বিরজু মহারাজ

বিরজু মহারাজ

ভারতের এক কিংবদন্তী কত্থক নৃত্যশিল্পী এবং এই ধারার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে ইতিহাসে বিখ্যাত বিরজু মহারাজ (Birju Maharaj)। শ্রী আছান মহারাজের একমাত্র পুত্র তথা শিষ্য হিসেবেও বিখ্যাত তিনি। বহু দেশে নৃত্য উপস্থাপন করেছেন তিনি। তাছাড়া হিন্দুস্তানি ধ্রুপদী সঙ্গীতের চর্চাতেও তিনি ছিলেন অতুলনীয় – ঠুমরি, দাদরা, গজল, ভজন ইত্যাদি ঘরানার গান তিনি দুর্দান্ত গাইতে পারতেন। মাত্র সাত বছর বয়সে প্রথম নৃত্য পরিবেশন করেন তিনি। শুধু নৃত্যশিল্পীই নয়, বিরজু মহারাজ একইসঙ্গে একজন মরমি কবি এবং সুবক্তা। লক্ষ্ণৌ কেন্দ্রিক ‘কল্কা-বিন্দাদিন’ নামের এক বিশেষ ঘরানার কত্থকের প্রচলন ও চর্চার জন্য তিনি ভারত সহ সমগ্র বিশ্বে বিখ্যাত হয়ে আছেন। ‘ভারতীয় কলা কেন্দ্র’ এবং নয়া দিল্লির ‘কত্থক কেন্দ্র’-তে তাঁর কাকা শম্ভু মহারাজের সাথে নৃত্য চর্চা করতেন বিরজু মহারাজ। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ‘কত্থক কেন্দ্র’-এর প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। এই পদ থেকে অবসর নেওয়ার পরে বিরজু মহারাজ নিজের একটি নাচের স্কুল খোলেন ‘কলাশ্রম’ নামে। পাশ্চাত্যের দেশগুলিতেও সুপরিচিত তাঁর নাম। শুধুই একক নৃত্য প্রদর্শন নয়, বেশ কিছু হিন্দি চলচ্চিত্রেও কোরিওগ্রাফি করেছেন বিরজু মহারাজ।

১৯৩৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে এক ঐতিহ্যবাহী কত্থক নৃত্যশিল্পীর পরিবারে বিরজু মহারাজের জন্ম হয়। তাঁর বাবা জগন্নাথ মহারাজ এবং দুই কাকা শম্ভু মহারাজ ও লাচ্ছু মহারাজ প্রত্যেকেই বিখ্যাত কত্থক নৃত্যশিল্পী। তাঁর মায়ের নাম আম্মাজি মহারাজ। তাঁর বাবা ভারতীয়দের কাছে পরিচিত আছান মহারাজ নামে যিনি লক্ষ্ণৌ ঘরানার নৃত্যে অত্যন্ত পারদর্শী। রায়গড় এস্টেটের রাজ দরবারে নৃত্য প্রদর্শন করতেন তিনি। বিরজু মহারাজের আসল নাম ছিল ব্রিজমোহন মিশ্র। খুব ছোটোবেলাতেই নাচের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তিনি। পুরো ভারত জুড়ে তাঁর বাবার সঙ্গে বিভিন্ন সঙ্গীত সম্মেলনে নৃত্য উপস্থাপন করতে যেতেন বিরজু মহারাজ। বাবাই ছিল তাঁর কাছে নাচের জগতের আদর্শ। কানপুর, এলাহাবাদ, গোরক্ষপুর, জৌনপুর, দেরাদুন, মধুবনী, কলকাতা, মুম্বাই প্রভৃতি বহু জায়গায় শৈশব এবং কৈশোরেই নৃত্য উপস্থাপন করেছিলেন তিনি। মাত্র নয় বছর বয়সে ১৯৪৭ সালে বিরজুর বাবা মারা যান। তারপর থেকে তাঁর দুই কাকার কাছেই নাচের তালিম নিতে থাকেন তিনি। খুব শীঘ্রই তিনি নিজের এক স্বতন্ত্র শৈলী গড়ে তোলেন। তাঁর বাবা আর দুই কাকার পৃথক পৃথক শৈলীর মিশ্রণেই বিরজু মহারাজের নিজস্ব শৈলী গড়ে উঠেছিল। অনেকে বলে থাকেন তাঁর বাবার থেকে ঘাড় আর মুখের নানাবিধ সঞ্চালনের কৌশল শিখেছিলেন বিরজু আর তাঁর দুই কাকার থেকে তিনি আয়ত্ত করেছিলেন শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সচলতা। বিরজু মহারাজের দুই পুত্রের নাম দীপক মহারাজ এবং জয় কিষেণ মহারাজ এবং তাঁর তিন কন্যার মধ্যে মমতা মহারাজ পরবর্তীকালের বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পীর মর্যাদায় উন্নীত হয়েছিলেন।

১৩ বছর বয়স থেকেই দিল্লির ‘সঙ্গীত ভারতী’ সংস্থায় নাচ শেখাতে শুরু করেন বিরজু মহারাজ। এত ছোট বয়সে লক্ষ্মৌ ছেড়ে দিল্লি চলে আসাটা তাঁর পক্ষে খুবই সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। মাঝে মাঝে দিল্লির রাস্তায় পথ হারিয়ে ফেলতেন তিনি। রিগ্যাল সিনেমা হলের দিকনির্দেশ মনে রেখে তিনি ফের রাস্তা ঠিক করতেন বলে পরবর্তীকালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন। এই রিগ্যাল সিনেমায় বহু ছবি দেখেছেন তিনি। ক্রমে ক্রমে দিল্লিই তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি হয়ে ওঠে। কিছুদিন পরেই দিল্লির ভারতীয় কলা কেন্দ্রে নাচ শেখাতে শুরু করেন তিনি। কয়েক বছর পরে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমির নিজস্ব নৃত্যচর্চা কেন্দ্র ‘কত্থক কেন্দ্র’-এ নাচ শেখাতে থাকেন বিরজু মহারাজ। ক্রমে এই সংস্থার প্রধান ও ডিরেক্টর পদে উন্নীত হন তিনি। ১৯৯৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন তিনি এবং তারপরে তিনি নিজের একটি নাচের স্কুল তৈরি করেন ‘কলাশ্রম’ নামে। নৃত্য প্রশিক্ষক হিসেবে নতুন নতুন দিশা দেখতে শুরু করেন বিরজু মহারাজ, কত্থক ধরানার নানাবিধ নতুন আঙ্গিক নিয়ে চর্চা শুরু হয় তাঁর। তাঁর কাছে ধ্রুপদী নৃত্যই ঈশ্বরকে পাবার পথ তথা পরমেশ্বরকে স্পর্শ করার মাধ্যম। নৃত্যচর্চাকে তিনি একটি সাধনা বলেই মনে করেছেন। বিরজু মহারাজ মনে করেন নৃত্যশিল্পী হিসেবে সঙ্গীতের বিভিন্ন ধারা এবং বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করলে তা শিল্পে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। এর সঙ্গে ধ্যান এবং যোগ সাধনাও দরকার কারণ কত্থক নৃত্য আসলে শ্বাস নিয়ন্ত্রণের খেলা। এই বিশেষ প্রকার নাচের জন্য শারীরিক সক্ষমতাও থাকা জরুরি।

বলিউডের বহু হিন্দি ছবিতে কোরিওগ্রাফি করেছেন বিরজু মহারাজ। সত্যজিৎ রায়ের ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’ ছবির জন্য একটি গান লিখেছিলেন তিনি এবং দুটি নৃত্যদৃশ্যে গানও গেয়েছিলেন। এছাড়াও ‘দেধ ইসকিয়া’, ‘বাজিরাও মস্তানি’, ‘উমরাও জান’ ইত্যাদি ছবিতে কত্থক নাচের কোরিওগ্রাফি করেছেন বিরজু মহারাজ। ২০০২ সালে শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত একটি হিন্দি ছবিতে ‘কাহে ছেড় মোহে’ গানের নৃত্যদৃশ্যের কোরিওগ্রাফি করেছিলেন তিনি। এরপরে ২০১৩ সালে দক্ষিণ ভারতীয় ছবি কমল হাসান অভিনীত ‘বিশ্বরূপম’-এ ‘উন্নাই কন্নথা নান’ গানের নৃত্য পরিকল্পনাও করেছিলেন বিরজু মহারাজ। একজন বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী হওয়ার পাশাপাশি ধ্রুপদী সঙ্গীতের জগতে ঠুমরি, দাদরা, গজল এবং ভজন গানেও তাঁর দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে তবলা আর বেহালা বাজাতেও পারদর্শী ছিলেন বিরজু মহারাজ। বহু কবিতাও লিখেছেন তিনি, লিখেছেন গানও। লক্ষ্ণৌয়ের ‘কল্কা-বিন্দাদিন’ নামের এক বিশেষ কত্থক নৃত্যের ঘরানার পথিকৃৎ শিল্পী ছিলেন তিনি। বিরজু মহারাজ ভালোবাসতেন যন্ত্রপাতি খোলাপড়া করতে এবং জ্যাকি চ্যান, সিলভেস্টার স্ট্যালোন প্রমুখদের ছবি দেখতে। অনেক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেওছেন যে নৃত্যশিল্পী না হলে তিনি হয়তো গাড়ির মেকানিক হতেন।

১৯৬৪ সালে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার পান বিরজু মহারাজ। ১৯৮৬ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করে। এরপরে ১৯৮৭ সালে কালিদাস সম্মান, ২০০২ সালে লতা মঙ্গেশকর পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। ইন্দিরা কলা সঙ্গীত বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় বিরজু মহারাজকে সম্মানীয় ডক্টরেট ডিগ্রিতে ভূষিত করেছে। তাছাড়া সংগ্রাম কলা পুরস্কার, ভারত মুনি পুরস্কার, অন্ধ্র রত্ন, নৃত্য বিলাস পুরস্কার, সোভিয়েত ল্যাণ্ড নেহেরু অ্যাওয়ার্ড, ন্যাশনাল নৃত্য শিরোমণি পুরস্কার, রাজীব গান্ধী ন্যাশনাল সদ্‌ভাবনা পুরস্কারের শিরোপা রয়েছে তাঁর মুকুটে। ২০১২ সালে বিশ্বরূপম ছবির কোরিওগ্রাফির জন্য ‘ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট কোরিওগ্রাফি’ লাভ করেন তিনি। ২০১৬ সালে ‘বাজিরাও মস্তানি’ ছবির কোরিওগ্রাফির জন্য বিরজু মহারাজ ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান।

২০২২ সালের ১৭ জানুয়ারি ৮৩ বছর বয়সে দিল্লিতে তাঁর নিজের বাড়িতেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বিরজু মহারাজের মৃত্যু হয়।       

আপনার মতামত জানান