স থেকেই বাবার সঙ্গে মূর্তি তৈরির কাজে লেগে পড়তে বাধ্য হন সক্রেটিস। কিন্তু অদম্য জ্ঞানস্পৃহা সক্রেটিসকে পড়াশোনার প্রতি কেবলই আকৃষ্ট করতে থাকে। কৈশোরে তাঁর সঙ্গে এক ধনী ব্যক্তির পরিচয় হয়। তিনি সক্রেটিসের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে তাঁর পড়াশোনার যাবতীয় দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন এবং এনাক্সগোরাস নামে একজন গুরুর কাছে শিক্ষা লাভের জন্য তাঁকে ভর্তি করে দেন।

এনাক্সাগোরাস বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে জেলে গেলে আরেক গ্রিক গুরু এখলাসের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন সক্রেটিস। পড়াশোনার দিকে মন থাকলেও সক্রেটিস বাধ্য হয়েছিলেন যুদ্ধে যেতে। সেই সময় গ্রিস অনেকগুলি নগর রাষ্ট্রে বিভক্ত থাকায় তাদের মধ্যে মাঝেমধ্যেই যুদ্ধ লাগত। এথেন্স গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হলেও নিয়ম ছিল রাজ্যের প্রতিটি সক্ষম পুরুষকে যুদ্ধে যেতে হবে। বাধ্য হয়ে অ্যামপিপোলিসের যুদ্ধে যেতে হয় সক্রেটিসকে এবং তারপরই তাঁর মন যুদ্ধের বিষে বিষিয়ে ওঠে। চিরদিনের জন্য সৈনিকের দায়িত্ব ছেড়ে তিনি আবার গ্রিসে ফিরে এসে দর্শন চর্চায় মনোনিবেশ করেন।

প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে যুক্তি খুঁজে পাওয়া দর্শনের এই ধারাটির প্রথম প্রচলন করেছিলেন সক্রেটিস। তৎকালীন গ্রিসে একদল মানুষের পেশা ছিল তর্ক করে এবং বড় বড় কথা বলে অর্থ উপার্জন করা। এঁরা সোফিস্ট নামে পরিচিত ছিলেন। সক্রেটিস কিন্তু জ্ঞানার্জন ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে পয়সা উপার্জনের এই পথটি ঘৃণা করতেন। তিনি সর্বদা সাধারণ মানুষের কথা মন দিয়ে শুনতেন এবং একের পর এক প্রশ্ন করে তাঁদের ভেতর থেকে যুক্তি বের করে আনতেন। সোফিস্টদের নানান সময়ে একের পর এক প্রশ্ন করে সক্রেটিস প্রমাণ করে দিতেন তাঁরা আসলে কিছুই জানেন না, বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই তাঁদের। সমাজে উচ্চশ্রেণীতে বসবাস করা সোফিস্টদের প্রকৃত স্বরূপ সবার সামনে প্রকাশ করে দেওয়ায় দ্রুত এথেন্সের শাসকশ্রেণীর বিরাগভাজন হতে শুরু করেন তিনি।

প্লেটোর লেখা থেকে জানা যায় সক্রেটিস প্রতিদিন সকালে সামান্য প্রাতরাশ করে বেরিয়ে পড়তেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষ কোথায় কোথায় কি ধরনের আলোচনা করছে তা মন দিয়ে শোনা। সুযোগ পেলেই তিনি মানুষের সঙ্গে তর্ক করতে শুরু করে দিতেন। একের পর এক প্রশ্ন করে করে প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করে দেওয়া ছিল তাঁর তর্কযুদ্ধের একটি বিশেষ পদ্ধতি। আরেক প্রাচীন দার্শনিক জেনোর দ্বন্দ্বমূলক যুক্তিবাদী দর্শনে আস্থাশীল ছিলেন তিনি। এই পদ্ধতি অনুযায়ী তিনি প্রথমেই প্রতিপক্ষের যুক্তিকে স্বীকার করে নিতেন। তারপর একের পর এক প্রশ্নের মধ্য দিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতেন। যুক্তির ফাঁদে প্রতিপক্ষরা জড়িয়ে পড়ার পর সক্রেটিসের কাছে তাঁদের হার ছিল একরকম নিশ্চিত। যতক্ষণ না প্রতিপক্ষ হার স্বীকার করে নিত ততক্ষণ সক্রেটিসের প্রশ্ন-উত্তর-পর্ব চলতেই থাকত। একসময় গ্রিসের তথাকথিত পরিচিত যুক্তিবাদী মানুষরা সক্রেটিসকে ভয় পেতে শুরু করেন। এই প্রশ্ন উত্তর পর্ব পরিচিত ছিল সক্রেটিসের শ্লেষ (Socratic question) নামে। তাঁর এই দার্শনিক যুক্তি পদ্ধতিটি পরে আরও বিকশিত করেন শিষ্য প্লেটো এবং প্লেটোর শিষ্য অ্যারিস্টটল।

স্পার্টার কাছে এথেন্সের পরাজয়ের পর এই গ্রিক নগর রাজ্যটির রাজনৈতিক অবস্থা বেশ টালমাটাল হয়ে ওঠে। সক্রেটিস এই সময় তাঁর যুক্তি দিয়ে এথেন্সের শাসকদের ভ্রান্ত অবস্থান সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করতে থাকেন। এর ফলে এথেন্সের অভিজাত শ্রেণী ব্যাপক ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সক্রেটিসের ওপর। তাঁরা বুঝতে পারেন এই গ্রিক দার্শনিক তাঁদের আধিপত্য বিনষ্ট করতে সক্ষম। খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৩৯৯ সালে এথেন্সের তিন অভিজাত ব্যবসায়ী মেলেতুল, লাইকন ও আনাতুস সক্রেটিসের নামে সরকারিভাবে অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল সক্রেটিস সমাজে নতুন ধর্ম ও দেবতার প্রচলন করার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি যুব সমাজকে বিপথে চালিত করার অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছিল সক্রেটিসের এইরকম পাপাচারের ফলেই দেবতা্রা এথেন্সের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিল যার ফল হিসেবে স্পার্টার কাছে তাঁদের হার স্বীকার করতে হয়। যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে এথেন্সের আর্থিক দুর্দশা চরমে ওঠায় সাধারণ মানুষ খুব সহজেই অভিজাত শ্রেণীর প্রতিনিধিদের এই অভিযোগ বিশ্বাস করে নেয়।

এথেন্সের নিয়ম অনুযায়ী সক্রেটিসের বিচার করার জন্য ৫০১ জন সদস্য নিয়ে বিচারকমণ্ডলী গঠিত হয়। বিচার প্রক্রিয়া চলার সময় সক্রেটিস নিজের সমর্থনে এক দীর্ঘ বক্তৃতা রাখেন। সেই দীর্ঘ বক্তৃতায় তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে যুক্তিবোধ জাগিয়ে তুলতে এবং তারা যে প্রকৃতপক্ষে কতটা অজ্ঞ সেটা বোঝাতে গিয়েই সকলের অপ্রিয় হয়ে উঠেছেন তিনি। যেহেতু তিনি সত্যের পথেই ছিলেন তাই তাঁর কোন আক্ষেপ নেই‌। এ প্রসঙ্গে নিজেকে মৌমাছি এবং রাষ্ট্রকে ঘোড়ার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, মৌমাছি হিসেবে তিনি ঘোড়ার গায়ে হুল ফুটিয়ে তাঁদেরকে সচেতন করে তুলে সামনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।

সক্রেটিসের দীর্ঘ বক্তৃতার পর বিচারকমণ্ডলীর ভোটে দেখা যায় তাঁকে শাস্তি দেওয়ার পক্ষে বেশি মানুষ ভোট দিয়েছেন। বিচারকমণ্ডলীর ভোটের ফলাফল ছিল ২৮১-২২০। এই ফলাফল দেখে কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে সক্রেটিস বলেছিলেন, হে এথেন্স বাসী আমি তোমাদের কল্যাণের জন্য তোমাদের প্রত্যেকের কাছে গিয়েছি। তোমাদের উচিত যে তোমাদের উপকার করেছে তার যাবতীয় ভরণপোষণ বহন করা। তাঁর এই বক্তব্য শুনে বিচারকমন্ডলী আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। প্রথমে যাঁরা সক্রেটিসের পক্ষে মত দান করেছিলেন তাঁদের অনেকেই তার বিপক্ষে চলে যান। শেষ পর্যন্ত সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয় বিচারকমণ্ডলীর পক্ষ থেকে।

সক্রেটিসের পরম বন্ধু ক্রিটো ছিলেন এথেন্সের সবথেকে ধনী ব্যবসায়ী। তিনি কারারক্ষীদের ঘুষ দিয়ে সক্রেটিসকে বিদেশে চলে যাওয়ার পথ করে দেবার চেষ্টা করেন। কিন্তু সক্রেটিস পালাতে চাননি। তিনি বন্ধুকে বলেছিলেন, আমি যদি পালিয়ে যাই তাহলে সকলে ভাববে আমি প্রকৃতপক্ষে অপরাধী। কিন্তু সত্যিটা তা নয়। তাছাড়া আমি রাষ্ট্রের আইনকে সম্মান করি, তাই অন্যায়ভাবে পালিয়ে যাওয়া উচিত নয়। ব্যর্থ হয়ে ক্রিটো শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেন।

পরের দিন এথেন্সের কারাগারে জল্লাদ সক্রেটিসকে নিতে এলে সক্রেটিস স্নান করে শুদ্ধ পোশাকে এসে দাঁড়ান। তাঁর সমস্ত শিষ্যরা কারাগারের কাছে উপস্থিত ছিলেন। জল্লাদ সক্রেটিসের হাতে হেমলক বিষ ভর্তি একটি পাত্র তুলে দেয়। স্বাভাবিকভাবেই সেই পাত্রটি গ্রহণ করে বিষ পান করেন তিনি। এরপর তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয় যতক্ষণ না তাঁর পা ভারী হয়ে আসে ততক্ষণ পর্যন্ত কারাকক্ষের মধ্যে হাঁটতে। পা অবশ হয়ে গেলে তিনি শয্যায় শুয়ে পড়েন। খ্রীষ্টপূর্বাব্দ ৩৯৯তে বিষপানের মাধ্যমে সক্রেটিসের মৃত্যু হয়। মৃত্যু শয্যায় সক্রেটিসের শেষ কথা ছিল- “ক্রিটো, আসক্লেপিয়াসের কাছে আমাদের একটি মোরগ ধার করা আছে। দয়া করে এই ঋণ পরিশোধ করে দিও”।

সক্রেটিসের মৃত্যু পরবর্তী প্রতিক্রিয়া গ্রিসে ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দিয়েছিল। সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন শাসকদের ওপর। অভিযোগকারীদের অন্যতম মেনেতুসকে এথেন্স বাসীরা গণপ্রহারের মাধ্যমে হত্যা করে। বিচারকমণ্ডলীর সদস্যরা দেশের মধ্যে কোনঠাসা হয়ে পড়ে। অনেকে অনুশোচনা ও গ্লানিতে আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছিলেন। পরবর্তীকালে এই গ্রিক নগর রাষ্ট্রের অধিবাসীরা সক্রেটিসের একটি বিশাল মূর্তি নির্মাণ করে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

রচনাপাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান?



এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন