ইতিহাস

রুক্মা বাঈ

ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের প্রথম অনুশীলনকারী মহিলা ডাক্তারদের মধ্যে একজন হলেন রুক্মা বাঈ রাউত (Rukhmabai Raut)। বর্তমান ভারতে নারী যে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তার শুরু হয়েছিল রুক্মা বাঈয়ের হাত ধরেই। রুক্মা বাঈ ছিলেন এমন এক সাহসী নারী যাঁর উদ্যমেই বাল্যবিবাহ এবং বাধ্যতামূলক বৈধব্য গ্রহণের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার ১৮৯১ সালে ‘সম্মতি বয়সের আইন’ (Age of Consent Act) জারি করতে বাধ্য হয়। দৃষ্টান্তমূলক ‘বিবাহ অধিকার পুনঃস্থাপন’ মামলার সঙ্গে আজও রুক্মা বাঈয়ের নাম স্মরণ করা হয়। রুক্মা বাঈ এক অর্থে ব্রিটিশ ভারতের প্রথম নারীবাদী সাহসিনী।

১৮৬৪ সালের ২২ নভেম্বর বম্বেতে গ্রান্ট রোডের কাছে গম্‌দেভি শহরে একটি মারাঠি পরিবারে রুক্মা বাঈয়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম জনার্দন পাণ্ডুরঙ্গ এবং মায়ের নাম জয়ন্তী বাঈ। তাঁর মা জয়ন্তী বাঈ নিজেই ছিলেন বাল্যবিবাহের শিকার। মাত্র ১৪ বছর বয়সে জয়ন্তী বাঈয়ের বিয়ে হয়েছিল, ১৫ বছর বয়সে তিনি তাঁর একমাত্র কন্যা রুক্মা’র জন্ম দেন এবং দুর্ভাগ্যক্রমে ১৭ বছর বয়সেই তিনি বিধবা হন। তখন রুক্মা বাঈয়ের বয়স মাত্র দুই বছর। তাঁর স্বামীর মৃত্যুর ৬ বছর পরে, জয়ন্তী বাঈয়ের আবার বিবাহ হয় বম্বের বিখ্যাত ডাক্তার ও সমাজকর্মী বিপত্নীক ড. সখারাম অর্জুনের সঙ্গে। এই দম্পতি ছিলেন ‘সুতার’ (ছুতার) সম্প্রদায়ের তাই তাঁদের মধ্যে বিধবাদের পুনর্বিবাহের প্রচলন ছিল।

রুক্মা বাঈয়ের প্রাথমিক পড়াশোনা সম্পর্কে বিশেষ কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। সেসময় সমাজের নিয়ম মেনে মাত্র এগারো বছর বয়সে রুক্মা বাঈয়ের বিয়ে হয় উনিশ বছরের কিশোর দাদাজি ভিকাজি’র সঙ্গে। রুক্মার বাবা মা ব্যতিক্রমীভাবে ভিকাজিকে তাঁদের পরিবারে ঘরজামাই হিসেবে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তাঁকে বাধ্যতামূলকভাবে স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াতে শুরু করেন। কিন্তু ভিকাজির এসমস্ত নিয়ম একেবারেই পছন্দ ছিল না। রুক্মা বাঈ তাঁর বাবা মায়ের অধীনে থেকে স্কুলে পড়াশোনা করছিলেন। বিয়ের সাতমাসের মধ্যে রুক্মা বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছালে তাঁর ‘গর্ভাধান’ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। কিন্তু তাঁর বাবা সখারাম একজন প্রগতিশীল চিকিৎসক হবার দরুন অসময়ে এই অনুষ্ঠানের মূল্যহীনতা বুঝতে পেরে বাধা দেন। এতে কুড়ি বছর বয়সী ভিকাজী অসন্তুষ্ট হন এবং ১৮৮৪ সালে রুক্মা বাঈকে তার কাছে থাকতে আদেশ করেও রুক্মা সম্মত না হওয়ায় বম্বে উচ্চ আদালতে মামলা রুজু করেন। এরই মধ্যে খারাপ সঙ্গে পড়ে ভিকাজীর চরিত্রের অধঃপতন দেখে তার সঙ্গে বিবাহ করতে অস্বীকৃত হন রুক্মা। সেসময় ভিকাজী তাঁর কাকা নারায়ণ ধুরমাজির কাছে থাকতেন। ভিকাজীর মায়ের মৃত্যু হলে তিনি আরো অলস ও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আদালতে মামলা উঠলে আদালত ভিকাজীর ‘বিবাহ অধিকার’-এর ক্ষমতায় রুক্মাকে দুটি উপায় বলেন- এক তাঁর স্বামীর সঙ্গে বিনা প্রশ্নে ঘরে যাওয়া আর নচেৎ ছয় মাসের কারাবাস। রুক্মা এই যুক্তিতে তীব্র প্রতিবাদ জানান যে, বাধ্যতামূলকভাবে যখন তাঁর বিবাহ হয়েছে তখন সেই বিবাহ সম্পর্কে সম্মতি জানানোর বোধ-জ্ঞান কিছুই তাঁর ছিল না। তাই তাঁর একপ্রকার অসম্মতিতেই এই বিবাহ হয়েছে। এখান থেকেই শুরু হয়ে যায় ইতিহাসে বিখ্যাত সেই ‘বিবাহ-অধিকার পুনঃস্থাপন মামলা’ যা ‘ভিকাজী বনাম রুক্মা বাঈ, ১৮৮৫’ নামে আদালতে ওঠে।

রুক্মা বাঈয়ের জীবনের সবথেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা তথা কৃতিত্ব হল এই মামলায় লড়ে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ‘সম্মতি বয়সের আইন’ পাস করানো। উনিশ শতকের ভারতে নারী অধিকারের ইতিহাসে এই মামলা ছিল একটি মাইলফলক। আদালতের এই মামলার বিরুদ্ধে বাল্যবিবাহ এবং নারীর অধিকার নিয়ে বেহ্‌রামজি মালাবারি, রমাবাঈ রানাডে’র মত সমাজসংস্কারকেরা এই মামলাটি জনসমক্ষে আনতে গড়ে তোলেন ‘রুক্মা বাঈ ডিফেন্স কমিটি’। ‘জনৈক হিন্দু মহিলা’ (A Hindu Lady) ছদ্মনামে ‘টাইমস অফ ইণ্ডিয়া’ পত্রিকায় রুক্মা বাঈ দুটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি লিখেছিলেন এইসময়। নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা এই দুটি চিঠির বিষয় ছিল বাল্যবিবাহের বিরোধিতা, বাধ্যতামূলক বৈধব্যগ্রহণ এবং সমাজে নারীর অবস্থান। ১৮৮৫ সালের ২৬ জুনে প্রকাশিত এর একটি চিঠিতে রুক্মা বাঈ জানিয়েছেন যে অত্যন্ত কম এবং অনুপযুক্ত বয়সে বিবাহের কারণে তাঁর পড়াশোনা এবং চিন্তা-চর্চার যে প্রসার তা ব্যাহত হয়েছে। জয়া সাগাড়ে’র (Jaya Sagade) লেখা ‘ভারতে বাল্যবিবাহ’ (Child Marriage in India) বইতে রুক্মার এই চিঠি দুটি পুনর্মুদ্রিত হয়েছে।

১৮৮৪ সালের মার্চ মাসে ভিকাজী তাঁর আইনজীবী চক (Chalk) ও ওয়াকারের (Walker) মাধ্যমে সখারাম অর্জুনকে এই মর্মে আইনি নির্দেশিকা পাঠান যে, রুক্মা বাঈয়ের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের পথে তিনি যেন বাধা না দেন। সখারাম এতে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে আইনজীবী পেইন-গিলবার্ট (Payne-Gilbert) ও সায়নি’র (Sayani) মাধ্যমে রুক্মা কেন ভিকাজীর সঙ্গে থাকতে অসম্মত তার কারণ ব্যাখ্যা করেন। আদালতে বিচারপতি রবার্ট হিল পিন্‌হে (Robert Hill Pinhey) দৃষ্টান্ত হিসেবে ইংরেজি আইনের ত্রুটি পেয়েছিলেন এবং হিন্দু আইনে কোনো উদাহরণ খুঁজে পাননি। তাই তিনি বলেছিলেন যে রুক্মা বাঈ তাঁর শৈশবে বিবাহ করতে বাধ্য হলেও, এখন যুবতী রুক্মাকে ভিকাজী কখনোই বাধ্য করতে পারেন না। এরপরে পিন্‌হে অবসর নিলে মামলাটি পুনরায় আদালতে ওঠে, তখন রুক্মা বাঈয়ের পক্ষের আইনজীবী ছিলেন জে.ডি.ইনভারারিটি জুনিয়র (J.D.Invererity Jr.)এবং কাশীনাথ ত্রিম্বক তেলং। এই মামলা সাধারণ মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। বিশ্বনাথ নারায়ণ মাণ্ডলিক তাঁর পরিচালিত অ্যাংলো-মারাঠি সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘নেটিভ ওপিনিয়ন’ (Native Opinion)-এ বিচারপতি পিন্‌হে-র বক্তব্যের সমালোচনা করে লেখেন যে এই আইন হিন্দুপ্রথার পবিত্রতা নষ্ট করেছে। বালগঙ্গাধর তিলক পুনের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘মারহাট্টা’তে লিখলেন যে পিন্‌হে হিন্দু আইনের মাহাত্ম্য বুঝতে পারেননি। এরই সঙ্গে টাইমস অফ ইণ্ডিয়ায় রুক্মা বাঈয়ের লেখা চিঠিগুলি আরো উত্তেজনা তৈরি করে। ১৮৮৭ সালে বিচারপতি ফার্‌আন (Farran) হিন্দু আইন ব্যাখ্যা করে বলেন যে রুক্মা বাঈ হয় কারাবন্দী হবেন অথবা তাঁর স্বামীগৃহে যাবেন। রুক্মা বাঈ বিবাহকে সম্মতি দেবার তুলনায় কারাবন্দী হওয়াকেই যথাযথ মনে করলেন। এই নিয়ে ‘কেশরী’ পত্রিকায় বালগঙ্গাধর তিলক লেখেন যে রুক্মা বাঈয়ের এই প্রতিবাদ আদতে তাঁর ইংরেজি শিক্ষার ফল এবং হিন্দুধর্ম  এইযুগে সঙ্কটাপন্ন। অন্যদিকে বিখ্যাত জার্মান ভাষাতাত্ত্বিক ম্যাক্সমুলার লেখেন যে রুক্মা বাঈয়ের শিক্ষাই তাঁকে তাঁর শ্রেষ্ঠ বিচারক করে তুলেছে। যোগ্য বিচারের আশায় তখন মরিয়া রুক্মা স্বয়ং রাণী ভিক্টোরিয়াকেই চিঠি লিখে বসেন হিন্দু আইনের পরিবর্তন করার অনুরোধ জানিয়ে। নারী অধিকার সচেতন ভিক্টোরিয়া বিশেষ ডিক্রি জারি করে রুক্মার এই বিবাহ বন্ধ করেন। আর এর চার বছর পরেই ১৮৯১-তে রাণী ভিক্টোরিয়া ‘সম্মতি বয়সের আইন’ পাস করে মেয়েদের বিবাহের একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা স্থির করেন। অবশেষে ১৮৮৮ সালের জুলাই মাসে দু’হাজার টাকার বিনিময়ে ভিকাজী রুক্মা’র সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে রাজী হন। আদালতের নির্দেশ না মেনেই বিবাহ ভেঙে দেন রুক্মা, ভারত সরকারের কাছে এ ব্যাপারে তাঁর সাক্ষ্যপ্রমাণের বয়ানটি প্রকাশিত হয় ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় ১৫ জুলাই ১৮৮৭ তারিখে।     

তবে এই মামলার পরে ভিকাজীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে রুক্মা বাঈ ১৮৮৮-তে ইংল্যাণ্ডের ‘লণ্ডন স্কুল অফ মেডিসিন’ (London School of Medicine)-এ ডাক্তারি পড়া সম্পূর্ণ করেন বম্বের কামা হাসপাতালের সক্রিয় কর্মী ডা. এডিথ পিচে (Dr. Edith Pechey)-র আন্তরিক সহায়তায়। রুক্মা বাঈয়ের প্রকৃত কর্মজীবন শুরু হয়  ১৮৯৪ সালে সুরাটের ‘চিফ মেডিক্যাল অফিসার’ হিসেবে নিযুক্ত হয়ে ভারতে ফিরে। তিনি সুরাট, রাজকোট, বম্বেতে ৩৫ বছর ধরে চিকিৎসকের কাজ করে গেছেন। যদিও তাঁর আগে আনন্দী গোপাল যোশী ছিলেন প্রথম মহিলা ডাক্তার কিন্তু তিনি রুক্মা বাঈয়ের মত সরাসরি কখনো ডাক্তারি অনুশীলন করেননি। ১৯২৯ সালে অবসর নেওয়ার পরে তিনি মহিলাদের পর্দাপ্রথার বিরুদ্ধে, এই কুপ্রথার অবলুপ্তি চেয়ে বই রচনা করতে থাকেন ও সচেতনতা প্রসার করতে থাকেন।

২০০৮ সালে রুক্মা বাঈ এবং ভিকাজীর মামলাটির বিষয় নিয়ে ‘এনস্লেভ্‌ড ডটারস : কলোনিয়ালিজ্‌ম, ল’ অ্যান্ড ওমেন’স রাইটস’ (Enslaved Daughters : Colonialism, Law and Womens’ Rights) নামে বই লেখেন সুধীর চন্দ্র। ২০১৬-তে অনন্ত মহাদেভ্‌ন পরিচালিত ‘রুক্মাবাঈ ভীমরাও রাউত’ নামে একটি মারাঠি ছবি মুক্তি পায় রুক্মা বাঈয়ের জীবন অবলম্বনে। তন্নিষ্ঠা চ্যাটার্জি এই ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর তাঁর ১৫৩তম জন্মদিনে তাঁকে সম্মান জানিয়েছে গুগ্‌ল ডুড্‌ল।

১৯৫৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রুক্মা বাঈয়ের মৃত্যু হয়।  

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন