সমুদ্র, পাহাড় কিংবা অরণ্য নয়, বাংলার প্রাচীন ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের টানে চলে যেতে পারেন ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত মুর্শিদাবাদে। এখানে পর্যটকেরা ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়ার জন্য ভিড় করেন। নবাবী আমলের ঐতিহাসিক সব প্রাসাদ এবং স্থাপত্যগুলির সম্মুখে দাঁড়ালে মন নিমেষে চলে যেতে পারে সূদুর অতীতে। বিখ্যাত হাজারদুয়ারি এবং তার চারপাশে গড়ে ওঠা নবাবী প্রাসাদ, তৎকালীন বাঙলার উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালীদের বাসভবন, বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ ও স্তম্ভ —সব মিলিয়ে মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অসাধারণ।। প্রাচীন ভারতবর্ষের অন্যতম সম্পদশালী শহর এবং স্বাধীন বাংলার শেষ রাজধানী এই মুর্শিদাবাদের আনাচে-কানাচে ঘুরলে বাঙলার সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে বাঙালি হিসেবে গর্বিত হতে হয়। ইতিহাসের আকর্ষণে তাই প্রায় সারাবছরই বাঙালি তথা ভারতীয় এমনকি বিদেশিরাও এখানে এসে ভিড় জমান।
মুর্শিদাবাদ কোথায়
মুর্শিদাবাদ জেলার অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর মুর্শিদাবাদ ভাগীরথী নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত। কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ প্রায় ২০০ কিলোমিটার এবং বর্ধমান থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
মুর্শিদাবাদের ইতিহাস
মুর্শিদাবাদের পূর্বনাম ছিল মকসুদাবাদ। অষ্টাদশ শতকের শুরুতে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ান ছিলেন মুর্শিদকুলি খান। পরে তিনি বাংলার নবাব হলে তাঁর নামানুসারে মকসুদাবাদের নাম হয় মুর্শিদাবাদ। অষ্টাদশ শতকে এই মুর্শিদাবাদ ছিল ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধশালী একটি শহর। ১৭১৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার আমলে মুর্শিদাবাদকে বাংলার রাজধানী করা হয়। মুর্শিদাবাদ শুধুমাত্র রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী অঞ্চলই ছিল না, অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারতে বাণিজ্য ও প্রশাসনের কেন্দ্রও ছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ফরাসী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ড্যানিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিসহ ইউরোপীয় সংস্থাগুলি এই মুর্শিদাবাদকে কেন্দ্র করেই ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে। ইংরেজের কাছে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ের পর মুর্শিদাবাদের প্রতিপত্তিই শুধু কমে যায় তাই নয়, এই যুদ্ধ সমগ্র ভারতের ভবিষ্যত রচনা করেছিল। এরপর মুর্শিদাবাদ থেকে বাংলার রাজধানী কলকাতায় স্থানান্তর করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান হল এই মুর্শিদাবাদ। মুর্শিদকুলি খান, সিরাজুদৌল্লা, তৎকালীন বাঙলার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি জগৎ শেঠ প্রমুখ ঐতিহাসিক চরিত্রের স্মৃতি ধারণ করে আছে এই মুর্শিদাবাদ। মুর্শিদাবাদ বললেই অধিকাংশ মানুষের চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজারদুয়ারির চিত্র। সেই হাজারদুয়ারিকে কেন্দ্র করেও নানারকম ঐতিহাসিক নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সেইসব ইতিহাস-বিজড়িত স্থানগুলি সম্পর্কে নানান ঐতিহাসিক তথ্য জেনে যদি সেসব জায়গায় ঘুরে বেড়ানো যায় তবে সত্যিই এক রোমাঞ্চকর অনুভূতির অভিজ্ঞতা হতে পারে পর্যটকদের। সেইসব প্রাসাদোপম ভবন, মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে সিরাজুদ্দৌলা, জগৎ শেঠদের কীর্তি চোখের সামনে একেরপর এক ফুটে উঠতে দেখলে অভিভূত হয়ে যেতে হয়। এছাড়াও ভাগীরথী নদীর তীর ধরে ভ্রমণ করলেও সেই শান্ত, নিস্তব্ধ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মন ভরে ওঠে।
মুর্শিদাবাদ কীভাবে যাবেন
ট্রেনে যেতে হলে মুর্শিদাবাদ স্টেশনে নামতে হবে। হাওড়া স্টেশন থেকে সরাসরি মুর্শিদাবাদ স্টেশনে যাওয়ার কোনও ট্রেন নেই। একইভাবে বর্ধমান থেকেও সরাসরি ট্রেন নেই। সরাসরি ট্রেন না থাকলেও আজিমগঞ্জ স্টেশন অবধি ট্রেনে গিয়ে তারপর আজিমগঞ্জ থেকে গাড়ি ভাড়া করে মুর্শিদাবাদ যাওয়া যাবে। বাসে করে যেতে হলে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে মুর্শিদাবাদগামী বাস পাওয়া যায়। বাস সাধারণত বহরমপুর অবধি যায়। তারপর বহরমপুর থেকে ১১ কিলোমিটার পথ ভাড়াগাড়ি বা অটোরিকশায় যাওয়া যেতে পারে। গাড়িতে যেতে হলে গ্র্যান্ড ট্যাঙ্ক রোড বা জিটি রোড ধরে যাওয়া যায়। বর্ধমান থেকে গাড়িতে সময় লাগবে প্রায় চারঘন্টা এবং কলকাতা থেকে গাড়িতে সময় লাগবে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। তবে নিজের গাড়িতে এলে পার্কিংয়ের অসুবিধার কারণে কিছু কিছু জায়গা দেখতে অসুবিধার সৃষ্টি হতে পারে।
মুর্শিদাবাদে কোথায় থাকবেন
মুর্শিদাবাদে থাকবার জন্য নানারকম হোটেল রয়েছে। হাজারদুয়ারির কাছে রয়েছে বেশ কিছু হোটেল। পাঁচশো থেকে শুরু করে পাঁচহাজার বা তারও বেশি ভাড়ার হোটেল এখানে পাওয়া যাবে। মোতিঝিলের আশেপাশেও অনেক হোটেল রয়েছে আবার শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে কাশিমবাজারের রাজবাড়িটিতেও বর্তমানে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও অনেকে বহরমপুরের বিভিন্ন হোটেলে থেকে এখানে সাইটসিইং হিসাবে ঘুরতে যান।
মুর্শিদাবাদে কী দেখবেন
মুর্শিদাবাদে অনেক দ্রষ্টব্য রয়েছে। সেগুলো টোটো বা অটো রিজার্ভ করে যেতে পারেন। তবে আগে থেকে ভাড়া ঠিক করে তবেই উঠবেন। প্রতিটা জায়গার আলাদা গাইড এবং তাঁদের জন্য আলাদা মূল্য লাগে। গাইড মূল্য কত, প্রবেশ মূল্য কত ইত্যাদি নিয়ে মুর্শিদাবাদে কী দেখবেন, সেটা বিস্তারিত পড়ুন এখানে।
হাজারদুয়ারি
মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ বলতেই প্রথমে যে স্থানটির কথা আসে, তা অবশ্যই হাজারদুয়ারি। প্রাসাদটি ভাগীরথীর পাড় থেকে মাত্র ৪০ ফুট দূরত্বে অবস্থিত। এর ভিতরে এক হাজার খানা দরজা রয়েছে যে কারণে এইরকম নাম। এখানে আসল দরজা ৯০০টি এবং বাকি ১০০টি কৃত্রিম দরজা। সে-এক আশ্চর্য গোলকধাঁধা। যদিও অনেকে সিরাজুদ্দৌলার সঙ্গে হাজারদুয়ারীকে জড়িয়ে ফেলেন , কিন্তু পলাশির যুদ্ধে সিরাজের পতনের প্রায় ৭২ বছর পরে এটি নির্মিত হয়। নাজিম হুমায়ুন জাহ-এর আমলে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল। এই প্রাসাদটি ইংরেজদের সাথে নবাবদের মিটিং-এর জন্য এবং উঁচু পদে আসীন অফিসারদের আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হত।

পূর্বে হাজারদুয়ারির নাম ছিল বড় কোঠি। হাজারদুয়ারি প্রাসাদটি তিনতলা। তিনতলায় ছিল বেগম ও নবাবদের থাকার ঘর। দোতলায় দরবার হল, পাঠাগার ও অতিথিশালা। একতলায় ছিল নানা অফিসঘর ও গাড়ি রাখার জায়গা। প্রাসাদটির উচ্চতা ৮০ ফুট। প্রায় ৩৭ টি উঁচু সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হয়। প্রাসাদের ভেতরে রয়েছে ৯০ ডিগ্রি কোণে রাখা আয়না যাতে কেউই নিজের মুখ দেখতে পায় না কিন্তু অন্যদের মুখ দেখতে পায়। সামনের দিকে রয়েছে ১৮ ফুট উচ্চতার ৭ টি বড় বড় থাম, রয়েছে ক্যাম্পাসে প্রবেশের বিভিন্ন দরজা।
১৯৮৫ সালে ‘আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ প্রাসাদটি নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং প্রাসাদটি জাদুঘর হিসেবে জনগণের জন্য খুলে দেয়। প্রায় কুড়িটি গ্যালারিতে নবাবী আমলের বিভিন্ন জিনিস প্রদর্শনের জন্য রাখা আছে। ৪৭৪২টি অ্যান্টিকের মধ্যে ১০৩৪ টি বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র, ইতালীয়, ওলন্দাজ ও ফরাসি শিল্পীদের আঁকা মূল্যবান ছবি, পুরানো ম্যাপ, পোর্সেলিন বাসন, দুষ্প্রাপ্য দলিল, বারো হাজার বই ও নানারকম পান্ডুলিপি এই গ্যালারিগুলিতে রাখা আছে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে হাজারদুয়ারি মিউজিয়াম। এখানে ভারতীয়দের জন্য প্রবেশমূল্য ২০ টাকা এবং বিদেশিদের জন্য ২৫০ টাকা।
এই জায়গায় যেদিন ঘোরার প্ল্যান করছেন, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া সাইটের থেকে আগেভাগেই সেইদিনের টিকিট কেটে রাখুন। এর ফলে আপনাকে এখানে পৌঁছে ভিড়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে না এবং আপনার টিকিট হারানোর ভয়ও থাকবে না।হাজারদুয়ারি দেখার সময় মোবাইল নিষ্ক্রিয় করে ব্যাগপত্র সহ বাইরে কাউন্টারে জমা করতে হয়। ভিতরে ছবি তোলা নিষেধ।
ক্লক টাওয়ার
হাজারদুয়ারী এবং নিজামত ইমামবাড়ার মাঝে রয়েছে একটি ক্লক টাওয়ার, এটিকে মুর্শিদাবাদের বিগ বেন বলা হয়ে থাকে। টাওয়ারটি ডানকান ম্যাক লিওডের সহকারী সাগর মিস্ত্রি ডিজাইন করেছিলেন। এর উপরে রয়েছে একটি বৃহৎ ঘন্টা।
নিজামত ইমামবাড়া
হাজারদুয়ারির ঠিক বিপরীত দিকেই এই বিশাল রাজকীয় প্রাসাদটি অবস্থিত। ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত ধবধবে সাদা ইমামবাড়াটি দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। নবাব সিরাজের তৈরী নিজামত ইমামবাড়া মূলত কাঠ দিয়ে নির্মিত হয়েছিল এবং দু-দুবার আগুন লেগে এটি ধ্বংস হয়ে যায়। নবাব সিরাজের ইমামবাড়া অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর ১৮৪৭ সালে মনসুর আলী খান ফেরাদুন জাহ এটি নির্মাণ করেছিলেন। ৬৮০ ফুট লম্বা ইমামবাড়াটি পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের বৃহত্তম ইমামবাড়া। ইমামবাড়ার ঠিক সামনেই দেখা যাবে মদিনা মসজিদ।

বিশ্বাস করা হয় সিরাজুদ্দৌলা নিজে মদিনা থেকে মাটি এনেছিলেন যা এই মসজিদ তৈরির সময় তার ভিতে লাগানো হয়। বিশ্বাস করা হয় নবাব সিরাজ এমনটি করেছিলেন যাতে গরীব ধর্মপ্রাণ মুসলিম প্রজারা হজ করতে যেতে না পারলেও তার কিছুটা স্বাদ যাতে এখানে মেটাতে পারে। বর্তমান মসজিদটি ইমামবাড়া চত্বরেই বানানো হয়েছে। মহরমের সময় জনসাধারণ এখানে অবাধে প্রবেশ করতে পারে। মহরমের সময় জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হলেও বছরের অন্য সময় এটি বন্ধ রাখা হয়।
মোতিঝিল
ঘসেটি বেগমের স্বামী তৎকালীন বাংলার নবাব নওয়াজেশ মোহাম্মদ ঘোড়ার ক্ষুরের আকৃতির এই লেকটি তৈরি করিয়েছিলেন। বলা হয় নবাবি আমলে এই লেকে মুক্ত চাষ করা হত বলেই এর নাম মোতিঝিল। লেকের একটি ধার ঘেঁষে ছিল ঘসেটি বেগমের প্রাসাদ সিংহী দালান।

পরবর্তীকালে ওয়ারেন হেস্টিংস গভর্নর থাকাকালীন এখানে থাকতেন। স্যার জন শোর, পরে লর্ড টেইনমাউথও এখানে থেকেছেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে থাকার কারণে মোতিঝিল “কোম্পানি বাগ” নামেও পরিচিত। বর্তমানে এখানে একটি পার্ক গড়ে উঠেছে যা এখানের জনপ্রিয় একটি পিকনিক স্পট। সবুজে ঘেরা পার্কের ভেতরে বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় সিরাজের পরাজয়ের কাহিনী। পার্কে প্রবেশের জন্য মাথাপিছু টিকিট কিনতে হয়, সঙ্গে পিকনিকের জন্য আলাদা মূল্য লাগে। পিকনিকের জন্য পার্কের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
কাটরা মসজিদ ও জাহানকোশা কামান
মুর্শিদাবাদের প্রাচীন স্থাপত্যগুলির একটি হল এই কাটরা মসজিদ। মুর্শিদকুলি খান এটি তৈরি করেন এবং তাঁর সমাধিও এখানে গেলে দেখতে পাবেন। এই মসজিদ ইসলামী শিক্ষার একটি বড় কেন্দ্র ছিল। বিশাল অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত এই মসজিদের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ইতিহাস। মসজিদের প্রাচীন স্থাপত্য আপনাকে মুগ্ধ করবে। মসজিদের নানা কুঠুরিতে ঘুরে ঘুরে ইতিহাসকে গায়ে মেখে রোমাঞ্চ অনুভবের অসাধারণ সুযোগ পর্যটকেরা এখানে পাবেন। কাটরা মসজিদের কাছে অবস্থিত জাহানকোশা কামানটিও দেখার মতো বস্তু। জনাদন কর্মকার নামে একজন এটি নির্মাণ করেন এবং মুর্শিদকুলি এই কামান কিনেছিলেন।
জগৎ শেঠের বাড়ি
আরেকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান হল জগৎ শেঠের বাড়ি। সেসময়ের ধনী পরিবার ছিল এটি। জগৎ শেঠ কোনও একজন ব্যক্তির নাম নয়, এটা পারিবারিক উপাধি। তাদের পারিবারিক ব্যবসা ছিল মহাজনি। এই বাড়িটি থেকেই তৎকালে ব্যাঙ্কিংয়ের কাজ চলত। নবাব সিরাজের সঙ্গে তৎকালীন জগৎ শেঠের মালিক মহতাব রাইয়ের ঝামেলা শুরু হলে তিনি পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের অর্থসাহায্য করেছিলেন। বর্তমানে প্রাসাদটি জাদুঘরে পরিবর্তিত হয়েছে। টিকিট কেটে পর্যটকেরা এখানে প্রবেশ করতে পারেন।
ফৌতি মসজিদ
হাজারদুয়ারী থেকে এক কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত ফৌতি মসজিদ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান।

মজার ব্যাপার হল এটি একটি অসম্পূর্ণ মসজিদ। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে নবাব মাত্র একদিনে এই মসজিদ নির্মাণের আদেশ দেন, কিন্তু রাজমিস্ত্রীরা সেই সময়ের মধ্যে তা সম্পন্ন করতে পারেননি৷ কেউ বলেন অর্থের অভাবে, কেউ আবার বলেন আলীবর্দি খানের আক্রমণের কারণে মসজিদটি সম্পূর্ণ করা যায়নি। তারপর কোন নবাব এটি সম্পূর্ণ করার দায়িত্বও নেননি। এখন এটি ধ্বংসস্তুপের মত পড়ে আছে।
কাঠগোলা প্রাসাদ এবং বাগান
কাঠগোলা প্রাসাদ এবং বাগান মুর্শিদাবাদের অবশ্য দ্রষ্টব্য একটি স্থানের মধ্যে পড়ে। এটির নির্মাতা রায় বাহাদুর লক্ষ্মীপতি সিং দুগার। চিত্তাকর্ষক প্রাসাদ, নহবতখানা এবং অতীব সুন্দর বাগান, নানা জাতের কাঠগোলাপ, স্বচ্ছ ও সবুজ মনোরম পরিবেশ ইত্যাদি সবকিছুই পর্যটকদের মুগ্ধ করে দেবে। এর ভিতরে প্রথম জৈন তীর্থঙ্কর আদিনাথকে উৎসর্গীকৃত মন্দিরটি বিশেষ আকর্ষণীয়। বর্তমানে এখানে একটি চিড়িয়াখানা নির্মিত হয়েছে যেখানে রয়েছে বেশ কিছু পাখি।
আজিমুন্নিসা বেগমের সমাধি ও মসজিদ
আজিমুন্নিসা বেগম মুর্শিদকুলি খানের কন্যা। কথিত আছে যে এক কঠিন ব্যাধি থেকে সেরে ওঠার জন্য আজিমুন্নিসাকে শিশুদের কলিজা খাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি তাই করেওছিলেন। সেকারণে তাঁকে কলিজা-খাকি বেগমও বলা হয়ে থাকে। এই বেগমেরই সমাধি এবং তাকে ঘিরে গড়ে তোলা এই মসজিদ একটি আকর্ষণীয় দ্রষ্টব্য স্থান।
খোশবাগ
ভাগীরথীর অপর পাড়ে অবস্থিত খোশবাগ একটি উল্লেখযোগ্য স্থান। এখানে আলীবর্দি খান, নবাব সিরাজুদ্দৌলা এবং তাঁর স্ত্রীয়ের কবর দেখতে পাওয়া যায়। রয়েছে সুদৃশ্য বাগান, সবুজ প্রাঙ্গন। জায়গাটিতে এক শান্ত প্রকৃতি বিরাজ করে।
এছাড়াও জাফরগঞ্জ কবরস্থান (যেখানে মীরজাফর এবং তাঁর পরিবারের অন্যান্যদের সমাধি রয়েছে), নসিপুর প্রাসাদ, ওয়াসিফ মঞ্জিল ইত্যাদি জায়গাগুলিও মুর্শিদাবাদের অবশ্য দ্রষ্টব্য স্থানের তালিকায় পড়বে। মুর্শিদাবাদের আশেপাশে আরও বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে, যেগুলিরও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অসীম। প্রথমেই মনে আসে কর্ণসুবর্ণের কথা। এটি শশাঙ্কের আমলে গৌড়ের রাজধানী ছিল। কর্ণসুবর্ণ বহরমপুর সাবডিভিশনের অন্তর্গত। মুর্শিদাবাদ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে কাশিমবাজার চলে গেলে কাশিমবাজার রাজবাড়ি। কাশিমবাজার বড়ো রাজবাড়িটি ভগ্নপ্রায় অবস্থায় পড়ে আছে যা কেবল বাইরে থেকেই দেখতে পাবেন আর অনবদ্য ছোটো রাজবাড়িটি মুগ্ধ করবে।
কাছাকাছি রয়েছে সেন্ট মেরির আর্মেনিয়ান চার্চ, ব্যাসপুর শিব মন্দির এবং পাতালেশ্বর শিব মন্দির ইত্যাদি। আজিমগঞ্জের দিকে গেলে পোড়ামাটির বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির দেখতে পাওয়া যাবে। অষ্টাদশ শতকে রাণী ভবানী এগুলি নির্মাণ করেছিলেন। আজিমগঞ্জের ৯টি জৈন মন্দির পরিদর্শন করতে পারলে তা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। প্রচুর মন্দির থাকার কারণে আজিমগঞ্জ এলাকা প্রাচ্যের কাশী নামে পরিচিত।
মুর্শিদাবাদে কখন যাবেন
সারাবছরই বিভিন্ন সময়ে মুর্শিদাবাদে পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে । তবে অক্টোবর থেকে মার্চ অর্থাৎ শীতকালটাই মুর্শিদাবাদ ঘোরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত এবং আরামদায়ক। গ্রীষ্মকালে মুর্শিদাবাদের তাপমাত্রা প্রচণ্ড বেশি থাকে ফলে তা ভ্রমণের পক্ষে দুঃসহনীয় হয়ে ওঠে। আবার বর্ষাকালে শহরের অধিকাংশ স্থানই জলমগ্ন থাকায় তা ভ্রমণের ক্ষেত্রে অসুবিধা সৃষ্টি করে।
মুর্শিদাবাদে কী কিনবেন
মুর্শিদাবাদে সিল্ক এবং বালুচরী শাড়ি ভীষণই জনপ্রিয়। মুর্শিদাবাদের বালুচরে এই শাড়ি তৈরি হত বলে এর নাম বালুচরী। স্থানীয় মার্কেট থেকে তা সংগ্রহ করতে পারেন পর্যটকেরা। তবে বেশিরভাগ বালুচর কারিগর বহুদিন হল বিষ্ণুপুরে চলে এসেছেন। তাই খুব একটা ভাল বালুচরী শাড়ি নাও পেতে পারেন এবং কিনবার সময় অবশ্যই ভাল করে যাচাই করে নেবেন। এছাড়াও মুর্শিদাবাদের তামা ও কাসার তৈরি বাসনপত্রেরও খুব নামডাক রয়েছে। হাজারদুয়ারি গেলে অবশ্যই স্মারক হিসেবে কিছু কেনাকাটা করা যায়। হাজারদুয়ারির স্নৃতি হিসেবে কাছের দোকান থেকে নিতে পারেন প্রাসাদের রেপ্লিকা বা বচ্চেওয়ালি কামানের রেপ্লিকা।
সতর্কতা ও পরামর্শ
- হাজারদুয়ারী-সহ আরও অনেকগুলি দর্শনীয় স্থানে প্রবেশের সময় নির্দিষ্ট করা আছে অতএব পরিদর্শনের সময় সম্পর্কে জেনে নিয়ে ভ্রমণে বেরোবেন। যেমন হাজারদুয়ারি খোলা থাকে সকাল নটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। টোটো করে ঘোরবার আগে তাদের সাথে কথা বললেই বিভিন্ন জায়গায় ঘোরবার সময় জানতে পারবেন।
- টোটো ভাড়া করার আগে অবশ্যই ভাড়ার কথা বলে নেবেন।
- হাজারদুয়ারি সহ অন্যান্য মিউজিয়ামের ভিতর ছবি তোলা নিষিদ্ধ।
- ঐতিহাসিক এইসব স্থানের সংরক্ষিত সবুজ পরিবেশ অযথা নোংরা করলে জরিমানা হবে।
- গ্রীষ্মকালে প্রচন্ড গরম এবং বর্ষাকালে জলমগ্ন অবস্থার কারণে ভ্রমণের আনন্দ মাটি হতে পারে।
- শাড়ি বা অন্য সামগ্রী কেনাকাটার আগে জিনিসপত্রের দাম অবশ্যই জেনে নিন এবং জিনিসটি যাচাই করে নিন।
ট্রিপ টিপস
- যেদিন হাজারদুয়ারি ঘোরার প্ল্যান করছেন, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া সাইটের থেকে আগেভাগেই সেইদিনের টিকিট কেটে রাখুন। এর ফলে আপনাকে সেখানে পৌঁছে ভিড়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে না এবং আপনার টিকিট হারানোর ভয়ও থাকবে না।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান