প্রাচীন বাংলায় ইংরেজদের লুঠের ইতিহাস কিংবা বর্গীদের লুঠের ইতিহাস সর্বজনবিদিত। তবে এদের নৃশংসতাকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল বাংলারই এক রাজা দেবী সিংহের লুঠের ইতিহাস। যদিও তিনি ইংরেজদের প্রতিনিধি হিসাবেই রাজস্ব আদায় করতেন এবং সেই কারণেই ইংরেজদের থেকে রাজা উপাধি পেয়েছিলেন। মুর্শিদাবাদের নশিপুর রাজবাড়ি তাঁর নৃশংসতার সাক্ষী হিসাবে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে। যে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময়ে বাংলার মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছিল, সেই ছিয়াত্তরেই রাজা দেবী সিংহ তৈরি করেছিলেন এই রাজবাড়ি। মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় রোমাঞ্চ যোগ করতে একবার অন্তত নশিপুর রাজবাড়ি ঘুরে দেখতে পারেন।
আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ
নশিপুর রাজবাড়ি কোথায়
মুর্শিদাবাদ জেলায় ভাগীরথী নদীর পূর্ব তীরে মুর্শিদাবাদ স্টেশন থেকে মাত্র সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে নশিপুর রাজবাড়ি অবস্থিত। এটি হাজারদুয়ারী থেকে তিন কিলোমিটার দূরে, কাটরা মসজিদ থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে এবং মোতিঝিল থেকে সাড়ে ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
নশিপুর রাজবাড়ির ইতিহাস
১৭৭৬ সালে রাজা দেবী সিংহ তৎকালীন নয় লক্ষ টাকা ব্যয়ে নশিপুর রাজবাড়ি তৈরি করেন। সেই রাজবাড়ির অনেক অংশ পরবর্তীকালে বিভিন্ন কারণে নষ্ট হয়ে গেলে ১৮৫৬ সালে দেবী সিংহের উত্তরপুরুষ রাজা কীর্তিচাঁদ রাজবাড়িটি সংস্কার করেন। সেই রূপটিই আমরা এখন দেখতে পাই। ১৯৮২ সালে রাজবাড়িটি মিউজিয়ামে পরিবর্তন করা হয় এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। রাজবাড়ির বর্তমান মালিকানা রয়েছে দেবী সিংহের অষ্টম প্রজন্মের হাতে।
নশিপুর রাজবাড়ি কীভাবে যাবেন
মুর্শিদাবাদ স্টেশনের বাইরে টোটো পাওয়া যায়। সম্পূর্ণ টোটো রিজার্ভ করে যেতে পারেন, আবার মাথাপিছু ভাড়াতে সহযাত্রীদের সাথেও যেতে পারেন। তবে সম্পূর্ণ টোটো রিজার্ভ না করলে ফেরার পথে গাড়ি পাওয়ার সুযোগ কম। সাধারণত স্থানীয় মানুষেরা নিজের গাড়ি বা বাইকে করে ঘুরতে যায় এখানে।
মুর্শিদাবাদ শহরের বাইরে থেকে গেলে ট্রেন, বাস বা গাড়ি বিভিন্ন উপায়ে যাওয়া যায়। ট্রেনে যেতে হলে মুর্শিদাবাদ স্টেশনে নামতে হবে। হাওড়া বা বর্ধমান স্টেশন থেকে সরাসরি মুর্শিদাবাদ স্টেশনে যাওয়ার কোনও ট্রেন নেই। সরাসরি ট্রেন না থাকলেও আজিমগঞ্জ স্টেশন অবধি ট্রেনে গিয়ে তারপর আজিমগঞ্জ থেকে গাড়ি ভাড়া করে মুর্শিদাবাদ যাওয়া যাবে। তাছাড়া কলকাতা স্টেশন থেকে সরাসরি মুর্শিদাবাদ স্টেশনে যাওয়ার ট্রেন রয়েছে। বাসে করে যেতে হলে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে মুর্শিদাবাদগামী বাস পাওয়া যায়। বাস সাধারণত বহরমপুর অবধি যায়। তারপর বহরমপুর থেকে ১১ কিলোমিটার পথ ভাড়াগাড়ি বা অটোরিকশায় যাওয়া যেতে পারে। গাড়িতে যেতে হলে গ্র্যান্ড ট্যাঙ্ক রোড বা জিটি রোড ধরে যাওয়া যায়। বর্ধমান থেকে গাড়িতে সময় লাগবে প্রায় চারঘন্টা এবং কলকাতা থেকে গাড়িতে সময় লাগবে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা।
আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদের সমস্ত দর্শনীয় স্থান
নশিপুর রাজবাড়িতে কোথায় থাকবেন
স্থানীয়দের কাছে একদিনের মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের জন্য নশিপুর রাজবাড়ি জনপ্রিয় একটি ভ্রমণস্থান। তবে মুর্শিদাবাদের বাইরে থেকে ঘুরতে গেলে মুর্শিদাবাদ শহরে, বিশেষ করে হাজারদুয়ারির কাছে থাকবার জন্য অনেক হোটেল রয়েছে। মোতিঝিলের আশেপাশেও অনেক হোটেল রয়েছে। এইসব হোটেলে থেকে একদিনের সাইটসিইং হিসাবে নশিপুর রাজবাড়ি ঘুরতে যেতে পারেন।
নশিপুর রাজবাড়িতে কী দেখবেন
হাজারদুয়ারির অনুকরণে তৈরি কুখ্যাত দেবীসিংহের উত্তর পুরুষ কীর্তিচাঁদের বসতবাড়িটি হল নশিপুর রাজবাড়ি।

দেবীসিংহ, নবাব মোবারকদৌল্লার সময়ে রাজস্ব বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি অত্যন্ত নৃশংস ছিলেন। কর আদায়ের জন্য স্ত্রী পুরুষ, প্রত্যেকের উপর অমানুষিক অত্যচার করতেন। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময়ও অত্যাচার করে প্রচুর কর আদায় করেন।বর্তমানে বসতবাড়িটি সংগ্রহশালা হিসাবে সকলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। রাজবাড়ির ভিতরে দশাবতার ও মহাবীর মূর্তি আছে। পুতুলের সাহয্যে দেখানো বিষ্ণুপুরাণ কাহিনী অবলম্বনে মূর্তি রয়েছে, রয়েছে উল্লেখযোগ্য জাফরির কাজ। এই রাজবাড়ির ঝুলনযাত্রা উৎসব, রথযাত্রা উৎসব আজও বিখ্যাত।
ফাঁসিঘর
প্রাসাদের মধ্যেই ছিল ফাঁসিঘর। রাজা দেবী সিংহের আদেশে অনেক প্রজাদের বন্দী করে রাখা হত তাঁদের মধ্যে অনেককেই এখানে ফাঁসি দেওয়া হত। সেই ফাঁসির চেন আজও সিলিং থেকে ঝুলতে দেখা যায়। নিচে ছিল কুয়ো, যেটি ভাগীরথী নদীর সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল। দুর্ভাগা সেই প্রজার লাশ তাঁর পরিবার পেতেন না। ফাঁসি দেওয়ার পর প্রজাদের লাশ কুয়োতে গিয়ে পড়ত এবং কুয়োর মাধ্যমে নদীতে চলে যেত। সাম্প্রতিক সময়ে ঘুরতে গিয়ে একটি বাচ্চা কুয়োতে পড়ে মারা যায়। তারপর কুয়ো সরিয়ে মেঝে বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ঘুরতে গেলে মেঝেটিই দেখতে পাবেন।
ভেতরে সংগ্রহশালা রয়েছে। রাজবাড়ি তথা সংগ্রহশালাটি বছরের প্রতিদিন খোলা থাকে। টিকিটমূল্য মাথাপিছু ২০ টাকা। এখানে প্রি ওয়েডিং থেকে শুরু করে বিভিন্ন সিনেমার শ্যুটিং হয়। যদি গাইড নিতে চান, তাহলে গাইডের খরচ ৫০ টাকা নির্দিষ্ট করা আছে।
নশিপুর আখড়া
নশিপুর রাজবাড়ির খুব কাছে দক্ষিণ ভারতীয় রামানুজ সম্প্রদায়ের সাধুদের তৈরি এই আখড়াটি দেখতে পাওয়া যাবে। এখানে ঝুলন ও রথযাত্রার সময়ে মেলা বসে। এই আখড়ায় পিতলের রথ রয়েছে যা রথযাত্রার সময় বের হয়। এছাড়া এখানে সংগ্রহশালা রয়েছে, যার ভেতরে নবাবী আমলের জিনিসপত্র দেখতে পাবেন।
আখড়ায় প্রবেশের টিকিটমূল্য মাথাপিছু ২০ টাকা। সংগ্রহশালার ভিতরে ছবি তোলা নিষেধ। যদি গাইড নিতে চান, তাহলে গাইডের আনুমানিক খরচ ৫০ টাকা।
নশিপুর রাজবাড়িতে কখন যাবেন
সারাবছরই নশিপুর রাজবাড়িতে যাওয়া যায়। তবে অক্টোবর থেকে মার্চ সবচেয়ে উপযুক্ত এবং আরামদায়ক। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেশি থাকায় ভ্রমণের পক্ষে কষ্টকর। এটি বছরের সবদিন সকাল সাতটা থেকে সন্ধে ছটা পর্যন্ত খোলা থাকে।
সতর্কতা ও পরামর্শ
- রাজবাড়িতে প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ২০ টাকা।
- রাজবাড়ি বছরের সবদিন সকাল সাতটা থেকে সন্ধে ছটা পর্যন্ত খোলা থাকে।
- রাজবাড়িতে যদি গাইড নিতে চান, তাহলে গাইডের জন্য ৫০ টাকা পড়বে।
- রাজবাড়ির মিউজিয়ামের জিনিসে হাত দেবেন না।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫
আরও পড়ুন: জগৎ শেঠের বাড়ি ভ্রমণ
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- নিজস্ব প্রতিনিধি
- “নবাবী অন্দরমহল”, লেখিকা – কল্পনা ভৌমিক
- “মুর্শিদাবাদ ভ্রমণগাইড”, লেখিকা – কাকলি মজুমদার
- https://en.wikipedia.org/
- https://map.sahapedia.org/


আপনার মতামত জানান