ইতিহাস

আবদুস সালাম

আবদুস সালাম (Abdus Salam) একজন পাকিস্তানি তাত্ত্বিক পদার্থবিদ যিনি ইলেক্ট্রোউইক ইউনিফিকেশন থিওরি (electroweak unification theory) তে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। কিন্তু প্রায় চার দশক হয়ে গেল, তাঁর এই কৃতিত্বের কথা মনে রাখেনি পাকিস্তান। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের সংসদে আহ্‌মেদীয় মুসলিমদের অমুসলিম আখ্যা দিয়ে একটি বিল পাশ করানো হয় যার প্রতিবাদে দেশ ছাড়েন আবদুস সালাম। তিনিই ছিলেন বিজ্ঞানে নোবেল প্রাপক প্রথম মুসলিম এবং প্রথম পাকিস্তানি বিজ্ঞানী। পাকিস্তানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ছিলেন আবদুস সালাম। পরবর্তীকালে তাঁর উদ্যোগেই স্থাপিত হয় ‘স্পেস অ্যাণ্ড আপার অ্যাটমোস্ফিয়ার রিসার্চ কমিশন’। কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের জগতে তাঁর অবদান অত্যন্ত স্মরণীয়। পাটি-সালাম মডেল, ম্যাগনেটিক ফোটন, ভেক্টর মেসন, গ্র্যাণ্ড ইউনিফায়েড তত্ত্ব ইত্যাদি আবদুস সালামের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।

১৯২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি পাঞ্জাবের একটি মুসলিম পরিবারে আবদুস সালামের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম চৌধুরী মহম্মদ হুসেইন এবং মায়ের নাম ছিল হাজিরা হুসেইন। আহমেদীয় আন্দোলনের প্রভাবেই পাঞ্জাবে বসতি গড়ে উঠেছিল তাঁদের। আবদুস সালামের ঠাকুরদাদা গুল মহম্মদ একাধারে একজন পদার্থবিদ এবং একজন আধ্যাত্মিক ছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন পেশায় পাঞ্জাব রাজ্য শিক্ষা বিভাগের অধীনে একজন অফিসার।

পাঞ্জাবে প্রাথমিক শিক্ষা চলাকালীনই আবদুস সালামের প্রতিভার স্ফূরণ ঘটে। ১৪ বছর বয়সে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনিই সবথেকে বেশি নম্বর পেয়ে রেকর্ড গড়েন যার ফলে লাহোরের গভর্নমেন্ট কলেজ ইউনিভার্সিটিতে একটি বৃত্তিসহ পড়ার সুযোগ পান তিনি। ঊর্দু এবং ইংরেজি সাহিত্য ছিল সালামের প্রিয় বিষয়। লাহোরে এক মাস পড়ার পরে তিনি বম্বে চলে যান উচ্চশিক্ষার জন্য। ১৯৪৭ সালে পুনরায় তিনি লাহোরে ফিরে আসেন এবং গণিত নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা শুরু করেন আবদুস সালাম। চতুর্থ বর্ষে পড়ার সময়েই শ্রীনিবাস রামানুজনের গণিতকেন্দ্রিক সমস্যাগুলির সমাধান সম্বলিত একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন তিনি। ১৯৪৪ সালে গণিতে স্নাতক উত্তীর্ণ হন আবদুস সালাম। তাঁর বাবা চাইতেন সালাম একজন আইসিএস অফিসার হবেন, রেলওয়ের পরীক্ষাও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এবং কম বয়সের কারণে তাঁর আবেদন খারিজ হয়ে যায়। ১৯৪৬ সালে লাহোরের গভর্নমেন্ট কলেজ ইউনিভার্সিটি থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন সালাম। পরে ১৯৪৯ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সেন্ট জন কলেজ থেকে গণিত এবং পদার্থবিদ্যায় ডাবল ফার্স্টক্লাস অর্জন করেন তিনি। ১৯৫০ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্মিথ পুরস্কার লাভ করেন সালাম। কেমব্রিজের ক্যাভেন্ডিশ গবেষণাগার থেকে আবদুস সালাম তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার শিরোনাম ছিল ‘ডেভেলপমেন্টস ইন কোয়ান্টাম থিওরি অফ ফিল্ডস’। ১৯৫১ সালে তাঁর এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পায় এবং তিনি অ্যাডামস পুরস্কার লাভ করেন। গবেষণা চলাকালীন তাঁর তত্ত্বাবধায়করা তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য পল ডিরাক এবং রিচার্ড ফাইনম্যান কথিত একটি প্রায় অসম্ভব সমস্যার সমাধান এক বছরের মধ্যে নির্ণয় করতে বলেন মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই যার সমাধান তিনি বের করে ফেলেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৯৫১ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের পরে লাহোরের গভর্নমেন্ট কলেজ ইউনিভার্সিটিতে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন আবদুস সালাম। ১৯৫২ সালে নিকটবর্তী পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হবার আমন্ত্রণ পান তিনি। সেখানে অধ্যাপনাকালীন সময়ে স্নাতক স্তরের সিলেবাসে কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অনুমতিক্রমে সালাম ছাত্র-ছাত্রীদের একটি সান্ধ্যকালীন ক্লাস নিয়ে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা পড়াতে শুরু করেন। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সের অন্যতম প্রথম সদস্য হন তিনি। ১৯৫৩ সালের লাহোর দাঙ্গার কারণে লাহোর ছেড়ে ১৯৫৪ সালে তিনি সেন্ট জন কলেজে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে লণ্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে পড়ানোর আমন্ত্রণ পান তিনি। পল ম্যাথিউস এবং আবদুস সালামের উদ্যোগেই ইম্পেরিয়াল কলেজে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা বিভাগ গড়ে ওঠে। ঐ বছরই কণা পদার্থবিদ্যায় বিশেষ অবদানের জন্য পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানীয় ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত করে। এরপরে পাকিস্তানে তাঁর ছাত্রদের জন্য তিনি একটি বৃত্তি চালু করেন। কেমব্রিজে এবং ইম্পেরিয়াল কলেজে পাকিস্তানি ছাত্রদের নিয়ে আবদুস সালাম একটি তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের গোষ্ঠী গড়ে তোলেন। ১৯৫৯ সালে মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে রয়্যাল সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেন সালাম। ঐ বছরই তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে সদস্যপদ লাভ করেন যেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় বিখ্যাত বিজ্ঞানী ওপেনহাইমারের এবং ওপেনহাইমারকে সালাম নিউট্রিনো বিষয়ে নিজের গবেষণাপত্রটি দেখিয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর বিদেশি সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন আবদুস সালাম।

কোয়ান্টাম তড়িৎ-গতিবিদ্যা এবং কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের ক্ষেত্রে আবদুস সালাম বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল তাঁর। পাকিস্তানি বিজ্ঞানী হিসেবে তিনিই প্রথম তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা এবং গণিতের উপর বহুল গবেষণা করেন। নিউট্রিনোর বিষয়ে গবেষণায় তিনিই প্রথম চিরাল সামঞ্জস্যের তত্ত্বটি আবিষ্কার করেন আর তাঁর এই আবিষ্কারই পরে ইলেক্ট্রোউইক ইন্টার‍্যাকশন তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। প্রোটন ক্ষয়ের ধারণাকে প্রাধান্য দিয়ে আবদুস সালামই প্রথম হিগ্‌স-বোসন কণার অস্তিত্বের কথা স্বীকার করেন। ১৯৬৩ সালে ভেক্টর মেসন সম্পর্কে তাঁর গবেষণা প্রকাশ পায়। ১৯৭২ সালে ইন্দো-আমেরিকান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ যোগেশ পাটির সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন আবদুস সালাম এবং তাঁর সঙ্গে কাজের সুবাদেই কণা পদার্থবিদ্যার উচ্চতর গবেষণার ফলে পাতি-সালাম মডেল তৈরি হয়। পদার্থবিদ্‌রা মনে করেন, বিশ্বের তিনটি প্রধান শক্তি হল অভিকর্ষ বল, শক্তিশালী ও দুর্বল নিউক্লীয় বল এবং তড়িৎ-চুম্বকীয় বল। ১৯৫৯ সালে বিজ্ঞানী গ্ল্যাশো এবং ওয়েইনবার্গের সঙ্গে কাজ করে আবদুস সালাম এই তিনটি শক্তির একত্রীকরণ বিষয়ে গবেষণা সম্পূর্ণ করেন। সালাম দেখান যে, নিউক্লীয় বল এবং তড়িত-চুম্বকীয় বল উভয়ে একত্রে মিশে যেতে পারে। ১৯৬৭ সালে ইলেক্ট্রোউইক একীকরণ তত্ত্বকে গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন এবং অবশেষে তাঁর গবেষণাপত্র জমা দেন। এই কাজের জন্যেই পদার্থবিদ্যার জগতে ১৯৭৯ সালে আবদুস সালাম, গ্ল্যাশো এবং ওয়েইবার্গ নোবেল পুরস্কার পান।

পাকিস্তান পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রথম সদস্য হন আবদুস সালাম। তাঁরই উদ্যোগে ১৯৬১ সালে স্থাপিত হয় স্পেস অ্যাণ্ড আপার অ্যাটমোস্ফিয়ার রিসার্চ কমিশন। ঐ বছরই নাসা পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশে তাদের প্রথম উড়ান পরীক্ষন কেন্দ্র স্থাপন করে। ১৯৬৭ সালে কেন্দ্রীয় স্তরে তাত্ত্বিক ও কণা পদার্থবিদ্যার উপর নানাবিধ গবেষণা পরিচালনার ভার নেন তিনি। পাকিস্তানের পরমাণু শক্তির উন্নয়নের জন্য সালামের গুরুত্বপূর্ণ অবদান অবিস্মরণীয়। তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের অনুমোদন পেয়ে সালাম করাচি পরমাণু শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করেন। তাঁর উদ্যোগে এবং উৎসাহেই কানাডা এবং পাকিস্তানের মধ্যে পরমাণু শক্তি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৬৫ সালে। জুলফিকার আলি ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে পাকিস্তানের পরমাণু শক্তি সামর্থ্যের উন্নতিকল্পে আবদুস সালামের কর্তৃত্বকে খণ্ডন করেন তিনি এবং সংসদে একটি বিল পাশ করে আহ্‌মেদীয় মুসলিমদের অমুসলিম বলে ঘোষণা করেন। ফলে সারা দেশ জুড়ে বিক্ষোভ ওঠে। এর প্রতিবাদে সালাম দেশ ত্যাগ করেন, কিন্তু পরে পাকিস্তানের পরমাণু শক্তি কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ অটুট রেখেছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তিনি মার্কিন মুলুকে চলে যান এবং পরে ফিরে এসে ১৯৭২ সালের পর থেকে পাকিস্তানে নিউক্লীয় অস্ত্র নির্মাণের কর্মকাণ্ডে আবদুস সালাম নেতৃত্ব দেন।

১৯৬৪ সালে আবদুস সালাম স্থাপন করেন ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স’ এবং ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এর নির্দেশক পদে বহাল ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে এই সংস্থার নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘আবদুস সালাম ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স’ হয়। পাকিস্তানে বিজ্ঞানের প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে তিনি ইন্টারন্যাশন্যাল নাথিয়াগালি সামার কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’ প্রতিষ্ঠা করেন আবদুস সালাম।

১৯৯৬ সালের ২১ নভেম্বর সত্তর বছর বয়সে ইংল্যাণ্ডের অক্সফোর্ডে প্রগ্রেসিভ সুপ্রানিউক্লিয়ার প্যালসিতে আক্রান্ত হয়ে আবদুস সালামের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য