সববাংলায়

মিজানুর রহমান চৌধুরী

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস রচিত হলে সেখানে যেসব প্রতিভাবান ও কর্মঠ রাজনীতিবিদদের প্রসঙ্গ উঠে আসবে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী (Mizanur Rahman Chowdhury)। শিক্ষকতা ও সরকারী চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদান করেছিলেন তিনি। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে উচ্চ প্রশাসনিক পদের দায়িত্ব, সর্বোপরি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদের দায়িত্ব নিষ্ঠা এবং সততার সঙ্গে পালন করেছিলেন তিনি। রক্তাক্ত ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে, ছয় দফা আন্দোলন কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইতে যাঁদের অবদান অনস্বীকার্য, মিজানুর রহমান চৌধুরী তাঁদেরই একজন। একাধিকবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং বহুবার জেলও খেটেছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এমনকি সাধারণ সম্পাদকের পদও অলঙ্কৃত করেছিলেন। মাঝে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিলেও মিজানুর রহমান চৌধুরী মৃত্যুর আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই সংযুক্ত ছিলেন।

১৯২৮ সালের ১৯ অক্টোবর চাঁদপুর জেলার অন্তর্গত পুরানবাজারের পূর্ব শ্রীরামদি গ্রামে (তখন ব্রিটিশ শাসনাধীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি) একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে মিজানুর রহমান চৌধুরীর জন্ম হয়। তাঁর পিতা ছিলেন মোহাম্মদ হাফিজ চৌধুরী (Muhammad Hafiz Chowdhury) এবং তাঁর মায়ের নাম মাহমুদা চৌধুরী (Mahmuda Chowdhury)।

মিজানুরের প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয়েছিল চাঁদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। তারপর সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে তিনি চাঁদপুরেরই নুরিয়া হাই মাদ্রাসা হাইস্কুলে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হন। হাইস্কুলে নিউ স্কিম কোর্সে পড়াশোনা করেন তিনি। বিদ্যালয় পর্ব সফলভাবে অতিক্রম করে উচ্চশিক্ষা লাভ করবার জন্য প্রবেশ করেন ফেনী কলেজে। ১৯৫২ সালে ফেনী কলেজ থেকে স্নাতক হয়েছিলেন তিনি। কলেজ জীবন সূচনার কিছু আগে থেকেই সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন মিজানুর।

মিজানুর রহমান চৌধুরীর কর্মজীবনের সূচনা হয়েছিল নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ থানার তাল মোহাম্মদ হাটের বামনি জুনিয়র হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে। সেই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করাকালীনই প্রাদেশিক পাবলিক সার্ভিস কমিশনে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি সরকারী চাকরি করা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীকালে সেই সরকারী চাকরি থেকেও ইস্তফা দিয়ে নিজেরই প্রাক্তন স্কুল চাঁদপুরের নুরিয়া হাই মাদ্রাসায় বিনা বেতনে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। কিন্তু বৃহত্তর রাজনৈতিক ক্ষেত্রের সঙ্গে ক্রমে আরও বেশি জড়িত হয়ে পড়েছিলেন এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন পদের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি।

মিজানুর রহমান চৌধুরী ১৯৪৪ সালের প্রথম দিক থেকেই সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৪৪ সালেই অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্ট লীগে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর রাজনীতিতে পদার্পণ। এরপর ১৯৪৫ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্ট লীগের কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঠিক এর পরের বছরেই তাঁকে মুসলীম লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল।

১৯৪৮ সালে মিজানুর চাঁদপুর কলেজের মুসলীম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন এবং এর ঠিক দুবছর পরে ১৯৫০ সালে ফেনী কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এরপর ১৯৫২ সালে দেশজুড়ে উর্দু ভাষার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করবার দাবিতে যখন ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, তখন সেই রক্তাক্ত আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী।

১৯৫৯ সালে মিজানুর চাঁদপুর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদেও নির্বাচিত হন তিনি। সেই বছরই আওয়ামী লীগে যোগদান করেছিলেন তিনি। সেই বছর সংসদীয় নির্বাচনে বিধানসভার সংসদ সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের জননিরাপত্তা অধ্যাদেশের অধীনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তাঁকে। যদিও জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের আগেই মুক্তি পান তিনি এবং ১৯৬৫ সালে পুনরায় সংসদে নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে মিজানুর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদের দায়িত্ব লাভ করেন এবং পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুসহ শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতা গ্রেপ্তার হলে এই লীগেরই ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মিজানুর। এই সময়তেই ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনকে সংগঠিত করে তুলতেও মিজানুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৬৬ সালের ৭ জুনের ধর্মঘটের প্রধান সাংগঠনিক আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। এই ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের জেরে ১৯৬৬ সালের ২২ জুন তারিখে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বিধির অধীনে গ্রেপ্তার করা হয় মিজানুরকে। যদিও ১৯৬৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের আদেশে মুক্তি পেয়ে যান তিনি। ১৯৬৮ সালে তিনি সংযুক্ত বিরোধী দলের (COP) আহ্বায়ক হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন।

১৯৬৯ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিমন্ডল গরম হয়ে উঠতে থাকে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান রূপকার হিসেবে মিজানুর রহমান চৌধুরীর নাম করতে হয়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি এবং জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলছিল, তাতেও মিজানুর সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে মালেক উকিল-সহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় চলে গিয়েছিলেন। অবশেষে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন সত্যি হয়েছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে মিজানুর রহমান চৌধুরী প্রথম তথ্য ও বেতার মন্ত্রী হয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে পুনরায় জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হন এবং পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ১৯৭৪ সালে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সংসদীয় সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালে সামরিক বাহিনী দ্বারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হলে মিজানুর রহমান এবং মালেক উকিলের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের দুটি পৃথক ধারা গড়ে ওঠে এবং ১৯৭৭ সালে আওয়ামী লীগের সেই একটি উপদলের সভাপতি হন তিনি। ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদে আবারও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।

আশির দশকের শুরুতে এরশাদের উত্থানের সময় তিনি এরশাদকে সমর্থন করেন এবং ১৯৮৪ এরশাদেরই জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন। ১৯৮৫ সালে ডাক ও টেলিগ্রাফ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ১৯৮৬ সালের মে মাসে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। সেই বছরই ৯ জুলাই এরশাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন মিজানুর। ১৯৮৮ সালের ২৭ মার্চ মন্ত্রীপরিষদ বাতিল হওয়ার আগে পর্যন্ত এই প্রায় দুই বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। ১৯৮৬ সালেই জিম্বাবুয়েতে অষ্টম জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন মিজানুর। ১৯৮৮ সালে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হন এবং পরে আবার ১৯৯১ সালের উপনির্বাচনে জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। তবে ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু ২০০১ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন মিজানুর এবং মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

২০০৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বারডেম হাসপাতালে ৭৭ বছর বয়সে এই প্রতিভাবান রাজনীতিবিদ ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীর মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading