ধর্ম

জগন্নাথ মন্দির

পুরীর জগন্নাথ মন্দির হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রাচীন একটি মন্দির এবং অহিন্দুদের প্রবেশ এখানে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এটিই একমাত্র মন্দির যেখানে মূর্তিগুলি কিছু বছর পর বদলে ফেলে নতুন মূর্তি তৈরি করা হয়। ২০১৬ সাল থেকে ভারতের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছে।

এই মন্দিরের নির্মাণ নিয়ে ইতিহাসে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়না। যেটুকু জানা যায় গঙ্গ বংশীয় রাজা চৌধগঙ্গা দেবের আমলে এই মন্দিরের কাজ শুরু হয়। তারপরে রাজা অনঙ্গভীম দেব মন্দিরের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। পরবর্তীকালে অন্য গঙ্গ বংশীয় রাজা এবং তারও পরে গজপতি বংশীয় রাজাদের আমলে এই মন্দির পরিবর্ধন করা হয়। ইউরোপীয় নাবিকদের কাছে মন্দিরটি “সাদা প্যাগোডা” নামে পরিচিত ছিল। নবম শতাব্দী থেকে শুরু করে উনবিংশ শতাব্দী অবধি বিভিন্ন সময়ে মোট আঠারোবার বিভিন্ন রাজা, সুলতান, মুঘল বাদশাহরা জগন্নাথধাম আক্রমণ করেছিল। প্রতিবারই মন্দির থেকে বিগ্রহ স্থানান্তরিত করে, পরে ফিরিয়ে আনা হয়। বলা হয় কালাপাহাড়ের আক্রমণে মূর্তিরও ক্ষতি হয়েছিল। যদিও এই নিয়ে বিভিন্ন মত আছে।

জগন্নাথধাম মন্দিরের সাথে বাঙালির যে ইতিহাসটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তা হল চৈতন্যদেবের মৃত্যুরহস্য। তিনি তাঁর জীবনের শেষ কুড়ি বছরেরও বেশি সময় পুরীতে কাটিয়েছেন। উড়িষ্যার তৎকালীন রাজা প্রতাপ রুদ্রদেব তাঁকে কৃষ্ণের অবতার বলে মনে করতেন। ১৫৩৩ সালে আষাঢ় মাসে তিনি সেই যে জগন্নাথধাম মন্দিরে ঢুকলেন, তারপর আর কেউ তাঁর দেখা পাননি। আজও তাঁর মৃত্যু রহস্যই রয়ে গেছে। জগন্নাথধাম থেকে অদূরেই রয়েছে গম্ভীরা আশ্রম, যেখানে তিনি থাকতেন।

মন্দিরে অহিন্দুদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মহাত্মা গান্ধী একবার মুসলমান, হরিজন ও দলিতদের নিয়ে মন্দিরে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁকে মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ইন্দিরা গান্ধীকেও ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এমনকি ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দকেও জগন্নাথ দর্শন করতে দেওয়া হয়নি।

জগন্নাথ মন্দির চত্বরটি চার লাখ বর্গফুট জায়গা জুড়ে অবস্থিত। মন্দির চত্বরের বাইরের দেওয়ালটাকে বলা হয় মেঘনাদ প্রাচীর। মন্দিরের চারটি প্রবেশ দ্বার রয়েছে। সেগুলো হল সিংহদ্বার, অশ্বদ্বার, হাতিদ্বার এবং ব্যাঘ্রদ্বার। প্রধান দ্বার সিংহদ্বার। হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী দুই দেবতা জয় ও বিজয় এই দ্বার তথা মন্দিরের দ্বাররক্ষী। ২০১৯ সালে ফণী ঝড়ের প্রকোপে জয়ের মূর্তিটি ভেঙে গিয়েছিল। সিংহদ্বারের ডানদিকে জগন্নাথের একটি ছবি আঁকা রয়েছে যা পতিতপাবন নামে পরিচিত। সিংহদ্বারের সামনেই রয়েছে অরুণস্তম্ভ যা কোনারক থেকে এনে স্থাপন করা হয়। সিংহদ্বার দিয়ে প্রবেশ করার পর বাইশটি সিঁড়ি পেরিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করতে হবে। এই বাইশটি সিঁড়িকে বলে বাইশি পহুচ এবং হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে এগুলোর মাধ্যমে মানুষের জীবনের বাইশটি পাপকে বোঝায়। বাইশি পহুচ অতিক্রম করা মানে জীবনের এইসমস্ত পাপগুলোকে অতিক্রম করা। ব্যাঘ্রদ্বার দিয়ে গিয়ে ডানদিকে রয়েছে নীলাচল উপবন যেখানে রয়েছে একটি সুন্দর বাগান এবং একদম কোণে রয়েছে দেবতার মূর্তি। পুরনো রোহিনী কুন্ডের আর অস্তিত্ব নেই। সেই জায়গায় ছোট একটি কুণ্ড রয়েছে।

কলিঙ্গ স্থাপত্য রীতিতে তৈরি জগন্নাথধাম মন্দিরের চারটি অংশ রয়েছে। প্রথমটি বিমান অর্থাৎ গর্ভগৃহ সম্বলিত অংশ, দ্বিতীয়টি জগমোহন অর্থাৎ সভাকক্ষ, তৃতীয়টি নাট মণ্ডপ অর্থাৎ উৎসব কক্ষ এবং চতুর্থটি হল ভোগ মণ্ডপ অর্থাৎ ভোগ নিবেদনের কক্ষ। মন্দিরের মূল অংশ এই বিমান বা গর্ভগৃহ যার উচ্চতা প্রায় ২১৫ ফুট। এখানেই রয়েছে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রার মূর্তি। এর মাথায় বসানো অষ্টধাতু দিয়ে তৈরি ‘নীলচক্র’। প্রতিদিন নীলচক্রের উপর আলাদা পতাকা লাগানো হয় এবং দৃশ্যটি দেখবার জন্য ভক্তেরা মন্দিরের বাইরে জড়ো হয়। অনেকের মতে ২১৫ ফুট উঁচু মন্দিরের মাথায় অষ্টধাতু দিয়ে তৈরি এই চক্রটি বাজ প্রতিরোধের কাজে লাগে। মন্দিরে দু’টি রত্নভাণ্ডার আছে , ভিতর ভাণ্ডার এবং বাহার ভাণ্ডার। দেবতাদের মূর্তি সাজানোর জন্য বাহার ভাণ্ডার থেকেই গয়না ব্যবহার করা হয় ৷ ভিতর ভাণ্ডারে কি আছে তা এক রহস্য। ১৯৮৪ সালে ভিতর ভাণ্ডারের সাতটি কক্ষের মধ্যে তিনটি খোলা হয়েছিল।

মন্দির চত্বরে জগন্নাথ মন্দির ছাড়াও রয়েছে আরও অনেকগুলো মন্দির। সেগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি মন্দির হল বিমলা, মহালক্ষ্মী, বটগণেশ, নবগ্রহ, নরসিংহ, গোপীনাথ, পঞ্চমুখী হনুমান, সর্বমঙ্গলা, বেনুমাধব, লক্ষ্মী-নারায়ণ, রাধাকান্ত, সূর্যদেব ইত্যাদি। এছাড়াও ছোটবড় মন্দির মিলিয়ে আরও প্রচুর মন্দির রয়েছে। বিমলা মন্দির হল চার আদি শক্তিপীঠের অন্যতম। মনে করা হয় মূল জগন্নাথ মন্দির নির্মাণের আগে থেকেই বিমলা মন্দির ছিল। শাক্তদের কাছে বিমলা জগন্নাথের স্ত্রী হলেও জগন্নাথের বিষ্ণুরূপের স্ত্রী দেবী লক্ষ্মী অবস্থান করেন মহালক্ষ্মী মন্দিরে। হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে মহালক্ষ্মীর তত্ত্বাবধানেই মন্দিরে রান্না হয়। মন্দির চত্বরের দক্ষিণদিকে রয়েছে বিখ্যাত বটগণেশের মন্দির। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে জগন্নাথধাম নির্মাণের পরে প্রথমে বটগণেশের পূজা করা হত। তার পাশেই আছে ‘কল্পবট’ নামক পবিত্র বটগাছ। এই গাছে সুতো বেঁধে ভক্তেরা মানত করে। ২০১৯ সালে ফণী ঝড় এই গাছের অনেকটা ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয়দের মতে জগন্নাথ মন্দিরের রান্নাঘর বিশ্বের বৃহত্তম রান্নাঘর, যেখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার ভক্ত ভোজন করে। তবে রান্নাঘরে সাধারণের প্রবেশের অনুমতি নেই। মন্দির চত্বরের উত্তর পূর্ব কোণে আছে আনন্দবাজার। এখানে বিক্রি হয় জগন্নাথের মহাপ্রসাদ

জগন্নাথ মন্দিরের গর্ভগৃহে রাখা রত্নবেদীর ওপর জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার মূর্তি স্থাপন করা আছে। সবকটি মূর্তির উচ্চতা আড়াই থেকে তিন মিটারের মধ্যে এবং মূর্তিগুলোর রং যথাক্রমে কালো, সাদা এবং হলুদ। মূর্তিগুলো নিমকাঠ থেকে তৈরি করা হয় এবং কিছু বছর পরপর বদলে ফেলা হয়। তারপর আবার নতুন নিমকাঠ দিয়ে তৈরি হয় নতুন মূর্তি বা কলেবর। এই রীতি বা উৎসবকে বলা হয় নবকলেবর। আর কোনও মন্দিরে এমন রীতির কথা শোনা যায় না। তিন দেবতার মূর্তির সাথে এখানে বিষ্ণুর অস্ত্র সুদর্শনকেও মূর্তিরূপে পূজা করা হয়। বাকি তিন মূর্তির মত সুদর্শনের মূর্তিও কাঠের তৈরি।

জগন্নাথ মন্দিরের প্রধান উৎসব হল রথযাত্রা। রথের দিন পর পর প্রথমে বলরামের রথ, তারপর সুভদ্রা এবং শেষে জগন্নাথের রথ যাত্রা করে মাসির বাড়ি বা গুন্ডিচা মন্দির। রথযাত্রার উদ্বোধন করেন পুরীর রাজা। এই সময়ে দাঁড়িয়ে রাজতন্ত্র না থাকলেও পুরীর রাজপরিবার এখনও বর্তমান এবং নিয়মানুসারে যিনি এই বংশ থেকে রাজা উপাধি পান, তিনি রথের সামনে সোনার ঝাঁটা দিয়ে পরিষ্কার করে পুষ্পাঞ্জলি দেন তবেই শুরু হয় রথযাত্রা। তারপর উপস্থিত ভক্তেরা রথের দড়ি ধরে রথ টেনে নিয়ে যায়। রথ টানতে প্রতি বছর লক্ষাধিক ভক্তের ভিড় হয়। রথযাত্রার প্রথম দিনে রথ গুন্ডিচা মন্দিরে পৌঁছলেও নিয়মমত মূর্তি তিনটি রথেই থাকে এবং রথযাত্রার দ্বিতীয় দিনে তাঁদের গুন্ডিচা মন্দিরে প্রবেশ করানো হয়। সেখানে তিন দেবতার মূর্তি সাতদিন পূজা করার পর তাঁদের নিজের মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়। সাতদিন পর তিন দেবমূর্তিকে জগন্নাথ মন্দিরে ফিরিয়ে আনার উৎসবকে স্থানীয়রা “বাহুড়া যাত্রা” বলে, আর বাংলায় এটি “উল্টোরথ” নামে পরিচিত। রথযাত্রা শেষে মন্দিরে ফেরার পর স্ত্রীয়ের মান ভাঙাতে রসগোল্লার শরণাপন্ন হন জগন্নাথ। জগন্নাথের সাথে রসগোল্লার সম্পর্ক জানতে পড়ুন এখানে

জগন্নাথ মন্দিরের অন্যতম প্রধান উৎসব হল স্নানযাত্রা। রথযাত্রার আগের এই উৎসবটি জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে দিনটিকে জগন্নাথের জন্মতিথি বলা হয়। মূল গর্ভগৃহ থেকে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা, সুদর্শনের মূর্তিকে স্নানের জন্য বার করে আনা হয়। তারপর মন্দিরের উত্তর দিকের কূপ থেকে ১০৮টি কলসী দিয়ে জল ভরে মূর্তিদের স্নান করানো হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে স্নানের পরে জগন্নাথের জ্বর আসে এবং তিনি পুরী থেকে ২০ কিমি দূরে ব্রহ্মগিরির অলরনাথ মন্দিরে অবস্থান করেন। এই সময় ভক্তেরা মূর্তিগুলোর দর্শন করতে পারে না। তখন রঘুরাজপুর গ্রামের শিল্পীদের বানানো তিনটি পটচিত্র মন্দিরে রাখা হয়।

এছাড়াও অন্যান্য দুটো উল্লেখযোগ্য উৎসব হল অক্ষয় তৃতীয়াতে পালিত চন্দন যাত্রা এবং নবকলেবর, যা প্রতি ৮, ১২, বা ১৮ বছরে পালিত হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সতীপীঠ কিরীটেশ্বরী



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

লতা মঙ্গেশকর



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন