ইতিহাস

পাপিয়া ঘোষ

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষণার জগতে দেশ-জাতি-রাষ্ট্র বিষয়ে কিংবা সাম্প্রদায়িক সমস্যা অথবা দেশভাগের করুণ ইতিহাসে বিহারের প্রেক্ষাপট বিষয়ে তথ্যনিষ্ঠ গবেষণা ও ইতিহাসের সারসত্য তুলে ধরেছিলেন বাঙালি ঐতিহাসিক পাপিয়া ঘোষ (Papiya Ghosh)। দেশভাগকে কেন্দ্র করে ভারতে তৈরি হওয়া সাম্প্রদায়িক সমস্যার সূত্র অনুসন্ধান করেছেন তিনি। বিহারে ছেচল্লিশের দাঙ্গার ফলশ্রুতিতে বহু মুসলিমের হত্যার প্রতিবাদ করেছেন পাপিয়া ঘোষ। একইসঙ্গে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতা করে ‘মুহাজির’দের নিয়ে তিনি গবেষণাঋদ্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন। দেশভাগের ফলে তৈরি হওয়া ভারতীয় মুসলিম এবং বাংলাদেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের মতো সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষায় এগিয়ে এসেছিলেন তিনি এবং চেয়েছিলেন অখণ্ড ভারতে কেবলই হিন্দু প্রাধান্যের বদলে সাম্প্রদায়িক বন্ধন গড়ে উঠুক। এর ফলশ্রুতিতে রক্ষণশীল এবং প্রতিক্রিয়াশীল হত্যাকারীদের হাতে খুন হন পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধাপিকা পাপিয়া ঘোষ।

১৯৫৩ সালের ৮ অক্টোবর সাঁওতাল পরগণার দুমকা শহরে এক অত্যন্ত অভিজাত পরিবারে পাপিয়া ঘোষের জন্ম হয়। তাঁর বাবা উজ্জ্বল কুমার ঘোষ বিহারের একজন আইএএস অফিসার ছিলেন এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল পূর্ণিমা ঘোষ। তাঁদের চার কন্যার মধ্যে পাপিয়া ছিলেন তৃতীয়। ১৯৫৭ সালে এক রাজনৈতিক চক্রান্তের শিকার হয়ে খুন হন পাপিয়ার বাবা এবং চার কন্যার দায়ভার সামলানোর জন্য বাধ্য হয়ে তাঁর মা পূর্ণিমা ঘোষ পাটনার বাঁকিপুর গার্লস স্কুলে একজন স্কুল শিক্ষিকার চাকরিতে যুক্ত হন। ফলে জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই মায়ের তত্ত্বাবধানে ও স্নেহ-সান্নিধ্যে বড়ো হয়েছেন পাপিয়া ঘোষ। মায়ের চাকরির কারণে বাড়িতে তাঁর সান্নিধ্য সেভাবে পেতেন না পাপিয়া। তাঁদের এক পারিবারিক বন্ধু মিস. বক্সী পাপিয়া ও তাঁর বোনেদের দেখাশোনা করতেন। পাপিয়া ঘোষের বাল্যকালে ডাকনাম ছিল গুড্ডু। ছোটোবেলা থেকেই তাঁর বাবা তাঁকে যুদ্ধের গল্প, ছিন্নমূল হয়ে যাওয়া মানুষের গল্প বলতেন। তাঁর বাবা পাতনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের কোয়েটা এবং মায়ানমারে যুদ্ধকালীন সেনা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের উপর এই যুদ্ধের কতখানি প্রভাব পড়েছিল তা তিনি পাপিয়াকে বলেছিলেন এবং আইএএস অফিসার পদে স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতে বিহারকে একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে উন্নত করে তোলার কাজে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। মা পূর্ণিমা ঘোষের কাছে পাপিয়া শুনেছেন দেশভাগের যন্ত্রণাদায়ক ইতিহাসের কথা। ফলে ছোটো থেকেই তাঁর মনে একটা ইতিহাস খননের ইচ্ছা প্রোথিত হতে শুরু করেছিল।

প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে পাটনার সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট হাই স্কুলে ভর্তি হন পাপিয়া ঘোষ। ১৯৭১ সালে এই স্কুলে তিনি সর্বোচ্চ স্থানাধিকারী এবং ‘হেড গার্ল’ নির্বাচিত হন। এরপর পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পাটনা ওমেন্স কলেজ থেকে ইতিহাসে তিনি স্নাতক উত্তীর্ণ হন। কলেজে পড়াকালীন পাপিয়া ঘোষ একজন দক্ষ তার্কিক, নাট্যকার এবং লেখিকা ছিলেন। সেকালের জনপ্রিয় কিশোর পত্রিকা ‘জুনিয়র স্টেটস্‌ম্যান’-এ ‘কুকি কোল’ শীর্শক কলামে নিয়মিত লিখতে শুরু করেন পাপিয়া ঘোষ। ১৯৭৫ সালে পাপিয়া ঘোষ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং এখান থেকেই তিনি এম.ফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল স্বাধীনতার প্রাক্কালে বিহারের আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০-১৯৩৪)।

গবেষণা শেষ করে দুই বছর ঐ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়েই তিনি অধ্যাপনা করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে তিনি পাটনায় ফিরে আসেন। এরপর থেকেই তাঁর প্রকৃত কর্মজীবন শুরু হয়। দিল্লির হিন্দু কলেজে কিছুদিন পড়িয়েছিলেন তিনি আর তারপরই পাটনা ওমেন্স কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন পাপিয়া ঘোষ। ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ইতিহাস বিভাগে তিনি অধ্যাপনা শুরু করেন। এই সময়েই তিনি নিউ দিল্লির ‘নেহেরু মেমোরিয়াল মিউজিয়াম অ্যাণ্ড লাইব্রেরি’ এবং সিমলার ‘ইণ্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজ’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। এরপরেই শুরু হয় তাঁর নিরলস ইতিহাস চর্চা এবং নিরন্তর গবেষণা। বিহারে জন্ম হওয়ার সুবাদে তিনি প্রাথমিকভাবে বিহারের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বিষয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেন এবং একইসঙ্গে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে বিহারের অবস্থান বিষয়েও স্পষ্ট ধারণা তৈরি করে দেন তিনি। এরপরে ঔপনিবেশিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিহারী মুসলিমদের অবস্থান বিষয়ে তিনি গবেষণা শুরু করেন। পাঞ্জাব কিংবা বাংলার মতো মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল ব্যতিরেকে বিহারের সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর তাঁর গবেষণা একটি শূন্যস্থান পূর্ণ করে। এরপরে কীভাবে সেই সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় থেকে পৃথকীকরণকামী মুসলিম লীগের মতো একটি সাম্প্রদায়িক পরিচিতি গড়ে ওঠে এবং জামিয়াত-আল-উলেমা-ই-হিন্দ্‌-এর বৃহত্তর আদর্শের অনুপ্রেরণা বিহারের মুসলিমদের উদ্বুদ্ধ করে তোলে তা নিয়ে বিস্তর অধ্যয়ন করেন পাপিয়া ঘোষ। ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে ‘ইকোনমিক অ্যাণ্ড সোশ্যাল হিস্ট্রি রিভিউ’ পত্রিকায় দুটো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন পাপিয়া ঘোষ এই বিষয়ের উপর। ইসলাম ও মুসলিমদের মধ্যেকার যে বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্য এই সবই তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে। ‘মুহাজিরস অ্যাণ্ড দ্য নেশন অ্যাণ্ড কমিউনিটি অ্যাণ্ড নেশন’ বইতে তিনি দেখিয়েছেন পাকিস্তানের আন্দোলনের সময় মুসলিমদের মধ্যেই ইমারত-ই-শারিয়াহ্‌ এবং মোমিন কনফারেন্স নামে দুটি সম্প্রদায়ের বিরোধ। প্রথমে জামিয়াত-আল-উলেমার আদর্শ ঔপনিবেশিক প্রাধান্যের বিরোধিতা করে এক জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রকাশ করলেও পরে তা মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির রূপ নেয়। একইসঙ্গে তাঁর গবেষণা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যেকার বিবাদকেও তুলে ধরেছে। এরপরে ‘দ্য পার্টিশান অ্যাণ্ড দ্য সাউথ এশিয়ান ডায়াস্পোরা’ বইতে পাপিয়া ঘোষ মূলত বিহারিদের অভিবাসন প্রক্রিয়ার উপরেই দৃষ্টিপাত করেছেন। জাতির ধারণা, রাষ্টের ধারণা এবং নাগরিকত্বের পরিচয়ের এক বিস্তৃত বিবরণ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি বহু উদাহরণের সাহায্যে দেখিয়েছেন যে শুধু ভারতেই নয়, পৃথিবীর বহু দেশেই এই দেশভাগ এবং অভিবাসন প্রক্রিয়ার প্রভাব লক্ষণীয়। দেশভাগের আগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিহারে নির্বিচারে সংখ্যালঘু মুসলিম হত্যার মূলে কীভাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে দুটি পৃথক মুহাজির গঠন ক্রিয়াশীল ছিল তা তিনি এই বইতে খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। দেশভাগের ফলে বাংলাদেশ পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠলেও ছেষট্টিটি উদ্বাস্তু শিবির গড়ে উঠেছিল সেই সময় এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের কাছে এই সমস্ত উদ্বাস্তুরা নিজেদের ‘মুসলিম উদ্বাস্তু’ কিংবা ‘ছিন্নমূল পাকিস্তানি’ হিসেবে পরিচিতির দাবি জানায়। ১৯৯২ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত কীভাবে ইউরোপ ও মার্কিন প্রদেশে মুসলিম ও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষেরা ভারতের অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং এই বিষয়েই বিবদমান হয়েছে তা দেখিয়েছেন পাপিয়া ঘোষ।

প্রাথমিকভাবে তিনি একজন ঐতিহাসিক হলেও তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র বিস্তৃত ছিল ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব এবং রাজনীতিকে কেন্দ্র করে যা কিনা বর্তমানে অভিবাসন বিদ্যার অন্তর্গত। তাঁর বইগুলিতে তিনি একটি বিকল্প আর্কাইভ গঠনের প্রয়াস করেছেন। ক্ষেত্রসমীক্ষার প্রতিবেদন, সাক্ষাৎকার, পারিবারিক ইতিহাস, শিবিরের আখ্যান, আশ্রয়-সন্ধানীদের বয়ান ইত্যাদি সবই নিপুণভাবে পাপিয়া ঘোষ তুলে ধরেছেন। কীভাবে কোনো মানুষ তাঁর জন্মস্থল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এককভাবে এবং সমষ্টিগতভাবে নিজেকে পরিচিত করতে পারে সেই জটিল দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রটিই তাঁর গবেষণা ও আগ্রহের মূল উৎস। এই গবেষণার কাজে দীর্ঘ সময় বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে ক্ষেত্র সমীক্ষা করেছেন তিনি, শিখেছেন উর্দু লেখা ও পড়া।

দার্শনিক জালালউদ্দিন রুমির অনুগামী পাপিয়া ঘোষ সুফি মরমিয়াবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই সুফি দর্শনই তাঁর উপজীব্য ছিল।

১৯৯৪ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে রকফেলার সদস্যপদ অর্জন করেন পাপিয়া ঘোষ। ১৯৯৬-৯৭ সালে নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়েও রকফেলার সদস্যপদ পান তিনি। নিউ দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, পাটনার এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরামর্শদাতা হিসেবে যুক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পরে স্থাপিত হয় ‘পূর্ণুজ্জ্বল পাপিয়া ঘোষ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ আর এই সংস্থার পক্ষ থেকেই পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হিন্দু কলেজে প্রতি বছর ইতিহাসের কৃতী ছাত্র-ছাত্রীদের পুরস্কৃত করা হয়।

তাঁর লেখা বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘দ্য সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স মুভমেন্ট ইন বিহার’ (২০০৮), ‘কমিউনিটি অ্যাণ্ড নেশন : এসেস অন আইডেন্টিটি অ্যাণ্ড পলিটিক্স ইন ইস্টার্ন ইণ্ডিয়া’ (২০০৮) এবং ‘পার্টিশান অ্যাণ্ড দ্য সাউথ এশিয়ান ডায়াস্পোরা : এক্সটেণ্ডিং দ্য সাবকন্টিনেন্ট’ (২০০৭)।

২০০৬ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রতিক্রিয়াশীল হত্যাকারীদের হাতে খুন হন পাপিয়া ঘোষ।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন