ধর্ম

গুন্ডিচা মন্দির ।। জগন্নাথের মাসির বাড়ি

জগন্নাথ মন্দির থেকে মাত্র তিন কিমি দূরে অবস্থিত গুন্ডিচা মন্দিরকে জগন্নাথের মাসির বাড়ি বলা হয়। এই মন্দিরের চারপাশে সুন্দর বাগান থাকায় মন্দিরটিকে জগন্নাথের বাগানবাড়িও বলা হয়। রথযাত্রার সময় এখানেই জগন্নাথের রথ এসে থামে এবং সাতদিন এই গুণ্ডিচা মন্দিরেই জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার আরাধনা করা হয়।

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে বিষ্ণুভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন দেব তৎকালীন পুরীতে বিষ্ণুর আরাধনার জন্য একটি মন্দির গড়ে তুলল। তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ রাজ্যের রানী ছিলেন গুন্ডিচা। বিষ্ণুর রূপ নীলমাধবকে এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করবার জন্য রাজা তার রাজ্যের চারদিকে লোক পাঠাল। অনেক খুঁজে তারা জানতে পারে শবররাজ বিশ্ববসু বংশপরম্পরায় নীলমাধবের নিত্যপূজা করে আসছে। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন নীলমাধবকে আনতে যায় কিন্তু সেখানে গিয়ে নীলমাধবকে পায় না। তখন দৈববাণী হয় যে সমুদ্রের জলে একটি কাঠ ভেসে আসবে যা থেকে বিগ্রহ বানাতে হবে। সেই অনুযায়ী ভেসে আসা কাঠ দিয়ে রাজা তার কারিগরদের মূর্তি বানাতে বলে। কিন্তু সেই কাঠ এমনই পাথরের মত শক্ত যে ছেনি, হাতুড়ি সবই ভেঙে যায়। তখন স্বয়ং বিশ্বকর্মা কারিগরের বেশে রাজার কাছে আসেন। অন্যমতে বলা হয় স্বয়ং জগন্নাথ আসেন রাজার কাছে। তিনি শর্ত রাখেন ২১ দিন দরজা বন্ধ করে তিনি মূর্তি গড়বেন। কেউ যেন তাঁকে বিরক্ত না করে। তিনি নিজে দরজা না খুললে কেউ যেন তাঁর ঘরে না আসে। রাজা তাঁর শর্ত মেনে নিলে তিনি দরজা বন্ধ করে কাজ শুরু করেন। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের রানী গুন্ডিচা রোজই বন্ধ দরজায় কান পেতে কাঠ কাটার ঠক্ ঠক্ শব্দ শোনে। একদিন রানী শব্দ শুনতে না পেয়ে কৌতূহলবশত দরজা খুলে ফেলে। তখন কারিগর উধাও হয়ে যায় এবং তিনটি অসমাপ্ত মূর্তি পড়ে থাকে সেখানে। সেই মূর্তিগুলোর হাত,পা কিছুই গড়া হয়নি। তখন রাজা ও রানী দুঃখে ভেঙে পড়লে স্বপ্নে জগন্নাথ তাদের বললেন যে এই রূপেই তিনি পূজিত হতে চান এবং রানী গুন্ডিচার ভক্তিতে খুশি হয়ে জগন্নাথ কথা দিয়েছিলেন যে রথযাত্রার সময় রানীর বাড়ি তিনি আসবেন।

অন্য কাহিনী অনুসারে গুন্ডিচা হলেন কৃষ্ণের মাসি। জগন্নাথ কৃষ্ণের আরেক রূপ। কৃষ্ণের মাসি গুন্ডিচা তাঁদের তিন ভাইবোনকে খুব ভালবাসেন এবং তাঁদের জন্য পোড়াপিঠে বানান। এই পোড়াপিঠে কৃষ্ণ অর্থাৎ জগন্নাথের খুব প্রিয়। বলা হয় রথযাত্রার সময় পোড়াপিঠে খেতে জগন্নাথ তাঁর ভাইবোনকে নিয়ে মাসির বাড়ি আসেন।

বেলেপাথর দ্বারা নির্মিত এই মন্দিরটি কলিঙ্গ স্থাপত্য রীতিতে তৈরি। মন্দিরের চারটি অংশ রয়েছে। প্রথমটি বিমান অর্থাৎ গর্ভগৃহ সম্বলিত অংশ, দ্বিতীয়টি জগমোহন অর্থাৎ সভাকক্ষ, তৃতীয়টি নাট মণ্ডপ অর্থাৎ উৎসব কক্ষ এবং চতুর্থটি হল ভোগ মণ্ডপ অর্থাৎ ভোগ নিবেদনের কক্ষ। গর্ভগৃহে ক্লোরাইট পাথরে তৈরি ৪ ফুট উঁচু এবং ১৯ ফুট দীর্ঘ একটি মঞ্চ রয়েছে, যাকে রত্নবেদী বলা হয়। রথযাত্রার সময় এই রত্নবেদীর ওপর জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি স্থাপন করা হয়। মন্দিরে একটি রান্নাঘরও রয়েছে। রথযাত্রার সময় যখন গুণ্ডিচা মন্দিরে জগন্নাথ,বলরাম, সুভদ্রার আরাধনা করা হয়, তখন জগন্নাথ মন্দিরের রান্নাঘরে জগন্নাথের মহাপ্রসাদ তৈরি বন্ধ থাকে এবং এই মন্দিরের রান্নাঘরেই জগন্নাথদের জন্য খাবার রান্না করা হয়। মন্দিরের দুটি দরজা আছে। পশ্চিমদিকের দরজাটি হল প্রধান দরজা এবং মন্দিরের প্রবেশদ্বার। পূর্বদিকের দরজাটি নাকচন দ্বার নামে পরিচিত। রথযাত্রার সময় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তিদের পশ্চিমের দরজাটি দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করানো হয়। রথযাত্রার শেষে নাকচন দ্বার দিয়ে তাঁদের জগন্নাথ মন্দিরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। মন্দিরের চারপাশে সুন্দর বাগান রয়েছে এবং মন্দিরটি এই বাগানের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাগান সমেত সমগ্র মন্দিরের চারপাশে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা রয়েছে।

রথযাত্রার প্রথম দিনে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা তিন দেবমূর্তিকে তাঁদের রথে চড়িয়ে জগন্নাথ মন্দির থেকে গুণ্ডিচা মন্দিরে নিয়ে আসা হয়। রথযাত্রায় উপস্থিত ভক্তেরা তাঁদের তিনজনের রথ টেনে নিয়ে যায়। রথ টানতে প্রতি বছর লক্ষাধিক ভক্তের ভিড় হয়। রথে চেপে জগন্নাথেরা গুন্ডিচা মন্দিরে আসেন বলে রথযাত্রাকে গুন্ডিচাযাত্রাও বলা হয়। রথযাত্রার প্রথম দিনে এই মন্দিরে পৌঁছেও নিয়মমত মূর্তি তিনটি রথেই থাকে এবং রথযাত্রার দ্বিতীয় দিনে তাদের এই মন্দিরে প্রবেশ করানো হয়। আগামী সাতদিন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার দেবমূর্তি গুণ্ডিচা মন্দিরে রেখেই তাঁদের আরাধনা করা হয়। সাতদিন পর তিন দেবমূর্তিকে জগন্নাথ মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়। এই উৎসবকে স্থানীয়রা “বাহুড়া যাত্রা” বলে, আর বাংলায় এটি “উল্টোরথ” নামে পরিচিত। ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী, জগন্নাথেরা রথযাত্রায় তিন ভাইবোন গুণ্ডিচার বাড়ি গেলেও দেবী মহালক্ষ্মী তাঁর মন্দিরেই থাকেন। তারপর তিনি গুণ্ডিচার বাড়ি এসে জগন্নাথকে নিজের বাড়ি ফিরতে অনুরোধ করেন এবং রাগের মাথায় রথের একখানি কাঠ ভেঙে জগন্নাথধাম মন্দিরে ফিরে আসেন।

রথযাত্রার সময় গুণ্ডিচা মন্দিরে প্রচণ্ড ভিড় হয়। দেশ বিদেশ থেকে দর্শনার্থীরা আসে। বছরের বাকি সময়ে তেমন ভিড় না হলেও পুরীতে যারা ঘুরতে আসে তারা এখানেও ঘুরতে আসে। মন্দিরে বিগ্রহ দেখা ছাড়াও মন্দিরে রাখা জগন্নাথের রথের দড়ি ছুঁয়ে ভক্তেরা প্রণাম করে এবং রশি থেকে সুতো সংগ্রহ করেও রাখে। ভক্তদের বিশ্বাস এই রথের দড়ি মাথায় ঠেকালে আর দুঃস্বপ্ন হয় না এবং মানুষ পাপ থেকে মুক্তি পায় ও রোগ থেকে মুক্তিলাভ করে।

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব প্রতিনিধি
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://eisamay.indiatimes.com/
  4. https://bengali.news18.com/
  5. http://www.shreekhetra.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অশোক ষষ্ঠী ব্রতকথা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

রচনাপাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান?



এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন