সববাংলায়

শান্তিস্বরূপ ধাওয়ান

ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস ঘাঁটলে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত এমন অনেক মানুষের নাম পাওয়া যাবে যাঁরা মূলত আইনচর্চার ক্ষেত্র থেকে এসে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছেন। শান্তিস্বরূপ ধাওয়ান (Shanti Swaroop Dhavan) তাঁদের মধ্যে অন্যতম এক ব্যক্তিত্ব। বিদেশ থেকে আইন বিষয়ে জ্ঞানলাভ করেছিলেন তিনি এবং এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেছিলেন তিনি দীর্ঘদিন। কেবল একজন আইনজ্ঞই নন, তিনি একইসঙ্গে একজন রাষ্ট্রনায়ক ও কূটনীতিবিদও ছিলেন। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, আশ্চর্য বিশ্লেষণী ক্ষমতা, প্রজ্ঞা এবং অসামান্য মেধার সাহায্যে তিনি এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি হন এবং পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টে একজন সিনিয়র আইনজীবী হিসেবেও আইন অনুশীলন করেন। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের দায়িত্বও পেয়েছিলেন তিনি। এই সাংবিধানিক পদে থাকাকালীন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁকে নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। বিদেশেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলেছিলেন দক্ষতার সঙ্গে। স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বেড়ে উঠেছিলেন শাস্তিস্বরূপ ধাওয়ান, ফলে তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারেও সঞ্চিত আছে উল্লেখযোগ্য অনেক ঘটনা।

১৯০৬ সালের ২ জুলাই অবিভক্ত ভারতবর্ষে বর্তমান পাকিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়ার অন্তর্গত পাকিস্তানের ৩৭তম বৃহত্তম শহর ডেরা ইসমাইল খানে শান্তিস্বরূপ ধাওয়ানের জন্ম হয়। তাঁর বাবা বলিরাম ধাওয়ান (Bali Ram Dhavan) খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের তৎকালীন রায় বাহাদুর ছিলেন। এই সম্মানীয় খেতাব ব্রিটিশ সরকার সেইসব ব্যক্তিদেরই প্রদান করত যাঁরা সাম্রাজ্যের একজন বিশ্বস্ত সেবক এবং জনকল্যাণমূলক কাজে সদা তৎপর থাকতেন। শান্তিস্বরূপের দুই পুত্র এবং এক কন্যার প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে ছিলেন সফল। তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র রবি স্বরূপ ধাওয়ান (Ravi Swaroop Dhavan) ছিলেন এলাহাবাদ এবং পাটনা হাইকোর্টের বিচারপতি। আরেক পুত্র রাজীব ধাওয়ান (Rajeev Dhavan) বর্তমানে একজন নামজাদা আইনজীবী। তিনি সুপ্রিম কোর্টেও আইন অনুশীলন করেছেন অনেকদিন। পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর সঙ্গে একটি কলহের কারণে তিনি সুপ্রিম কোর্ট ত্যাগ করেন। রাজীব ধাওয়ানের জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা তিনি বাবরি মসজিদ ধ্বংস নিয়ে চলা দীর্ঘদিনব্যাপী যে ঐতিহাসিক মামলা তাতে মুসলমান পক্ষের আইনজীবী হিসেবে লড়াই করেছিলেন। এছাড়াও রাজীববাবু একজন মানবাধিকার কর্মী এবং আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন। শান্তিস্বরূপ ধাওয়ানের কন্যা রানি ধাওয়ান শংকরদাস (Rani Dhavan Shankardass) ছিলেন একজন সামাজিক ইতিহাসবিদ ও কারাগার সংস্কার বিষয়ের একজন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ। এছাড়াও তিনি পেনাল রিফর্ম অ্যান্ড জাস্টিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এবং পেনাল রিফর্ম ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। 

প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা সমাপ্ত করে শান্তিস্বরূপ ধাওয়ান ভর্তি হয়েছিলেন লাহোরের ফরমান ক্রিশ্চিয়ান কলেজে। সেখান থেকে পাশ করবার পর শান্তিস্বরূপ বিদেশে পাড়ি দেন আরও উচ্চস্তরের পড়াশোনার জন্য। কেমব্রিজের ইমানুয়েল কলেজে তিনি অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হন। সেখানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা তিনি সেসময় কেমব্রিজ ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৮১৫ সালে ছাত্রদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত বিখ্যাত বিতর্কসভা এবং স্বাধীনভাবে কথা বলবার একটি মঞ্চ হিসেবে পরিচিত গোটা বিশ্বে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় এই সোসাইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। এই কেমব্রিজ ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শান্তিস্বরূপ নির্বাচিত হয়েছিলেন তাঁর প্রখর মেধা এবং জ্ঞানের জোরেই। ইমানুয়েল কলেজ থেকে বেরিয়ে তিনি লন্ডনের পেশাদার ব্যারিস্টারদের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান ইনস অফ কোর্টের চারটি শাখার একটি শাখা মিডল টেম্পলে আইন অধ্যয়ন করেছিলেন। 

দেশে ফিরে এসে শান্তিস্বরূপ ধাওয়ান ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এই চোদ্দ বছর এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের প্রভাষক বা লেকচারার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর জ্ঞান, মেধা, বিচার ক্ষমতা, মানবপ্রকৃতি বোঝবার অসামান্য দক্ষতার জন্য তিনি ১৯৫৮ সালের ২৮ জুন এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতির দায়িত্ব পান। পরবর্তী দীর্ঘ নয় বছর ১৯৬৭ সালের ২ জুলাই পর্যন্ত তিনি এই বিচারপতির আসন অলঙ্কৃত করেন। ঠিক তারপরেই ভারতবর্ষের সর্বোচ্চ বিচারালয় সুপ্রিম কোর্টে একজন সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯৬৮ সালে ইউনাইটেড কিংডম বা যুক্তরাজ্যের হাই কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন শান্তিস্বরূপ ধাওয়ান। এই হাই কমিশনাররা মূলত কমনওয়েলথ অফ নেশনসের অন্তর্ভুক্ত বা সদস্য একেকটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। শান্তিস্বরূপ ধাওয়ান ১৯৬৮ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত এই এক বছর রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাজ্যের হাই কমিশনারের পদে বহাল ছিলেন। পরবর্তীকালে মিস্টার ধাওয়ান ভারতীয় ল কমিশনেরও সদস্য পদ অলঙ্কৃত করেন। 

এরপরেই ১৯৬৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শান্তিস্বরূপ ধাওয়ান পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি দীপ নারায়ণ সিন্হা‌র পর পশ্চিমবঙ্গের সপ্তম রাজ্যপাল হন এবং ১৯৭১ সালের ২১ আগস্ট পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। তাঁর সময়কালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নকশাল আন্দোলনকে ঘিরে উত্তাল হয়ে ওঠে। তেমনই এক সময়ে ১৯৭০ সালের ২৫ মে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে মিস্টার পি. বি মুখার্জির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে শান্তিস্বরূপ ধাওয়ান একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই ভাষণের বয়ানকে কেন্দ্র করে তুমুল বিতর্কের ঝড় বয়ে যায় চতুর্দিকে। সেখানে মিস্টার ধাওয়ান ভারতীয় উকিল সমাজের শোচনীয় অবস্থার কথা বলেন। সিনিয়র আইনজীবীদের স্বার্থপর একচেটিয়া ব্যবসার কথাও বলেন তিনি অকপটে। এমনকি কলকাতা সহ অন্যান্য হাইকোর্টের মুলতুবি বিষয়ে সীমাহীন অধিকারের মতো একচেটিয়া অসামাজিকতার তীব্র নিন্দা করেন তিনি। আইনি শিক্ষার মান যে বর্তমানে বিশ্বের সমস্ত সভ্য দেশের তুলনায় ভয়ঙ্করভাবে নিম্ন, সেকথাও উল্লেখ করতে পিছপা হননা শান্তিস্বরূপ ধাওয়ান। এরপর তিনি এই সমস্ত কিছুর জন্য দায়ী করেছিলেন তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারকে। আইনি পেশার দীর্ঘ বিরোধিতা করবার পর মিস্টার ধাওয়ান একটি বিচার মন্ত্রক গঠনের পরামর্শও দিয়েছিলেন। তাঁর পরামর্শ ছিল আদালত, বিচারক, আইনি পেশা, আইনশিক্ষা এইসব কিছুই সেই বিচার মন্ত্রকের দায়িত্বে থাকবে। শান্তিস্বরূপের আইনজীবীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ এবং বিচারলায়ের নিন্দে করাকে অনেকেই ভালো চোখে দেখেননি। কেউ কেউ বলেছেন একাজ রাজ্যপালের এক্তিয়ার বহির্ভূত। কলকাতার বার অ্যাসোসিয়েশন এমন ঘটনার পরে এই গভর্নরের প্রত্যাহারের দাবি তুলেছিল। অজয় মুখার্জির যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন এবং ১৯৭১ সালে তাঁর তৃতীয় মন্ত্রকের পতনের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে ধাওয়ানের মেয়াদকালেই রাষ্ট্রপতি শাসনের দুই দফা জারি করা হয়েছিল।

১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি ৭১ বছর বয়সে শান্তিস্বরূপ ধাওয়ানের মৃত্যু হয়। 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading