ইতিহাস

পল ডির‍্যাক

পল অ্যাড্রিয়েন মরিস ডির‍্যাক (Paul Adrien Maurice Dirac) বিশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ। তাঁর আবিষ্কৃত ডির‍্যাক সমীকরণ থেকে প্রথম অ্যান্টি ম্যাটারের সম্ভবনা জানা যায়। আইন্সটাইনের আপেক্ষিকতাবাদ হোক বা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তত্ত্ব সব ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর মৌলিক অবদান রেখেছেন। আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে পল ডির‍্যাকের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১৯০২ সালের ৮ অগস্ট ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে (Bristol) পল ডির‍্যাকের জন্ম হয় এবং বড় হয়ে ওঠেন বিশপ্‌টন (Bishopton) এলাকায়। তাঁর বাবা চার্লস অ্যাড্রিয়েন লাডিস্লাস ডির‍্যাক (Charles Adrien Ladislas Dirac) ছিলেন ফরাসি ভাষার একজন শিক্ষক। তাঁর মা ফ্লোরেন্স হ্যানা ডির‍্যাক (Florence Hannah Dirac) ছিলেন ব্রিস্টন কেন্দ্রীয় পাঠাগারের (Briston Central Library) একজন গ্রন্থাগারিক।

পল ডির‍্যাকের ছোটবেলা কেটেছে খুবই যন্ত্রণায়। কারণ তাঁর বাবা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অনুশাসনে তাঁর সন্তানদের মানুষ করতে চাইতেন। তিনি বাড়িতেও তাঁদের ফরাসি ভাষায় কথা বলতে বাধ্য করতেন। ফরাসি ভাষায় ততটা সাবলীল না হওয়ায় পল ডির‍্যাক নিজের মনের কথা প্রকাশ করতে পারতেন না, ফলস্বরূপ চুপ করে থাকতেন। ছোটোবেলার এই ঘটনা তাঁর গোটা জীবনে প্রভাব ফেলেছে। সারাজীবন তিনি অত্যন্ত অন্তর্মুখী স্বভাবের একজন মানুষ হিসেবেই পরিচিত হয়েছেন।

প্রাথমিকভাবে তিনি বিশপ রোড প্রাইমারি স্কুলে (Bishop Road Primary School) পড়াশোনা করেছেন। পরে তিনি মার্চেন্ট ভেঞ্চার্স টেকনিকাল কলেজে (Merchant Ventures Technical College) ভর্তি হন। এরপরে ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Bristol) ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। স্নাতক হওয়ার আগেই কেমব্রিজের সেন্ট জন্স কলেজে (St. John’s College, Cambridge) প্রবেশিকা পরীক্ষায় বৃত্তিসহ উত্তীর্ণ হন। কিন্তু কেমব্রিজে থেকে পড়াশোনা করার মতো অর্থ না থাকায় তিনি সেখানে ভর্তি হতে পারেননি। তার পরিবর্তে তিনি ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আবার অঙ্কে স্নাতক হন।

১৯২৩ সালে দ্বিতীয়বার স্নাতক হওয়ার পরে তিনি ডিপার্মেন্ট অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (Department of Scientific and Industrial Research) থেকে আবার বৃত্তি পান। ব্রিস্টলে পড়াশোনা করাকালীন সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ, কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ জন্মায়। এরপরই তিনি র‍্যালফ ফাওলারের (Ralph Fowler) তত্ত্বাবধানে এই বিষয়গুলি নিয়ে এগোতে শুরু করেন। ১৯২৫ থেকে ১৯২৮ পর্যন্ত তিনি রয়াল কমিশন ফর দ্য এক্সিবিশন ১৮৫১ (Royal Commision for the Exhibition 1851) থেকে ১৮৫১ রিসার্চ ফেলোশিপ (1851 Research Fellowship) করেন। ১৯২৫ সালে ওয়ার্নার হেইসেনবার্গ (Werner Heisenberg) কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে কথা বলার পর পরই তিনি এই বিষয় নিয়ে কাজ করা শুরু করে দেন। ১৯২৬ সালে তিনি তাঁর গবেষণা শেষ করেন। উল্লেখ্য যে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ওপর প্রথম থিসিসটিই ছিল পল ডির‍্যাকের গবেষণার বিষয়।

১৯২৭ সালে তিনি অংশগ্রহণ করেন সোলভে কনফারেন্সে (Solvay Conference), যেখানে তৎকালীন বিশ্বের কিংবদন্তী ২৯ জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। এই কনফারেন্সটি পল ডির‍্যাকের পরবর্তী বিজ্ঞানচর্চাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। ১৯২৮ সালে ইলেকট্রনের তরঙ্গরূপের (Wave Function) গতির জন্য একটি আপেক্ষিক সমীকরণ হিসেবে তিনি বিখ্যাত ‘ডির‍্যাক সমীকরণের’ (Dirac Equation) প্রস্তাবনা দেন। এই কাজটিই পজিট্রনের অস্তিত্ব, প্রতিবস্তুর তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর ধারণাকে দৃঢ় করে তোলে। এর পাশাপাশি আপেক্ষিক প্রপঞ্চ (Relativistic Phenomenon) হিসেবে কোয়ান্টাম স্পিনের (Quantum Spin) উৎস সংক্রান্ত ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও তিনি অবদান রেখেছেন। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তত্ত্বে কোয়ান্টাম স্টেটকে (Quantum State) বর্ণনা করার জন্য তিনি ‘ব্রাকেট নোটেশন’ (bra-ket notation) বা ডির‍্যাক নোটেশন (Dirac Notation) সৃষ্টি করেন।

১৯৩০ সালে তাঁর লেখা একটি বই ‘প্রিন্সিপলস অফ কোয়ান্টাম মেকানিক্স’ (Principles of Quantum Mechanics) বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি মাইলস্টোন বলে বিবেচিত হয়। গোটা বিশ্বের কাছে পল ডির‍্যাক কোয়ান্টাম তত্ত্বকে এক অনন্য ভঙ্গিতে তুলে ধরেন। এটি আজও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি বিশ্বাসযোগ্য পাঠ্যবই। ১৯৩১ সালে তিনি তড়িৎচুম্বকত্ব (Electromagnetism) এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে উৎসাহী হয়ে পড়েন। চুম্বকের একমেরুত্ব নিয়ে তিনি গবেষণাও চালান।

১৯৩২ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে তিনি কেমব্রিজে অঙ্কের অধ্যাপক (Lucasian Professor of Mathematics) হিসেবে নিযুক্ত হন। পরবর্তী ৩৭ বছর তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। পরবর্তীকালে ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে (Florida State University) তিনি বহিরাগত অধ্যাপক (Visiting Professor) হিসেবে পড়ান। ১৯৩০ এর দশকের শুরুর দিকে তিনি ভ্যাকুয়াম পোলারাইজেশনের (Vacuum Polarisation) ধারণা দেন। তিনি কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রোডায়ানামিক্সের (Quantum Electrodynamics) ক্ষেত্রও প্রস্তুত করেন। এই শব্দবন্ধটিও প্রথম তিনিই ব্যবহার করেন।

১৯৩৭ সালে পল ডির‍্যাক মার্গিট উইগ্নারকে (Margit Wignar) বিয়ে করেন। তিনি মার্গিটের দুই কন্যা জুডিথ (Judith) এবং গ্যাব্রিয়েলকে (Gabriel) দত্তক নেন। পরে তাঁদের দুই কন্যা সন্তানও হয়, যাদের নাম ছিল মেরি এলিজাবেথ (Mary Elizabeth) এবং ফ্লোরেন্স মনিকা (Florence Monica)।

বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে পল ডির‍্যাকের যুগান্তকারী কীর্তির জন্য তিনি একাধিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো নোবেল পুরস্কার। ১৯৩৩ সালে তিনি এবং এরভিন শ্রোডিঙ্গার (Erwin Schrodinger) পারমাণবিক তত্ত্বে নতুন উৎপাদনক্ষম রূপ আবিষ্কারের জন্য যৌথভাবে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। এছাড়াও, তিনি ১৯৩৯ সালে রয়্যাল মেডাল (Royal Medal), ১৯৫২ সালে কোপলে মেডাল (Copley Medal) এবং ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক মেডাল (Max Planck Medal) পান। ১৯৩০ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটির একজন ফেলো নির্বাচিত হন। এছাড়াও, ১৯৪৮ সালে আমেরিকান ফিজিকাল সোসাইটির এবং ১৯৭১ সালে ইন্সটিটিউট অফ ফিজিক্সের ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে তিনি জে. রবার্ট ওপেনহেইমার মেমোরিয়াল প্রাইজের (J. Robert Oppenheimer Memorial Prize) প্রারম্ভিক পুরস্কারটি পান।

১৯৮৪ সালের ফ্লোরিডার তালাহাসিতে (Tallahassee) ২০ অক্টোবর পল ডির‍্যাকের মৃত্যু হয়। তাঁকে তালাহাসিতেই রোজলন কবরখানায় (Roselawn Cemetary) কবর দেওয়া হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।