বেলা মিত্র (Bela Mitra) একজন বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামী যিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজের ঝাঁসি রানী রেজিমেন্টের সদস্যা ছিলেন। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি অসীম সাহস এবং পারদর্শীতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সম্পর্কে তিনি সুভাষচন্দ্র বসুর ভাইঝি ছিলেন।
সাম্প্রতিক পোস্ট
১৯২০ সালে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার কোদালিয়া গ্রামে মতান্তরে ভাগলপুরে মামা বাড়িতে বেলা মিত্রের জন্ম হয়। তাঁর প্রকৃত নাম ওমিতা বসু। বাবা সুরেশচন্দ্র বসু ও মা সুধা বসুর কনিষ্ঠা কন্যা ছিলেন বেলা। বড় মেয়ে ইলা বসু। ১৯৩৬ সালে আজাদ হিন্দ বাহিনী -র গুপ্তচর বিভাগের প্রধান হরিদাস মিত্র-র সাথে বিবাহ হয় বেলা-র। তাঁদের পুত্র অমিত মিত্র বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী ও প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল।
ছোটোবেলা থেকেই কাকা সুভাষচন্দ্র এবং পরিবার সূত্রে বেলার মধ্যেও তৈরি হয়েছিল বিপ্লবী চিন্তাধারা। বিয়ের বছর দুয়েকের মধ্যেই বেলা তাঁর শ্বশুর বাড়িতেও নিজস্ব কায়দায় গড়ে তুলেছিলেন বিপ্লবী মহিলা সমিতি। ১৯৪০ সালে কংগ্রেসের রামগড় অধিবেশন থেকে বেরিয়ে নেতাজি আপস বিরোধী সম্মেলনের ডাক দিলে তখন মাত্র ১৯ বছর বয়সে বেলা সেই সম্মেলনের মহিলা শাখার প্রধান নিযুক্ত হয়ে নিজেই দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসেন। বিপ্লবীদের গোপন জায়গায় পাঠানো , তাঁদের পালাতে সাহায্য করা , সংগঠন চালানো, গোপন সংবাদ আদানপ্রদান— সমস্ত কিছু একসময় সামলেছেন তিনি। ১৯৪৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তাঁর বেহালার বাড়িতে থেকেই তিনি ট্রান্সমিটার মারফত সিঙ্গাপুর ও রেঙ্গুনে নেতাজির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। নেতাজির পাঠানো অস্ত্রশস্ত্রসহ আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের উড়িষ্যার কোনারক মন্দিরের কাছে গোপনে ও নিরাপদে থাকার জন্য বেলা ও তাঁর স্বামী বিশেষ সাহায্য করেন যার ফলে বেলাকে নিজের গয়না বিক্রি পর্যন্ত করতে হয়েছিল। নিজেদের জীবনের প্রবল ঝুঁকি নিয়েই তাঁরা এই কাজ করেছিলেন।
সুভাষচন্দ্র যখন দেশের বাইরে তখন ৬-এ বিপিন পাল রোডের বাড়িতে ব্রিটিশ পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সুভাষ অনুগামী চার বিপ্লবী আইএনএ (INA)-এর গুপ্তবাহিনীর কাজ চালাতেন। এঁরা হলেন পবিত্রমোহন রায়, অমর সিং গিল, জ্যোতিষচন্দ্র বসু ও হরিদাস মিত্র। এই বাড়িটিতে একটি টেলিগ্রাফ সেট বসানো হয়েছিলো যার সাহায্যে তাঁরা সাংকেতিক ভাষায় ব্রিটিশদের গোপন খবর নেতাজিকে পাঠাতেন। এই কাজটি জ্যোতিষচন্দ্র বসুই করতেন এবং এই কাজে তাঁকে সাহায্য করতেন হরিদাস মিত্র ও পবিত্রমোহন রায়। ১৯৪৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই বাড়ি থেকেই গ্রেফতার হন জ্যোতিষচন্দ্র বসু এবং এর কয়েকদিনের মধ্যেই ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেফতার করে বেলা-র স্বামী হরিদাস মিত্র এবং তাঁর অন্য দুই সহকর্মী অমৃক সিং গিল ও পবিত্রমোহন রায়কে। তাঁদের ধরে এনে প্রথমে রাখা হয়েছিল লর্ড সিনহা রোডের গোয়েন্দা বিভাগের বাড়িতে। পুলিশের অকথ্য অত্যাচারেও মুখ খোলেননি তাঁরা। কিছুদিন পরে অমৃক সিং গিল সিং গিল ও জ্যোতিষচন্দ্রকে নিয়ে যাওয়া হয় প্রেসিডেন্সি জেলে আর হরিদাস মিত্র ও পবিত্র রায়কে রাখা হয় আলিপুর জেলে। অল্প দিনের মধ্যেই অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চার বিপ্লবীর ফাঁসির হুকুম জারি করা হয়।
হরিদাস মিত্রর স্ত্রী বেলার কানে এ খবর যেতেই তিনি একটুও অপেক্ষা না করে রওনা পুনে চলে যান মহাত্মা গান্ধীর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেলকে গান্ধীজী কালবিলম্ব না করে চার বিপ্লবী যুবকের ফাঁসি রোধের আবেদন জানান। গান্ধীর আবেদনে কাজ হয় এবং শেষমুহুর্তে নাটকীয়ভাবে ১৯৪৬ সালের মার্চে চার বিপ্লবীর ফাঁসির আদেশ রদ করে ব্রিটিশ সরকার। সে বছরেই গান্ধীজির নোয়াখালির পদযাত্রায় অংশ নেন জ্যোতিষচন্দ্র ও তাঁর স্ত্রী পূরবী।
১৯৪৭ সালে বেলা মিত্র প্রতিষ্ঠিত ‘ঝাঁসির রানি ত্রাণ সমিতি’ সমাজসেবা সহ অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সামাজিক কাজে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। স্বাধীনতার পর শিয়ালদহ ও অন্য কয়েকটি জায়গায় ত্রাণকার্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন বেলা মিত্র। তাঁর স্বামী হরিদাস মিত্র তখন কংগ্রেসের টিকিট জিতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হলেও বেলা মিত্র কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় রাজনীতির জগতে পা রাখেননি।
১৯৫০ সালে বালি ও ডানকুনির মধ্যবর্তী অভয়নগর অঞ্চলে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন বেলা। অত্যধিক পরিশ্রমে তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়তে থাকে এবং এক সময় তিনি কঠিন রোগে আক্রান্ত হন।অবশেষে ১৯৫২ সালের ৩১ জুলাই মাত্র ৩২ বছর বয়সে বেলা মিত্র-র মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর পর ১৯৫৩ সালে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে অভয়নগর অঞ্চলের নাম পরিবর্তন করে ‘বেলানগর’ করা হয়। ১৯৫৮ সালে ভারতীয় রেল ওই অঞ্চলেই একটি নতুন স্টেশন তৈরী করে যার নাম ‘বেলানগর’ রেলওয়ে স্টেশন। এটাই প্রথম ভারতীয় কোনো নারীর নামে নামাঙ্কিত স্টেশন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান