সববাংলায়

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় (Prosenjit Chatterjee) বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অবিসংবাদিত নায়ক। তিরিশ বছরের বেশী সময় ধরে বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করে চলেছেন তিনি। হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’ ছবিতে শিশু শিল্পী হিসাবে আত্মপ্রকাশ তাঁর। তারপর থেকে আজকের কাকাবাবু পর্যন্ত প্রসেনজিৎ দর্শকের কাছে সমান গ্রহনীয়। যেকোনো ধারার ছবিতে তাঁর সাবলীল অভিনয় মুগ্ধ করেছে দর্শককে। বানিজ্যিক ছবির সফল নায়ক থেকে অন্যধারার ছবিতে চরিত্রাভিনেতা প্রসেনজিৎ প্রযোজক হিসাবেও সমান সফল। মূলত বাংলা ও হিন্দি ভাষার সিনেমায় তিনি অভিনয় করে থাকলেও তাঁর অভিনয় করা ইংরেজি ভাষার একমাত্র সিনেমা হল ‘দি লাস্ট লিয়র’।

১৯৬২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্ম হয় প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের। তাঁর বাবা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় একজন বিখ্যাত অভিনেতা। মা রত্না চট্টোপাধ্যায়। তাঁদের দুই সন্তানের প্রথম সন্তান হলেন প্রসেনজিৎ। তাঁর বোন পল্লবী চট্টোপাধ্যায়ও একজন অভিনেত্রী।

প্রসেনজিৎ দশম শ্রেনী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন ক্যালকাটা এয়ারপোর্ট ইংলিশ হাই স্কুলে। তারপর সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন, এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’য় শিশু শিল্পী হিসাবে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর অভিনয় জীবনের যাত্রাপথ শুরু হলেও নায়ক হিসাবে প্রসেনজিৎ-এর প্রথম সিনেমা বিমল রায়ের পরিচালনায়  ‘দুটিপাতা’। সিনেমাটি ১৯৮৩ সালে মুক্তি পায়। ১৯৮৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অমর সঙ্গী’, ১৯৯০ সালের ছবি ‘আপন আমার আপন’,এবং ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আমি, ইয়াসিন আর আমার মধুবালা’ এই তিনটি ছবি তাঁর অভিনয় জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা বলে মনে করা হয়। ‘আপন আমার আপন’ সিনেমার পরিচালক ছিলেন তরুন মজুমদার এবং ‘আমি, ইয়াসিন আর আমার মধুবালা’ ছবির পরিচালক ছিলেন বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত। এছাড়াও সুজিৎ গুহ পরিচালিত  ‘অমর সঙ্গী’ সিনেমার “চিরদিনই তুমি যে আমার” গানটি বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীত জগতে একটি মাইলস্টোন। শতাব্দী রায় ও তাঁর একসাথে করা সিনেমার সংখ্যা পঞ্চাশটিরও বেশী।রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে জুটি বেঁধে পয়ত্রিশটি, ইন্দ্রানী হালদারের সাথে ষোলোটি এবং সবথেকে জনপ্রিয় জুটি হিসাবে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর সাথে তিনি পঞ্চাশটিরও বেশী সিনেমায় অভিনয় করেছেন।

১৯৯০ সালে বলিউডে তাঁর প্রথম ছবি ‘আন্ধিয়া’ মুক্তি পায়। ডেভিড ধাওয়ান ছিলেন ছবিটির পরিচালক। ছবিটিতে প্রসেনজিৎ অভিনেত্রী মুমতাজের ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেন। বানিজ্যিক ছবির সাথে সাথে তিনি অন্য ধারার সিনেমায় সফল হয়ে ওঠেন পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের হাত ধরে। প্রথম ছবি ‘চোখের বালি’ একই সাথে সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল এবং বানিজ্যিক ভাবেও সফল হয়েছিল। অন্যধারার ছবির মধ্যে সৃজিৎ মুখোপাধ্যায়ের ‘অটোগ্রাফ’, ‘জাতিস্মর’, গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষ’, ‘শঙ্খচিল’, ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘দোসর’, ‘সব চরিত্র কাল্পনিক নয়’ তাঁর কেরিয়ারে উল্লেযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৯১ সালে হিন্দি ছবির নায়ক হিসাবে মেহুল কুমার পরিচালিত ‘মিত মেরে মন কি’ সিনেমায় প্রথম অভিনয় করেন। আয়েশা জুলকা, ফিরোজ খান ,সালমা আঘা প্রমুখেরা এই ছবিতে অভিনয় করেন।

প্রসেনজিৎ অভিনীত অন্য হিন্দি ছবিগুলির মধ্যে ‘সোনে কি জঞ্জির’, ‘বীরতা’, ‘সাংহাই’ এবং অতি সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘ট্রাফিক’ দর্শক নন্দিত। প্রযোজক হিসাবে তাঁর প্রথম সিনেমা হল ‘বাপি বাড়ি যা’। সিনেমাটি ৭ ডিসেম্বর ২০১২ সালে মুক্তি পায়। এছাড়াও ‘উড়নচণ্ডী’, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জীবন আধারিত ‘মহালয়া’ বাংলা সিনেমায় অন্য ধারার ছবির জগতে জনপ্রিয় এবং সমালোচকের প্রশংসা পেয়েছে। ‘গানের ওপারে’ ধারাবাহিকটিরয় প্রযোজনা করেছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। লালন ফকির এবং অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির মতো দুটি কিংবদন্তি চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি, এই দুটি ছবিই রাষ্ট্রীয় পুরষ্কারে সম্মানিত হয়েছে। সৃজিৎ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম ছবি ‘অটোগ্রাফ’-এ অরুন কুমার চ্যাটার্জী নামাঙ্কিত রোলে তাঁর অভিনয় এম আই এ এ সি ( Mahindra indo-american arts council) এর চলচ্চিত্র উৎসবে বেস্ট অ্যাক্টরের বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছিল। তাঁর অভিনীত কয়েকটি বিশেষ ধরনের সিনেমার মধ্যে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘ক্ষত’, শিবপ্রসাদ-নন্দিতা মুখোপাধ্যায়ের ‘প্রাক্তন’,-এর নাম করা যায়। স্টার জলসা চ্যানেলে ‘মহানায়ক’ ধারাবাহিকে উত্তম কুমারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। এই সিরিয়ালটির ৯৭টি পর্ব সম্প্রচার হবার পর বন্ধ হয়ে যায়।

জীবনের প্রথম ছবি ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’তে অভিনয়ের জন্য বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের তরফ থেকে পেয়েছিলেন আউটস্ট্যান্ডিং ওয়ার্ক অফ দি ইয়ার পুরষ্কার। অভিনয় জীবনে প্রসেনজিৎ পেয়েছেন অসংখ্য পুরষ্কার। বহুবার পেয়েছেন বি এফ জে এ , কলাকার, ফিল্মফেয়ার ইস্ট সম্মান। ২০১৮ সালে ‘ময়ূরাক্ষী’ ছবির জন্য পেয়েছেন মহানায়ক সম্মান। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফ থেকে পেয়েছেন বঙ্গ বিভূষণ সম্মাননা। ‘দোসর’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ অভিনেতের রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার। তাঁর অভিনয় করা এবং প্রযোজনার সিনেমা ‘নিরন্তর’ দাদাসাহেব ফালকে চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কার পায়।

১৯৯২ সালে তাঁর প্রথম বিয়ে অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়ের সাথে। ১৯৯৫ সালে বিচ্ছেদের পর ১৯৯৭ সালে তিনি অপর্না গুহঠাকুরতাকে বিয়ে করেন। তাঁদের একমাত্র কন্যাসন্তানের নাম প্রেরনা চ্যাটার্জী। ২০০২ সালে দ্বিতীয় বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি অভিনেত্রী অর্পিতা পালকে বিয়ে করেন। তাঁদের একমাত্র পুত্র সন্তানের নাম তৃষানজিৎ।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading