ইতিহাস

কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহ

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নায়ক হলেন কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহ (Kazi Mohammed Shafiullah) যিনি মূলত কে. এম. শফিউল্লাহ নামেই অধিক পরিচিত। তিনি বাংলাদেশের একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনানায়ক। বাংলাদেশ সেনার প্রাক্তন সেনাপ্রধান ছিলেন কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহ। শুধু সেনাবাহিনীই নয়, পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতেও অংশগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের আওয়ামি লিগের একজন সাংসদ ছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের যে কান্ডারীরা এখনও জীবিত অবস্থায় রয়েছেন তাঁদের মধ্যে কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহ বিশেষ উল্লেখের দাবিদার।  

১৯৩৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকার নারায়ণগঞ্জ জেলায় কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহের জন্ম হয়। তিনি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল এবং দ্বিতীয় প্রধান ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি দ্বিতীয় পূর্ববঙ্গ রেজিমেন্ট কম্যান্ডের দ্বিতীয় প্রধান ছিলেন। দ্বিতীয় পূর্ববঙ্গ রেজিমেন্ট কম্যান্ডের দ্বিতীয় প্রধান হিসেবে কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহ ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ বিদ্রোহ ঘোষণা করা প্রথম বাঙালি সেনা আধিকারিক ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বাংলাদেশ সৈন্যবাহিনী্র সেক্টর ৩-এর সেক্টর কম্যান্ডার ছিলেন। তাঁর সেক্টরের সদর দপ্তর ছিল ভারত। মুক্তিযুদ্ধের গোটা সময়টা তিনি ভারতেই ছিলেন। সিলেটের তেলিয়াপারা থেকে তিনি তাঁর দলকে নির্দেশ দিতেন। তাঁর সেক্টরের এলাকাগুলি ছিল ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, এবং কুমিল্লার কিছু অংশ, যা এখন ব্রাহ্মণবেড়িয়া জেলা নামে পরিচিত। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে তিনজন কম্যান্ডারের পদবীর শুরুর অক্ষর দিয়ে নামকরণ করে তিনটি ব্রিগেড তৈরি করা হয়। এই তিনটি ব্রিগেডের মধ্যে কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহকে ‘এস ফোর্স’ (S-force) নামক ব্রিগেডের প্রধান ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্সে বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ করার সময় কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহ সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর সাহসিকতা এবং অধ্যাবসায়ের জন্য বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনা সম্মান ‘বীর উত্তম’ মেডেল দেওয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামি লিগের সরকার ১৯৭২ সালের ৫ এপ্রিল কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহকে বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর সেনাপ্রধান হিসেবে নিযুক্ত করে। ৭ এপ্রিল জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানি (M. A. G. Osmani) পদত্যাগ করলে বাংলাদেশ সেনার কম্যান্ড কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহকে দেওয়া হয়।

তিনি বাংলাদেশের সেনাপ্রধান থাককালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। তিনি জানান যে, মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। ফলতঃ তিনি তাঁকে খুন হওয়া থেকে বাঁচাতে পারেননি। ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট পরবর্তী মুস্তাক সরকার তাঁকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে বরখাস্ত করলে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিশ্বস্ততার কারণে সন্দেহের বশে কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহকে তাঁর বন্ধু বাংলাদেশ বায়ুসেনা প্রধান এ. কে. খন্দকরের (A. K. Khandker) সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের হিসেবে বিদেশে প্রেরণ করা হয়।

কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহ মালয়েশিয়াতে প্রথম বাংলাদেশী হাই কমিশনার নিযুক্ত হন। এছাড়াও তিনি কানাডা, দক্ষিণ আমেরিকাতে বাংলাদেশের হাই কমিশনার নিযুক্ত হন এবং তাঁকে স্ক্যান্ডেনেভিয়ার রাষ্ট্রদূত করেও পাঠানো হয়। শেষ পর্যন্ত  তিনি লন্ডনে বাংলাদেশের হাই কমিশনার নিযুক্ত হন। স্বভাবজাত কূটনৈতিক ক্ষমতাবলে কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং একাধিক কূটনৈতিক সমস্যাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। যে যে দেশে তিনি কাজ করেছেন সেই দেশগুলির সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। লন্ডনে থাকাকালীন তিনি ছিলেন কমনওয়েলথের প্রবীণতম রাষ্ট্রদূত যিনি বিগত ২০ বছর ধরে নতুনভাবে গঠিত বাংলাদেশের মূল্যবোধ এবং লক্ষ্যকে সারা বিশ্বে প্রচার করেছেন।

১৯৯০ সালে কূটনৈতিক পরিষেবা থেকে অবসর নিয়ে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লিগের সাংসদ নির্বাচিত হয়ে কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহ জাতীয় পরিষেবার সামাজিক স্তরে নিজেকে পুনরায় নিয়োজিত করেন। রূপগঞ্জ সাংবিধানিক এলাকার সাংসদ হিসেবে তিনি এলাকার রাস্তা নির্মাণ, জনসাধারণের কর্মসংস্থান সহ বিবিধ উন্নয়ন করেন। দু বার সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নেন।

বাংলাদেশের প্রবীণতম সেনা আধিকারিক হিসেবে ২০১৪ সালে তাঁকে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতিত্ব করতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যে অপরাধীরা নৃশংসতার জন্য দায়ী ছিলেন তাঁদের বিরুদ্ধে এই সংঘের মাধ্যমে বিভিন্ন মিছিল প্রতিবাদ সভাতে তিনি নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবের আদর্শে দীক্ষিত কাজি মুহাম্মদ শফিউল্লাহ দুর্নীতি এবং দারিদ্যের বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন।

  • telegram sobbanglay

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বুনো রামনাথ - এক ভুলে যাওয়া প্রতিভা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন