সববাংলায়

রামনাথ কোবিন্দ

ভারতের বর্তমান তথা ১৪তম রাষ্ট্রপতি হলেন রামনাথ কোবিন্দ (Ram Nath Kovind)। এর আগে তিনি বিহারের রাজ্যপালের দায়িত্বও সামলেছেন। ১৯৯৪ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন রামনাথ কোবিন্দ। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন এন ডি এ জোট সরকারের মনোনীত প্রার্থী হিসাবে ২০১৭ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করেন তিনি। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান থেকে কর্মক্ষেত্রে একজন সফল উকিল , রাজনৈতিক দক্ষ নেতা থেকে সর্বোপরি সমগ্র দেশের সাংবিধানিক প্রধান রামনাথ কোবিন্দ ভারতীয় ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব।

রামনাথ কোবিন্দের জন্ম ১ অক্টোবর ১৯৪৫ সালে উত্তর প্রদেশের কানপুর দেহাত জেলার পারাউঙ্খ গ্রামের এক কোরি পরিবারে। এই দলিত পরিবারের পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্ব কনিষ্ঠ সন্তান। তাঁর বাবা মাইকুলাল কোবিন্দ একটি ছোটো দোকান চালাতেন। তাঁর বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর তখন তাঁর মা আগুনে পুড়ে মারা যান। তাঁদের পরিবারের একমাত্র আশ্রয় ছোট্ট কুঁড়েঘরটি কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ে এবং তাঁরা আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন। অবহেলিত দলিত পরিবারের এই বাড়িটি তথা জায়গাটি পরবর্তীকালে রামনাথ রাস্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘকে সমাজকল্যাণের উদ্দেশ্যে দান করে দেন।

তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা কানপুরের একটি বিদ্যালয় থেকে শুরু হয়। স্কুলটি তাঁর গ্রাম থেকে আট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছিল এবং তিনি প্রতিদিন পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতেন। তাঁর কাছে তো নয়ই এমনকি সারা গ্রামেও কারো কাছে একটিও বাই সাইকেল ছিল না সেই সময়। তিনি বানিজ্য বিভাগ নিয়ে  স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করেন দয়ানন্দ অ্যাংলো বৈদিক মহাবিদ্যালয়ে। এরপর তিনি ছত্রপতি শাহুজি মহারাজ বিশ্ববিদ্যালয় ( বর্তমানে কানপুর বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে এল এল বি পাশ করেন। স্নাতক হবার পর তিনি দিল্লিতে চলে আসেন এবং সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। তিন বারের চেষ্টায় তিনি এই পরীক্ষায় পাশ করলেও তিনি কর্মক্ষেত্রে যোগ না দিয়ে ওকালতির অনুশীলনে ফিরে যান।

কোবিন্দ ১৯৭১ সাল থেকে দিল্লি বার কাউন্সিলে রেজিস্ট্রার্ড উকিল হিসাবে কাজ শুরু করেন। ১৯৭৭ সাল থেকে  ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত  তিনি  কেন্দ্রীয় সরকারের হয়ে দিল্লি হাইকোর্টে যাবতীয় কেস লড়তেন। ১৯৭৭-৭৮ সালে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের ব্যক্তিগত সহকারী হিসাবেও কাজ করেছেন। ১৯৭৮ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের উকিল হিসাবে উন্নীত হন। স্ট্যান্ডিং কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় সকারের উকিল হিসাবে কাজ করেছেন কোবিন্দ। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি দিল্লি হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টে তিনি অনুশীলন করেছেন। একজন উকিল হিসাবে তিনি সর্বদা অনগ্রসর, অর্থনৈতিকভাবে অক্ষম মানুষের পাশে থেকেছেন এবং নারীর সম্মান ও সুরক্ষার বিষয়ে যথেষ্ট চেষ্টা করে গেছেন।

তাঁর রাজনীতিতে যোগদান  ১৯৯১ সালে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগদানের মাধ্যমে। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি বিজেপি দলিত মোর্চার সভাপতি ছিলেন। এছাড়াও সর্বভারতীয় কোরি সমাজের সভাপতি ছিলেন রামনাথ কোবিন্দ। তিনি বিজেপির জাতীয় মুখপত্র হিসাবেও কাজ করেছেন কিছুদিন। বিজেপিতে যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই ঘাতমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী হন তিনি কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন নির্বাচনে। এরপর ভগ্নিপুর বিধানসভায় প্রার্থী হলে সেখানেও পরাজিত হন। ঘাতমপুর এবং ভগ্নিপুর এই দুই বিধানসভাই উত্তর প্রদেশের অন্তর্গত। ১৯৯৭ সালে তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের একটি আন্দোলনে তিনি যোগ দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এন ডি এ জোট সরকার একটি তফসিলি স্বার্থ বিরোধী বিল পাশ করার প্রতিবাদে।

১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাসে উত্তর প্রদেশ থেকে রাজ্যসভায় মনোনীত হন কোবিন্দ। ২০০৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত রাজ্যসভায় দুবারের মনোনীত সাংসদ ছিলেন তিনি। তিনি পার্লামেন্টারি কমিটির বিভিন্ন শাখায় কাজ করেছেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সোশাল জাস্টিস এন্ড এম্পাওয়ারমেন্ট এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতি উন্নয়ন কমিটি। তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষা পৌছে দেওয়া। তিনি উত্তর প্রদেশের একাধিক অনুন্নত জায়গায় স্কুল বানানোর জন্য সাহায্য করেছেন। পার্লামেন্টের সদস্য হিসাবে থাইল্যান্ড, নেপাল, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, জার্মানী, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স , ব্রিটেন, আমেরিকা প্রভৃতি দেশ গিয়েছেন । তিনি লক্ষ্নৌয়ের ডঃ বি আর আম্বেদকর ইউনিভার্সিটির পরিচালন বোর্ডের সদস্য ছিলেন কিছুদিন এবং আই আই এম ক্যালকাটার গভর্নর হিসাবেও কাজ করেছেন তিনি।

২০০২ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ অধিবেশনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন রামনাথ কোবিন্দ। ২০১৫ সালের ৮ আগস্ট তিনি বিহারের ২৬তম রাজ্যপাল হিসাবে নিযুক্ত হন। এন ডি এ জোট সরকারের মনোনীত রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসাবে জয়লাভ করেন তিনি।রামনাথ কোবিন্দ ৬৫ শতাংশের কিছু বেশী ভোট পেয়ে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মীরা কুমারকে পরাজিত করেন। মীরা কুমারের প্রাপ্ত ভোটের পরিমান ছিল ৩৪ শতাংশের কিছু বেশী। কোবিন্দ এম পি এবং এম এল এ মিলিয়ে ২৯৩০ টি ভোট পান সেখানে মীরা কুমার পান ১৮৮৪ টি ভোট। কে আর নারায়ণনের পরে তিনি ভারতের দ্বিতীয় দলিত রাষ্ট্রপতি এবং বিজেপি নির্বাচিত প্রথম রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী।

কোবিন্দ ১৯৭৪ সালের মে মাসে শ্রীমতী সবিতা কোবিন্দের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বাতী কোবিন্দ এবং প্রশান্ত কুমার কুমার কোবিন্দ হলেন তাঁদের দুই সন্তান।

রামনাথ কোবিন্দ ক্রোয়েশিয়া, বলিভিয়া, জিনিয়া, মাদাগাস্কার সহ আরও অনেক দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading