সববাংলায়

তিরুপতি বালাজি মন্দির

তিরুপতি বালাজি মন্দির (Tirupati Balaji Temple) হল ভারত এবং সমগ্র বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও পবিত্র হিন্দু মন্দিরগুলির মধ্যে একটি। এটি তিরুপতি মন্দির, তিরুমালা মন্দির, তিরুমালা ভেঙ্কটেশ্বর মন্দির এবং সপ্তগিরি মন্দির নামেও পরিচিত। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, কলিযুগের দুঃখ ও যন্ত্রণা থেকে মানব সমাজকে মুক্তি দেওয়ার জন্য ভগবান বিষ্ণু এই মন্দিরে ভেঙ্কটেশ্বর রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এই কারণেই এই মন্দিরটিকে কলিযুগের বৈকুণ্ঠ বলা হয়। ভেঙ্কটেশ্বর মন্দিরটি বিষ্ণুর আটটি স্বয়ম্ভু মন্দিরের মধ্যে অন্যতম এবং শেষ পার্থিব দিব্য দেশমের একটি। এখানে ভগবান ভেঙ্কটেশ্বরকে ‘বালাজি’, ‘গোবিন্দ’ এবং ‘শ্রীনিবাস’ নামেও ডাকা হয়।

দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের চিত্তুর জেলার তিরুমালা পর্বতে এই মন্দিরটি অবস্থিত। পৌরাণিক মতে, তিরুমালা হল শেষাচলম পর্বতমালার অংশবিশেষ এবং আদিবরাহ ক্ষেত্র। তামিল ভাষায় ‘তিরুমালা’ শব্দের অর্থ হল পবিত্র পাহাড়। ভক্তদের বিশ্বাস, এই মন্দিরের উপাস্য দেবতা ভগবান ভেঙ্কটেশ্বর কোন ভক্তকে খালি হাতে ফেরান না এবং সবার মনস্কামনা পূরণ করেন। এই বিশ্বাসে প্রতি দিন হাজার হাজার মানুষ বালাজি বা ভেঙ্কটেশ্বরের দর্শন করতে মন্দিরে ভিড় করেন। এখানে মানুষের ভক্তি ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের সাথে মিশেছে মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

তিরুপতি বালাজি মন্দিরের সঙ্গে এক সুবিখ্যাত পৌরাণিক কাহিনি জড়িত। একসময় হিন্দু ধর্মের প্রধান তিন দেবতা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের মধ্যে কে যজ্ঞের ফল গ্রহণের যোগ্য, তা নির্ণয় করার জন্য দেবর্ষি নারদ সাধুদের একটি যজ্ঞ করার পরামর্শ দেন। যজ্ঞের পর, দেবতাদের পরীক্ষা করার দায়িত্ব দেওয়া হয় ঋষি ভৃগুকে। প্রথমে তিনি ব্রহ্মার কাছে যান, কিন্তু তাঁকে দেখতে না পেয়ে পৃথিবীতে পূজা না পাওয়ার অভিশাপ দেন। এরপর তিনি শিবের কাছে যান এবং একই ঘটনা ঘটলে তাঁকে লিঙ্গ রূপে পূজিত হওয়ার অভিশাপ দেন।

সবশেষে ঋষি ভৃগু ভগবান বিষ্ণুর কাছে যান। সেই সময় বিষ্ণু যোগনিদ্রায় থাকায় ভৃগুর উপস্থিতি বুঝতে পারেননি। এতে ঋষি অপমানিত বোধ করে ক্রোধে বিষ্ণুর বুকে পদাঘাত করেন। কিন্তু বিষ্ণু এতে শান্ত থাকেন এবং ঋষির নরম পায়ে আঘাত লাগার জন্য তাঁর পা টিপে দেন। এই সুযোগে তিনি ভৃগুর পায়ে স্থিত অহংকারের প্রতীক তৃতীয় চক্ষুটি নষ্ট করে দেন। এরপর ভৃগু নিজের ভুল বুঝতে পেরে বিষ্ণুর কাছে ক্ষমা চান এবং সিদ্ধান্ত নেন যে ত্রিদেবের মধ্যে বিষ্ণুই শ্রেষ্ঠ।

এই ঘটনায় বিষ্ণুর স্ত্রী দেবী লক্ষ্মী অত্যন্ত অপমানিত বোধ করেন, কারণ বিষ্ণুর বুকে লক্ষ্মীর নিবাস। তাঁর পবিত্র স্থানে পদাঘাত করা হয়েছে ভেবে লক্ষ্মী বৈকুণ্ঠ ত্যাগ করে কোলহাপুরে চলে যান এবং ধ্যানে বসেন। অন্যদিকে, বিষ্ণু শ্রীনিবাস নামক মানুষের রূপ ধারণ করে লক্ষ্মীর খোঁজে বৈকুণ্ঠ ত্যাগ করে তিরুমালার শেষাচলম পর্বতে চলে যান এবং ধ্যান শুরু করেন।

শ্রীনিবাসের কথা জানতে পেরে দেবী লক্ষ্মী শিব ও ব্রহ্মাকে গাভী এবং বাছুরের বেশ ধারণ করতে বলেন। তাঁরা রূপ পরিবর্তিত করলে লক্ষ্মী সেই গাভী ও বাছুরটিকে তিরুমালার তৎকালীন অধিপতি চোল রাজাকে উপহার দেন। কিছুদিন পর থেকে ওই গাভীটি প্রতিদিন চড়তে বেরিয়ে শ্রীনিবাসকে দুধ খাওয়াতে শুরু করে। একদিন রাজার এক গোপালক এটি দেখে গাভীটিকে আঘাত করতে যান, কিন্তু শ্রীনিবাস সেই আঘাত নিজের ওপর নেন। আঘাতের ফলে তাঁর মাথার একটি অংশের চুল পড়ে গিয়েছিল। এরপর নীলাদেবী নামক এক গন্ধর্ব রাজকুমারী বালাজির সুন্দর মুখে এই খুঁত দেখে ব্যথিত হন এবং নিজের চুলের একটি অংশ কেটে জাদুশক্তির সাহায্যে সেটি বালাজির মাথায় প্রতিস্থাপন করে দেন। মনে করা হয়, সেই থেকেই বালাজি মন্দিরে চুল দান করার প্রথা শুরু হয়।

গোপালকের এই কাজের জন্য শ্রীনিবাস তার প্রভু চোল রাজাকে অভিশাপ দেন। তবে রাজা শ্রীনিবাসের কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি জানান যে, পরজন্মে চোল রাজা আকাশরাজা রূপে জন্মগ্রহণ করে তাঁর কন্যা পদ্মাবতীর সঙ্গে শ্রীনিবাসের বিয়ে দিলে তিনি অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবেন। কালক্রমে চোল রাজা বর্তমানের অন্ধ্রপ্রদেশের তিরুচানুরে আকাশরাজা রূপে জন্মগ্রহণ করেন এবং নিজ কন্যা পদ্মাবতীর সঙ্গে শ্রীনিবাসের বিয়ে দেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ভেঙ্কটেশ্বর নিজের বিয়ের জন্য স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করতে কুবেরের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা ঋণ নিয়েছিলেন। কথিত আছে, কুবেরের এই ঋণ শোধ করার জন্য আজও ভক্তেরা বিপুল পরিমাণে দান করেন। বিয়ের পর শ্রীনিবাস ও পদ্মাবতী কলিযুগের শেষদিন পর্যন্ত মর্ত্যে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, এবং তারা দুজনে পাথরে পরিণত হয়ে চিরকালের জন্য তিরুপতিতে থেকে যান।

তিরুপতি বালাজির মন্দির কোনও একক ব্যক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে বিশ্বাস করা হয় যে মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হয় ৩৫০ সাল থেকে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে মন্দিরটি পল্লব, চোল, পাণ্ড্য, বিজয়নগরের রাজাদের দ্বারা সংস্কার করা হয়।

তিরুপতি বালাজি মন্দিরটি দ্রাবিড় স্থাপত্যশৈলীর এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। মন্দিরটির গঠনশৈলী অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং শিল্পকর্ম সমৃদ্ধ। এই মন্দিরের প্রধান অংশগুলি হল –

আনন্দ-নিলয়ম: এটি মন্দিরের গর্ভগৃহের নাম। ১৫১৭ সালে বিজয়নগরের সম্রাট কৃষ্ণদেবরায় মন্দিরে বিপুল পরিমাণ সোনা ও রত্ন দান করেন, যা দিয়ে আনন্দ-নিলয়মের ছাদটি স্বর্ণমণ্ডিত করা হয়েছিল।

প্রবেশদ্বার: তিরুপতি বালাজি মন্দিরে প্রবেশের জন্য তিনটি প্রধান দ্বার রয়েছে। প্রথমটি হল মহাদ্বারম বা পদিকাভালি, যার উপর প্রায় ৫০ ফুট উঁচু একটি গোপুরম রয়েছে। দ্বিতীয়টি ভেন্দিভাকিলি বা রৌপ্যদ্বার। এবং তৃতীয় ও প্রধান প্রবেশদ্বারটি হল বাঙ্গারুভাকিলি বা স্বর্ণদ্বার, যা দিয়ে গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে হয়। এই স্বর্ণদ্বারের দুই পাশে তামার দ্বারপালক জয় ও বিজয়-এর মূর্তি স্থাপিত। দরজাটি মোটা কাঠে নির্মিত এবং তার ওপর সোনার গিলটি করা পাতে বিষ্ণুর দশাবতারের চিত্র খোদিত রয়েছে।

প্রদক্ষিণের পথ: গর্ভগৃহের চারপাশে দুটি প্রধান প্রদক্ষিণের পথ রয়েছে—সম্পাঙ্গি প্রদক্ষিণম এবং বিমানপ্রদক্ষিণম।

পুরো মন্দির প্রাঙ্গণটি গ্রানাইট, বেলেপাথর এবং সাবান পাথর দিয়ে তৈরি। এখানে পিরামিড আকৃতির ছাদ, প্রধান পাকশালা, বিনামূল্যে খাবার দেওয়ার কক্ষ, মুদ্রা ভাণ্ডার এবং তীর্থযাত্রীদের থাকার জন্য একাধিক কক্ষ রয়েছে। মন্দিরের মধ্যে সোনার পাতে মোড়া একটি ধ্বজস্তম্ভ এবং অসাধারণ পাথরের কারুকার্য ও দেবদেবীর নানা মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়।

মন্দিরের দেওয়ালে তামিল, তেলেগু ও কন্নড় ভাষায় অনেক লিপি খোদাই করা আছে। এখানে প্রায় ৩০০০টি তামার পাতে তাল্লাপাকা আন্নামাচার্য এবং তার উত্তরসূরিদের তেলুগু সংকীর্তন উৎকীর্ণ করা রয়েছে। এই লিপিগুলো শুধু সংগীতবিদ্যার জন্যই নয়, তেলুগু ভাষার ঐতিহাসিক ভাষাতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।

তিরুপতি বালাজি মন্দিরের প্রধান উপাস্য দেবতা হলেন ভগবান ভেঙ্কটেশ্বর। গর্ভগৃহে স্থাপিত দেববিগ্রহটি মন্দিরের মূল কেন্দ্রের একটু ডান দিক ঘেঁষে রয়েছে বলে মনে করা হয়। পূর্বমুখী এই মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় ৯ ফুট। মণিমুক্তাখচিত অলঙ্কার ও পুষ্পমালায় সজ্জিত কালো পাথরের এই চতুর্ভুজ ও দণ্ডায়মান মূর্তির চারটি হাত রয়েছে। এর একটিতে শঙ্খ, একটিতে চক্র, একটিতে বরদ মুদ্রা এবং অন্য হাতটি হাঁটুর উপর রাখা আছে। ভেঙ্কটেশ্বরের ডান বুকে দেবী লক্ষ্মী এবং বাম বুকে দেবী পদ্মাবতী বিরাজমান। ভক্তদের বিশ্বাস, বালাজির মূর্তির চুল আসল এবং মসৃণ এবং এটি কোনো অবস্থাতেই জটযুক্ত হয় না।

তিরুপতি বালাজি মন্দিরে পূজার কিছু বিশেষ রীতিনীতি রয়েছে। ভক্তদের মন্দিরে প্রবেশের জন্য আইডি কার্ড থাকা বাধ্যতামূলক এবং ভারতীয় রীতি অনুসারে পোশাক পরিধান করতে হয়। এখানে ফুল বা ফলের ডালি দিয়ে পূজা দেওয়ার রীতি নেই। ভক্তরা মন্দিরের বাইরে কর্পূরের দীপ জ্বালিয়ে এবং নারকেল ফাটিয়ে ভগবানের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন করেন। এরপর প্রণামী হিসেবে অর্থ হুন্ডি বা অর্থ ভাণ্ডারে দান করার রীতি প্রচলিত। চুল দান করার প্রথাও এখানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রতিদিন সকালে সুপ্রভাতম গান গেয়ে ভগবানকে ঘুম থেকে জাগানোর ঐতিহ্য রয়েছে।

গর্ভগৃহে প্রধান ভেঙ্কটেশ্বর মূর্তি ছাড়াও ভেঙ্কটেশ্বরের পাঁচটি রূপ — মূলাবিরাট, ভোগ শ্রীনিবাস, উগ্র শ্রীনিবাস, মালায়াপ্পা স্বামী, এবং কোলুভু শ্রীনিবাসকে একসাথে পঞ্চ বেরাম নামে পূজা করা হয়। এছাড়া মন্দির চত্বরে সীতা, রাম, লক্ষ্মণ, কৃষ্ণ, গরুড়, নৃসিংহ, কুবের, রামানুজ এবং হনুমানের জন্য আলাদা আলাদা মন্দির রয়েছে।

তিরুপতি বালাজি মন্দিরের প্রধান উৎসব হল শ্রীভেঙ্কটেশ্বর ব্রহ্মোৎসব, যা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে নয় দিন ধরে উদযাপিত হয়। এই উৎসবে ভগবানের চমৎকার শোভাযাত্রা বের করা হয়। এছাড়াও বৈকুণ্ঠ একাদশী, রথসপ্তমী, রামনবমী এবং জন্মাষ্টমী-এর মতো অনুষ্ঠানগুলি এই মন্দিরে ধুমধাম করে পালন করা হয়। সাধারণ দিনে হাজার হাজার দর্শনার্থী উপস্থিত হলেও বিশেষ উৎসবের সময় তীর্থযাত্রীর সংখ্যা লক্ষাধিক ছাড়িয়ে যায়। এই মন্দিরটি বিশ্বের সেই সকল মন্দিরগুলির মধ্যে একটি, যেখানে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। এর সমৃদ্ধ ইতিহাস, গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং আকর্ষণীয় স্থাপত্য এটিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading